📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহর হৃদয়ের প্রাণ ও আখিরাতের নূর

📄 যিকরুল্লাহর হৃদয়ের প্রাণ ও আখিরাতের নূর


৩৬. যিকরুল্লাহ যিকিরকারীর দুনিয়ার আলো, কবরের প্রদীপ ও পরকালের নূর। পুলসিরাত অতিক্রম করার সময় যিকরুল্লাহ আলো হয়ে তার আগে আগে চলবে। এমন কোনো আমল নেই যা যিকিরের মতো অন্তর ও কবরকে আলোয় ভাসাতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُوْرًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا
যে ব্যক্তি ছিল মৃত তাকে আমি জীবিত করেছি এবং একটি আলো দান করেছি যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলতে পারে-সে কি ঐ ব্যক্তির মতো হতে পারে, যে অন্ধকারে নিমজ্জিত, যা থেকে সে বের হতে পারে না? ৫১

আয়াতে উল্লিখিত আলোকপ্রাপ্ত প্রথমজন দ্বারা উদ্দেশ্য, মুমিন ব্যক্তি। মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর মারিফত ও তাঁর যিকির দ্বারা প্রদীপ্ত ও আলোকোদ্ভাসিত থাকে। আর অন্ধকারে নিমজ্জিত ব্যক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য, আল্লাহর ব্যাপারে যে উদাসীন এবং তাঁর যিকির ও ভালোবাসা থেকে যে বিমুখ থাকে। এটা যেনতেন কোনো ব্যাপার নয়; বরং কোনো ব্যক্তি যদি এই আলোতে নিজেকে উদ্ভাসিত করতে পারে, তবে সে সবদিক থেকে সফল। আর কেউ যদি তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তবে সে সবদিক থেকে দুর্ভাগা।

এই আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআ করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারবার তাঁর রবের নিকট আলো চাইতেন। তিনি তাঁর রবের বারগাহে দুআ করে বলতেন যে, তিনি যেন তাঁর মাংস, হাড়-হাড্ডি, শিরা-উপশিরা, পশম, চামড়া, শ্রবণ-দর্শন, ওপর-নিচ, ডান-বাম, সামনে-পেছনে সবজায়গায় উপচে পড়া আলো দেন; এমনিক বলতেন, তুমি আমাকেই আলো করে দাও। ৫২

তিনি তাঁর রবের কাছে চাইতেন, তিনি যেন তাঁর বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সত্তা আলোয় ভরে দেন। তিনি যেন চারিদিক থেকে আলো দ্বারা পরিবেষ্টিত হন এবং স্বয়ং তাঁকেই যেন আলো বানিয়ে দেন।

আল্লাহর দ্বীন আলো। তাঁর কিতাব আলো। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য পরকালে যা প্রস্তুত করে রেখেছেন তা-ও আলোর মিনার। স্বয়ং রব তাবারাকা ওয়া তাআলা আসমান-জমিনের আলো। তাঁর নাম নূর বা আলো। তাঁর চেহারার আলোয় যাবতীয় অন্ধকার বিতাড়িত হয়ে আলোকোজ্জ্বল হয়ে পড়ে।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফের দিন যে দুআটি করেছিলেন, তা হলো:
أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ مِنْ أَنْ تُنْزِلَ بِي غَضَبَكَ ، أَوْ يَحِلَ عَلَيَّ سُخْطُكَ ، لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
আমার ওপর তোমার ক্রোধ বর্ষণ হওয়া অথবা আমার ওপর তোমার রাগ অবধারিত হয়ে যাওয়া থেকে তোমার চেহারার এমন আলোর সাহায্যে আশ্রয় চাচ্ছি, যে আলোর সামনে যাবতীয় অন্ধকার আলোয় পরিণত হয় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের বিষয় সঠিক হয়। আমি তোমার সন্তুষ্টির ভিখারী। একমাত্র তুমি সওয়াব করতে পারা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সামর্থ্য দিতে পারো। ৫৩

টিকাঃ
৫১. সূরা আনআম, আয়াত: ১২২
৫২. সহীহ মুসলিম, ১৬৭৬
৫৩. আল-মুজামুল কাবীর, ৭৩; আল-মুখতারাহ, ৯/১৮১; অনেকেই হাদিসটিকে সহীহ ও হাসান বলেছেন।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 আমলের রবের আলো

📄 আমলের রবের আলো


সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমাদের রবের নিকট কোনো রাত-দিন নেই। আসমান-জমিনের সমস্ত আলো তো তাঁর চেহারার আলো থেকে উৎসারিত। ৫৪

আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا
তার রবের আলোতে জমিন আলোকিত হয়েছে। ৫৫

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের মাঝে ফয়সালা করার জন্য আগমন করবেন, সেদিন তাঁর আলোয় জমিন আলোকিত হবে; চাঁদ বা সূর্যের আলোয় নয়। কেননা তার আগেই সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে এবং চাঁদ খসে পড়বে। ফলে চাঁদ ও সূর্যের আলো হারিয়ে যাবে। সেদিন রবের পর্দাগুলো আলো বিকিরণ করবে।

আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে চারটি বিষয় আলোচনা করেন :
ক. আল্লাহ তাআলা ঘুমান না। নিদ্রা তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়।

খ. তিনি আমল মাপার দাঁড়িপাল্লা উঁচু-নিচু করেন।
গ. তাঁর কাছে দিনের আমলের পূর্বে রাতের আমল এবং রাতের আমলের পূর্বে দিনের আমল তুলে ধরা হয়।
ঘ. তাঁর পর্দা আলো। তিনি সেই পর্দা উন্মোচিত করে দিলে তাঁর চেহারার বিভা তাঁর দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত সকল সৃষ্টিকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবে। এরপর তিনি তিলাওয়াত করেন,
أَنْ بُورِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا
তিনি বরকতময় সত্তা যিনি আগুনে আছেন আর তার আশেপাশে। ৫৬

সেইসব পর্দা তাঁর চেহারার আলোয় আলোকিত। সেইসব পর্দা না থাকলে তাঁর চেহারার আলোর বিভা তাঁর দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত সকল জিনিসকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিত। এ কারণে তিনি যখন পাহাড়ের ওপর তাঁর আলোর তাজাল্লি দেন এবং যৎসামান্য পর্দা উন্মোচিত করেন, তখন পাহাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে জমিনে ভেঙে পড়েছিল। তাঁর আলোর সামনে এক মুহূর্তও তা টিকে থাকতে পারেনি।

টিকাঃ
৫৪. আল-মুজামুল কাবীর, ৯/১৭৯
৫৫. সূরা যুমার, আয়াত: ৬৯
৫৬. সহীহ মুসলিম, ৩৩৬; সুনানু ইবন মাজাহ, ১৯৫

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 কোনো দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না

📄 কোনো দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না


আল্লাহর বাণী : لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ
কোনো দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ব করতে পারে না' ৫৭

এর ব্যাখ্যায় সাহাবী ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। তাঁর আলোর তাজাল্লির সামনে কোনোকিছু টিকতে পারে না।'৫৮

ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর এ ব্যাখ্যা তাঁর প্রজ্ঞা ও সঠিক বোধশক্তির প্রমাণ বহন করে। আর কেন-ই-বা করবে না। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ, তুমি তাকে কুরআনের ব্যাখ্যার জ্ঞান দাও।'

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলাকে চর্মচক্ষু দিয়ে সরাসরি দেখা যাবে; কিন্তু চর্মচক্ষু তাঁকে পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারবে না। দেখা এক জিনিস আর সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত্ব করা আরেক জিনিস। যেমন, আমরা সূর্যকে দেখতে পাই কিন্তু সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে দেখতে পাই না; এমনকি এর ধারের কাছেও যেতে পারি না। অথচ আল্লাহ তাআলা এর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। এ কারণে কেউ ইবন আব্বাসের কাছে

لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ

- 'কোনো দৃষ্টি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না'। আয়াত পাঠ করে আল্লাহর দর্শনের ব্যাপারে আপত্তি তুললে তিনি তাকে বলতেন, 'তুমি কি আসমান দেখতে পাও?' সে বলতো, 'হ্যাঁ, পাই।' তখন তিনি তাকে বলতেন, 'তুমি কি সম্পূর্ণ আসমান দেখতে পাও?' সে বলতো, 'না।' তিনি তখন বলতেন, 'আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে অনেক বড় ও শ্রেষ্ঠ।'

টিকাঃ
৫৭. সূরা আনআম, আয়াত: ১০৩
৫৮. সুনানুত তিরমিযী, ৩২৭৯

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 অন্তরের আলোর দৃষ্টান্ত

📄 অন্তরের আলোর দৃষ্টান্ত


বান্দার অন্তরে আল্লাহর যে আলো রয়েছে, তিনি সেই আলোর একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। সে দৃষ্টান্ত শুধুমাত্র জ্ঞানীরা উপলব্ধি করতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحُ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونَةٍ لَا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনের আলো। তাঁর আলোর উপমা হলো, যেন একটি দীপাধার যাতে একটি প্রদীপ রয়েছে। প্রদীপটি একটি কাঁচের মধ্যে অবস্থিত। আর কাঁচটি যেন একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রদীপটি এমন বরকতময় যায়তুন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্ব-দিকের নয় আবার পশ্চিম-দিকেরও নয়। আগুন তাকে স্পর্শ না করলেও যেন ওর তেল উজ্জ্বল আলো দিচ্ছে। আলোর ওপর আলো। আল্লাহ যাকে চান তাঁর আলোর পথ প্রদর্শন করেন। তিনি মানুষের জন্য নানারকম উপমা পেশ করে থাকেন। আল্লাহ সবকিছু ভালোভাবে জানেন।৬০

উবাই ইবন কাব বলেন, 'আয়াতে উল্লিখিত 'প্রদীপ' দ্বারা মুসলিম হৃদয় বোঝানো হয়েছে। এটা মূলত তাদের হৃদয়ে থাকা তাঁর আলোর দৃষ্টান্ত।'

টিকাঃ
৫৯. সূরা আনআম, আয়াত: ১০৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00