📄 যিকরুল্লায় রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি ও সুখ
আল্লাহকে ভালোবাসা, তাঁকে যথাযথভাবে চেনা, সর্বদা তাঁর যিকির করা, যিকরুল্লাহর মাধ্যমে প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি পাওয়া, তাঁকে মুহাব্বত করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর ব্যাপারে আশা রাখা, তাঁর ওপর ভরসা করা এবং সকল কাজে এমনভাবে তাঁর সাথে নিজেকে জুড়ে দেওয়া যে, যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে একচ্ছত্র মালিক মনে করা-এসব দুনিয়ার জান্নাত ও তুলনাহীন নেয়ামত। এসব তাঁর প্রেমিকদের চক্ষুশীতলকারী এবং আল্লাহওয়ালাদের প্রাণ। এসবের মাধ্যমে তাদের চক্ষুশীতল হয় এবং তারা বেঁচে থাকার খোরাক পায়।
ভালোভাবে জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে যার যতটুকু চক্ষুশীতল হয়, তাকে দেখে মানুষেরও ততটুকু চক্ষুশীতল হয়। আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে যার চক্ষুশীতল হয় না, তার দুনিয়ার জীবন সংকীর্ণ, কষ্টকর ও যন্ত্রণাময় হয়ে ওঠে। আমাদের এ কথাটি তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে যার অন্তর এখনো জীবিত। আর যার অন্তরের মৃত্যু ঘটেছে সে কখনই বিশ্বাস করবে না।
আর যার অন্তরের মৃত্যু ঘটেছে, তার থেকে যতদূর সম্ভব দূরে থাক। তার সাথে চলাফেরা করলে ও তার সাথে মেলামেশা করলে সে তোমাকেও তার যন্ত্রণার ভাগীদার বানাবে। ঘটনাক্রমে তার সাথে চলতে হলে কিংবা মিশতে হলে, তার সাথে বাহ্যিকভাবে উঠাবসা করো, তবে আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দূরত্ব বজায় রাখ। তার ব্যাপারে সামান্যতম আন্তরিক হয়ো না। তার কারণে উত্তম ও উপকারী জিনিস থেকে গাফেল হয়ে পড়ো না।
ভালোভাবে শুনে রেখ, দুনিয়ার বুকে সর্বাধিক দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হল, তুমি এমন কাউকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে এবং এমন কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে, যে তোমাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে, রবের সাথে তোমার সম্পর্ক নষ্ট করবে, তোমার মূল্যবান সময় অপচয় করবে, তোমার ভেতরে নানাধরণের দুশ্চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটাবে, তোমার দৃঢ় প্রত্যয়কে দুর্বল করে ছাড়বে এবং অন্তরকে বিক্ষিপ্ত করে দেবে। কোনো কারণে এমন ব্যক্তির পাল্লায় পড়ে গেলে, তার সাথে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ব্যবহার করো, তার সাথে এমনভাবে সম্পর্ক বজায় রাখো, যাতে তোমার রব তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। তার সাথে একজন সফল ব্যবসায়ীর মত লেনদেন করো; তোমার ব্যবসায় যেন লোকসান না হয় সেদিকে জোড়ালো দৃষ্টি রাখ।
মনে কর, তুমি সফর অবস্থায় আছ। এ অবস্থায় তোমার সাথে রাস্তায় একজনের সাক্ষাৎ হল। সে তোমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল এবং তোমার সাথে সফর করার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। এ সময় তোমার কাজ হল, তাকে সঙ্গে নিয়ে সফর করা। তুমি তাকে তোমার সফরসঙ্গী বানিয়ে নাও, তুমি তার সফরসঙ্গী হয়ো না। অতঃপর সে যদি আর তোমার সাথে যেতে না চায়, তোমার সাথে সফর করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তবে তার জন্য তোমার সফর স্থগিত করো না। বরং তাকে বর্জন করে তোমার মনযিলে মাকসাদের দিকে সফর অব্যহত রাখ। তার দিকে ফিরেও তাকায়ো না। কেননা মূলত সে তোমার সফরসঙ্গী নয়; বরং সে তোমার সফরকে স্থগিতকারী ডাকাত। তুমি তোমার অন্তরকে হিফাযত করো এবং দিনের আলো থাকতেই মানযিলে মাকসাদে পৌঁছে যাও। মানযিলে মাকসাদের পৌঁছার আগে যেন সূর্য ডুবে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখো। ফজর উদিত হওয়ার সময়ও যদি রাস্তায় পড়ে থাক, তবে তুমি তোমার সফরসঙ্গীদের হারাবে এবং একাই পড়ে থাকবে।
📄 হৃদয়ের সব আকুতি পূরণের মাধ্যম যিকরুল্লাহ
৩৮. হৃদয়ে এক ধরণের আকুতি ও অভাব থাকে। সেই আকুতি ও অভাব পূরণ হয় যিকরুল্লাহর মাধ্যমে। যিকির যখন অন্তরে প্রতীক ও শ্লোগানে রূপ নেয় এবং জিহ্বাও তার অনুসরণ করা শুরু করে, তখন তার যাবতীয় অভাব পূরণ হয়ে যায়, দারিদ্রতা বিদায় নেয়। ফলে যিকিরকারীর সম্পদ না থাকলেও সম্পদশালী হয়ে যায়, বংশ-বুনিয়াদ ছাড়াই প্রভাবশালীতে পরিণত হয় এবং রাজত্ব ছাড়াই মর্যাদার শিখরে আরোহন করে। আর যিকিরবিমুখ ব্যক্তির অবস্থা হয় ঠিক এর উল্টা। সম্পদের প্রাচুর্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদেরকে হতদরিদ্র মনে করে, রাজত্ব থাকা সত্ত্বেও অপমান ও লাঞ্ছনার সাথে জীবনযাপন করে এবং বংশ-বুনিyad থাকা সত্ত্বেও তুচ্ছ ও হীন অবস্থায় দিনাতিপাত করে।
📄 যিকরুল্লাহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান
৩৯. যিকরুল্লাহ বিচ্ছিন্ন জিনিসকে একত্রিত করে আর একত্রিত জিনিসকে বিচ্ছিন্ন করে, দূরকে নিকটে আনে আর নিকটকে দূরে ঠেলে দেয়।
বিচ্ছিন্ন জিনিসকে একত্রিত করে দেওয়ার অর্থ হল, বান্দার বিচ্ছিন্ন অন্তর, বিচ্ছিন্ন ইচ্ছা, বিচ্ছিন্ন চিন্তা-চেতনা ও বিচ্ছিন্ন সংকল্পকে একত্রিত করে। এসব জিনিস বিচ্ছিন্নাবস্থায় থাকলে তা শাস্তি, যাতনা ও দুঃখ-কষ্টের উপজীব্য হয়ে যায় আর একত্রিত থাকলে সুন্দর ও নেয়ামতের জীবন কাটানো সম্ভব হয়।
একত্রিত জিনিসকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অর্থ হল, বান্দার পুঞ্জিভূত বিভিন্ন দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা, উৎকণ্ঠা, কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত জিনিস না পাওয়ার আক্ষেপ ইত্যাদিকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করে দেয়।
অনুরূপভাবে বান্দার পূঞ্জিভূত পাপ, ভুলটি ও অন্যায়গুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়; এমনকি সেসব পাপ, ভুলত্রুটি ও অন্যায় হারিয়ে যায় ও কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
একইভাবে যিকির শয়তান-বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কেননা আক্রমণের জন্য ইবলীস একের পর এক পর্যায়ক্রমে তার সৈন্যবাহিনী পাঠায়। বান্দা যত বেশি আল্লাহকে পেতে আকুল হয়, তাঁর সাথে তার সম্পর্ক যত গভীর, শয়তান তত শক্তিশালী ও দুঃসাহসী সৈন্যবাহিনী পাঠায়। শয়তানের এমন শক্তিশালী ও দুঃসাহসী সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত ও বিচ্ছিন্ন করার একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে, অহর্নিশ যিকরুল্লাহ।
দূরকে নিকটবর্তী করে দেওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য, শয়তান বিভিন্ন আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বান্দার সামনে জাঁকজমকভাবে তুলে ধরে পরকালকে দূরবর্তী বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু যিকরুল্লাহ শয়তানের সব পাতানো ফাঁদ ছিন্নভিন্ন করে পরকালকে বান্দার সামনে অতি নিকটবর্তী করে উপস্থাপন করে। যিকরুল্লাহয় জিহ্বা সিক্ত থাকলে বান্দা পরকালের সীমায় প্রবেশ করে এবং পরকালের ময়দানে নিজেকে উপস্থিত মনে করে। ফলে দুনিয়া তার কাছে একেবারেই তুচ্ছ মনে হয় আর পরকালের বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও মর্যাদা তার হৃদমাঝারে বাসা বাঁধে।
নিকটবর্তীকে দূরবর্তী করে দেওয়ার অর্থ হল, গতকালও যে দুনিয়া বান্দার সবচেয়ে কাছের জিনিস বলে মনে হত, আজকে সেই একই দুনিয়া তার কাছে পরকাল অপেক্ষা অধিক দূরবর্তী মনে হয়। কেননা পরকাল যত নিকটবর্তী মনে হয় দুনিয়া তত দূরে সরে যায়। পরকাল একধাপ কাছে হলে দুনিয়া একধাপ দূরে সরে যায়। সুতরাং দুনিয়াকে দূরে ঠেলে দিয়ে পরকালকে কাছে টেনে নেওয়ার একমাত্র পদ্ধতি হল, জিহ্বাকে যিকরুল্লাহ দ্বারা ভিজিয়ে রাখা।
📄 যিকরুল্লাহ অন্তরকে সদা জাগ্রত রাখে
৪০. যিকরুল্লাহ অন্তরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে এবং তন্দ্রার চাদরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। অন্তর ঘুমিয়ে থাকলে ব্যবসায় ধস নামে। লোকসান হয়। ফলে চরম ক্ষতির হিসাব গুণতে হয়। কিন্তু বান্দা যখন অলসতার চাদর গা থেকে ছুঁড়ে ফেলে ঘুম থেকে জেগে উঠে ক্ষতির পরিমাণ জানতে পারে, তখন সে শক্ত করে কোমর বাঁধে। বাকী জীবনটা নির্ঘুম কাটিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
একমাত্র যিকরুল্লাহর মাধ্যমেই সচেতন, নির্ঘুম ও জাগ্রত থাকা সম্ভব। যিকরুল্লাহ বিমুখতার কারণে বান্দার শরীরে অলসতার চাদর লেপ্টে যায় এবং সে গভীর ঘুমের রাজ্যে পৌঁছে যায়।