📄 যিকরুল্লাহ অন্তরকে সদা জাগ্রত রাখে
৪০. যিকরুল্লাহ অন্তরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে এবং তন্দ্রার চাদরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। অন্তর ঘুমিয়ে থাকলে ব্যবসায় ধস নামে। লোকসান হয়। ফলে চরম ক্ষতির হিসাব গুণতে হয়। কিন্তু বান্দা যখন অলসতার চাদর গা থেকে ছুঁড়ে ফেলে ঘুম থেকে জেগে উঠে ক্ষতির পরিমাণ জানতে পারে, তখন সে শক্ত করে কোমর বাঁধে। বাকী জীবনটা নির্ঘুম কাটিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
একমাত্র যিকরুল্লাহর মাধ্যমেই সচেতন, নির্ঘুম ও জাগ্রত থাকা সম্ভব। যিকরুল্লাহ বিমুখতার কারণে বান্দার শরীরে অলসতার চাদর লেপ্টে যায় এবং সে গভীর ঘুমের রাজ্যে পৌঁছে যায়।
📄 যিকরুল্লাহর মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গী হওয়া যায়
৪২. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে যিকিরকারী আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়; এমনকি আল্লাহ তার সাথী হয়ে যান। রবের এ সঙ্গী হওয়া দ্বারা জ্ঞানের মাধ্যমে সঙ্গী হওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং বিশেষ সঙ্গী হওয়া উদ্দেশ্য। নৈকট্য, বেলায়াত, মহব্বত, সাহায্য ও তাওফীকের মাধ্যমে তিনি বান্দার সঙ্গী হন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُمْ مُحْسِنُونَ
নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকী ও সৎকর্মশীলদের সাথে থাকেন। ৭৬
وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন। ৭৭
وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ ৭৮
আল্লাহ মুমিনদের সাথে থাকেন।
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ৭৯
চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন।
যিকিরকারী আল্লাহ তাআলার অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে যায়। এ ব্যাপারে হাদিসে কুদসীতে বলা হয়েছে,
'বান্দা যতক্ষণ আমার যিকির করে এবং যিকিরের মাধ্যমে তার ঠোঁট নাড়ায়, আমি ততক্ষণ তার সাথেই থাকি।'৮০
যিকিরকারী যেভাবে আল্লাহর অন্তরঙ্গ সঙ্গী হতে পারে, অন্য কেউ সেভাবে তাঁর সঙ্গী হতে পারে না। আল্লাহর সঙ্গী হওয়ার ক্ষেত্রে যিকিরকারী নজিরবিহীন। মুহসিন ও মুত্তাকীদের থেকেও তাঁর সঙ্গলাভ শ্রেষ্ঠ। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব; শুধু অনুভব করতে হয়। তবে এই জায়গাটা খুব ভয়ানক ও খতরনক। এখানে এসেই বান্দা পা পিছলে পড়ে যায়। এখানে এসে যখন আদি-অনাদি, রব-বান্দা, স্রষ্টা-সৃষ্টি, আবেদ-মাবুদ এসবের মাঝে বিভাজন শক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন নাসারাদের মতো হুলুল৮১ পন্থী ও ইত্তিহাদ৮২ পন্থী হয়ে যায়। ওয়াহদাতুল উজুদ৮৩ মতবাদে জড়িয়ে পড়ে। মনে করে স্রষ্টা আর সৃষ্টি বলতে ভিন্ন কোনো জিনিস নেই; যিনি স্রষ্টা তিনিই সৃষ্টি। তাদের কাছে রব আর বান্দা বলতে আলাদা কোনো জিনিসের অস্তিত্ব থাকে না। মনে করে, রবই বান্দা আর বান্দাই রব। তারা তখন বলে, আল্লাহ সৃষ্টির রূপে আগমন করেছেন। এইসব জালিম ও অস্বীকারকারীরা যা বলে আল্লাহ তাআলা এর চেয়ে অনেক অনেক ঊর্ধ্বে।
মোটকথা, কোনো বান্দা সহীহ আকীদার জ্ঞান না রাখা অবস্থায় যিকরুল্লাহর রাজত্বে পা রাখলে, সে তার ও তার যিকির থেকে রবকে হারিয়ে ফেলবে এবং সুনিশ্চিতভাবে হুলুল ও ইত্তিহাদের চোরাবালিতে প্রবেশ করবে।
টিকাঃ
৭৬. সূরা নাহল, আয়াত: ১২৮
৭৭. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৪৯
৭৮. সূরা আনফাল, আয়াত: ১৯
৭৯. সূরা তাওবাহ, আয়াত: ৪০
৮০. সহীহুল বুখারী, ১৩/৫০৮; ইবন মাজাহ, ৩৭৯২
৮১. হুলুল সূফীদের একটি পরিভাষা। আল্লাহ সকল বস্তুর মাঝে বিদ্যমান রয়েছেন, মানব দেহে তিনি প্রবেশ করেন এমন বিশ্বাসকে হুলুল বলা হয়।
৮২. ইত্তিহাদও সূফীদের একটি পরিভাষা। আল্লাহ তাআলা মাখলুকের মাঝে মিশে একাকার হয়ে গেছেন। তাই মানুষ যা কিছু দেখে, আল্লাহকে দেখে এমন বিশ্বাসকে ইত্তিহাদ বলা হয়।
৮৩. সর্বেশ্বরবাদ বা সবকিছুকে আল্লাহ বলে বিশ্বাস করাকে ওয়াহদাতুল উজুদ বলা হয়।
📄 অন্তরের কঠোরতা দূরীকরণে যিকিরের প্রভাব
৪৬. পাথরের মতো শক্ত অন্তরসমূহ যিকরুল্লাহর মাধ্যমে গলে যায়। এমন অন্তরকে অন্য কোনো মাধ্যমে গলানো সম্ভব নয়। যাদের অন্তর এমন শক্ত হয়ে গিয়েছে, তাদের উচিত যিকরুল্লাহর প্রতিষেধক গ্রহণ করা এবং যিকরুল্লাহর সাহায্যে চিকিৎসা করা।
হাম্মাদ ইবন যাইদ মুআল্লা ইবন যিয়াদ থেকে বর্ণনা করেন, “এক ব্যক্তি হাসান বসরীকে বলে, আমার অন্তর খুবই শক্ত হয়ে গিয়েছে। এখন কী করা যায়? তিনি বলেন, যিকিরের সাহায্যে গলিয়ে দাও।”১১১
অন্তর যত বেশি আল্লাহর যিকির থেকে দূরে থাকে তত বেশি শক্ত হয়ে যায়। আবার যখন যিকির শুরু করে তখন আগুন যেমন লোহাকে গলিয়ে দেয় যিকির তেমন সেই শক্ত অন্তরকে গলিয়ে দেয়। শক্ত অন্তরকে গলানোর ক্ষেত্রে যিকিরের কোনো জুড়ি নেই।
টিকাঃ
১১১. শুআবুল ঈমান, ২/৫৮৮
📄 যিকরুল্লাহ অন্তরের ওষুধ
৪৭. যিকরুল্লাহ অসুস্থ অন্তরের আরোগ্য ও শিফা। যিকির বিমুখতা মূলত অন্তরের একপ্রকার রোগ। ফলে কেউ যিকির বিমুখ হলে তার অন্তর অসুস্থ হয়ে যায়। সেই অসুস্থ অন্তরকে শুধুমাত্র যিকির সুস্থ করে তুলতে পারে। মাকহুল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর যিকির আরোগ্য আর মানুষের যিকির ব্যাধি।১১২
জেনো রেখো, তুমি যতক্ষণ আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকবে ততক্ষণ তোমার অন্তর সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকবে আর যখনই যিকির থেকে দূরে সরে যাবে তখনই তোমার অন্তর অসুস্থ ও রোগা হয়ে যাবে। কবি বলেছেন,
'আমরা অসুস্থ হলে তোমার যিকিরের ওষুধ সেবন করি বটে; কোনো সময় যিকির ছুটে গেলে আবারও অবস্থার অবনতি ঘটে।'
টিকাঃ
১১২. আত-তারগীব ওয়াত তারহীবে (১৩৮৯) উক্তিটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্ণনাটি মুরসাল।