📄 মনকা বা সংকীর্ণ জীবিকা বনতে কী বোঝায়
অর্থাৎ তোমাকে শাস্তিতে নিক্ষেপ করে ভুলে যাওয়া হবে, যেভাবে আমার নিদর্শনসমূহ তুমি ভুলে গিয়েছিলে। অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দুনিয়াতে তুমি আমার নিদর্শনসমূহ স্মরণ করোনি এবং তদনুযায়ী আমল করোনি।
আয়াতে উল্লিখিত 'যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া' এর অর্থ হল, আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব, সে কিতাবের আদেশ-নিষেধ, আল্লাহর নাম ও গুণাবলী এবং তাঁর প্রদত্ত নেয়ামত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। এসবকিছুই যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তা তিলাওয়াত করে না, তা নিয়ে গবেষণা করে না, বোঝে না এবং সে অনুযায়ী আমল করে না—তার জীবন ও জীবিকা সংকীর্ণ হতেই থাকবে; এমনকি নিজের জীবন ও জীবিকাকে আযাব ও শাস্তি মনে হতে থাকবে।
আয়াতে উল্লিখিত কর্মা-যনকা শব্দের অর্থ হলো, সংকীর্ণতা, কঠোরতা ও বিপদ। এই আয়াতে 'জীবিকা' এর সাথে 'যনকা বা সংকীর্ণতা' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সংকীর্ণতার আধিক্যতা বোঝাতে। কেউ কেউ বলেছেন, সংকীর্ণ জীবিকা দ্বারা কবরের আযাব উদ্দেশ্য। তবে আমার মতে দুনিয়াবী জীবিকা ও কবরের আযাব দুটোই উদ্দেশ্য। কেননা এমন ব্যক্তি দুনিয়া ও কবর উভয় জায়গায় সংকীর্ণতা, শাস্তি ও কঠোরতার মধ্যে থাকবে আর পরকালে তাকে আযাবে নিক্ষেপ করে ভুলে যাওয়া হবে।
সৌভাগ্যবান ও সফলকামদের অবস্থান এই সমস্ত লোকের ঠিক বিপরীতে হবে। সৌভাগ্যবান ও সফলকাম ব্যক্তিদের দুনিয়া ও কবরের জীবন হবে অতিউত্তম ও প্রশান্তিদায়ক আর পরকালে থাকবে অঢেল সওয়াব।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
"যে পুরুষ ও নারী ঈমানদার অবস্থায় সৎকাজ করবে, তাকে আমি উত্তম জীবন দান করবো।"৪৩
আয়াতে বর্ণিত এই অঙ্গীকার দুনিয়াবী জীবনের জন্য প্রযোজ্য। আর পরের—
وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
এবং তাদেরকে তাদের শ্রেষ্ঠ কর্মের পুরস্কার দেব।44
-এ অংশটুকু কবর ও পরকালীন জীবনের জন্য প্রযোজ্য।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَالَّذِينَ هَاجَرُوا فِي اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا لَنُبَوِّئَنَّهُمْ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَلَأَجْرُ الْآخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
নির্যাতিত হওয়ার পর যারা আমার জন্য হিজরত করেছে, আমি তাদেরকে অবশ্যই দুনিয়াতে উত্তম বাসস্থান দেব। আর আখিরাতের পুরস্কার তো আরও বড়। হায়, তারা যদি জানতো।৪৫
তিনি আরও বলেন,
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى
"তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা চাও আর অনুশোচনা ভরে তাঁর দিকেই ফিরে এসো, তাহলে তিনি নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তোমাদেরকে উত্তম ভোগ সামগ্রী দেবেন।"৪৬
আয়াতের এ অংশটুকুও দুনিয়ার জীবনের জন্য প্রযোজ্য। আর পরের—
وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ
এবং অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাঁর অনুগ্রহ দানে ধন্য করবেন। ৪৯
-এই অংশটুকু কবর ও পরকালের জন্য প্রযোজ্য।
তিনি অন্যত্র আরও বলেন,
قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
বলে দাও, হে ঈমানদারগণ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যারা এ দুনিয়াতে সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আল্লাহর জমিন প্রশস্ত। আর ধৈর্যশীলদেরকে বিনা হিসাবে অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে। ৪৮
আল্লাহ তাআলা উপর্যুক্ত চার আয়াতে ঘোষণা দিয়েছেন, সৎকর্মশীলদের তিনি দ্বিগুণ প্রতিদান ও পুরস্কার দেবেন: দুনিয়াতে ও পরকালে।
টিকাঃ
৪৩. সূরা নাহল, আয়াত: ৯৭
৪৪. সূরা নাহল, আয়াত: ৯৭
৪৫. সূরা নাহল, আয়াত: ৪১
৪৬. সূরা হুদ, আয়াত: ৩
৪৭. সূরা হুদ, আয়াত: ৩
৪৮. সূরা যুমার, আয়াত: ১০
📄 সৎকর্মের দুনিয়াবী পুরস্কার আর অসৎকর্মের দুনিয়াবী শাস্তি
সৎকর্মের দুনিয়াবী প্রতিদান ও পুরস্কার রয়েছে। অসৎকর্মেরও দুনিয়াবী প্রতিদান ও শাস্তি রয়েছে। সৎকর্মের দুনিয়াবী প্রতিদান ও পুরস্কার হচ্ছে, বক্ষ প্রশস্থ হওয়া, অন্তর প্রসারিত হওয়া, অন্তরে আনন্দ খেলে যাওয়া এবং আল্লাহর আনুগত্য, যিকির ও আদেশ পালন করতে অমৃতের স্বাদ পাওয়া। আল্লাহকে ভালোবাসার ও তাঁর যিকির করার মাধ্যমে অন্তরে যে আনন্দ ও খুশি বিরাজ করে, তার কাছে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের নৈকট্য লাভের খুশি ও আনন্দ একেবারেই নস্যি।
অপরপক্ষে অসৎকর্ম ও পাপের দুনিয়াবী শাস্তি হল, বক্ষ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। অন্তর ইস্পাতসম কঠোর হয়ে যাওয়া এবং দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, বিষণ্ণতা, দুঃখ-কষ্ট ও ভয়-ভীতির কারণে হৃদয় অশান্ত, অন্ধকার ও কালো হয়ে যাওয়া। যার সামান্য অনুভূতি ও উপলব্ধি-শক্তি আছে, সে সন্দেহাতীতভাবে বুঝতে পারে যে, দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, বিষণ্ণতা, দুঃখ-কষ্ট ও ভয়-ভীতি হচ্ছে, দুনিয়াবী শান্তি, দুনিয়াবী দাহন এবং দুনিয়াবী জাহান্নাম।
আল্লাহ অভিমুখী হওয়া, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করা, তাঁর ও তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, তাঁর ভালোবাসায় অন্তরকে টইটুম্বর রাখা, তাঁর যিকিরে নিমজ্জিত থাকা এবং তাঁর মারিফাতে আনন্দ ও খুশি হওয়া—এসবকিছু দুনিয়াবী পুরস্কার, দুনিয়াবী জান্নাত এবং দুনিয়াবী উত্তম জীবিকা। এমন জীবিকার কাছে রাজা-বাদশাহদের জীবিকা একেবারেই নগণ্য।