📘 যিকরুল্লাহ > 📄 সর্বাধিক যিকরকারী সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি

📄 সর্বাধিক যিকরকারী সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি


৫৬. দুনিয়াতে অনেক ধরনের আমল ও অনেক প্রকারের আমলকারী রয়েছে। তবে আমলকারীদের মাঝে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম, যে বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করে। ঐ সিয়ামপালনকারী সবচেয়ে উত্তম, যে সবচেয়ে বেশি যিকির করে। ঐ দানকারী সবচেয়ে উত্তম, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকির করে। ঐ হজ্বকারী সবচেয়ে উত্তম, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকির করে। এভাবে সকল আমলের ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে সবচেয়ে বেশি যিকিরকারী।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোন মুসল্লী সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেন, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকির করে। আবার জিজ্ঞেস হয়, সবচেয়ে উত্তম জানাযার সালাত আদায়কারী কে? তিনি বলেন, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকির করে। পুনরায় জিজ্ঞেস করা হয়, সবচেয়ে উত্তম মুজাহিদ কে? তিনি বলেন, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকির করে। আবার জিজ্ঞেস হয়, সবচেয়ে উত্তম হাজী কে? তিনি বলেন, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকির করে। এরপর আবার জিজ্ঞেস করা হয়, যারা অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যায় তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কে? তিনি বলেন, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকির করে। তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যিকিরকারী তো তাহলে সব কল্যাণ নিয়ে গেল।১৩০

উবাইদ ইবন উমাইর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাত জেগে ইবাদত করা যদি তোমাদের জন্য খুব কষ্টকর হয়, সম্পদ দান করা যদি খুব কঠিন মনে হয় এবং শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে যদি সাহস সঞ্চার করতে অক্ষম হও, তবে বেশি বেশি আল্লাহর যিকির কর। ১৩১

টিকাঃ
১৩০. ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ, ৫০১; শুআবুল ঈমান, ২/৪৫১-৪৫২; হাদিসটি মুরসাল

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ নফল ইবাদতের স্থলাভিষিক্ত

📄 যিকরুল্লাহ নফল ইবাদতের স্থলাভিষিক্ত


৫৭. ধারাবাহিক আল্লাহর যিকির নফল ইবাদতের স্থলাভিষিক্ত; সেটা যেকোন নফল ইবাদতই হতে পারে। দৈহিক বা আর্থিক কিংবা নফল হজের মতো দৈহিক ও আর্থিক উভয় নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

হাদিসে সুস্পষ্টভাবে এটা বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, দরিদ্র লোকেরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলে, 'সম্পদশালী ও ধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের দ্বারা উচ্চমর্যাদা ও স্থায়ী আবাস অর্জন করে ফেলছে অথচ তারা আমাদের মত সালাত আদায় করছে, আমাদের মত সিয়াম পালন করছে এবং অর্থের দ্বারা হজ, উমরাহ, জিহাদ ও সাদকাহ করার মর্যাদাও লাভ করছে।'

দরিদ্রদের এমন অভিযোগ শুনে তিনি বলেন, 'আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব, তোমরা যেটা করলে, যারা নেক কাজে তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে গেছে, তোমরাও তাদের পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে।

তবে যারা পুনরায় এ ধরনের কাজ করবে তাদের কথা স্বতন্ত্র। তোমরা প্রত্যেক সালাতের পর তেত্রিশ বার তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাকবীর (আল্লাহ আকবার) পাঠ করবে। কয়বার পড়তে হবে তা নিয়ে পরে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। কেউ বলে, আমরা তেত্রিশবার তাসবীহ পড়ব, তেত্রিশবার তাহমীদ পড়ব আর চৌত্রিশ বার তাকবীর পড়ব। অতপর আমি তাঁর নিকট ফিরে যাই।

তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার সবগুলোই তেত্রিশবার করে বলবে। ১৩২

এই হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরিদ্রদেরকে ছুটে যাওয়া হজ, উমরা, জিহাদের পরিবর্তে যিকির করার পরামর্শ দিয়ে বলেন,
তোমরা এই যিকিরের মাধ্যমে ধনী লোকদের ছাড়িয়ে যাবে। পরবর্তীতে ধনী লোকেরা একথা শুনে ফেলে এবং তারাও আমল করতে শুরু করে। সাদকাহ, আর্থিক ইবাদত-সহ এই যিকিরেও তারা মনোনিবেশ করে। ফলে তারা আবার দরিদ্র লোকদের পেছনে ফেলে দেয়। দরিদ্ররা পুনরায় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলে, তারাও তো আমাদের সাথে আপনার শিক্ষা দেওয়া যিকির করতে শুরু করেছে। আর আর্থিক ইবাদতের মাধ্যমে আমাদেরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ; যাকে ইচ্ছা তিনি অনুগ্রহ করেন।

আবদুল্লাহ ইবন বুসর থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি বলে,
'ইয়া রাসুলাল্লাহ, ভালো আমল তো অনেক। আর আমি সব ভালো আমল করতে সামর্থ্য রাখি না। আমাকে এমন ভালো কিছু কাজ বলুন যা আমি আঁকড়ে ধরে থাকতে পারব। আবার এমন বেশি বলবেন না, যা আমি ভুলতে বসব।'

আরেক বর্ণনায় এসেছে তিনি বলেন,
'ইসলামী শরিয়তের বিষয়গুলো আমার জন্য অতিরিক্ত হয়ে গেছে অথচ আমি একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ। অতএব, এমন কিছু বিষয় বলুন যা আমি আঁকড়ে ধরে থাকতো পারব। আবার এমন বেশি বলবেন না, যা আমি ভুলতে বসব।'

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন, তোমার রসনা যেন সর্বদা আল্লাহর যিকিরে সিক্ত থাকে। ১৩৩

বিচক্ষণ নসীহতকারী নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এমন জিনিসের নসীহত করেন যে, সে যদি সত্যিকারার্থে তাঁর নসীহত মতো চলে, তবে তার জন্য ইসলামের সমস্ত বিধিবিধান সহজ হয়ে যাবে, সেসব বিধান পালন করতে উদ্দীপ্ত হবে এবং সেগুলো বেশি বেশি পালন করবে। সে যদি যিকরুল্লাহকে তার জীবনের অনুষঙ্গ বানিয়ে নেয়, তবে একদিন সে আল্লাহকে ভালোবেসে ফেলবে এবং আল্লাহ যা ভালোবাসেন, তা ভালোবাসতে শুরু করবে। এক পর্যায়ে শরিয়তের বিধিবিধান পালন করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যলাভ করা তার সবচেয়ে প্রিয় আমলে পরিণত হবে। এ কারণে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে যিকরুল্লাহর মতো এমন এক জিনিসের সন্ধান দেন, যার মাধ্যমে খুব সহজেই সে ইসলামের বাকী বিধিবিধান পালন করতে পারবে।

টিকাঃ
১৩১. মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/৩৯২; আহমাদ ইবন হাম্বাল, আয-যুহদ, ৩৭৮-৩৭৯; হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৩/২৬৭-২৬৮
১৩২. সহীহুল বুখারী, ৮৪৩; সহীহ মুসলিম, ৫৯৫
১৩৩. সুনানুত তিরমিযী, ৩৩৭৫; সুনানু ইবন মাজাহ, ৩৭৯৩; হাদিসটি সহীহ

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরকারীরা সর্বক্ষেত্রে অগ্রগামী

📄 যিকরকারীরা সর্বক্ষেত্রে অগ্রগামী


৬২. এই দুনিয়া আমলের প্রতিযোগিতার ময়দান। প্রতিটি বান্দা একেকজন প্রতিযোগী। এই প্রতিযোগিতায় যিকিরকারীরা সবচেয়ে অগ্রগামী। তারা সকল প্রতিযোগীকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু প্রতিযোগিতা-ময়দানের উড়ন্ত ধুলোবালির কারণে অন্যান্য প্রতিযোগীরা তাদের চেয়ে অগ্রগামী যিকিরকারী প্রতিযোগীদের দেখতে পায় না। যখন ধুলোবালি শেষ হয়ে যাবে, তখন তারা দেখতে পাবে, যিকিরকারীরা সর্বাগ্রে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে।

গাফরার মুক্ত দাস উমার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘কিয়ামতের দিন যখন পর্দা উন্মোচিত হয়ে পড়বে এবং সবাইকে তাদের আমলের প্রতিদান দেওয়া হবে, তখন তারা যিকিরের তুলনায় উত্তম কোনো আমল দেখতে পাবে না। ফলে সেদিন একদল আফসোস করে বলবে, হায়, আমরা কেন যিকির করিনি অথচ যিকির করা কতই না সহজ ছিলো!’

আবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা সফর অব্যহত রাখ। তবে মুফাররিদুনরা অগ্রগামী হয়ে গিয়েছে।’ সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, ‘মুফাররিদুন’ কারা ইয়া রাসুলাল্লাহ?’ তিনি বলেন, যারা আল্লাহর যিকিরে নিমগ্ন থাকে এবং যিকির যাদের পাপের বোঝাকে সরিয়ে ফেলে। ১৩৮

টিকাঃ
১৩৮. সুনানুত তিরমিযী, ৩৫৯৬; তিরমিযীর সনদে এ হাদিসটি দুর্বল। তবে এ রকম হাদিস সহীহ মুসলিমে রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00