📄 কোনো দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না
আল্লাহর বাণী : لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ
কোনো দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না' ৫৭
এর ব্যাখ্যায় সাহাবী ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। তাঁর আলোর তাজাল্লির সামনে কোনোকিছু টিকতে পারে না।'৫৮
ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর এ ব্যাখ্যা তাঁর প্রজ্ঞা ও সঠিক বোধশক্তির প্রমাণ বহন করে। আর কেন-ই-বা করবে না। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ, তুমি তাকে কুরআনের ব্যাখ্যার জ্ঞান দাও।'
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলাকে চর্মচক্ষু দিয়ে সরাসরি দেখা যাবে; কিন্তু চর্মচক্ষু তাঁকে পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারবে না। দেখা এক জিনিস আর সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত্ব করা আরেক জিনিস। যেমন, আমরা সূর্যকে দেখতে পাই কিন্তু সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে দেখতে পাই না; এমনকি এর ধারের কাছেও যেতে পারি না। অথচ আল্লাহ তাআলা এর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। এ কারণে কেউ ইবন আব্বাসের কাছে
لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ
- 'কোনো দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না'। আয়াত পাঠ করে আল্লাহর দর্শনের ব্যাপারে আপত্তি তুললে তিনি তাকে বলতেন, 'তুমি কি আসমান দেখতে পাও?' সে বলতো, 'হ্যাঁ, পাই।' তখন তিনি তাকে বলতেন, 'তুমি কি সম্পূর্ণ আসমান দেখতে পাও?' সে বলতো, 'না।' তিনি তখন বলতেন, 'আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে অনেক বড় ও শ্রেষ্ঠ।'
টিকাঃ
৫৭. সূরা আনআম, আয়াত: ১০৩
৫৮. সুনানুত তিরমিযী, ৩২৭৯
📄 অন্তরের আলোর দৃষ্টান্ত
বান্দার অন্তরে আল্লাহর যে আলো রয়েছে, তিনি সেই আলোর একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। সে দৃষ্টান্ত শুধুমাত্র জ্ঞানীরা উপলব্ধি করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحُ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর আলোর উপমা হলো, যেন একটি দীপাধার যাতে একটি প্রদীপ রয়েছে। প্রদীপটি একটি কাঁচের মধ্যে অবস্থিত। আর কাঁচটি যেন একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রদীপটি এমন বরকতময় যায়তুন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্ব-দিকের নয় আবার পশ্চিম-দিকেরও নয়। আগুন তাকে স্পর্শ না করলেও যেন ওর তেল উজ্জ্বল আলো দিচ্ছে। আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে চান তাঁর আলোর পথ প্রদর্শন করেন। তিনি মানুষের জন্য নানারকম উপমা পেশ করে থাকেন। আল্লাহ সবকিছু ভালোভাবে জানেন।৬০
উবাই ইবন কাব বলেন, 'আয়াতে উল্লিখিত 'প্রদীপ' দ্বারা মুসলিম হৃদয় বোঝানো হয়েছে। এটা মূলত তাদের হৃদয়ে থাকা তাঁর আলোর দৃষ্টান্ত।'
টিকাঃ
৫৯. সূরা আনআম, আয়াত: ১০৩
📄 মুমিন হৃদয়ে ঈমানের আলো
মুমিন হৃদয়ে আল্লাহর যে আলো থাকে, সে আলো মূলত তাঁকে জানার, তাঁকে ভালোবাসার, তাঁর প্রতি ঈমানের ও তাঁর যিকিরের আলো। এই আলো আল্লাহ তাআলা মুমিনের হৃদয়ে উজ্জীবিত করে রাখেন। এই আলো মুমিন বান্দাদের প্রাণবন্ত করে রাখে এবং বাঁচার শক্তি সঞ্চার করে। এই আলোকে সাথে নিয়ে তারা মানুষের সামনে চলাফেরা ও উঠাবসা করে। এই আলো তাদের হৃদয়ে শক্তভাবে গেঁথে থাকে। তারপর আস্তে-আস্তে এই আলোর পরিধি ও শক্তি বৃদ্ধি হতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের চেহারা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও গোটা শরীরে সেই আলো ছড়িয়ে পড়ে; এমনকি তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, বাড়ি-ঘর সর্বত্র ছেয়ে যায়। তবে তাদের এই আলো সবাই দেখতে পায় না। তাদের মতো যারা মুমিন তারাই কেবল দেখতে পায়। ফলে অন্যরা তাদের এই আলোকে অস্বীকার করে বসে।
কিয়ামতের দিন মুমিন হৃদয়ের এই আলো প্রকাশ পাবে। গহীন অন্ধকার পুলসিরাতে এই আলো তার সামনে দৌড়াদৌড়ি করবে। তারা এই আলোতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। তবে দুনিয়াতে হৃদয়ের আলো কমবেশি হওয়া অনুপাতে কিয়ামতের দিন আলো কমবেশি হবে। কারো আলো হবে সূর্যের মতো, কারো হবে চন্দ্রের মতো, কারো হবে তারকার মতো আবার কারো হবে প্রদীপের মতো। কাউকে আলো দেওয়া হবে তার টাকনু বরাবর; তার এই আলো কখনো জ্বলবে আবার কখনো নিভে যাবে। সারকথা, পুলসিরাত পার হওয়ার জন্য বান্দাকে ঠিক ততটুকুই আলো দেওয়া হবে, সে দুনিয়াতে যতটুকু আলো অর্জন করতে পেরেছিল। দুনিয়ায় অর্জিত আলোটুকুই তাকে দেওয়া হবে। দুনিয়ার অভ্যন্তরীণ আলো পরকালে জ্বলে উঠবে। দুনিয়ায় মুনাফিকদের হৃদয়ে বা অভ্যন্তরে কোনো আলো থাকে না। তাদের আলো থাকে বাহ্যিকতায়। এ কারণে কিয়ামতের দিন তাদেরকে বাহ্যিক আলো দেওয়া হবে। আর বাহ্যিক আলো আরও নিকষ কালো গহীন অন্ধকার সৃষ্টি করবে।
উপর্যুক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা আলো, আলোর জায়গা ও আলোর বাহককে দীপাধারের সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ মানুষের বক্ষ একেকটি দীপাধার। সে দীপাধারে একটি প্রদীপ রাখা আছে। আর সেই প্রদীপটি রয়েছে একটি অতি স্বচ্ছ পরিষ্কার কাঁচের পাত্রে; যেন কাঁচটি একটি উজ্জ্বল তারকা। উজ্জ্বল পরিষ্কার স্বচ্ছ কাঁচের মতোই মুমিনের অন্তর। অন্তরকে কাঁচের সাথে তুলনা করা হয়েছে, কারণ, স্বচ্ছতা, কোমলতা ও কঠোরতাসহ মুমিন-অন্তরের অন্যান্য গুণাবলী কাঁচের মাঝে নিহিত রয়েছে। স্বচ্ছ পরিষ্কার অন্তর হক ও হিদায়াতকে অবলোকন করতে পারে। কোমল অন্তর দয়া, সহানুভূতি ও করুণা দ্বারা সমৃদ্ধ থাকে। আর কঠোরতার মাধ্যমে মুমিনরা আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে, তাদের ব্যাপারে খড়গহস্ত হয় এবং হকের ব্যাপারে হয় সিদ্ধহস্ত ও আপোষহীন। মুমিন অন্তরের একটি গুণের কারণে অন্য গুণ হারিয়ে যায় না; বরং গুণগুলো পরস্পরকে সহযোগিতা ও শক্তিশালী করে।
এসব গুণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর আর নিজেদের মাঝে পরস্পরে দয়াশীল। ৬১
টিকাঃ
৬০. সূরা নূর, আয়াত: ৩৫
৬১. সূরা ফাতহ, আয়াত: ২৯
📄 অন্তর দুই প্রকার
মুমিনদের এমন অন্তরের বিপরীতে দুপ্রকারের ঘৃণিত অন্তর রয়েছে। এই দুই প্রকার ঘৃণিত অন্তর আবার পরস্পর বিরোধী।
প্রথম প্রকারের ঘৃণিত অন্তর: পাথরের মতো শক্ত অন্তর; যে অন্তরে কোনো দয়ামায়া, অনুগ্রহ, ও কল্যাণ নেই এবং হক অবলোকন করার মতো স্বচ্ছতা নেই। এ প্রকারের অন্তর কঠোর, জাহিল ও নির্বোধ; হকের ব্যাপারে অজ্ঞ এবং সৃষ্টিজীবের ওপর কঠোর।
দ্বিতীয় প্রকারের ঘৃণিত অন্তর: এই প্রকারের অন্তর প্রথম প্রকার অন্তরের ঠিক বিপরীত। একেবারেই দুর্বল ও পানির মতো তরল; তাতে কোনো শক্তি, অবিচলতা ও দৃঢ়তা নেই। যা পায় সব গ্রহণ করে কিন্তু মস্তিষ্কে ধরে রাখার মতো শক্তি থাকে না এবং তা দ্বারা প্রভাবিত হবার বলও থাকে না। বরং উল্টা দুর্বলতা-সবলতা, ভালো-মন্দ ও হক-বাতিল মিশ্রিত বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়।
অন্য আয়াতে বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছিলে। আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা অবশ্যই আপনার আশপাশ থেকে সরে যেত। ৬২
অন্যত্র বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ
হে নবি, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন। ৬৩
একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, অন্তরসমূহ জমিনে আল্লাহর পাত্র। কোমল, কঠোর ও স্বচ্ছ অন্তর তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। ৬৪
টিকাঃ
৬২. সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯
৬৩. সূরা তওবা, আয়াত: ৭৩
৬৪. মুসনাদুশ শামিয়ীন, ২/১৯; ইরাকী আল-মুগনী আন হামলিল আসফার গ্রন্থে এর সনদকে ভালো বলেছেন। দেখুন, সিলসিলাহ সহীহাহ, ১৬৯১; হাদিসটি রাসুল ও সাহাবীর কথা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।