📘 যিকরুল্লাহ > 📄 অন্তরের মরিচা দূরীকরণে যিকিরের ভূমিকা

📄 অন্তরের মরিচা দূরীকরণে যিকিরের ভূমিকা


লোহা, পিতল, চান্দি ও অন্যান্য জিনিসে যেমন মরিচা ধরে, তেমনি অন্তরেও মরিচা ধরে। অন্তরে মরিচা ধরলেও আল্লাহ সেই মরিচা দূর করার কেমিক্যাল দিয়ে দিয়েছেন। যিকরুল্লাহ হলো সেই কেমিক্যাল। যিকরুল্লাহর মাধ্যমে অন্তরের মরিচা এমনভাবে দূর হয় যে, অন্তর একেবারেই স্বচ্ছ-সফেদ ও পরিষ্কার হয়ে যায় এবং আয়নার মতো জ্বলজ্বল করে। বান্দা যখন যিকরুল্লাহ থেকে দূরে থাকে, তখন তার অন্তরে মরিচা পড়তে শুরু করে। তবে আশার কথা হলো, বান্দা যিকির শুরু করলে সেই মরিচা দূর হয়ে যায়।

দুই কারণে অন্তরে মরিচা পড়ে: যিকিরবিমুখতা ও গুনাহ। মরিচা দূর করার পদ্ধতিও দুটি : যিকির ও ইসতিগফার। যিকির ছাড়াই যে ব্যক্তির সিংহভাগ সময় কাটে, মরিচা তার অন্তরে খুব শক্তভাবে জেঁকে বসে। যিকিরবিমুখতা অনুযায়ী মরিচা কম-বেশি হয়। মরিচা পড়তে পড়তে কারো অন্তর যদি একেবারেই কালো হয়ে যায়, তাহলে ঐ অন্তর সঠিক-বেঠিক ও হক-বাতিলের মাঝে বিভাজন করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে সে আর সঠিক জিনিস গ্রহণ করতে পারে না; এমনকি তার কাছে বাতিলকে হক মনে হয় আর হককে মনে হয় বাতিল। কারণ, মরিচা পড়া কালো ও অন্ধকার অন্তরে কোনো বস্তুর সঠিক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে না।

এছাড়া মরিচা ধরে কারো অন্তর কালো ও অন্ধকার হয়ে গেলে তার চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতি শক্তিও নষ্ট হয়ে যায়। হক গ্রহণ করার শক্তি ও সাহস নিঃশেষ হয়ে যায় এবং হারিয়ে যায় বাতিলকে অস্বীকার করার চেতনা। এটাই হচ্ছে অন্তরের সবচেয়ে বড় শাস্তি। এসব মূলত যিকিরবিমুখতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে উৎসারিত। কেননা যিকিরবিমুখতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ অন্তরের প্রদীপকে নিভিয়ে দেয় এবং অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ করে ফেলে।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ অন্তরের খোরাক ও প্রাণ

📄 যিকরুল্লাহ অন্তরের খোরাক ও প্রাণ


১৭. যিকরুল্লাহ অন্তরের খোরাক ও প্রাণ। যিকিরবিহীন মানুষ এমন শরীরের মতো, যে শরীরকে খাবার দেওয়া হয় না। খাবার ছাড়া কোনো শরীর যেমন টিকে থাকতে পারে না, তেমনি যিকির ছাড়া কোনো অন্তর বেঁচে থাকতে পারে না।

একদিন আমি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যার কাছে উপস্থিত হলাম। দেখলাম, তিনি ফজর সালাত শেষে বসে রইলেন এবং প্রায় দুপুর পর্যন্ত যিকিরে নিমগ্ন থাকলেন। যিকির শেষ হলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'যিকির আমার সকালের নাস্তা। এই নাস্তা গ্রহণ না করলে আমি আমার শক্তি হারিয়ে ফেলি।'

তিনি আরেকবার আমাকে বলেন, আমি মাঝেমধ্যে নফসকে আরাম ও বিশ্রাম দেওয়ার উদ্দেশ্য যিকির করা থেকে বিরত থাকি। যাতে অন্য যিকির করার জন্য নফস আবারও পূর্ণোদ্যমে প্রস্তুতি নিতে পারে।

১৮. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে অন্তরের মরিচা দূর হয় এবং অন্তর স্বচ্ছ-সুন্দর হয়ে যায়। এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি।
প্রত্যেক জিনিসে মরিচা পড়ে। অন্তরে মরিচা পড়ে যিকির থেকে গাফেল থাকলে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে। যিকির, তওবা ও ইসতিগফারের মাধ্যমে সে-মরিচা পুরোপুরি ধুয়ে-মুছে যায়।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ বান্দার যাবতীয় আমলের বাহন

📄 যিকরুল্লাহ বান্দার যাবতীয় আমলের বাহন


২১. সুবহানাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ-সহ যেসব বাক্য দ্বারা বান্দা আল্লাহর যিকির করা হয়, বান্দার বিপদে-আপদে সেসব বাক্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ দ্বারা তোমরা আল্লাহর যে যিকির করো, সেসব যিকির মৌমাছির গুঞ্জনের মতো আরশের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং যিকিরকারীর কথা উল্লেখ করে। তোমাদের কেউ কি চাও না যে, আল্লাহর নিকট তার কথা উল্লেখকারী কিছু থাকুক। ২৮

২২. যে ব্যক্তি সুখ-স্বাচ্ছন্দের সময় আল্লাহর যিকির করে, বিপদ-আপদের সময় আল্লাহ তাকে স্মরণ করেন এবং যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে তাকে উতরিয়ে দেন। একটি আসারে ২৯ পাওয়া যায়, 'আল্লাহর অনুগত যিকিরকারী বান্দা যখন বিপদ-আপদের মুখোমুখি হয় অথবা নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে, তখন ফেরেশতারা বলেন, 'রব, এটি পরিচিত বান্দার পরিচিত কণ্ঠ।' এর বিপরীতে যিকিরবিমুখ গাফেল বান্দা যখন আল্লাহকে ডাকে বা আল্লাহর কাছে কোনোকিছু চায়, তখন ফেরেশতারা বলেন, 'রব, এটা তো অপরিচিত বান্দার অপরিচিত কণ্ঠ।'৩০

২৩. যিকরুল্লাহ বান্দাকে আল্লাহর আযাব থেকে নাজাত দেয়। মুআয রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, 'যিকরুল্লাহ আদম সন্তানকে আল্লাহর আযাব থেকে যতটা রক্ষা করে, অন্য কোনো আমল ততটা রক্ষা করতে পারে না।' ৩১

২৪. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে বান্দার ওপর প্রশান্তি নেমে আসে, আল্লাহর রহমত তাকে পরিবৃত্ত করে এবং ফেরেশতারা তাকে ঘিরে রাখে; যেমনটি পূর্বে হাদিসে বলা হয়েছে।

২৫. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে গীবত, চোগলখোরি, মিথ্যা ও অশ্লীলতার মতো অন্যান্য বাতিল কথাবার্তা থেকে রসনাকে মুক্ত রাখা যায়। মানুষের প্রকৃতি হচ্ছে, তারা চুপ থাকতে পারে না; কোনো না কোনো কথা তাকে বলতেই হয়। তাই আল্লাহর যিকিরে রসনাকে ব্যস্ত রাখা নাহলে এবং তাঁর বিধিবিধানের ব্যাপারে আলোচনা করা নাহলে, রসনা হারাম ও বাতিল কথাবার্তায় লিপ্ত হবেই; আল্লাহর যিকির ছাড়া এ থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পথ নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে একথা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত যে, কেউ যদি স্বীয় রসনাকে আল্লাহর যিকিরে অভ্যস্ত করে ফেলে, তবে তার রসনা অনর্থক ও বাতিল কথাবার্তা থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে। অপরপক্ষে যার রসনা আল্লাহর যিকির থেকে নীরস থাকে, তার রসনা যাবতীয় বাতিল, অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা দ্বারা সিক্ত থাকে। লা-হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ।

টিকাঃ
২৮. সুনানু ইবন মাজাহ, ৩৮০۹; হাদিসটি সহীহ
২৯. সাহাবী ও তাবিয়ীদের উক্তিকে আসার বলা হয়।
৩০. এটি সাহাবী সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা। মুহাম্মাদ ইবন ফুযাইল আয-যব্বী, আদ-দুআ, ৮৫; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/৩০۹-৩১০, সনদ সহীহ
৩১. সুনানুত তিরমিযী, ৩৩৭৭; হাদিসটি সহীহ

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরকারীর অন্তর থেকে আল্লাহ কখনো বিচ্যুত হয় না

📄 যিকরকারীর অন্তর থেকে আল্লাহ কখনো বিচ্যুত হয় না


৩৪. কেউ স্থায়ী ও ধারাবাহিকভাবে যিকির করলে তার অন্তরে আল্লাহর নাম সদা ভাস্বর থাকে; অণুক্ষণের জন্যও সে আল্লাহ থেকে বিস্মৃত হয় না। আর অন্তরে আল্লাহর নাম সদা ভাস্বর থাকা একজন বান্দার বড় সফলতার কুঞ্চিকা। বান্দা দুনিয়া ও আখিরাতে তখনই হতচ্ছড়া ও দুর্ভাগাদের মিছিলে যুক্ত হয়, যখন সে আল্লাহকে ভুলে যায়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়া অর্থ নিজেকে ও নিজের কল্যাণকে ভুলে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে। ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছেন। তারাই মূলত পাপাচারী। ৪১

টিকাঃ
৪১. সূরা হাশর, আয়াত: ১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00