📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 তাওয়িলের পরিচয়ে ইমামদের বক্তব্য

📄 তাওয়িলের পরিচয়ে ইমামদের বক্তব্য


।। ইমাম আমিদি রহ. (মৃত্যু : ৬৩১ হিজরি) বলেন :
التأويل المقبول الصحيح : فهو حمل اللفظ على غير مدلوله الظاهر منه مع احتماله له بدليل يعضده
গ্রহণযোগ্য বিশুদ্ধ তাওয়িল হলো, শব্দকে শক্তিশালী কোনো দলিলের কারণে তার বাহ্যিক অর্থ ছাড়া এমন কোনো অর্থে প্রয়োগ করা, যার সম্ভাবনা শব্দের ভেতরে রয়েছে।— [আল-ইহকাম : ৩/৫৯]

।। ইমাম ইবনু কুদামা রহ. (মৃত্যু : ৬২০ হিজরি) তাওয়িলের পরিচয় দিতে গিয়ে লেখেন:
والتأويل صرف اللفظ عن الاحتمال الظاهر إلى احتمال مرجوح به لا عتضاده بدليل يصير به أغلب على الظن من المعنى الذي دل عليه الظاهر إلا أن الاحتمال يقرب تارة ويبعد اخرى وقد يكون الاحتمال بعيدا جدا فيحتاج إلى دليل في غاية القوة وقد يكون قريبا فيكفيه أدنى دليل وقد يتوسط بين الدرجتين فيحتاج دليلا متوسطا
তাওয়িল হলো শব্দকে প্রকাশ্য সম্ভাবনা থেকে সরিয়ে কোনো অপ্রধান সম্ভাবনার দিকে ফেরানো— কোনো দলিলের আলোকে সেই অপ্রধান সম্ভাবনা শক্তিশালী হওয়ার কারণে, যে দলিলের দ্বারা শাব্দিক অর্থের তুলনায় তা-ই ধারণার ওপর প্রবল হয়। তবে সম্ভাবনা কখনো নিকটবর্তী হয়, কখনো দূরবর্তী হয়, কখনো খুব বেশি দূরবর্তী হয়। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শক্তিশালী দলিলের প্রয়োজন হয়। আর কখনো সেই সম্ভাবনা নিকটবর্তী হয়। তখন সাধারণ দলিল এর জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। আর কখনো তা মাঝামাঝি পর্যায়ের হয়, তখন মাঝামাঝি পর্যায়ের দলিলের প্রয়োজন হয়। — [রাওজাতুন নাজির : ১৭৮]

।। ইমাম তুফি রহ. (মৃত্যু : ৭১৬ হিজরি) লেখেন :
صرف اللفظ عن ظاهره لدليل يصير به المرجوح راجحا فَالظَّوَاهِرُ الْوَارِدَةُ فِي الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ فِي صِفَاتِ الْبَارِئِ جَلَّ جَلَالُهُ، لَنَا أَنْ نَسْكُتَ عَنْهَا، وَلَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ فِيهَا. فَإِنْ سَكَتْنَا عَنْهَا قُلْنَا : تُمَرُّ كَمَا جَاءَتْ، كَمَا نُقِلَ عَنِ الْإِمَامِ أَحْمَدَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَسَائِرِ أَعْيَانِ أَئِمَّةِ السَّلَفِ، وَإِنْ تَكَلَّمْنَا فِيهَا، قُلْنَا هِيَ عَلَى ظَوَاهِرِهَا مِنْ غَيْرِ تَحْرِيفٍ مَا لَمْ يَقُمْ دَلِيلٌ يَتَرَجَّحُ عَلَيْهَا بِالتَّأْوِيلِ
শব্দকে এমন কোনো দলিলের কারণে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে দেওয়া, যার দ্বারা অপ্রধান সম্ভাবনা প্রাধান্যপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং কুরআন-সুন্নাহয় মহান আল্লাহ তাআলার গুণাবলির ব্যাপারে যে সমস্ত বাহ্যিক শব্দ এসেছে— আমাদের সুযোগ রয়েছে সে ব্যাপারে নীরব থাকা এবং সুযোগ রয়েছে সে ব্যাপারে কথা বলা। যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে বলব, শব্দগুলো যেভাবে এসেছে, সেভাবে রেখে দেওয়া হবে; যেমনটা ইমাম আহমদ রহ.-সহ সালাফের অন্য সকল বিশিষ্ট ইমাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর যদি কথা বলি, তাহলে আমরা বলব, শব্দগুলো কোনোপ্রকার বিকৃতি ছাড়া তার বাহ্যিক অর্থে প্রযোজ্য হবে, যতক্ষণ না এমন দলিল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাহ্যিক অর্থের ওপর তাওয়িলকে প্রাধান্য দেয়।— [শারহু মুখতাসারির রাওজাহ : ৫৬২]

।। ইমাম মারঈ কারঈ হাম্বলি রহ.- (মৃত্যু: ১০৩৩ হিজরি)-ও একই কথা লেখেন :
والتأويل هو أن يراد باللفظ ما يخالف ظاهره أو هو صرف اللفظ عن ظاهره لمعنى آخر. وهو في القرآن كثير؛ ومن ذلك آيات الصفات المقدسة، وهي من الآيات المتشابهات
তাওয়িল হলো কোনো শব্দ দ্বারা এমন অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়া, যা তার বাহ্যিক অর্থের বিপরীত অথবা তাওয়িল হলো, শব্দকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে অন্য কোনো অর্থের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া। কুরআনে তা রয়েছে প্রচুর। তন্মধ্যে আল্লাহ তাআলার পবিত্র গুণাবলি-সংক্রান্ত আয়াতসমূহও অন্তর্ভুক্ত। আর সিফাতের এসব আয়াত মুতাশাবিহ (দ্ব্যর্থবোধক) আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। [আকাওয়িলুস সিকাত : ৪৮]

।। আল্লামা ইবনুন নাজ্জার রহ. (মৃত্যু: ৯৭২ হিজরি)-ও 'শারহুল কাওকাবিল মুনির' গ্রন্থে একই কথা লিখেছেন। বলা বাহুল্য, আশআরি ও মাতুরিদিরা যে তাওয়িল গ্রহণ করেছে, তা হলো এই তাওয়িল। অন্যথায় তাওয়িলে ফাসিদ তথা গলদ তাওয়িল যেটা, তা তারা কখনোই গ্রহণ করেনি। সেগুলো গ্রহণ করেছে রাফেজিসহ অন্যান্য গোমরাহ সম্প্রদায়। যেমন, সুরা রহমানের ১৯ নম্বর আয়াতের 'বাহরাইন' (দুই সমুদ্র) শব্দের তাওয়িল তারা করেছে আলি ও ফাতিমা রা.। একই সুরার ২২ নম্বর আয়াতের 'আল-লু'লু' ওয়াল মারজান' শব্দের তাওয়িল তারা করেছে হাসান ও হুসাইন রা.। সুরা বাকারাহর ২০৫ নম্বর আয়াতের নিন্দিত লোকটির তাওয়িল করেছে মুয়াবিয়া রা.। এ ধরনের মনগড়া তাওয়িলের ব্যাপারে ইমামগণ সর্বদা সতর্ক করে গেছেন।— [উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য- আল-বুরহান : ২/১৫২]

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 যে যে সালফে সালেহিন তাওয়িল করেছেন

📄 যে যে সালফে সালেহিন তাওয়িল করেছেন


তাওয়িলের অর্থ যখন জানা হলো, তখন (এ কথাও জেনে রাখা প্রয়োজন যে,) যখন শর্ত বাস্তবায়িত হবে, তখন তাওয়িল গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য হবে। সাহাবাযুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সর্বযুগে সব এলাকার আলিমরা কোনো ধরনের আপত্তি ছাড়া এর ওপর অব্যাহতভাবে আমল করে আসছেন। [আল-ইহকাম : ৩/৬০]

এবার পাঠক, আপনিই বলতে পারবেন, সালাফি নাম ধারণ করে সালাফদের স্বীকৃত মানহাজের ওপর আপত্তি করাই কি সালাফিদের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত নাকি বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনে নেওয়া তাদের স্বভাববৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত?

এখানে আমরা সালাফে সালেহিন বলতে প্রথমে যাদেরকে বোঝায়, তাদের কিছু তাওয়িলের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করতে পারি।

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 ইবনু আব্বাস (রা.) ও দাহহাক রহ. এর তাওয়িল

📄 ইবনু আব্বাস (রা.) ও দাহহাক রহ. এর তাওয়িল


আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. ও দাহহাক রহ. আল্লাহ তাআলার 'আসা' (أَنْ يَأْتِيَهُمُ) -কে তাওয়িল করেছেন— তাঁর 'নির্দেশ' আসবে।— [কুরতুবি : ৭/১২৯]

হাসান বসরি রহ. তাঁর 'আগমন' (المجيئ) -কে তাওয়িল করেছেন— তাঁর আদেশ ও সিদ্ধান্তের আগমন হবে।— [বাগাওয়ি : ৪/৪৫৪]

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. ও আরও অনেকে 'কুরসি'কে তাওয়িল করেছেন 'ইলম' বলে।— [ইবনু আবি হাতিম : ২/৪৯০]

ইবনু আব্বাস রা., মুজাহিদ ও দাহহাক রহ. পায়ের গোছা (ساق) -কে তাওয়িল করেছেন অবস্থার বিভীষিকা ও প্রচণ্ডতা বলে। [তাবারি, ইবনু আবি হাতিম প্রভৃতি]

ইবনু আব্বাস রা.-সহ আরও অনেকে হাতসমূহ (أيد) -কে তাওয়িল করেছেন 'শক্তি' দ্বারা। [তাবারি: ১১/৪৭২]

আ'মাশ রহ. দ্রুত চলা (هرولة) -কে তাওয়িল করেছেন ক্ষমা ও রহমত দ্বারা।— [তিরমিজি: ৫/৫৮১]

আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক রহ. 'আল্লাহর পার্শ্ব' (كنف) -কে তাওয়িল করেছেন 'ছায়া ও আশ্রয়' দ্বারা।— [খালকু আফআলিল ইবাদ, বুখারি : ৭৮]

ইমাম মালিক রহ. 'আল্লাহর নেমে আসা' (نزول) -কে তাওয়িল করেছেন 'নির্দেশ ও রহমত নাজিল হওয়া' দ্বারা।— [আত-তামহিদ: ৭/১৪৩; সিয়ার : ৮/১০৫]

হাসান বসরি ও নজর ইবনু শুমায়ল রহ. 'আল্লাহর পা' (قدم) -কে তাওয়িল করেছেন 'পূর্বে যাদের ব্যাপারে ইলম রয়েছে' বলে। — [আসমা-সিফাত, বায়হাকি : ৩৫২; দাফউ শুবাহিত তাশবিহ: ৮১]

ইবনু হিব্বান রহ. একই শব্দের তাওয়িল করেছেন 'স্থান' দ্বারা। [সহিহ ইবনু হিব্বান : ১/৫০২]

সুফয়ান ইবনু উয়ায়না রহ. 'রহমানের পদক্ষেপ' (وطأة) -কে তাওয়িল করেছেন বিজয় ও সাহায্য দ্বারা।— [তাওয়িলু মুখতালিফিল হাদিস, ইবনু কুতায়বা : ২১৩]

মুজাহিদ ও শাফিয়ি রহ. 'যেদিকে মুখ ফেরাও না কেন, সেদিকেই আল্লাহর চেহারা রয়েছে' (فثم وجه الله) -কে তাওয়িল করেছেন— সেদিকেই আল্লাহর কিবলা রয়েছে।— [মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া]

এছাড়াও আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম থেকেও তাওয়িল বর্ণিত রয়েছে।— [লিসানুল আরব: ১/২০৬]

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 ইমাম বুখারি রহ.-এর তাওয়িল

📄 ইমাম বুখারি রহ.-এর তাওয়িল


রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: يَضْحَكُ اللَّهُ مِنْ رَجُلَيْنِ يَقْتُلُ أَحَدُهُمَا الْآخَرَ كِلَاهُمَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ
আল্লাহ এমন দুই ব্যক্তিকে দেখে হাসেন, যাদের একজন অপরজনকে হত্যা করে, অনন্তর উভয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে। [আস-সুনানুল কুবরা, বায়হাকি : ১৮৫৩২]

ইমাম বায়হাকি রহ. লেখেন : قَالَ الشَّيْخُ: وَأَمَّا الضَّحِكُ الْمَذْكُورُ فِي الْخَبَرِ فَقَدْ رَوَى الْفِرَبْرِيُّ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْمَاعِيلَ الْبُخَارِيِّ رَحِمَهُ اللَّهُ أَنَّهُ قَالَ: «مَعْنَى الضَّحِكِ فِيهِ الرَّحْمَةُ»
হাদিসে বর্ণিত 'হাসা' শব্দটির ব্যাপারে ইমাম বুখারি রহ. বলেছেন, 'হাদিসের হাসার অর্থ হচ্ছে রহমত'। [আল-আসমা ওয়াস সিফাত, বায়হাকি : ২/৭৯]

ইমাম বুখারি রহ. তার 'সহিহ' গ্রন্থে লেখেন : {كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ} [القصص: 88] : إلا ملكه، وَيُقَالُ: إِلَّا مَا أُرِيدَ بِهِ وَجْهُ اللَّهِ
'তাঁর চেহারা ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল' (কাসাস : ৮৮)— এই আয়াতে 'তাঁর চেহারা' অর্থ হলো, 'তাঁর রাজত্ব'। আরেকটি মত হলো, 'এমন আমল, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে করা হয়েছে'। [সহিহ বুখারি, সুরা কাসাসের তাফসির]

বঙ্গদেশীয় আসারিরাও আয়াতে উল্লেখিত 'চেহারা' দ্বারা সত্তা উদ্দেশ্য নিয়েছে। শায়খ আবদুল হামিদ ফাইযি মাদানি থেকে শায়খ আবু বকর যাকারিয়া— এ ক্ষেত্রে তাওয়িল করতে কেউ ত্রুটি করেনি। শায়খ যাকারিয়া সিফাত অস্বীকারকারী ট্যাগ থেকে পিঠ বাঁচাতে মূলনীতি থেকে সরে গিয়ে একইসঙ্গে শব্দের মূল অর্থ ও রূপক অর্থ উভয়টি গ্রহণ করেছেন! তবে এখানে যে এ দ্বারা মূলত 'সত্তা' উদ্দেশ্য, তা-ও নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px