📘 যিকরুল্লাহ > 📄 মুমিন হৃদয়ে ঈমানের আলো

📄 মুমিন হৃদয়ে ঈমানের আলো


মুমিন হৃদয়ে আল্লাহর যে আলো থাকে, সে আলো মূলত তাঁকে জানার, তাঁকে ভালোবাসার, তাঁর প্রতি ঈমানের ও তাঁর যিকিরের আলো। এই আলো আল্লাহ তাআলা মুমিনের হৃদয়ে উজ্জীবিত করে রাখেন। এই আলো মুমিন বান্দাদের প্রাণবন্ত করে রাখে এবং বাঁচার শক্তি সঞ্চার করে। এই আলোকে সাথে নিয়ে তারা মানুষের সামনে চলাফেরা ও উঠাবসা করে। এই আলো তাদের হৃদয়ে শক্তভাবে গেঁথে থাকে। তারপর আস্তে-আস্তে এই আলোর পরিধি ও শক্তি বৃদ্ধি হতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের চেহারা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও গোটা শরীরে সেই আলো ছড়িয়ে পড়ে; এমনকি তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, বাড়ি-ঘর সর্বত্র ছেয়ে যায়। তবে তাদের এই আলো সবাই দেখতে পায় না। তাদের মতো যারা মুমিন তারাই কেবল দেখতে পায়। ফলে অন্যরা তাদের এই আলোকে অস্বীকার করে বসে।

কিয়ামতের দিন মুমিন হৃদয়ের এই আলো প্রকাশ পাবে। গহীন অন্ধকার পুলসিরাতে এই আলো তার সামনে দৌড়াদৌড়ি করবে। তারা এই আলোতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। তবে দুনিয়াতে হৃদয়ের আলো কমবেশি হওয়া অনুপাতে কিয়ামতের দিন আলো কমবেশি হবে। কারো আলো হবে সূর্যের মতো, কারো হবে চন্দ্রের মতো, কারো হবে তারকার মতো আবার কারো হবে প্রদীপের মতো। কাউকে আলো দেওয়া হবে তার টাকনু বরাবর; তার এই আলো কখনো জ্বলবে আবার কখনো নিভে যাবে। সারকথা, পুলসিরাত পার হওয়ার জন্য বান্দাকে ঠিক ততটুকুই আলো দেওয়া হবে, সে দুনিয়াতে যতটুকু আলো অর্জন করতে পেরেছিল। দুনিয়ায় অর্জিত আলোটুকুই তাকে দেওয়া হবে। দুনিয়ার অভ্যন্তরীণ আলো পরকালে জ্বলে উঠবে। দুনিয়ায় মুনাফিকদের হৃদয়ে বা অভ্যন্তরে কোনো আলো থাকে না। তাদের আলো থাকে বাহ্যিকতায়। এ কারণে কিয়ামতের দিন তাদেরকে বাহ্যিক আলো দেওয়া হবে। আর বাহ্যিক আলো আরও নিকষ কালো গহীন অন্ধকার সৃষ্টি করবে।

উপর্যুক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা আলো, আলোর জায়গা ও আলোর বাহককে দীপাধারের সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ মানুষের বক্ষ একেকটি দীপাধার। সে দীপাধারে একটি প্রদীপ রাখা আছে। আর সেই প্রদীপটি রয়েছে একটি অতি স্বচ্ছ পরিষ্কার কাঁচের পাত্রে; যেন কাঁচটি একটি উজ্জ্বল তারকা। উজ্জ্বল পরিষ্কার স্বচ্ছ কাঁচের মতোই মুমিনের অন্তর। অন্তরকে কাঁচের সাথে তুলনা করা হয়েছে, কারণ, স্বচ্ছতা, কোমলতা ও কঠোরতাসহ মুমিন-অন্তরের অন্যান্য গুণাবলী কাঁচের মাঝে নিহিত রয়েছে। স্বচ্ছ পরিষ্কার অন্তর হক ও হিদায়াতকে অবলোকন করতে পারে। কোমল অন্তর দয়া, সহানুভূতি ও করুণা দ্বারা সমৃদ্ধ থাকে। আর কঠোরতার মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে, তাদের ব্যাপারে খড়গহস্ত হয় এবং হকের ব্যাপারে হয় সিদ্ধহস্ত ও আপোষহীন। মুমিন অন্তরের একটি গুণের কারণে অন্য গুণ হারিয়ে যায় না; বরং গুণগুলো পরস্পরকে সহযোগিতা ও শক্তিশালী করে।

এসব গুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর আর নিজেদের মাঝে পরস্পরে দয়াশীল। ৬১

টিকাঃ
৬০. সূরা নূর, আয়াত: ৩৫
৬১. সূরা ফাতহ, আয়াত: ২৯

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 অন্তর দুই প্রকার

📄 অন্তর দুই প্রকার


মুমিনদের এমন অন্তরের বিপরীতে দুপ্রকারের ঘৃণিত অন্তর রয়েছে। এই দুই প্রকার ঘৃণিত অন্তর আবার পরস্পর বিরোধী।

প্রথম প্রকারের ঘৃণিত অন্তর: পাথরের মতো শক্ত অন্তর; যে অন্তরে কোনো দয়ামায়া, অনুগ্রহ, ও কল্যাণ নেই এবং হক অবলোকন করার মতো স্বচ্ছতা নেই। এ প্রকারের অন্তর কঠোর, জাহিল ও নির্বোধ; হকের ব্যাপারে অজ্ঞ এবং সৃষ্টিজীবের ওপর কঠোর।

দ্বিতীয় প্রকারের ঘৃণিত অন্তর: এই প্রকারের অন্তর প্রথম প্রকার অন্তরের ঠিক বিপরীত। একেবারেই দুর্বল ও পানির মতো তরল; তাতে কোনো শক্তি, অবিচলতা ও দৃঢ়তা নেই। যা পায় সব গ্রহণ করে কিন্তু মস্তিষ্কে ধরে রাখার মতো শক্তি থাকে না এবং তা দ্বারা প্রভাবিত হবার বলও থাকে না। বরং উল্টা দুর্বলতা-সবলতা, ভালো-মন্দ ও হক-বাতিল মিশ্রিত বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়।

অন্য আয়াতে বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছিলে। আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা অবশ্যই আপনার আশপাশ থেকে সরে যেত। ৬২

অন্যত্র বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ
হে নবি, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন। ৬৩

একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, অন্তরসমূহ জমিনে আল্লাহর পাত্র। কোমল, কঠোর ও স্বচ্ছ অন্তর তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। ৬৪

টিকাঃ
৬২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
৬৩. সূরা তওবা, আয়াত: ৭৩
৬৪. মুসনাদুশ শামিয়ীন, ২/১৯; ইরাকী আল-মুগনী আন হামলিল আসফার গ্রন্থে এর সনদকে ভালো বলেছেন। দেখুন, সিলসিলাহ সহীহাহ, ১৬৯১; হাদিসটি রাসুল ও সাহাবীর কথা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 মুমিনের প্রদীপের ঈমানী তেল

📄 মুমিনের প্রদীপের ঈমানী তেল


উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, প্রদীপ কাঁচের ভেতর অবস্থিত। প্রদীপ মূলত পলিতার মাধ্যমে জ্বলে। অতএব, পলিতা হল আলোর বাহক। আলোর আবার দ্রব্য ও পদার্থ থাকা বাঞ্ছনীয়। আলোর এই দ্রব্য ও পদার্থ হল যাইতুন তেল। আর তা যেনতেন যাইতুন গাছের তেল নয়; বরং এমন যাইতুন গাছের তেল যে গাছ সমতল ভূমিতে অবস্থিত, সকাল-সন্ধ্যায় রোদ পায়। এমন গাছের তেল এতটাই স্বচ্ছ পরিষ্কার হয় যে, যেন আলো ছাড়াই জ্বলে ওঠে। এমন তেলই হচ্ছে আয়াতে উল্লিখিত প্রদীপের আলোর দ্রব্য ও পদার্থ।

মুমিনের হৃদয়ে অবস্থিত প্রদীপের আলোর দ্রব্য ও পদার্থও ঠিক এমন তেল। এ তেল দুনিয়ার কোনো গাছের তেল নয়; বরং ওহি নামক গাছের তেল। আর ওহি পৃথিবীর সবচেয়ে বরকতময় জিনিস এবং সকল প্রকার ভ্রান্তি থেকে মুক্ত; সবচেয়ে মধ্যমপন্থা, বস্তুনিষ্ঠ, উত্তম ও সরল। তাতে না আছে খ্রিষ্টানদের ভ্রান্তি ও বিচ্যুতি, না আছে ইহুদিদের সীমালঙ্ঘন ও ভ্রষ্টতা। যাবতীয় ব্যাপারে ঘৃণিত দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝিতে ওহির অবস্থান। এমন ঈমানী তেল হচ্ছে মুমিনের হৃদয়ে অবস্থিত প্রদীপের দ্রব্য ও পদার্থ। এমন স্বচ্ছ ও পরিষ্কার তেল আগুনের সংস্পর্শ ছাড়া নিজেই নিজেই যেন জ্বলে উঠে। অধিকিন্তু এর সাথে যখন ঈমান নামক আগুন জ্বালানো হয়, তখন তার আলো পূর্ণতার চরম শিখরে পৌঁছে যায় এবং আলোর দ্রব্যও শক্তিশালী হয়ে যায়। ফলে তা যেন হয়ে উঠে নূরুন আলা নূর, আলো আর আলো।

মুমিনের অন্তর এ আলোয় এমনভাবে আলোকিত হতে থাকে যে, তারা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবেই হককে চিনে ফেলে। এর ওপর যখন ওহির দ্রব্য ও পদার্থ এসে যুক্ত হয় এবং শিরায়-উপশিরায় তা ছড়িয়ে পড়ে, তখন ভিতরকার প্রাকৃতিক আলোর সাথে ওহির আলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এভাবে প্রাকৃতিক ও ওহি দুই আলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলে তার আলো বহুগুণে বেড়ে যায়। একেই বলা হয় নূরুন আলা নূর বা আলো আর আলো। ফলে কুরআন ও হাদিস থেকে দলীল না পেলেও তার মুখ দিয়ে হক কথা বেরিয়ে আসে। পরে যখন দলীল পায়, তখন দেখে তার ফিতরাত যে কথা বলেছে তা সম্পূর্ণ দলীলের অনুকূলে। ফলে তা হয়ে যায় নূরুন আলা নূর। মুমিনের অবস্থা এমন হয় যে, সে তার ফিতরাতের মাধ্যমে সামগ্রীকভাবে হক নির্ণয় করে ফেলে। এরপর তার পক্ষে বিস্তারিত দলীল পায়। এভাবে ওহি ও ফিতরাতের সত্যায়নের মাধ্যমে তার ঈমানের পারদ আরও শাণিত হয়।

প্রতিটি বিবেকবান ব্যক্তির উচিৎ এই আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এই আয়াতের অন্তর্নিহিত বাস্তব অর্থ নিয়েও গভীর গবেষণা করা সবার একান্ত কর্তব্য।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 বোধগম্য আলো এবং অনুভবযোগ্য আলো

📄 বোধগম্য আলো এবং অনুভবযোগ্য আলো


আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাঁর দুই প্রকারের আলোর কথা উল্লেখ করেছেন :
• তাঁর যে আলো আসমান ও জমিনে রয়েছে।
• তাঁর যে আলো মুমিন বান্দাদের অন্তরে রয়েছে।

এক প্রকার আলো বোধগম্য, যা চোখ ও অন্তর দিয়ে অবলোকন করা যায়। এ প্রকার আলোর মাধ্যমে চোখ ও অন্তর আলোকিত হয়। দ্বিতীয় প্রকার আলো অনুভবযোগ্য, যা চোখ দিয়ে অবলোকন করা যায় না। এ প্রকার আলোর মাধ্যমে ঊর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের সর্বত্র আলোকিত হয়। এ দুই প্রকার আলো মহান আলো হলেও এক প্রকার আলো অন্য প্রকার আলো থেকে উত্তম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00