📄 আলো ও জীবনের সম্পর্ক
এই দুই প্রকার আলো একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো স্থান বা জায়গায় যদি দুই প্রকার আলোর কোনো এক প্রকার অনুপস্থিত থাকে, তবে সে স্থান ও জায়গা মানুষ ও প্রাণীর বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। কেননা মানুষ ও প্রাণীর বসবাসের জন্য আলোকিত স্থান অত্যাবশ্যক। অন্ধকারে নিমজ্জিত স্থানে, যেখানে কোনো আলো নেই, সেখানে কোনো প্রাণী বসবাস করতে পারে না। এই অবস্থা উম্মাতে মুহাম্মাদীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে উম্মত ও অন্তর থেকে ওহি ও ঈমানের আলো হারিয়ে যায়, সে উম্মত ও অন্তর জিন্দা লাশে পরিণত হয়, তার মাঝে কোনো প্রাণ থাকে না; যে স্থানে কোনো আলো থাকে না, সেখানে কোনো প্রাণীর জীবনও থাকে না।
আল্লাহ তাআলা আলো ও জীবনকে এক সাথে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا
যে ব্যক্তি ছিলো মৃত তাকে আমি জীবিত করেছি এবং একটি আলো দান করেছি যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলতে পারে-সে কি ঐ ব্যক্তির মতো হতে পারে, যে অন্ধকারে নিমজ্জিত, যা থেকে সে বের হতে পারে না?৬৫
অন্য আয়াতে তিনি বলেন,
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا
এভাবেই আমি আপনার কাছে আমার আদেশের একটি প্রাণ পাঠিয়েছি। এর আগে আপনি জানতেন না কিতাব কী আর ঈমান কী। তবে আমি একে একটি আলো করেছি, যার সাহায্যে আমি আমার বান্দাদের মধ্যথেকে যাকে চাই পথ দেখাই। ৬৬
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমি আপনার কাছে যে প্রাণ পাঠিয়েছি, তাকে আলো বানিয়ে দিয়েছি। অতএব, উল্লিখিত আয়াতে কুরআনকে প্রাণ বলে অবহিত করা হয়েছে। কারণ কুরআন-ই জীবন ও প্রাণ। আবার প্রাণকে আলো বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, কুরআনের মাধ্যমে সবাই আলোকিত হয়। তাই প্রমাণ হয়, জীবন ও আলো একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতএব, যেখানে প্রাণের মাধ্যমে জীবন পাওয়া যাবে সেখানে আলোও পাওয়া যাবে। আবার যেখানে আলো পাওয়া যাবে সেখানে প্রাণও পাওয়া যাবে। যার অন্তর এই প্রাণকে গ্রহণ করে না, সে মৃত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত; যেমন কোনো দেহ থেকে প্রাণপাখি উড়ে গেলে সে মারা যায়। হয়ে পড়ে মূল্যহীন।
টিকাঃ
৬৫. সূরা আনআম, আয়াত: ১২২
৬৬. সূরা শূরা, আয়াত: ৫২
📄 পানি ও আগুনের দৃষ্টান্ত
এ কারণে আল্লাহ তাআলা দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন: আগুন ও পানির। কারণ, পানির মাধ্যমে জীবন পাওয়া যায় আর আগুনের মাধ্যমে উজ্জ্বলতা ও আলো পাওয়া যায়।
আগুনের দৃষ্টান্ত পেশ করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَا يُبْصِرُونَ
তাদের (মুনাফিকদের) দৃষ্টান্ত হচ্ছে, এক ব্যক্তি আলোর জন্য আগুন প্রজ্জ্বলিত করলো; তারপর আগুন যখন তার আশপাশ আলোকিত করলো তখন আল্লাহ তাদের আলো ছিনিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারের মধ্যে ছেড়ে দিলেন। ৬৭
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি মুনাফিকদের আলো ছিনিয়ে নেন; তাদের আগুন ছিনিয়ে নেন না। আগুনে দাহন ও আলো উভয়টি থাকে। কিন্তু তিনি তাদের আলো ছিনিয়ে নিয়ে দাহন তাদের মাঝে রেখে দেন; যাতে তারা দহিত হতে থাকে এবং কষ্টে জীবন অতিবাহিত করে।
মুনাফিকদের অবস্থা এমনই। নিফাকীর কারণে তাদের আলো ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং কুফর ও সন্দেহ-সংশয়ের দাহন তাদের মাঝে রেখে দেওয়া হয়। ফলে দুনিয়াতে ঐ দাহন তাদের অন্তরকে পোড়াতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তাদের এমন আগুনে পোড়াবেন যে আগুন সরাসরি তাদের অন্তরে আঘাত হানবে।
আয়াতে উল্লিখিত উদাহরণটি তাদের জন্য, যারা দুনিয়াতে ঈমানের আলোকে সঙ্গী বানায়নি; বরং ঈমানের আলো পাওয়ার পর তা থেকে বেরিয়ে গেছে। আর এটা মূলত মুনাফিকদের স্বভাব। তারা ইসলামের বিধান জানার পর মানতে চায় না। তা স্বীকার করার পর অস্বীকার করে ফেলে। ফলে, তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং পরিগণিত হয় বধির, মূক ও অন্ধ হিসেবে; যেমনটি আল্লাহ তাদের ভাই কাফিরদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا صُمٌّ وَبُكُمْ فِي الظُّلُمَاتِ
যারা আমাদের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তারা বধির, মূক ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। ৬৮
অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَنِدَاءً صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ
কাফিরদের তুলনা সেই ব্যক্তির সাথে যে এমন কিছুকে চিৎকার করে ডাকে, কিন্তু যাকে ডাকে সে ডাক আর সম্বোধন ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না। তারা বধির, মূক, ও অন্ধ; কাজেই তারা বুঝবে না। ৬৯
টিকাঃ
৬৭. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭
৬৮. সূরা আনআম, আয়াত: ৩৯
৬৯. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭১
📄 মুনাফিক ও কাফিরদেরকে সর্বোচ্চ পার্থক্য
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন আগুন প্রজ্জ্বলনকারী ব্যক্তির সাথে। আগুন প্রজ্জ্বলনকারী ব্যক্তি যেমন আগুন জ্বালানোর পর আশপাশ আলোকিত হলে সে তার আলো হারিয়ে ফেলে, তেমনি মুনাফিকরা ঈমান আনয়নের মাধ্যমে আলোকিত হওয়ার পর আবার সে আলো থেকে বের হয়ে যায়। এছাড়াও মুনাফিকরা মুসলিমদের সাথে চলাফেরা উঠাবসা করে, তাদের সাথে সালাত আদায় করে, তাদের সাথে সিয়াম পালন করে, কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করে, ইসলামের সৌন্দর্য ও নিদর্শন অবলোকন করে এবং আলো দর্শন করে, এরপরও তা থেকে বের হয়ে যায়। এ কারণে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ
"তারা আর ফিরে আসবে না।"
কেননা তারা ইসলামে আসা ও ইসলাম দ্বারা আলোকিত হওয়ার পর ইসলাম ত্যাগ করেছে। ফলে তারা আর ইসলামে ফেরত আসবে না। অপরপক্ষে কাফিরদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَلُقِعْدَ لَا مُهُفَ
কাজেই তারা বুঝবে না।' কারণ, কাফিরেরা ইসলাম বুঝেনি, ইসলামে প্রবেশ করেনি এবং ইসলাম দ্বারা আলোকিত হয়নি; বরং তারা কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং বধির, মূক ও অন্ধ।
টিকাঃ
৭০. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৮
📄 আলোর কারণে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে
আল্লাহ তাআলা ‘জীবন’ বোঝাতে ‘আলো’ আর ‘মৃত’ বোঝাতে ‘অন্ধকার’ অভিধা ব্যবহার করেছেন। আত্মা ও দেহ উভয়ের জীবন আলোর ওপর নির্ভরশীল। আলো যেমন উজ্জ্বলতার মূল উপকরণ, ঠিক জীবনেরও মূল উপকরণ। আলো ছাড়া উজ্জ্বলতা ও জীবন কোনোটারই অস্তিত্ব নেই। আলোর মাধ্যমে অন্তর জীবন পায় এবং হৃদয় প্রসারিত ও প্রশস্ত হয়। যেমন তিরমিযীর হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "অন্তরে আলো প্রবেশ করলে তা প্রশস্ত ও প্রসারিত হয়ে যায়। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেন, এর আলামত কী? তিনি বলেন, চিরস্থায়ী জগতের প্রতি উদগ্রীব হওয়া, ধোঁকার জগত থেকে দূরে থাকা এবং মৃত্যু আসার পূর্বেই তার প্রস্তুতি নেওয়া।”৭১
কেবল মাত্র আলো ওপরের দিকে আল্লাহর কাছে উঠতে পারে। আলো ছাড়া অন্য কিছু ওপরের দিকে আল্লাহর কাছে উঠতে পারে না। বান্দার আমল ও কথাকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয় তার আলো। আল্লাহর দিকে উত্তম কথা এই আলোর কারণেই উঠতে পারে; অন্যথায় তা উঠতে পারত না। উত্তম কথা আলো, কারণ আলো থেকে তা উৎসারিত। উত্তম কথা ছাড়াও বান্দার সৎআমল ও উত্তম আত্মা আল্লাহর দিকে উঠতে সক্ষম হয়। উত্তম আত্মা দ্বারা মুমিনদের আত্মা ও ফেরেশতাগণকে বোঝানো হয়েছে। এই দুই আত্মা আলো হওয়ার কারণে আল্লাহর দিকে উঠতে সক্ষম হয়। মুমিনদের আত্মা আল্লাহর রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ আলো দ্বারা আলোকিত আর ফেরেশতারা আলো থেকে সৃষ্ট। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'ফেরেশতাদেরকে আলো থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। শয়তানকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে। আর আদমকে যা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার বর্ণনা তোমাদের দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।'
টিকাঃ
৭১. তিরমিযীতে এই হাদিস পাওয়া যায়নি। ইবন মুবারক, আয-যুহদ, ১/১০৬; মুসতাদরাক হাকিম, ৪/৩১১; হাদিসটি মুরসাল