📄 যিকরুল্লাহর উপকার
যিকরুল্লাহর একশরও বেশি উপকার ও ফায়দা রয়েছে। তবে সবগুলো উপকার ও ফায়দা নিয়ে আমরা আলোচনা করবো না। কিছু কিছু ফায়দা ও উপকার নিয়ে আলোকপাত করা হবে।
১. যিকরুল্লাহ শয়তানকে দমিয়ে রাখে ও বিতাড়িত করে। যিকরুল্লাহর মাধ্যমে শয়তান মূলোৎপাটিতও হতে পারে।
২. যিকরুল্লাহর কারণে বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলা রাজি-খুশি হন এবং তাকে ভালোবেসে ফেলেন।
৩. যিকরুল্লাহ অন্তর থেকে যাবতীয় দুশ্চিন্তা, হতাশা ও বিষণ্ণতা দূর করে।
৪. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে অন্তর আনন্দিত থাকে, খুশির সমীরণ প্রবাহিত হয় এবং সুখের ঊর্মিমালা আঁছড়ে পড়ে।
৫. যিকরুল্লাহ হৃদয় ও শরীরে শক্তি সঞ্চার করে।
৬. যিকরুল্লাহর বিভায় চেহারা ও অন্তর আলোকিত হয়।
৭. যিকরুল্লাহ বান্দার রিজিকের বন্দোবস্ত করে।
৮. যিকিরকারীকে যিকরুল্লাহ আত্মসম্মানবোধ, ভক্তি, প্রশান্তি ও প্রাণবন্ততার পোশাক পরিয়ে দেয়।
৯. যিকিরের মাধ্যমে রবের ভালোবাসা অর্জন হয়। আর রবের ভালোবাসা হলো, ইসলামের রূহ, দ্বীনের কেন্দ্র এবং সফলতা ও নাজাতের উৎস। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বস্তুর কিছু উপকরণ ও মাধ্যম নির্ধারণ করে রেখেছেন। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার উপকরণ ও মাধ্যম হলো, তাঁর অহর্নিশ যিকির। অতএব, কেউ যদি রবের ভালোবাসায় সিক্ত হতে চায়, তবে সে যেন তাঁর যিকিরে নিবেদিত হয়। দারস ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে যেমন জ্ঞান বৃদ্ধি পায়, তেমনি আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে রবের ভালোবাসা শাণিত হয়। যিকরুল্লাহ হলো রবের ভালোবাসার মূল ফটক এবং প্রধান ও সহজ সড়ক।
১০. যিকরুল্লাহ হলো রবের ধ্যানমগ্ন হওয়া ও ইহসানের স্তরে পৌঁছার উপজীব্য। কেউ ইহসানের স্তরে পৌঁছতে সক্ষম হলে ইবাদত করার সময় সে যেন সরাসরি আল্লাহকে দেখতে পায়। একজন উপবিষ্ট ব্যক্তি যেমন কখনো ছাদে উঠতে পারে না, তেমনি আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল ব্যক্তি কোনোভাবেই ইহসানের স্তরে পৌঁছাতে পারে না।
১১. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা সম্ভব হয়। যিকিরের মাধ্যমে কেউ বারবার আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করলে একপর্যায়ে সে স্থায়ীভাবে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়। ফলে আল্লাহ তার আশ্রয় ও ভরসাস্থল এবং অন্তরের কিবলা হয়ে যান।
১২. যিকরুল্লাহ বান্দাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। যিকিরের পরিমাণ অনুযায়ী বান্দা তাঁর নৈকট্য লাভ করে এবং যিকির থেকে গাফলতি অনুযায়ী আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়।
১৩. যিকরুল্লাহ আল্লাহর মারিফাতের প্রকাণ্ড দরজাকে খুলে দেয়। যিকিরের পরিমাণ যত বেশি হয় আল্লাহর মারিফাত তত বেশি অর্জন হয়।
১৪. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও সম্মান বৃদ্ধি পায়। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা যিকিরকারীর অন্তরকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং বান্দাও মনে করে যে, সে তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল ব্যক্তির অবস্থান ঠিক এর বিপরীত মেরুতে। তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভক্তি, সম্মান ও ভালোবাসা থাকে না বললেই চলে।
১৫. যিকিরকারীকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা স্মরণ করেন এবং আসমানে তাকে নিয়ে আলোচনা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ
তোমরা আমার যিকির করো, আমি তোমাদের স্মরণ করবো। ২৬
যিকিরের এই একটি মাত্র ফযিলত ও ফায়দা ছাড়া অন্য কোনো ফযিলত ও ফায়দা না থাকলেও, যিকিরের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে এটাই যথেষ্ট।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'যে ব্যক্তি মনে মনে আমার যিকির করে, আমিও অন্তরে তাকে স্মরণ করি আর যে ব্যক্তি মজলিসে আমার যিকির করে, আমি তাদের থেকে উত্তম মজলিসে তাকে স্মরণ করি। ২৭
১৬. যিকির অন্তরের প্রাণ। আমি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ কদ্দাসাল্লাহু রূহাহু-কে বলতে শুনেছি,
'অন্তরের জন্য যিকির তেমন, মাছের জন্য পানি যেমন।' পানি ছাড়া কি মাছ বেঁচে থাকতে পারে?! পানি ছাড়া মাছ যেমন তড়পাতে তড়পাতে মারা যায়, যিকির ছাড়া অন্তরও তেমন তড়পাতে তড়পাতে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়ে।
টিকাঃ
২৬. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫২
২৭. সহীহুল বুখারী, ৭৪০৫; সহীহ মুসলিম, ১৬৭৫
📄 অন্তরের মরিচা দূরীকরণে যিকিরের ভূমিকা
লোহা, পিতল, চান্দি ও অন্যান্য জিনিসে যেমন মরিচা ধরে, তেমনি অন্তরেও মরিচা ধরে। অন্তরে মরিচা ধরলেও আল্লাহ সেই মরিচা দূর করার কেমিক্যাল দিয়ে দিয়েছেন। যিকরুল্লাহ হলো সেই কেমিক্যাল। যিকরুল্লাহর মাধ্যমে অন্তরের মরিচা এমনভাবে দূর হয় যে, অন্তর একেবারেই স্বচ্ছ-সফেদ ও পরিষ্কার হয়ে যায় এবং আয়নার মতো জ্বলজ্বল করে। বান্দা যখন যিকরুল্লাহ থেকে দূরে থাকে, তখন তার অন্তরে মরিচা পড়তে শুরু করে। তবে আশার কথা হলো, বান্দা যিকির শুরু করলে সেই মরিচা দূর হয়ে যায়।
দুই কারণে অন্তরে মরিচা পড়ে: যিকিরবিমুখতা ও গুনাহ। মরিচা দূর করার পদ্ধতিও দুটি : যিকির ও ইসতিগফার। যিকির ছাড়াই যে ব্যক্তির সিংহভাগ সময় কাটে, মরিচা তার অন্তরে খুব শক্তভাবে জেঁকে বসে। যিকিরবিমুখতা অনুযায়ী মরিচা কম-বেশি হয়। মরিচা পড়তে পড়তে কারো অন্তর যদি একেবারেই কালো হয়ে যায়, তাহলে ঐ অন্তর সঠিক-বেঠিক ও হক-বাতিলের মাঝে বিভাজন করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে সে আর সঠিক জিনিস গ্রহণ করতে পারে না; এমনকি তার কাছে বাতিলকে হক মনে হয় আর হককে মনে হয় বাতিল। কারণ, মরিচা পড়া কালো ও অন্ধকার অন্তরে কোনো বস্তুর সঠিক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে না।
এছাড়া মরিচা ধরে কারো অন্তর কালো ও অন্ধকার হয়ে গেলে তার চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতি শক্তিও নষ্ট হয়ে যায়। হক গ্রহণ করার শক্তি ও সাহস নিঃশেষ হয়ে যায় এবং হারিয়ে যায় বাতিলকে অস্বীকার করার চেতনা। এটাই হচ্ছে অন্তরের সবচেয়ে বড় শাস্তি। এসব মূলত যিকিরবিমুখতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে উৎসারিত। কেননা যিকিরবিমুখতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ অন্তরের প্রদীপকে নিভিয়ে দেয় এবং অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ করে ফেলে।
📄 যিকরুল্লাহ অন্তরের খোরাক ও প্রাণ
১৭. যিকরুল্লাহ অন্তরের খোরাক ও প্রাণ। যিকিরবিহীন মানুষ এমন শরীরের মতো, যে শরীরকে খাবার দেওয়া হয় না। খাবার ছাড়া কোনো শরীর যেমন টিকে থাকতে পারে না, তেমনি যিকির ছাড়া কোনো অন্তর বেঁচে থাকতে পারে না।
একদিন আমি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যার কাছে উপস্থিত হলাম। দেখলাম, তিনি ফজর সালাত শেষে বসে রইলেন এবং প্রায় দুপুর পর্যন্ত যিকিরে নিমগ্ন থাকলেন। যিকির শেষ হলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'যিকির আমার সকালের নাস্তা। এই নাস্তা গ্রহণ না করলে আমি আমার শক্তি হারিয়ে ফেলি।'
তিনি আরেকবার আমাকে বলেন, আমি মাঝেমধ্যে নফসকে আরাম ও বিশ্রাম দেওয়ার উদ্দেশ্য যিকির করা থেকে বিরত থাকি। যাতে অন্য যিকির করার জন্য নফস আবারও পূর্ণোদ্যমে প্রস্তুতি নিতে পারে।
১৮. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে অন্তরের মরিচা দূর হয় এবং অন্তর স্বচ্ছ-সুন্দর হয়ে যায়। এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি।
প্রত্যেক জিনিসে মরিচা পড়ে। অন্তরে মরিচা পড়ে যিকির থেকে গাফেল থাকলে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে। যিকির, তওবা ও ইসতিগফারের মাধ্যমে সে-মরিচা পুরোপুরি ধুয়ে-মুছে যায়।
📄 যিকরুল্লাহ বান্দার যাবতীয় আমলের বাহন
২১. সুবহানাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ-সহ যেসব বাক্য দ্বারা বান্দা আল্লাহর যিকির করা হয়, বান্দার বিপদে-আপদে সেসব বাক্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ দ্বারা তোমরা আল্লাহর যে যিকির করো, সেসব যিকির মৌমাছির গুঞ্জনের মতো আরশের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং যিকিরকারীর কথা উল্লেখ করে। তোমাদের কেউ কি চাও না যে, আল্লাহর নিকট তার কথা উল্লেখকারী কিছু থাকুক। ২৮
২২. যে ব্যক্তি সুখ-স্বাচ্ছন্দের সময় আল্লাহর যিকির করে, বিপদ-আপদের সময় আল্লাহ তাকে স্মরণ করেন এবং যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে তাকে উতরিয়ে দেন। একটি আসারে ২৯ পাওয়া যায়, 'আল্লাহর অনুগত যিকিরকারী বান্দা যখন বিপদ-আপদের মুখোমুখি হয় অথবা নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে, তখন ফেরেশতারা বলেন, 'রব, এটি পরিচিত বান্দার পরিচিত কণ্ঠ।' এর বিপরীতে যিকিরবিমুখ গাফেল বান্দা যখন আল্লাহকে ডাকে বা আল্লাহর কাছে কোনোকিছু চায়, তখন ফেরেশতারা বলেন, 'রব, এটা তো অপরিচিত বান্দার অপরিচিত কণ্ঠ।'৩০
২৩. যিকরুল্লাহ বান্দাকে আল্লাহর আযাব থেকে নাজাত দেয়। মুআয রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, 'যিকরুল্লাহ আদম সন্তানকে আল্লাহর আযাব থেকে যতটা রক্ষা করে, অন্য কোনো আমল ততটা রক্ষা করতে পারে না।' ৩১
২৪. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে বান্দার ওপর প্রশান্তি নেমে আসে, আল্লাহর রহমত তাকে পরিবৃত্ত করে এবং ফেরেশতারা তাকে ঘিরে রাখে; যেমনটি পূর্বে হাদিসে বলা হয়েছে।
২৫. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে গীবত, চোগলখোরি, মিথ্যা ও অশ্লীলতার মতো অন্যান্য বাতিল কথাবার্তা থেকে রসনাকে মুক্ত রাখা যায়। মানুষের প্রকৃতি হচ্ছে, তারা চুপ থাকতে পারে না; কোনো না কোনো কথা তাকে বলতেই হয়। তাই আল্লাহর যিকিরে রসনাকে ব্যস্ত রাখা নাহলে এবং তাঁর বিধিবিধানের ব্যাপারে আলোচনা করা নাহলে, রসনা হারাম ও বাতিল কথাবার্তায় লিপ্ত হবেই; আল্লাহর যিকির ছাড়া এ থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো পথ নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে একথা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত যে, কেউ যদি স্বীয় রসনাকে আল্লাহর যিকিরে অভ্যস্ত করে ফেলে, তবে তার রসনা অনর্থক ও বাতিল কথাবার্তা থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে। অপরপক্ষে যার রসনা আল্লাহর যিকির থেকে নীরস থাকে, তার রসনা যাবতীয় বাতিল, অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা দ্বারা সিক্ত থাকে। লা-হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ।
টিকাঃ
২৮. সুনানু ইবন মাজাহ, ৩৮০۹; হাদিসটি সহীহ
২৯. সাহাবী ও তাবিয়ীদের উক্তিকে আসার বলা হয়।
৩০. এটি সাহাবী সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা। মুহাম্মাদ ইবন ফুযাইল আয-যব্বী, আদ-দুআ, ৮৫; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/৩০۹-৩১০, সনদ সহীহ
৩১. সুনানুত তিরমিযী, ৩৩৭৭; হাদিসটি সহীহ