📄 যিকরুল্লাহ বান্দার যাবতীয় আমলের বাহন
২১. সুবহানাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ-সহ যেসব বাক্য দ্বারা বান্দা আল্লাহর যিকির করা হয়, বান্দার বিপদে-আপদে সেসব বাক্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ দ্বারা তোমরা আল্লাহর যে যিকির করো, সেসব যিকির মৌমাছির গুঞ্জনের মতো আরশের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং যিকিরকারীর কথা উল্লেখ করে। তোমাদের কেউ কি চাও না যে, আল্লাহর নিকট তার কথা উল্লেখকারী কিছু থাকুক। ২৮
২২. যে ব্যক্তি সুখ-স্বাচ্ছন্দের সময় আল্লাহর যিকির করে, বিপদ-আপদের সময় আল্লাহ তাকে স্মরণ করেন এবং যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে তাকে উতরিয়ে দেন। একটি আসারে ২৯ পাওয়া যায়, 'আল্লাহর অনুগত যিকিরকারী বান্দা যখন বিপদ-আপদের মুখোমুখি হয় অথবা নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে, তখন ফেরেশতারা বলেন, 'রব, এটি পরিচিত বান্দার পরিচিত কণ্ঠ।' এর বিপরীতে যিকিরবিমুখ গাফেল বান্দা যখন আল্লাহকে ডাকে বা আল্লাহর কাছে কোনোকিছু চায়, তখন ফেরেশতারা বলেন, 'রব, এটা তো অপরিচিত বান্দার অপরিচিত কণ্ঠ।'৩০
২৩. যিকরুল্লাহ বান্দাকে আল্লাহর আযাব থেকে নাজাত দেয়। মুআয রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, 'যিকরুল্লাহ আদম সন্তানকে আল্লাহর আযাব থেকে যতটা রক্ষা করে, অন্য কোনো আমল ততটা রক্ষা করতে পারে না।' ৩১
২৪. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে বান্দার ওপর প্রশান্তি নেমে আসে, আল্লাহর রহমত তাকে পরিবৃত্ত করে এবং ফেরেশতারা তাকে ঘিরে রাখে; যেমনটি পূর্বে হাদিসে বলা হয়েছে।
২৫. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে গীবত, চোগলখোরি, মিথ্যা ও অশ্লীলতার মতো অন্যান্য বাতিল কথাবার্তা থেকে রসনাকে মুক্ত রাখা যায়। মানুষের প্রকৃতি হচ্ছে, তারা চুপ থাকতে পারে না; কোনো না কোনো কথা তাকে বলতেই হয়। তাই আল্লাহর যিকিরে রসনাকে ব্যস্ত রাখা নাহলে এবং তাঁর বিধিবিধানের ব্যাপারে আলোচনা করা নাহলে, রসনা হারাম ও বাতিল কথাবার্তায় লিপ্ত হবেই; আল্লাহর যিকির ছাড়া এ থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পথ নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে একথা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত যে, কেউ যদি স্বীয় রসনাকে আল্লাহর যিকিরে অভ্যস্ত করে ফেলে, তবে তার রসনা অনর্থক ও বাতিল কথাবার্তা থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে। অপরপক্ষে যার রসনা আল্লাহর যিকির থেকে নীরস থাকে, তার রসনা যাবতীয় বাতিল, অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা দ্বারা সিক্ত থাকে। লা-হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ।
টিকাঃ
২৮. সুনানু ইবন মাজাহ, ৩৮০۹; হাদিসটি সহীহ
২৯. সাহাবী ও তাবিয়ীদের উক্তিকে আসার বলা হয়।
৩০. এটি সাহাবী সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা। মুহাম্মাদ ইবন ফুযাইল আয-যব্বী, আদ-দুআ, ৮৫; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/৩০۹-৩১০, সনদ সহীহ
৩১. সুনানুত তিরমিযী, ৩৩৭৭; হাদিসটি সহীহ
📄 যিকরকারীর অন্তর থেকে আল্লাহ কখনো বিচ্যুত হয় না
৩৪. কেউ স্থায়ী ও ধারাবাহিকভাবে যিকির করলে তার অন্তরে আল্লাহর নাম সদা ভাস্বর থাকে; অণুক্ষণের জন্যও সে আল্লাহ থেকে বিস্মৃত হয় না। আর অন্তরে আল্লাহর নাম সদা ভাস্বর থাকা একজন বান্দার বড় সফলতার কুঞ্চিকা। বান্দা দুনিয়া ও আখিরাতে তখনই হতচ্ছড়া ও দুর্ভাগাদের মিছিলে যুক্ত হয়, যখন সে আল্লাহকে ভুলে যায়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়া অর্থ নিজেকে ও নিজের কল্যাণকে ভুলে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে। ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছেন। তারাই মূলত পাপাচারী। ৪১
টিকাঃ
৪১. সূরা হাশর, আয়াত: ১৯
📄 দুনিয়ার জান্নাত
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ কদ্দাসাল্লাহু রুহাহু-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘দুনিয়াতেই রয়েছে জান্নাত। যে দুনিয়ার জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না, সে পরকালের জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না।’
তিনি একবার আমাকে বলেন, আমার শত্রুরা আমার কীইবা করতে পারবে? আমার জান্নাত তো আমার বুকেই। আমি যেখানেই যাই, সেই জান্নাত আমার সাথেই থাকে, আমার থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। কারাগার আমার ইবাদতের জন্য নির্জন আশ্রয়স্থল। মৃত্যুদন্ড আমার জন্য শাহাদাতের সুযোগ। আর দেশ থেকে নির্বাসন আমার জন্য এক সফর।
কারাবন্দী অবস্থায় তিনি বলতেন, ‘আমি যদি এই কারাগার পরিমাণ স্বর্ণ দান করি তবুও এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় হবে না।’
অথবা তিনি এ কথা বলেন, ‘কারাগারে বন্দী করে শত্রুরা আমার কল্যাণের যে ব্যবস্থা করেছে, আমি কোনোভাবেই এর প্রতিদান দিতে পারবো না।’
কারাগারে বন্দী অবস্থায় তিনি সাজদায় বলতেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তোমার যিকির, শোকর এবং তোমার উত্তম ইবাদত করতে সাহায্য করো।’
তিনি একবার আমাকে বলেন, ‘প্রকৃত বন্দী তো ঐ ব্যক্তি, যার অন্তর রবের যিকির থেকে বন্দী। প্রকৃত কয়েদী তো সেই, যার প্রবৃত্তি তাকে কয়েদ করে ফেলেছে।’
শাইখুল ইসলামকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হলে কারাগারে প্রবেশ করে কারাগারের চার দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে তিনি এই আয়াত পাঠ করেন,
فَضُرِبَ بَيْنَهُمْ بِسُورٍ لَهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ
অতঃপর তাদের মাঝে একটি প্রাচীর স্থাপন করা হবে, যার একটি দরজা থাকবে। তার ভেতর ভাগে থাকবে রহমত আর বহির্ভাগের সর্বত্র থাকবে আযাব। ৪৯
আমি এমন কাউকে দেখিনি যার জীবন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহর জীবন থেকে বেশি উত্তম ও প্রশান্ত ছিলো। অথচ বাহ্যিক জীবনোপকরণ ছিলো সংকীর্ণ, তাতে ছিলো না কোনো বিলাসিতা ও প্রাচুর্যতা। এছাড়াও তাকে কারাগার বরণ করতে হয়েছে, শুনতে হয়েছে বিভিন্নরকমের হুমকি-ধুমকি। এতকিছুর পরও তার জীবনপদ্ধতি ছিল সর্বোত্তম, বক্ষ ছিল প্রশস্থ, অন্তর ছিল ইস্পাতের মতো শক্ত, সবসময় আনন্দ লেগে থাকত মনে। চেহারা থেকে সর্বদা আলো ও বিভা ঝরে পড়ত।
যখন আমরা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম, আমাদের অন্তরে যখন ওয়াসওয়াসা ও কুধারণা জন্ম নিত, আমাদের জীবন হয়ে উঠত সংকীর্ণ, তখন আমরা তার কাছে ছুটে যেতাম। তাকে দেখা ও তার কথা শোনা মাত্রই রাজ্যের ভয়-ভীতি, ওয়াসওয়াসা, কুধারণা ও সংকীর্ণতা আমাদের থেকে দূর হয়ে যেত। বিন্দু মাত্র তার রেশ থাকত না। আমাদের মাঝে তখন প্রশান্তি, প্রশস্থতা, মনোবল, ইয়াকিন ও প্রফুল্লতা ছড়িয়ে পড়ত।
সেই সত্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, যিনি তাঁর সাথে সাক্ষাতের পূর্বে দুনিয়াতেই তার বান্দাকে জান্নাত দেখিয়েছেন এবং দারুল আমালে ৫০ তাঁর জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিয়েছেন। সেই দরজা দিয়ে তার কাছে জান্নাতের স্বাদ, ঘ্রাণ ও মৃদমন্দ বায়ু আসত।
এক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলেন, 'আমরা যে সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশে থাকি, রাজা-বাদশাহ ও রাজপুতেরা যদি কোনোভাবে তা টের পেত, তবে তারা তা ছিনিয়ে নিতে আমাদের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করত।'
আরেকজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলেন, 'প্রকৃত মিসকীন তো সেই, যে দুনিয়ার উত্তম বস্তু, তৃপ্তি ও স্বাদ আস্বাদন করা ছাড়াই দুনিয়া ত্যাগ করেছে।'
তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'দুনিয়ার উত্তম বস্তু, তৃপ্তি ও স্বাদ কী?'
তিনি বলেন, 'আল্লাহকে ভালোবাসা, তাঁকে ভালোভাবে চেনা ও তাঁর যিকির করা।'
আরেকজন বলেন, 'কখনো কখনো চিত্ত এমন অবস্থার সম্মুখীন হয় যে, আনন্দে সে নাচতে শুরু করে।'
অন্য আরেকজন বলেন, 'মাঝেমধ্যে অন্তরে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, আমি বলে উঠি, জান্নাতীরা যদি এমন অবস্থায় থাকে তবে তারা সুখে আছে।'
টিকাঃ
৪৯. সূরা হাদীদ, আয়াত: ১৩
৫০. আমলের রাজ্য অর্থাৎ দুনিয়া
📄 যিকরুল্লায় রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি ও সুখ
আল্লাহকে ভালোবাসা, তাঁকে যথাযথভাবে চেনা, সর্বদা তাঁর যিকির করা, যিকরুল্লাহর মাধ্যমে প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি পাওয়া, তাঁকে মুহাব্বত করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর ব্যাপারে আশা রাখা, তাঁর ওপর ভরসা করা এবং সকল কাজে এমনভাবে তাঁর সাথে নিজেকে জুড়ে দেওয়া যে, যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে একচ্ছত্র মালিক মনে করা-এসব দুনিয়ার জান্নাত ও তুলনাহীন নেয়ামত। এসব তাঁর প্রেমিকদের চক্ষুশীতলকারী এবং আল্লাহওয়ালাদের প্রাণ। এসবের মাধ্যমে তাদের চক্ষুশীতল হয় এবং তারা বেঁচে থাকার খোরাক পায়।
ভালোভাবে জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে যার যতটুকু চক্ষুশীতল হয়, তাকে দেখে মানুষেরও ততটুকু চক্ষুশীতল হয়। আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে যার চক্ষুশীতল হয় না, তার দুনিয়ার জীবন সংকীর্ণ, কষ্টকর ও যন্ত্রণাময় হয়ে ওঠে। আমাদের এ কথাটি তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে যার অন্তর এখনো জীবিত। আর যার অন্তরের মৃত্যু ঘটেছে সে কখনই বিশ্বাস করবে না।
আর যার অন্তরের মৃত্যু ঘটেছে, তার থেকে যতদূর সম্ভব দূরে থাক। তার সাথে চলাফেরা করলে ও তার সাথে মেলামেশা করলে সে তোমাকেও তার যন্ত্রণার ভাগীদার বানাবে। ঘটনাক্রমে তার সাথে চলতে হলে কিংবা মিশতে হলে, তার সাথে বাহ্যিকভাবে উঠাবসা করো, তবে আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দূরত্ব বজায় রাখ। তার ব্যাপারে সামান্যতম আন্তরিক হয়ো না। তার কারণে উত্তম ও উপকারী জিনিস থেকে গাফেল হয়ে পড়ো না।
ভালোভাবে শুনে রেখ, দুনিয়ার বুকে সর্বাধিক দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হল, তুমি এমন কাউকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে এবং এমন কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে, যে তোমাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে, রবের সাথে তোমার সম্পর্ক নষ্ট করবে, তোমার মূল্যবান সময় অপচয় করবে, তোমার ভেতরে নানাধরণের দুশ্চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটাবে, তোমার দৃঢ় প্রত্যয়কে দুর্বল করে ছাড়বে এবং অন্তরকে বিক্ষিপ্ত করে দেবে। কোনো কারণে এমন ব্যক্তির পাল্লায় পড়ে গেলে, তার সাথে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ব্যবহার করো, তার সাথে এমনভাবে সম্পর্ক বজায় রাখো, যাতে তোমার রব তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। তার সাথে একজন সফল ব্যবসায়ীর মত লেনদেন করো; তোমার ব্যবসায় যেন লোকসান না হয় সেদিকে জোড়ালো দৃষ্টি রাখ।
মনে কর, তুমি সফর অবস্থায় আছ। এ অবস্থায় তোমার সাথে রাস্তায় একজনের সাক্ষাৎ হল। সে তোমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল এবং তোমার সাথে সফর করার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। এ সময় তোমার কাজ হল, তাকে সঙ্গে নিয়ে সফর করা। তুমি তাকে তোমার সফরসঙ্গী বানিয়ে নাও, তুমি তার সফরসঙ্গী হয়ো না। অতঃপর সে যদি আর তোমার সাথে যেতে না চায়, তোমার সাথে সফর করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তবে তার জন্য তোমার সফর স্থগিত করো না। বরং তাকে বর্জন করে তোমার মনযিলে মাকসাদের দিকে সফর অব্যহত রাখ। তার দিকে ফিরেও তাকায়ো না। কেননা মূলত সে তোমার সফরসঙ্গী নয়; বরং সে তোমার সফরকে স্থগিতকারী ডাকাত। তুমি তোমার অন্তরকে হিফাযত করো এবং দিনের আলো থাকতেই মানযিলে মাকসাদে পৌঁছে যাও। মানযিলে মাকসাদের পৌঁছার আগে যেন সূর্য ডুবে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখো। ফজর উদিত হওয়ার সময়ও যদি রাস্তায় পড়ে থাক, তবে তুমি তোমার সফরসঙ্গীদের হারাবে এবং একাই পড়ে থাকবে।