📘 যিকরুল্লাহ > 📄 পানি ও আগুনের দৃষ্টান্ত

📄 পানি ও আগুনের দৃষ্টান্ত


এ কারণে আল্লাহ তাআলা দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন: আগুন ও পানির। কারণ, পানির মাধ্যমে জীবন পাওয়া যায় আর আগুনের মাধ্যমে উজ্জ্বলতা ও আলো পাওয়া যায়।

আগুনের দৃষ্টান্ত পেশ করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَا يُبْصِرُونَ
তাদের (মুনাফিকদের) দৃষ্টান্ত হচ্ছে, এক ব্যক্তি আলোর জন্য আগুন প্রজ্জ্বলিত করলো; তারপর আগুন যখন তার আশপাশ আলোকিত করলো তখন আল্লাহ তাদের আলো ছিনিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারের মধ্যে ছেড়ে দিলেন। ৬৭

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি মুনাফিকদের আলো ছিনিয়ে নেন; তাদের আগুন ছিনিয়ে নেন না। আগুনে দাহন ও আলো উভয়টি থাকে। কিন্তু তিনি তাদের আলো ছিনিয়ে নিয়ে দাহন তাদের মাঝে রেখে দেন; যাতে তারা দহিত হতে থাকে এবং কষ্টে জীবন অতিবাহিত করে।

মুনাফিকদের অবস্থা এমনই। নিফাকীর কারণে তাদের আলো ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং কুফর ও সন্দেহ-সংশয়ের দাহন তাদের মাঝে রেখে দেওয়া হয়। ফলে দুনিয়াতে ঐ দাহন তাদের অন্তরকে পোড়াতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তাদের এমন আগুনে পোড়াবেন যে আগুন সরাসরি তাদের অন্তরে আঘাত হানবে।

আয়াতে উল্লিখিত উদাহরণটি তাদের জন্য, যারা দুনিয়াতে ঈমানের আলোকে সঙ্গী বানায়নি; বরং ঈমানের আলো পাওয়ার পর তা থেকে বেরিয়ে গেছে। আর এটা মূলত মুনাফিকদের স্বভাব। তারা ইসলামের বিধান জানার পর মানতে চায় না। তা স্বীকার করার পর অস্বীকার করে ফেলে। ফলে, তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং পরিগণিত হয় বধির, মূক ও অন্ধ হিসেবে; যেমনটি আল্লাহ তাদের ভাই কাফিরদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا صُمٌّ وَبُكُمْ فِي الظُّلُمَاتِ
যারা আমাদের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তারা বধির, মূক ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। ৬৮

অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَنِدَاءً صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ
কাফিরদের তুলনা সেই ব্যক্তির সাথে যে এমন কিছুকে চিৎকার করে ডাকে, কিন্তু যাকে ডাকে সে ডাক আর সম্বোধন ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না। তারা বধির, মূক, ও অন্ধ; কাজেই তারা বুঝবে না। ৬৯

টিকাঃ
৬৭. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭
৬৮. সূরা আনআম, আয়াত: ৩৯
৬৯. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭১

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 মুনাফিক ও কাফিরদেরকে সর্বোচ্চ পার্থক্য

📄 মুনাফিক ও কাফিরদেরকে সর্বোচ্চ পার্থক্য


আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন আগুন প্রজ্জ্বলনকারী ব্যক্তির সাথে। আগুন প্রজ্জ্বলনকারী ব্যক্তি যেমন আগুন জ্বালানোর পর আশপাশ আলোকিত হলে সে তার আলো হারিয়ে ফেলে, তেমনি মুনাফিকরা ঈমান আনয়নের মাধ্যমে আলোকিত হওয়ার পর আবার সে আলো থেকে বের হয়ে যায়। এছাড়াও মুনাফিকরা মুসলিমদের সাথে চলাফেরা উঠাবসা করে, তাদের সাথে সালাত আদায় করে, তাদের সাথে সিয়াম পালন করে, কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করে, ইসলামের সৌন্দর্য ও নিদর্শন অবলোকন করে এবং আলো দর্শন করে, এরপরও তা থেকে বের হয়ে যায়। এ কারণে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ
"তারা আর ফিরে আসবে না।"

কেননা তারা ইসলামে আসা ও ইসলাম দ্বারা আলোকিত হওয়ার পর ইসলাম ত্যাগ করেছে। ফলে তারা আর ইসলামে ফেরত আসবে না। অপরপক্ষে কাফিরদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَلُقِعْدَ لَا مُهُفَ
কাজেই তারা বুঝবে না।' কারণ, কাফিরেরা ইসলাম বুঝেনি, ইসলামে প্রবেশ করেনি এবং ইসলাম দ্বারা আলোকিত হয়নি; বরং তারা কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং বধির, মূক ও অন্ধ।

টিকাঃ
৭০. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৮

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 আলোর কারণে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে

📄 আলোর কারণে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে


আল্লাহ তাআলা ‘জীবন’ বোঝাতে ‘আলো’ আর ‘মৃত’ বোঝাতে ‘অন্ধকার’ অভিধা ব্যবহার করেছেন। আত্মা ও দেহ উভয়ের জীবন আলোর ওপর নির্ভরশীল। আলো যেমন উজ্জ্বলতার মূল উপকরণ, ঠিক জীবনেরও মূল উপকরণ। আলো ছাড়া উজ্জ্বলতা ও জীবন কোনোটারই অস্তিত্ব নেই। আলোর মাধ্যমে অন্তর জীবন পায় এবং হৃদয় প্রসারিত ও প্রশস্ত হয়। যেমন তিরমিযীর হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "অন্তরে আলো প্রবেশ করলে তা প্রশস্ত ও প্রসারিত হয়ে যায়। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেন, এর আলামত কী? তিনি বলেন, চিরস্থায়ী জগতের প্রতি উদগ্রীব হওয়া, ধোঁকার জগত থেকে দূরে থাকা এবং মৃত্যু আসার পূর্বেই তার প্রস্তুতি নেওয়া।”৭১

কেবল মাত্র আলো ওপরের দিকে আল্লাহর কাছে উঠতে পারে। আলো ছাড়া অন্য কিছু ওপরের দিকে আল্লাহর কাছে উঠতে পারে না। বান্দার আমল ও কথাকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয় তার আলো। আল্লাহর দিকে উত্তম কথা এই আলোর কারণেই উঠতে পারে; অন্যথায় তা উঠতে পারত না। উত্তম কথা আলো, কারণ আলো থেকে তা উৎসারিত। উত্তম কথা ছাড়াও বান্দার সৎআমল ও উত্তম আত্মা আল্লাহর দিকে উঠতে সক্ষম হয়। উত্তম আত্মা দ্বারা মুমিনদের আত্মা ও ফেরেশতাগণকে বোঝানো হয়েছে। এই দুই আত্মা আলো হওয়ার কারণে আল্লাহর দিকে উঠতে সক্ষম হয়। মুমিনদের আত্মা আল্লাহর রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ আলো দ্বারা আলোকিত আর ফেরেশতারা আলো থেকে সৃষ্ট। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'ফেরেশতাদেরকে আলো থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। শয়তানকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে। আর আদমকে যা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার বর্ণনা তোমাদের দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।'

টিকাঃ
৭১. তিরমিযীতে এই হাদিস পাওয়া যায়নি। ইবন মুবারক, আয-যুহদ, ১/১০৬; মুসতাদরাক হাকিম, ৪/৩১১; হাদিসটি মুরসাল

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 উত্তম আত্মা ও খারাপ আত্মা

📄 উত্তম আত্মা ও খারাপ আত্মা


ফেরেশতাগণ আলো থেকে সৃষ্ট হওয়ার কারণে তারা তাদের রবের পানে উঠতে সক্ষম হয়। অনুরূপভাবে ফেরেশতাগণ যখন মুমিনদের আত্মা কবজ করে নেয়, তখন তাদের আত্মা রবের পানে উঠে যায়। তাদের আত্মার জন্য দুনিয়ার আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এরপর তৃতীয় আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এভাবে সাত আসমান পাড়ি দিয়ে রবের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখন তাদের রব তাকে ইল্লীয়্যিন অধিবাসীদের তালিকায় তালিকাভুক্ত করে দেন। মুমিনদের আত্মা পবিত্র, উত্তম, আলোকিত ও উজ্জ্বল হওয়ার কারণে ফেরেশতাদের সাথে আল্লাহর দিকে ওপরে উঠে যায়।

এর বিপরীতে বেঈমানদের অন্ধকারাচ্ছন্ন খারাপ ও কুৎসিত আত্মার জন্য আসমানের দরজা খোলা হয় না, আল্লাহর দিকে তা আর উঠতে পারে না। তাকে প্রথম আসমান থেকে তার যোগ্য স্থান দুনিয়ায় নিক্ষেপ করা হয়। এভাবে প্রত্যেক আত্মাকে তার উপাদান ও যোগ্য স্থানে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এসব কথা এক সহীহ হাদিসে বিশদাকারে বর্ণিত হয়েছে।

মোদ্দাকথা, আল্লাহর দিকে শুধুমাত্র আলোকিত আমল, কথা ও আত্মা উঠতে পারে। যার আলো যত বেশি, সে আল্লাহর তত নিকটবর্তী, তাঁর কাছে তত সম্মানিত।

মুসনাদ আহমাদে আবদুল্লাহ ইবন আমর রাযিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
'আল্লাহ তাআলা মাখলুককে অন্ধকারে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাতে তাঁর আলোর তাজাল্লি দিয়েছেন। যে এই আলো পেয়েছে সে হিদায়াত পেয়ে গেছে আর যে এই আলো পায়নি সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। এজন্যই আমি বলি, কলম আল্লাহর ইলমে শুকিয়ে গিয়েছে। ৭৩

এটি একটি চমৎকার হাদিস। এখানে ঈমানের একটি মূলনীতি আলোচিত হয়েছে। এ হাদিস থেকে তকদিরের তত্ত্ব, রহস্য ও হিকমতসহ তকদিরের নানা বিষয়ের সমাধান দেওয়া হয়েছে।

টিকাঃ
৭২. সহীহ মুসলিম, ২৯৯৬
৭৩. মুসনাদ আহমাদ, ২/৬২৪-৬২৫; সুনানুত তিরমিযী, ২৬৪২; হাদিসটি সহীহ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00