📄 যিকির সব কিছুর মূল
৩৭. যিকরুল্লাহ সব কিছুর মূল, সকল শ্রেণির মানুষের জন্য ফলপ্রসূ এবং বিলায়েত অর্জনে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। যার জন্য যিকরুল্লাহর দরজা খুলে দেওয়া হয়, তার জন্য আল্লাহর নৈকট্যলাভের ও তাঁর কাছে পৌঁছার দরজা খুলে দেওয়া হয়। অতএব, যার জন্য এ দরজা খুলে দেওয়া হয়, তার দায়িত্ব হচ্ছে, পবিত্রতা অর্জন করে রবের কাছে পৌঁছে যাওয়া। যে তাঁর কাছে পৌঁছতে পারবে সে যা চাইবে তাই পাবে, তাতে কোনো কমতি থাকবে না। যে তার রবকে পায় সে তাবৎ কিছু পেয়ে যায় আর যে তার রবকে হারিয়ে ফেলে সে সবকিছু হারিয়ে ফেলে।
📄 যিকরুল্লাহ একটি ফরজ গাছ
৪১. যিকরুল্লাহ একটি ফলজ গাছ। যে মারিফত ও আহওয়াল৭৪ অর্জনের জন্য সালিক তথা আধ্যাত্মিকপন্থীরা কোমর বেঁধে পরিশ্রম করে, যিকরুল্লাহ সেই মারিফত ও আহওয়ালের ফল দেয়। এই ফল যিকরুল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। যিকরুল্লাহর গাছ যত প্রকাণ্ড হবে, এর শিকড় যত শক্ত হবে, তার ফল তত বেশি পাওয়া যাবে। অতএব, বোঝা যায়, যিকরুল্লাহ সকল প্রকার ‘মাকামাত’ ৭৫ এর ফল প্রদান করে।
যিকিরকারী গাফলতি দূর করে তাওহিদের সামিয়ানায় আশ্রয় নেয়। আর সকল মাকামাতের মূল হল তাওহিদ। তাওহিদের ওপর সকল মাকামাত ভিত্তিশীল, যেমন পিলারের ওপর বিল্ডিং ভিত্তিশীল। বান্দা যদি গাফিলতি দূর না করে, তখন তার পক্ষে আল্লাহর পথের সফর শেষ করা সম্ভব নয়। আর আগেই বলেছি, গাফলতি দূর করতে হলে যিকরুল্লাহর আশ্রয় নিতে হবে। গাফলতি হল অন্তরের ঘুম; বরং গাফলতি অন্তরকে মেরে ফেলে। যখন কেউ গাফেল থাকে, তার অন্তরের অপমৃত্যু ঘটে।
টিকাঃ
৭৪. আহওয়াল অর্থ: অন্তরের অবস্থা জানতে পারা。
৭৫. মাকামাত একটি আধ্যাত্মিক পরিভাষা। মাকামাত বলতে বোঝানো হয়, ইবাদত ও মুজাহাদা করতে গিয়ে নিজেকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো মনে করা।
📄 যিকরুল্লাহ সাদকা ও জিহাদ থেকে উত্তম
৪৩. যিকরুল্লাহ দাস মুক্ত করা, সম্পদ দান করা এবং জিহাদের জন্য ঘোড়াসহ যুদ্ধাস্ত্র দান করার সমপর্যায়ের ইবাদত; এমনকি স্বয়ং নিজেই অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো ইবাদত। আমরা পূর্বে একটি হাদিসে জেনেছি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি একশত বার
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌفِ
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহুদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া হল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর'
অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান; পড়ে, সে দশটি গোলাম মুক্ত করার সমান সাওয়াব পায়। তার জন্য একশত সাওয়াব লেখা হয় এবং আর একশত গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া ঐদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান থেকে হিফাযতে থাকে। কোনো লোক তার চেয়ে উত্তম সাওয়াবের কাজ করতে পারে না; তবে ঐ ব্যক্তি করতে পারে, যে তার চেয়ে বেশিবার এই দুআটি পাঠ করে। ৮৪
ইবন আবীদ দুনইয়া আমাশ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি সালিম ইবন আবীজ জাদ থেকে বর্ণনা করেন। সালিম বলেন, আবু দারদাকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়, 'অমুক ব্যক্তি একশত দাস মুক্ত করেছে।'
তিনি বলেন, 'একশত দাস মুক্ত করা তো অনেক বড় সদকা। তবে এর চেয়ে উত্তম হল, এমন ঈমান যা রাতদিন বান্দার সাথে থাকে এবং এমন যিকির যার মাধ্যমে বান্দার জিহ্বা সিক্ত থাকে। '৮৫
বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আল্লাহর রাস্তায় যতগুলো স্বর্ণমুদ্রা খরচ করব, ততবার সুবহানাল্লাহ বলা আমার কাছে অধিক প্রিয়। '৮৬
একদিন আবদুল্লাহ ইবন আমর ও আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) একসাথে বসে ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ বললেন, "রাস্তায় চলতে চলতে আল্লাহর পথে যতগুলো স্বর্ণমুদ্রা খরচ করব, ততবার 'সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার' বলা আমার কাছে অধিক প্রিয়।"
তখন আবদুল্লাহ ইবন আমার বললেন, "রাস্তায় চলতে চলতে আল্লাহর পথে যে কয়টি ঘোড়া দান করব, ততবার 'সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার' বলা আমার কাছে অধিক প্রিয়। '৮৭
মুআয রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের শ্রেষ্ঠ আমল সম্পর্কে বলব না? যে আমল তোমাদের মালিকের কাছে সবচেয়ে প্রিয়, তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সর্বাধিক সহায়ক, স্বর্ণ-রৌপ্য দান করার চেয়ে অধিক উত্তম এবং শত্রুর মুখোমুখি হয়ে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়া ও তাদের কর্তৃক তোমাদের গর্দান উড়ে যাওয়া থেকে শ্রেষ্ঠ। সাহাবীগণ বললেন, 'অবশ্যই, ইয়া রাসুলাল্লাহ।' তিনি বললেন, যিকরুল্লাহ." ৮৮
টিকাঃ
৮৪. সহীহুল বুখারী, ৩২৯৩; সহীহ মুসলিম, ২৬৯১
৮৫. ইবন আবী শায়বাহ, ১০/৩০৪। এর সনদ বিচ্ছিন্ন। তবে ইমাম মুনযিরী বলেছেন, ইবন আবীদ দুনইয়া হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন। আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ২/৩৬৭
৮۶. মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/২৯১, এর সনদ ভালো।
৮৭. বাইহাকী, শুআবুল ঈমান, ২/৫৬৭-৫৬৮; সনদে অপরিতির বর্ণনাকারী রয়েছে। মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/২৯২; এর সনদ ভালো তবে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের কথা উল্লেখ নেই।
৮৮. সুনানুত তিরমিযী, ৩৩৭৭; হাদিসটি সহীহ
📄 যিকির শোকরের মূল
৪৪. শোকরের মূল হল যিকির। যে যিকির করে না সে আল্লাহর শুকরিয়া করতে পারে না। যাইদ ইবন আসলাম থেকে বর্ণিত, মূসা আলাইহিস সালাম বলেন,
'ইয়া রব, আপনি আমাকে অগণিত নেয়ামতে সিক্ত করেছেন। এখন আমাকে আপনার অগণিত শোকর করার উপায় বাতলে দিন!'
আল্লাহ বলেন, 'তুমি বেশি বেশি আমার যিকির করো। যতবার আমার যিকির করবে ততবার আমার শোকর আদায় করা হবে। অতএব, বেশি বেশি যিকির করো। আর আমার থেকে গাফেল হয়ে গেলে আমার নেয়ামতের প্রতি কুফরি করা হবে।'৮৯
আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলেন, মূসা আলাইহি সালাম বলেন, 'ইয়া রব, কোন ধরণের শোকর আপনার শানে উপযুক্ত?'
তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওহি করে বলেন, 'আমার যিকিরের মাধ্যমে তোমার জিহ্বাকে সিক্ত রাখবে।'
মূসা আলাইহিস সালাম আবার বলেন, 'ইয়া রব, কখনো কখনো আমি এমন অবস্থায় থাকি যে, ঐ অবস্থায় যিকির করা থেকে আপনার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অনেক উর্ধ্বে।'
আল্লাহ বলেন, 'কী সেই অবস্থা?'
তিনি বলেন, 'অপবিত্রতা ও পেশাব-পায়খানা।'
আল্লাহ বলেন, 'তখনও আমার যিকির করবে।'
মূসা বলেন, 'তখন কী বলে আপনার যিকির করব?'
তিনি বলেন,
سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ جَنِّبْنِي الْأَذَى سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ قِنِي الْأَذَى
'সুবহানাকা ওয়াবিহামদিকা ওয়া জান্নিবনিল আযা ওয়া সুবহানাকা ওয়াবিহামদিকা ফাকিনিল আযা।'
অর্থাৎ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং তোমার প্রশংসা করছি, তুমি আমাকে কষ্টদায়ক বস্তু থেকে দূরে রাখো। তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং তোমার প্রশংসা করছি, তুমি আমাকে কষ্টদায়ক বস্তু থেকে বাঁচিয়ে রাখো।৯০
টিকাঃ
৮৯. শুআবুল ঈমান, ২/৫৭৪; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১৩/২১২
৯০. শুআবুল ঈমান, ২/৫৯১