📘 যিকরুল্লাহ > 📄 দুনিয়ার জান্নাত

📄 দুনিয়ার জান্নাত


শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ কদ্দাসাল্লাহু রুহাহু-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘দুনিয়াতেই রয়েছে জান্নাত। যে দুনিয়ার জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না, সে পরকালের জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না।’

তিনি একবার আমাকে বলেন, আমার শত্রুরা আমার কীইবা করতে পারবে? আমার জান্নাত তো আমার বুকেই। আমি যেখানেই যাই, সেই জান্নাত আমার সাথেই থাকে, আমার থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। কারাগার আমার ইবাদতের জন্য নির্জন আশ্রয়স্থল। মৃত্যুদন্ড আমার জন্য শাহাদাতের সুযোগ। আর দেশ থেকে নির্বাসন আমার জন্য এক সফর।

কারাবন্দী অবস্থায় তিনি বলতেন, ‘আমি যদি এই কারাগার পরিমাণ স্বর্ণ দান করি তবুও এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় হবে না।’

অথবা তিনি এ কথা বলেন, ‘কারাগারে বন্দী করে শত্রুরা আমার কল্যাণের যে ব্যবস্থা করেছে, আমি কোনোভাবেই এর প্রতিদান দিতে পারবো না।’

কারাগারে বন্দী অবস্থায় তিনি সাজদায় বলতেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তোমার যিকির, শোকর এবং তোমার উত্তম ইবাদত করতে সাহায্য করো।’

তিনি একবার আমাকে বলেন, ‘প্রকৃত বন্দী তো ঐ ব্যক্তি, যার অন্তর রবের যিকির থেকে বন্দী। প্রকৃত কয়েদী তো সেই, যার প্রবৃত্তি তাকে কয়েদ করে ফেলেছে।’

শাইখুল ইসলামকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হলে কারাগারে প্রবেশ করে কারাগারের চার দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে তিনি এই আয়াত পাঠ করেন,

فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ

অতঃপর তাদের মাঝে একটি প্রাচীর স্থাপন করা হবে, যার একটি দরজা থাকবে। তার ভেতর ভাগে থাকবে রহমত আর বহির্ভাগের সর্বত্র থাকবে আযাব। ৪৯

আমি এমন কাউকে দেখিনি যার জীবন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহর জীবন থেকে বেশি উত্তম ও প্রশান্ত ছিলো। অথচ বাহ্যিক জীবনোপকরণ ছিলো সংকীর্ণ, তাতে ছিলো না কোনো বিলাসিতা ও প্রাচুর্যতা। এছাড়াও তাকে কারাগার বরণ করতে হয়েছে, শুনতে হয়েছে বিভিন্নরকমের হুমকি-ধুমকি। এতকিছুর পরও তার জীবনপদ্ধতি ছিল সর্বোত্তম, বক্ষ ছিল প্রশস্থ, অন্তর ছিল ইস্পাতের মতো শক্ত, সবসময় আনন্দ লেগে থাকত মনে। চেহারা থেকে সর্বদা আলো ও বিভা ঝরে পড়ত।

যখন আমরা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম, আমাদের অন্তরে যখন ওয়াসওয়াসা ও কুধারণা জন্ম নিত, আমাদের জীবন হয়ে উঠত সংকীর্ণ, তখন আমরা তার কাছে ছুটে যেতাম। তাকে দেখা ও তার কথা শোনা মাত্রই রাজ্যের ভয়-ভীতি, ওয়াসওয়াসা, কুধারণা ও সংকীর্ণতা আমাদের থেকে দূর হয়ে যেত। বিন্দু মাত্র তার রেশ থাকত না। আমাদের মাঝে তখন প্রশান্তি, প্রশস্থতা, মনোবল, ইয়াকিন ও প্রফুল্লতা ছড়িয়ে পড়ত।

সেই সত্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, যিনি তাঁর সাথে সাক্ষাতের পূর্বে দুনিয়াতেই তার বান্দাকে জান্নাত দেখিয়েছেন এবং দারুল আমালে ৫০ তাঁর জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিয়েছেন। সেই দরজা দিয়ে তার কাছে জান্নাতের স্বাদ, ঘ্রাণ ও মৃদমন্দ বায়ু আসত।

এক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলেন, 'আমরা যে সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশে থাকি, রাজা-বাদশাহ ও রাজপুতেরা যদি কোনোভাবে তা টের পেত, তবে তারা তা ছিনিয়ে নিতে আমাদের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করত।'

আরেকজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলেন, 'প্রকৃত মিসকীন তো সেই, যে দুনিয়ার উত্তম বস্তু, তৃপ্তি ও স্বাদ আস্বাদন করা ছাড়াই দুনিয়া ত্যাগ করেছে।'

তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'দুনিয়ার উত্তম বস্তু, তৃপ্তি ও স্বাদ কী?'

তিনি বলেন, 'আল্লাহকে ভালোবাসা, তাঁকে ভালোভাবে চেনা ও তাঁর যিকির করা।'

আরেকজন বলেন, 'কখনো কখনো চিত্ত এমন অবস্থার সম্মুখীন হয় যে, আনন্দে সে নাচতে শুরু করে।'

অন্য আরেকজন বলেন, 'মাঝেমধ্যে অন্তরে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, আমি বলে উঠি, জান্নাতীরা যদি এমন অবস্থায় থাকে তবে তারা সুখে আছে।'

টিকাঃ
৪৯. সূরা হাদীদ, আয়াত: ১৩
৫০. আমলের রাজ্য অর্থাৎ দুনিয়া

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লায় রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি ও সুখ

📄 যিকরুল্লায় রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি ও সুখ


আল্লাহকে ভালোবাসা, তাঁকে যথাযথভাবে চেনা, সর্বদা তাঁর যিকির করা, যিকরুল্লাহর মাধ্যমে প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি পাওয়া, তাঁকে মুহাব্বত করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর ব্যাপারে আশা রাখা, তাঁর ওপর ভরসা করা এবং সকল কাজে এমনভাবে তাঁর সাথে নিজেকে জুড়ে দেওয়া যে, যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে একচ্ছত্র মালিক মনে করা-এসব দুনিয়ার জান্নাত ও তুলনাহীন নেয়ামত। এসব তাঁর প্রেমিকদের চক্ষুশীতলকারী এবং আল্লাহওয়ালাদের প্রাণ। এসবের মাধ্যমে তাদের চক্ষুশীতল হয় এবং তারা বেঁচে থাকার খোরাক পায়।

ভালোভাবে জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে যার যতটুকু চক্ষুশীতল হয়, তাকে দেখে মানুষেরও ততটুকু চক্ষুশীতল হয়। আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে যার চক্ষুশীতল হয় না, তার দুনিয়ার জীবন সংকীর্ণ, কষ্টকর ও যন্ত্রণাময় হয়ে ওঠে। আমাদের এ কথাটি তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে যার অন্তর এখনো জীবিত। আর যার অন্তরের মৃত্যু ঘটেছে সে কখনই বিশ্বাস করবে না।

আর যার অন্তরের মৃত্যু ঘটেছে, তার থেকে যতদূর সম্ভব দূরে থাক। তার সাথে চলাফেরা করলে ও তার সাথে মেলামেশা করলে সে তোমাকেও তার যন্ত্রণার ভাগীদার বানাবে। ঘটনাক্রমে তার সাথে চলতে হলে কিংবা মিশতে হলে, তার সাথে বাহ্যিকভাবে উঠাবসা করো, তবে আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দূরত্ব বজায় রাখ। তার ব্যাপারে সামান্যতম আন্তরিক হয়ো না। তার কারণে উত্তম ও উপকারী জিনিস থেকে গাফেল হয়ে পড়ো না।

ভালোভাবে শুনে রেখ, দুনিয়ার বুকে সর্বাধিক দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হল, তুমি এমন কাউকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে এবং এমন কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে, যে তোমাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে, রবের সাথে তোমার সম্পর্ক নষ্ট করবে, তোমার মূল্যবান সময় অপচয় করবে, তোমার ভেতরে নানাধরণের দুশ্চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটাবে, তোমার দৃঢ় প্রত্যয়কে দুর্বল করে ছাড়বে এবং অন্তরকে বিক্ষিপ্ত করে দেবে। কোনো কারণে এমন ব্যক্তির পাল্লায় পড়ে গেলে, তার সাথে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ব্যবহার করো, তার সাথে এমনভাবে সম্পর্ক বজায় রাখো, যাতে তোমার রব তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। তার সাথে একজন সফল ব্যবসায়ীর মত লেনদেন করো; তোমার ব্যবসায় যেন লোকসান না হয় সেদিকে জোড়ালো দৃষ্টি রাখ।

মনে কর, তুমি সফর অবস্থায় আছ। এ অবস্থায় তোমার সাথে রাস্তায় একজনের সাক্ষাৎ হল। সে তোমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল এবং তোমার সাথে সফর করার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। এ সময় তোমার কাজ হল, তাকে সঙ্গে নিয়ে সফর করা। তুমি তাকে তোমার সফরসঙ্গী বানিয়ে নাও, তুমি তার সফরসঙ্গী হয়ো না। অতঃপর সে যদি আর তোমার সাথে যেতে না চায়, তোমার সাথে সফর করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তবে তার জন্য তোমার সফর স্থগিত করো না। বরং তাকে বর্জন করে তোমার মনযিলে মাকসাদের দিকে সফর অব্যহত রাখ। তার দিকে ফিরেও তাকায়ো না। কেননা মূলত সে তোমার সফরসঙ্গী নয়; বরং সে তোমার সফরকে স্থগিতকারী ডাকাত। তুমি তোমার অন্তরকে হিফাযত করো এবং দিনের আলো থাকতেই মানযিলে মাকসাদে পৌঁছে যাও। মানযিলে মাকসাদের পৌঁছার আগে যেন সূর্য ডুবে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখো। ফজর উদিত হওয়ার সময়ও যদি রাস্তায় পড়ে থাক, তবে তুমি তোমার সফরসঙ্গীদের হারাবে এবং একাই পড়ে থাকবে।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 হৃদয়ের সব আকুতি পূরণের মাধ্যম যিকরুল্লাহ

📄 হৃদয়ের সব আকুতি পূরণের মাধ্যম যিকরুল্লাহ


৩৮. হৃদয়ে এক ধরণের আকুতি ও অভাব থাকে। সেই আকুতি ও অভাব পূরণ হয় যিকরুল্লাহর মাধ্যমে। যিকির যখন অন্তরে প্রতীক ও শ্লোগানে রূপ নেয় এবং জিহ্বাও তার অনুসরণ করা শুরু করে, তখন তার যাবতীয় অভাব পূরণ হয়ে যায়, দারিদ্রতা বিদায় নেয়। ফলে যিকিরকারীর সম্পদ না থাকলেও সম্পদশালী হয়ে যায়, বংশ-বুনিয়াদ ছাড়াই প্রভাবশালীতে পরিণত হয় এবং রাজত্ব ছাড়াই মর্যাদার শিখরে আরোহন করে। আর যিকিরবিমুখ ব্যক্তির অবস্থা হয় ঠিক এর উল্টা। সম্পদের প্রাচুর্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদেরকে হতদরিদ্র মনে করে, রাজত্ব থাকা সত্ত্বেও অপমান ও লাঞ্ছনার সাথে জীবনযাপন করে এবং বংশ-বুনিyad থাকা সত্ত্বেও তুচ্ছ ও হীন অবস্থায় দিনাতিপাত করে।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান

📄 যিকরুল্লাহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান


৩৯. যিকরুল্লাহ বিচ্ছিন্ন জিনিসকে একত্রিত করে আর একত্রিত জিনিসকে বিচ্ছিন্ন করে, দূরকে নিকটে আনে আর নিকটকে দূরে ঠেলে দেয়।

বিচ্ছিন্ন জিনিসকে একত্রিত করে দেওয়ার অর্থ হল, বান্দার বিচ্ছিন্ন অন্তর, বিচ্ছিন্ন ইচ্ছা, বিচ্ছিন্ন চিন্তা-চেতনা ও বিচ্ছিন্ন সংকল্পকে একত্রিত করে। এসব জিনিস বিচ্ছিন্নাবস্থায় থাকলে তা শাস্তি, যাতনা ও দুঃখ-কষ্টের উপজীব্য হয়ে যায় আর একত্রিত থাকলে সুন্দর ও নেয়ামতের জীবন কাটানো সম্ভব হয়।

একত্রিত জিনিসকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অর্থ হল, বান্দার পুঞ্জিভূত বিভিন্ন দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা, উৎকণ্ঠা, কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত জিনিস না পাওয়ার আক্ষেপ ইত্যাদিকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করে দেয়।

অনুরূপভাবে বান্দার পূঞ্জিভূত পাপ, ভুলটি ও অন্যায়গুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়; এমনকি সেসব পাপ, ভুলত্রুটি ও অন্যায় হারিয়ে যায় ও কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

একইভাবে যিকির শয়তান-বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কেননা আক্রমণের জন্য ইবলীস একের পর এক পর্যায়ক্রমে তার সৈন্যবাহিনী পাঠায়। বান্দা যত বেশি আল্লাহকে পেতে আকুল হয়, তাঁর সাথে তার সম্পর্ক যত গভীর, শয়তান তত শক্তিশালী ও দুঃসাহসী সৈন্যবাহিনী পাঠায়। শয়তানের এমন শক্তিশালী ও দুঃসাহসী সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত ও বিচ্ছিন্ন করার একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে, অহর্নিশ যিকরুল্লাহ।

দূরকে নিকটবর্তী করে দেওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য, শয়তান বিভিন্ন আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বান্দার সামনে জাঁকজমকভাবে তুলে ধরে পরকালকে দূরবর্তী বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু যিকরুল্লাহ শয়তানের সব পাতানো ফাঁদ ছিন্নভিন্ন করে পরকালকে বান্দার সামনে অতি নিকটবর্তী করে উপস্থাপন করে। যিকরুল্লাহয় জিহ্বা সিক্ত থাকলে বান্দা পরকালের সীমায় প্রবেশ করে এবং পরকালের ময়দানে নিজেকে উপস্থিত মনে করে। ফলে দুনিয়া তার কাছে একেবারেই তুচ্ছ মনে হয় আর পরকালের বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও মর্যাদা তার হৃদমাঝারে বাসা বাঁধে।

নিকটবর্তীকে দূরবর্তী করে দেওয়ার অর্থ হল, গতকালও যে দুনিয়া বান্দার সবচেয়ে কাছের জিনিস বলে মনে হত, আজকে সেই একই দুনিয়া তার কাছে পরকাল অপেক্ষা অধিক দূরবর্তী মনে হয়। কেননা পরকাল যত নিকটবর্তী মনে হয় দুনিয়া তত দূরে সরে যায়। পরকাল একধাপ কাছে হলে দুনিয়া একধাপ দূরে সরে যায়। সুতরাং দুনিয়াকে দূরে ঠেলে দিয়ে পরকালকে কাছে টেনে নেওয়ার একমাত্র পদ্ধতি হল, জিহ্বাকে যিকরুল্লাহ দ্বারা ভিজিয়ে রাখা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00