📘 যিকরুল্লাহ > 📄 মুমিনের প্রদীপের ঈমানী তেল

📄 মুমিনের প্রদীপের ঈমানী তেল


উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, প্রদীপ কাঁচের ভেতর অবস্থিত। প্রদীপ মূলত পলিতার মাধ্যমে জ্বলে। অতএব, পলিতা হল আলোর বাহক। আলোর আবার দ্রব্য ও পদার্থ থাকা বাঞ্ছনীয়। আলোর এই দ্রব্য ও পদার্থ হল যাইতুন তেল। আর তা যেনতেন যাইতুন গাছের তেল নয়; বরং এমন যাইতুন গাছের তেল যে গাছ সমতল ভূমিতে অবস্থিত, সকাল-সন্ধ্যায় রোদ পায়। এমন গাছের তেল এতটাই স্বচ্ছ পরিষ্কার হয় যে, যেন আলো ছাড়াই জ্বলে ওঠে। এমন তেলই হচ্ছে আয়াতে উল্লিখিত প্রদীপের আলোর দ্রব্য ও পদার্থ।

মুমিনের হৃদয়ে অবস্থিত প্রদীপের আলোর দ্রব্য ও পদার্থও ঠিক এমন তেল। এ তেল দুনিয়ার কোনো গাছের তেল নয়; বরং ওহি নামক গাছের তেল। আর ওহি পৃথিবীর সবচেয়ে বরকতময় জিনিস এবং সকল প্রকার ভ্রান্তি থেকে মুক্ত; সবচেয়ে মধ্যমপন্থা, বস্তুনিষ্ঠ, উত্তম ও সরল। তাতে না আছে খ্রিষ্টানদের ভ্রান্তি ও বিচ্যুতি, না আছে ইহুদিদের সীমালঙ্ঘন ও ভ্রষ্টতা। যাবতীয় ব্যাপারে ঘৃণিত দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝিতে ওহির অবস্থান। এমন ঈমানী তেল হচ্ছে মুমিনের হৃদয়ে অবস্থিত প্রদীপের দ্রব্য ও পদার্থ। এমন স্বচ্ছ ও পরিষ্কার তেল আগুনের সংস্পর্শ ছাড়া নিজেই নিজেই যেন জ্বলে উঠে। অধিকিন্তু এর সাথে যখন ঈমান নামক আগুন জ্বালানো হয়, তখন তার আলো পূর্ণতার চরম শিখরে পৌঁছে যায় এবং আলোর দ্রব্যও শক্তিশালী হয়ে যায়। ফলে তা যেন হয়ে উঠে নূরুন আলা নূর, আলো আর আলো।

মুমিনের অন্তর এ আলোয় এমনভাবে আলোকিত হতে থাকে যে, তারা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবেই হককে চিনে ফেলে। এর ওপর যখন ওহির দ্রব্য ও পদার্থ এসে যুক্ত হয় এবং শিরায়-উপশিরায় তা ছড়িয়ে পড়ে, তখন ভিতরকার প্রাকৃতিক আলোর সাথে ওহির আলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এভাবে প্রাকৃতিক ও ওহি দুই আলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলে তার আলো বহুগুণে বেড়ে যায়। একেই বলা হয় নূরুন আলা নূর বা আলো আর আলো। ফলে কুরআন ও হাদিস থেকে দলীল না পেলেও তার মুখ দিয়ে হক কথা বেরিয়ে আসে। পরে যখন দলীল পায়, তখন দেখে তার ফিতরাত যে কথা বলেছে তা সম্পূর্ণ দলীলের অনুকূলে। ফলে তা হয়ে যায় নূরুন আলা নূর। মুমিনের অবস্থা এমন হয় যে, সে তার ফিতরাতের মাধ্যমে সামগ্রীকভাবে হক নির্ণয় করে ফেলে। এরপর তার পক্ষে বিস্তারিত দলীল পায়। এভাবে ওহি ও ফিতরাতের সত্যায়নের মাধ্যমে তার ঈমানের পারদ আরও শাণিত হয়।

প্রতিটি বিবেকবান ব্যক্তির উচিৎ এই আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এই আয়াতের অন্তর্নিহিত বাস্তব অর্থ নিয়েও গভীর গবেষণা করা সবার একান্ত কর্তব্য।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 বোধগম্য আলো এবং অনুভবযোগ্য আলো

📄 বোধগম্য আলো এবং অনুভবযোগ্য আলো


আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাঁর দুই প্রকারের আলোর কথা উল্লেখ করেছেন :
• তাঁর যে আলো আসমান ও জমিনে রয়েছে।
• তাঁর যে আলো মুমিন বান্দাদের অন্তরে রয়েছে।

এক প্রকার আলো বোধগম্য, যা চোখ ও অন্তর দিয়ে অবলোকন করা যায়। এ প্রকার আলোর মাধ্যমে চোখ ও অন্তর আলোকিত হয়। দ্বিতীয় প্রকার আলো অনুভবযোগ্য, যা চোখ দিয়ে অবলোকন করা যায় না। এ প্রকার আলোর মাধ্যমে ঊর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের সর্বত্র আলোকিত হয়। এ দুই প্রকার আলো মহান আলো হলেও এক প্রকার আলো অন্য প্রকার আলো থেকে উত্তম।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 আলো ও জীবনের সম্পর্ক

📄 আলো ও জীবনের সম্পর্ক


এই দুই প্রকার আলো একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো স্থান বা জায়গায় যদি দুই প্রকার আলোর কোনো এক প্রকার অনুপস্থিত থাকে, তবে সে স্থান ও জায়গা মানুষ ও প্রাণীর বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। কেননা মানুষ ও প্রাণীর বসবাসের জন্য আলোকিত স্থান অত্যাবশ্যক। অন্ধকারে নিমজ্জিত স্থানে, যেখানে কোনো আলো নেই, সেখানে কোনো প্রাণী বসবাস করতে পারে না। এই অবস্থা উম্মাতে মুহাম্মাদীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে উম্মত ও অন্তর থেকে ওহি ও ঈমানের আলো হারিয়ে যায়, সে উম্মত ও অন্তর জিন্দা লাশে পরিণত হয়, তার মাঝে কোনো প্রাণ থাকে না; যে স্থানে কোনো আলো থাকে না, সেখানে কোনো প্রাণীর জীবনও থাকে না।

আল্লাহ তাআলা আলো ও জীবনকে এক সাথে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا
যে ব্যক্তি ছিলো মৃত তাকে আমি জীবিত করেছি এবং একটি আলো দান করেছি যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলতে পারে-সে কি ঐ ব্যক্তির মতো হতে পারে, যে অন্ধকারে নিমজ্জিত, যা থেকে সে বের হতে পারে না?৬৫

অন্য আয়াতে তিনি বলেন,
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا
এভাবেই আমি আপনার কাছে আমার আদেশের একটি প্রাণ পাঠিয়েছি। এর আগে আপনি জানতেন না কিতাব কী আর ঈমান কী। তবে আমি একে একটি আলো করেছি, যার সাহায্যে আমি আমার বান্দাদের মধ্যথেকে যাকে চাই পথ দেখাই। ৬৬

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমি আপনার কাছে যে প্রাণ পাঠিয়েছি, তাকে আলো বানিয়ে দিয়েছি। অতএব, উল্লিখিত আয়াতে কুরআনকে প্রাণ বলে অবহিত করা হয়েছে। কারণ কুরআন-ই জীবন ও প্রাণ। আবার প্রাণকে আলো বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, কুরআনের মাধ্যমে সবাই আলোকিত হয়। তাই প্রমাণ হয়, জীবন ও আলো একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতএব, যেখানে প্রাণের মাধ্যমে জীবন পাওয়া যাবে সেখানে আলোও পাওয়া যাবে। আবার যেখানে আলো পাওয়া যাবে সেখানে প্রাণও পাওয়া যাবে। যার অন্তর এই প্রাণকে গ্রহণ করে না, সে মৃত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত; যেমন কোনো দেহ থেকে প্রাণপাখি উড়ে গেলে সে মারা যায়। হয়ে পড়ে মূল্যহীন।

টিকাঃ
৬৫. সূরা আনআম, আয়াত: ১২২
৬৬. সূরা শূরা, আয়াত: ৫২

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 পানি ও আগুনের দৃষ্টান্ত

📄 পানি ও আগুনের দৃষ্টান্ত


এ কারণে আল্লাহ তাআলা দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন: আগুন ও পানির। কারণ, পানির মাধ্যমে জীবন পাওয়া যায় আর আগুনের মাধ্যমে উজ্জ্বলতা ও আলো পাওয়া যায়।

আগুনের দৃষ্টান্ত পেশ করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَا يُبْصِرُونَ
তাদের (মুনাফিকদের) দৃষ্টান্ত হচ্ছে, এক ব্যক্তি আলোর জন্য আগুন প্রজ্জ্বলিত করলো; তারপর আগুন যখন তার আশপাশ আলোকিত করলো তখন আল্লাহ তাদের আলো ছিনিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারের মধ্যে ছেড়ে দিলেন। ৬৭

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি মুনাফিকদের আলো ছিনিয়ে নেন; তাদের আগুন ছিনিয়ে নেন না। আগুনে দাহন ও আলো উভয়টি থাকে। কিন্তু তিনি তাদের আলো ছিনিয়ে নিয়ে দাহন তাদের মাঝে রেখে দেন; যাতে তারা দহিত হতে থাকে এবং কষ্টে জীবন অতিবাহিত করে।

মুনাফিকদের অবস্থা এমনই। নিফাকীর কারণে তাদের আলো ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং কুফর ও সন্দেহ-সংশয়ের দাহন তাদের মাঝে রেখে দেওয়া হয়। ফলে দুনিয়াতে ঐ দাহন তাদের অন্তরকে পোড়াতে থাকে। আর কিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তাদের এমন আগুনে পোড়াবেন যে আগুন সরাসরি তাদের অন্তরে আঘাত হানবে।

আয়াতে উল্লিখিত উদাহরণটি তাদের জন্য, যারা দুনিয়াতে ঈমানের আলোকে সঙ্গী বানায়নি; বরং ঈমানের আলো পাওয়ার পর তা থেকে বেরিয়ে গেছে। আর এটা মূলত মুনাফিকদের স্বভাব। তারা ইসলামের বিধান জানার পর মানতে চায় না। তা স্বীকার করার পর অস্বীকার করে ফেলে। ফলে, তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং পরিগণিত হয় বধির, মূক ও অন্ধ হিসেবে; যেমনটি আল্লাহ তাদের ভাই কাফিরদের ব্যাপারে বলেছেন,
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا صُمٌّ وَبُكُمْ فِي الظُّلُمَاتِ
যারা আমাদের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তারা বধির, মূক ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। ৬৮

অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَنِدَاءً صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَعْقِلُونَ
কাফিরদের তুলনা সেই ব্যক্তির সাথে যে এমন কিছুকে চিৎকার করে ডাকে, কিন্তু যাকে ডাকে সে ডাক আর সম্বোধন ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায় না। তারা বধির, মূক, ও অন্ধ; কাজেই তারা বুঝবে না। ৬৯

টিকাঃ
৬৭. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭
৬৮. সূরা আনআম, আয়াত: ৩৯
৬৯. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00