📄 আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে সালাফে সালেহীনের আকিদা
প্রশ্ন: সিফাতে খাবারিয়্যার ক্ষেত্রে সালাফের মাজহাব কী ছিল?
উত্তর: সালাফদের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব ছিল তানজীহ। সকলেই আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত বিশ্বাস করতেন। এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করতেন না। সুতরাং সালাফের সমস্ত বক্তব্য সামনে রাখলে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সকলের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব ছিল তানজীহ। যেমন নুজুল বা অবতরণ। আল্লাহর নুজুল যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়, এব্যাপারে সকলেই একমত। একইভাবে আল্লাহর নুজুল উপর থেকে নীচে নামান নয়। সালাফদের কেউ কেউ ইয়াদকে (হাত) সিফাত বলেছেন। কিন্তু তাদের সকলেই এ বিষয়ে একমত ছিলেন, ইয়াদ কোন অঙ্গ বা দেহের কোন অংশ নয়। মোটকথা, তানজীহ (সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে আল্লাহ তায়ালাকে মুক্ত বিশ্বাস করা) হল সালাফের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব।
প্রশ্ন: তানজীহের পর সালাফ কী করতেন?
উত্তর: এ বিষয়ে সালাফের মধ্যেই মতবিরোধ আছে। মোটামুটি তিনটি মত পাওয়া যায়।
১। ইসবাত মায়াত তানজীহ।
২। তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ।
৩। তা'বীল মায়াত তানজীহ।
ইসবাত মায়াত তানজীহ:
ইসবাত মায়াত তানজীহ হল, প্রথমে তারা শব্দের আক্ষরিক অর্থ থেকে আল্লাহকে মুক্ত ঘোষণা করতেন। এরপর তারা ঐ শব্দকে আল্লাহর সিফাত বলতেন। তবে শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর ঐ শব্দের কী অর্থ হবে, তা আল্লাহ দিকে ন্যস্ত করতেন। এক্ষেত্রে মূলত: তারা তা'বীল ও তাফয়ীজ করতেন। অর্থাৎ শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়া হল তা'বীল। ঐ শব্দকে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করা হল ইসবাত। ঐ শব্দের আসল অর্থ ও উদ্দেশ্য কী হবে সেটা আল্লার দিকে ন্যস্ত করা হল তাফয়ীজ। উদাহরণ: ইয়াদ। অর্থ হল, হাত। আরবী 'ইয়াদ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, এটি দেহের অঙ্গ বা অংশ। সালাফদের সকলেই এই অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। ইয়াদ ব্যবহার কতে অঙ্গ বা অংশ উদ্দেশ্য না নেয়া হল এক ধরনের তা'বীল। এরপর কেউ কেউ ইয়াদকে সিফাত বলেছেন। এটা হল ইসবাত (সিফাত সাব্যস্তকরণ)। ইয়াদের বাহ্যিক অর্থ (অঙ্গ) পরিত্যাগ করার পর ইয়াদ দ্বারা আসলে কী উদ্দেশ্য সেটা আল্লাহ জানেন। এভাবে ইয়াদের আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াকে বলে তাফয়ীজ। একই সাথে তা'বীল, ইসবাত ও তাফয়ীজ পাওয়া গেল। এটা কিছু কিছু সালাফের মত ছিল।
তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ:
তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ হল, শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর কী অর্থ হবে সেটা আল্লাহর উপর ন্যস্ত করা। এক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর অন্য কোন অর্থ তারা নির্ধারণ করতেন না। আবার এটাও বলতেন না যে, এটা আল্লাহর সিফাত। যেমন, আরবীতে ইয়াদ এর প্রায় পঁচিশটা অর্থ রয়েছে। ফাতহুল বারীতে ইবনে হাজার আসকালানী রহ: ইয়াদ এর পঁচিশটা অর্থ লিখেছেন। ইয়াদের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর এই পঁচিশটার কোনটা উদ্দেশ্য অথবা অন্য কোন অর্থ উদ্দেশ্য কি না, সেটা তারা নির্ধারণ না করে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতেন। এক্ষেত্রে তা'বীল ও তাফয়ীজ পাওয়া যায়। শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগের কারণে এটি তা'বীল। আবার সম্পূর্ণ বিষয়কে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করার কারণে এটি তাফয়ীজ।
তা'বীল মায়াত তানজীহ:
তা'বীল মায়াত তানজীহ হল, শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করার পর সম্ভাবনাময় কোন একটা অর্থ গ্রহণ করা। শুরুতেই তারা এর আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। এটা হল তা'বীলে ইজমালী। এরপর তারা উক্ত শব্দের অন্যান্য ব্যবহার দেখতেন। এক্ষেত্রে আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা অর্থ গ্রহণ করতেন। যেমন, ইয়াদ বা হাত। প্রথমে তারা আক্ষরিক অর্থ বাদ দিতেন। এরপর আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা অর্থ নিতেন। যেমন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের সম্পর্কে বলেছেন; তারা বলে, আল্লার হাত বন্ধ (কৃপণ অর্থে)। এর প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহর উভয় হাত লম্বা। এখানে ইবনে কাসীর সহ অনেক মুফাসসির 'আল্লারহ উভয় হাত প্রশস্ত' কে রুপক অর্থে নিয়েছেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তায়ালা অধিক দানশীল। ব্যবহার অনুযায়ী কখন ইয়াদ অর্থ শক্তি। কখনও নিয়ামত। কখনও ক্ষমতা। এধরণের প্রায় পচিশটা অর্থ ও এর ব্যবহার রয়েছে আরবী ভাষায়। স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী অর্থ গ্রহণ করা। এটাকে তা'বীলে তাফসিলি বলে।
প্রশ্ন: উপরের তিনটি মতই কি সালাফ থেকে প্রমাণিত?
উত্তর: অবশ্যই। তবে তাদের কেউ কেউ একেকটা প্রাধান্য দিয়েছেন। সকলেই একটা বিষয়ের একমত হননি। তবে তিনটি বিষয়ই সালাফ থেকে প্রমাণিত।
প্রশ্ন: প্রসিদ্ধ মত কোনটি?
উত্তর: তিনটি বিষয় সালাফদের থেকে প্রমাণিত হলেও প্রসিদ্ধ মত হল তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ।
প্রশ্ন: কেউ কেউ বলে সালাফ তা'বীল করতেন না?
উত্তর: এটা তাদের নামে মিথ্যাচার। সালাফ থেকে দু'ধরণের তা'বীলই প্রমাণিত। ১। তা'বীলে ইজমালী। ২। তা'বীলে তাফসালী।
শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করা হল তা'বীলে ইজমালী (সামগ্রিক তা'বীল)। এটা সমস্ত সালাফ করেছেন। শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর সম্ভাবনাময় কোন একটা অর্থ গ্রহণ করা হল তা'বীলে তাফসালী। এটাও অসংখ্য সালাফ থেকে প্রমাণিত।
প্রশ্ন: বর্তমান সালাফীদের সাথে সালাফের বিরোধ কোথায়?
উত্তর: ১। সালাফ তানজীহ করতেন। কিন্তু বর্তমান সালাফীরা তানজীহ করে না। সালাফ আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন, কিন্তু সালাফীদের মূল হল, তারা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করে। ২। সকল সালাফ কাইফকে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সালাফীরা কাইফ সাব্যস্ত করে। তবে তারা বলে কাইফ অজ্ঞাত। কিন্তু সালাফ বলতেন, কোন কাইফ নেই। তারা বলে, কাইফ আছে কিন্তু অজ্ঞাত। ৩। অধিকাংশ সালাফ তাফয়ীজ মা'য়াত তানজীহ করতেন। কিন্তু সালাফীদের কাছে তাফয়ীজ হল নিকৃষ্ট বিদয়াত। ৪। সালাফ শব্দের আক্ষরি অর্থ পরিত্যাগ করার কারণে দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদ থেকে মুক্ত ছিলেন, কিন্তু বর্তমান সালাফীরা আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করার কারণে বিশ্বাসের দিক থেকে অধিকাংশ সালাফী দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদী।
প্রশ্ন: সালাফীদেরকে দেহবাদী বা সাদৃশ্যবাদী হয় কেন?
উত্তর: কারণ তারা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করে। আর আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর জন্য হাত সাব্যস্ত করলে সেটা দেহবাদই হয়।
প্রশ্ন: তারা যে বলে, আল্লাহর হাত আল্লাহর হাতের মত?
উত্তর: হাতের আক্ষরি অর্থ পরিত্যাগ না করে একথা বলে কোন লাভ নেই। হাতের আক্ষরিক অর্থ হল, এটা দেহের একটা অংশ বা অঙ্গ। যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ আছে। আপনি যদি হাতের মূল অর্থ বাদ না দেন, আর বলেন, আল্লাহর হাত আল্লাহর মতই, তাহলেও সাদৃশ্যবাদ থাকে। আপনি আসলে মনে করছেন, আমাদের হাত ছোট-খাট। কিন্তু আল্লাহ অসীম হওয়ার কারণে তার হাত প্রকান্ড। এর দ্বারা আপনি শুধু হাতের ধরণের পার্থক্য করেছেন। মূল হাত আপনি আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছেন। আমরা বলি, হাত দ্বারা কখনও দেহের অংশ বা অঙ্গ উদ্দেশ্য নয়। মোটকথা হল, বাহ্যিক অর্থ সম্পূর্ণভাবে বাদ না দিতে পারলে আপনি সাদৃশ্যবাদ থেকে মুক্ত নন। আপনি যতই বলেন, আপনি আল্লাহর হাত তার শান অনুযায়ী। কারণ আল্লাহর শানই হল, তিনি একক। অঙ্গ বা অংশ থেকে মুক্ত।
প্রশ্ন: উপরের তিনটি মতের মধ্যে কোনটি উত্তম।
উত্তর: তানজীহের বিষয়ে কোন মতবিরোধ নেই। এ বিষয়ে সকলেই একমত। সুতরাং তানজীহ অবশ্যই থাকতে হবে। এরপর আরবী ভাষার ব্যবহার অনুযায়ী যদি তা'বীল খুব স্পষ্ট হয়, তাহলে তা'বীল করাটাই উত্তম। আর যদি সম্ভাব্য অর্থ আরবী ভাষা সমর্থন না করে তাহলে সেক্ষেত্রে তাফয়ীজ করা হবে। তবে বিষয়টি যেহেতু ইজতিহাদী (গবেষণা নির্ভর), এজন্য তানজীহ করার পর যে কোন একটা মত গ্রহণের সুযোগ আছে। তবে যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ নয় বরং দেহের অংশ বা অঙ্গ বোঝায়, সেসব ক্ষেত্রে তা'বীল করাই উত্তম।
প্রশ্ন: সিফাতের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ: এর মাজহাব কী ছিল?
উত্তর: ইমাম আবু হানিফা রহ: কিছু ক্ষেত্রে ইসবাত মায়াত তানজীহ করেছেন। যেমন, ইয়াদকে সিফাত বলে তার আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে বলেছেন 'ইয়াদ' কোন অঙ্গ নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে তা'বীল মায়াত তানজীহ করেছেন। যেমন, আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন, আল্লাহর নৈকট্য স্থানগত নয়। আবার পাপী বান্দা আল্লাহর থেকে দূরে। এই দূরত্ব স্থানগত নয়। এখানে স্পষ্ট তা'বীল মায়াত তানজীহ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ: এর থেকে যদি ফিকহুল আকবার ও আবসাত প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি তার মাজহাব হবে। নতুবা ইমাম আবু হানিফা রহ: এর আকিদা হিসেবে সেটাই মূল ধরা হবে, যা ইমাম ত্বহাবী রহ: আকিদাতুত ত্বাহীবিয়া তে লিখেছেন। কারণ তিনি শুরুতেই বলেছেন, এই আকিদাগুলো ইমাম আবু হানিফা রহ, ইমাম আবু ইউসুফ রহ: ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ: এর আকিদা। যেহেতু আল-ফিকহুল আকবার ও আবসাতের প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ রয়েছে, এজন্য এগুলোর উপর ভিত্তি করে ইমাম আবু হানিফা রহ: এর সুনিশ্চিত মাজহাব নির্ধারণ করাটা কঠিন। ইমাম ত্বহাবী রহ: যেহেতু স্পষ্ট করেছেন যে, আকিদাতুত ত্বহাবীর আকিদাগুলি ইমাম আবু হানিফা রহ: ও তার ছাত্রদ্বয়ের, এজন্য আকিদাতুত ত্বাহাবীকে মূল ধরাটাই অগ্রগণ্য।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ বোঝায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে তা'বীল করা উত্তম। যেমন, হাত, পা, চোখ, পায়ের পিন্ডলী। অথচ আমরা জানি, তা'বীল করলে সিফাত অস্বীকার করা হয়। তা'বীল করে কি আপনি সিফাত অস্বীকার করছেন না?
উত্তর: এসব শব্দ থেকে সিফাত প্রমাণের বিষয়টা গবেষণা নির্ভর (ইজতেহাদী)। আর এ গবেষণা ভুল ও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টা যে গবেষণা নির্ভর এটা বোঝার জন্য কয়েকটা উদাহরণ দেই।
উদাহরণ-১: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, فأينما تولوا فثم وجه الله ( তোমরা যেদিকেই ফিরো, সেদিকে আল্লাহর চেহারা রয়েছে (আক্ষরিক অনুবাদ)। এই আয়াতে আল্লাহর চেহারা দ্বারা কী উদ্দেশ্য? আয়াত কি আল্লাহর চেহারা প্রমাণের জন্য এসেছে? ১। ইবনে তাইমিয়া রহ: এই আয়াতকে সিফাতের আয়াত মনে করতেন না। তিনি আল্লাহর চেহারা এর ব্যাখ্যা করেছেন কিবলা দ্বারা। এর স্বপক্ষে তিনি অনেক সালাফের বক্তব্যও এনেছেন। এ আয়াতটি তার নিকট সিফাতের আয়াত নয়। আল্লাহর চেহারা দ্বারা সিফাত উদ্দেশ্য নয়। এটি ছিল ইবনে তাইমিয়া রহ: এর ইজতিহাদ বা গবেষণা। ২। আবার ইবনে তাইমিয়া রহ: এর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম রহ: আয়াতটিকে সিফাতের আয়াত মনে করতেন। তার মতে, আল্লাহর চেহারা দ্বারা বাস্তবেই আল্লাহর চেহারা উদ্দেশ্য। চেহারা আল্লাহর একটি সিফাত বা গুণ। এটি হল ইবনুল কাইয়্যিম রহ: এর ইজতিহাদ। স্পষ্টত: উস্তাদ ও ছাত্রের ইজতিহাদে বিস্তর পার্থক্য লক্ষণীয়। একই আয়াত একজনের কাছে সিফাত, অন্যজনের কাছে সিফাত নয়। এটা মূলত: ইজতিহাদের পার্থক্যের কারণে হয়েছে।
উদাহরণ-২: হাদীসে এসেছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণির মানুষকে তার ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। হাদীসের শব্দে ছায়া আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আল্লাহর ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষকে জায়গা দিবেন। ১। হাদীছে যেহেতু আল্লাহর ছায়া বলা হয়েছে, এজন্য শায়খ ইবনে বাজ রহ: এর মতে ছায়া আল্লাহর একটি সিফাত। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর ছায়া আছে। এটা ছিল তার ইজতিহাদ। ২। অপর দিকে সৌদি আরবের মান্যবর সালাফী আলেম শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ: এর কঠোর বিরোধীতা করেছেন। তার মতে, ছায়া আল্লাহর সিফাত নয়। কিয়ামতের দিন মূলত: আরশের ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষকে জায়গা দেয়া হবে।
উদাহরণ-৩: সালাফীদের মৌলিক বিশ্বাস হল, আল্লাহর দু'টি হাত রয়েছে। এই দুই হাতের একটি কি ডান হাত এবং অপরটি কি বাম হাত? এ বিষয়ে শায়খদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ১। শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ: ও শায়খ ইবনে বাজ রহ: এর মতে আল্লাহর বাম হাত আছে। তারা মুসলিম শরীফের একটি হাদীস থেকে এর প্রমাণ দিয়ে থাকেন। যেখানে বাম হাত আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ২। শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহ: এর মতে আল্লাহর কোন বাম হাত নেই। এ বিষয়ে মুসলিম শরীফের হাদীসটি শায (বিচ্ছিন্ন বর্ণনা)। তিনি এ বর্ণনা গ্রহণ করেননি। এ বিষয়ে আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
মোটকথা, সিফাত প্রমাণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ইজতিহাদী বা গবেষণা নির্ভর। এটা শরীয়তের অকাট্য বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত বিষয় না। কারও কাছে কোন একটা আয়াত বা হাদীস সিফাত এর প্রমাণ হলেও অন্যের কাছে সেটি সিফাতের দলিল নয়। যার কাছে বিষয়টি সিফাত, তিনি দাবী করছেন যে এটি আল্লাহর সিফাত। কিন্তু যার গবেষণায় এটি সিফাত নয়, তিনি বলছেন, আয়াত বা হাদীস সিফাত প্রমাণ করছে না। বিষয়টি গবেষণা নির্ভর হওয়ার কারণে একজনের গবেষণার কারণে অন্যকে সিফাত অস্বীকারকারী বলার কোন সুযোগ নেই। কারণ অস্বীকারের প্রশ্ন পরে আসবে। তার কাছে তো বিষয়টি সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়। এক্ষেত্রে একজনের গবেষণাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া যেমন অন্যায়, একইভাবে যার কাছে বিষয়টি সিফাত হিসেবে প্রমাণিত নয়, তাকে সিফাত অস্বীকারকারী বলাটাও অন্যায়। আপনার প্রশ্নের উত্তর হল, যিনি তা'বীল করছেন, তিনি উক্ত আয়াত বা হাদীসকে সিফাতের আয়াত বা হাদীস মনে করছেন না। তার ইজতিহাদে এই আয়াত বা হাদীস আল্লাহর কোন গুণ প্রমাণের জন্য আসেনি। আপনার ইজতিহাদে হয়ত বিষয়টা কোন গুণ প্রমাণ করছে, কিন্তু যিনি তা'বীল করছেন তার কাছে এটি গুণ প্রমাণ করছে না। যেমন, শায়খ ইবনে বাজ রহঃ ছায়াকে আল্লাহর গুণ মনে করলেও ইবনে উসাইমিন রহঃ ছায়াকে আল্লাহর গুণ মনে করেননি। এক্ষেত্রে আপনি কাকে সিফাত অস্বীকারকারী বলবেন? আর ইবনে বাজ রহঃ এর এই ইজতিহাদ কি সবার মেনে নেয়া জরুরি? মূলকথা হল, সিফাত প্রমাণের বিষয়টি গবেষণার উপর নির্ভর করছে। যার গবেষণায় বিষয়টি সিফাত নয় এবং তিনি এর তা'বীল করেছেন, তাকে আপনার গবেষণার কারণে সিফাত অস্বীকারকারী বলার সুযোগ নেই। এর দ্বারা আপনি আপনার গবেষণা সবাইকে মানতে বাধ্য করছেন। বাস্তবে অন্য সবাই আপনার গবেষণা মানতে বাধ্য নয়। আহলে সুন্নতের অসংখ্য আলেমের ইজতিহাদ হল, হাত, পা, চোখ, পায়ের পিন্ডলী, দেহের পাশ এগুলো সিফাত নয়। যেসব আয়াত বা হাদীসে এগুলো আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, এগুলো আল্লাহর সিফাত প্রমাণের জন্য আসেনি। তাদের কাছে বিষয়গুলো সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়। এখন আপনার গবেষণায় বা অন্য কোন আলিমের গবেষণায় এগুলো সিফাত হতে পারে। আপনার গবেষণার কারণে যাদের কাছে এগুলো সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়, তারা সিফাত অস্বীকারকারী হবে কেন? আপনি হয়ত দু'পক্ষের গবেষণার মধ্যে যে কোন একটা প্রাধান্য দিতে পারেন। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আপনার ইজতিহাদের কারণে অন্য পক্ষ সিফাত অস্বীকারকারী হবে না।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে তা'বীল মায়াত তানজীহ প্রাধান্য পাবে। ইসবাত ও তাফয়ীজের উপর একে প্রাধান্য দেয়ার কারণ কী? অথচ সালাফ ইসবাত মায়াত তানজীহকে প্রাধান্য দিয়েছেন?
উত্তর: যেহেতু বিষয়টা ইজতেহাদী, এজন্য এবিষয়ে যেকোন একটা মতকে প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ আছে। আর তিনটি বিষয়ই যেহেতু সালাফ থেকে প্রমাণিত, এজন্য কোন একটাকে প্রাধান্য দিলেও সেটা সালাফেরই মত হিসেবে গণ্য হবে। কিছু কিছু সালাফ তাফয়ীজকে প্রাধান্য দিয়েছেন, এর অর্থ এই নয় যে, যেসব সালাফ তা'বীল করেছেন, তাদের মাজহাবটি ভুল। সালাফের কেউ কেউ হয়ত তা'বীলের বিরোধীতা করেছেন, কিন্তু অন্যান্য সালাফ থেকে তা'বীল প্রমাণিত। তাদের বিরোধীতার কারণে একথা বলার সুযোগ নেই যে, তা'বীল সালাফের মাজহাব নয়। মোটকথা, তানজীহের পর ইসবাত, তাফয়ীজ, তা'বীল থেকে যে মতটিই গ্রহণ করা হবে, সেটা সালাফেরই মত হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু সবগুলিই সালাফ থেকে প্রমাণিত। আবার কোন একটি মতকে প্রাধান্য দিলে মূলত: সালাফের একটা মতকে আরেকটার উপর প্রাধান্য দেয়া হল। কিছু ক্ষেত্রে তা'বীলকে তাফয়ীজের উপর প্রাধান্য দেয়ার কিছু মৌলিক কারণ উল্লেখ করছি।
১। অনেক আয়াত বা হাদীসে রুপক অর্থটাই মূল। রুপক অর্থ না নিলে আয়াত বা হাদীসের বক্তব্য বিকৃত হয়, সেক্ষেত্রে অবশ্য তা'বীল করতে হবে। যেমন,
ক) সূরা কাসাসের ৮৮ নং আয়াত। আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এখানে সালাফ থেকে দু'টি তা'বীল বর্ণিত আছে। আল্লাহর সত্ত্বা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হবে। এখানে চেহারা দ্বারা সত্ত্বা উদ্দেশ্য। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কৃত নেক আমল। দ্বিতীয় তা'বীলটি ইমামা বোখারী রহ: সহীহ বোখারীতে উল্লেখ করেছেন। এ আয়াতে তা'বীল না করে বাহ্যিক অর্থ নিলে আয়াতের অর্থ বিকৃত হয়।
খ) পবিত্র কুরআনের সুরা দাহরে (আয়াত-৯) আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ এই আয়াতের আক্ষরিক অর্থ হল, আমরা তোমাদেরকে আল্লাহর চেহারার জন্য আহার্য দান করি। মূল অর্থ হল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। এ আয়াতে 'আল্লাহর চেহারা' দ্বারা যদি তা'বীল না করে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাহলে আয়াতের অর্থ ও উদ্দেশ্য বিকৃত করা হয়। এধরণের তাহরীফে মা'নাবী (পরোক্ষ বিকৃতি) আবশ্যক হলে আয়াতের তা'বীল করা জরুরি।
গ) কেউ কেউ সূরা হুদের ৩৭ নং আয়াত দ্বারা আল্লাহর চোখ প্রমাণের চেষ্টা করেছে। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে আল্লাহর বহু চোখ সাব্যস্ত করা হয়। আবার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের কারণে আয়াতের বক্তব্য বিকৃত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا আয়াতের বাহ্যিক অর্থ হল, হে নূহ, আমার চোখসমূহ দ্বারা নৌকা তৈরি করো। আয়াত দ্বারা বহু চোখ সাব্যস্ত হয়। আবার সেই চোখসমূহ দ্বারা নৌকা তৈরির আদেশটিও অসম্ভব। আয়াতের মূল উদ্দেশ্য ও অর্থ এটি হতে পারে না। এজন্য এ আয়াতে তা'বীল না করলে তাহরীফ আবশ্যক হয়। তাফসীরে ইবনে কাসীরে এর অর্থ করা হয়েছে, আমার সম্মুখে বা তত্ত্বাবধানে নৌকা তৈরি করো।
২। যেসব ক্ষেত্রে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী-শিরকী আবশ্যক হয়, সেসব ক্ষেত্রে তা'বীল করা জরুরি। যেমন,
ক। হাদীসে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি বান্দার হাত হয়ে যায়। আমি বান্দার পা হয়ে যায়। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী আবশ্যক হয়।
খ। কুরআনে এসেছে, আল্লাহ হলেন আসমান-জমিনের নূর বা আলো। এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী আবশ্যক হয়।
গ। হাদীসে এসেছে, তোমরা সময়কে গালি দিও না। কারণ আল্লাহ হলেন সময়। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী হবে।
ঘ। কুরআনে এসেছে, কাফেররা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আল্লাহ তায়ালাও তাদেরকে ভুলে গেছেন। এ আয়াত থেকে বাহ্যিক অর্থ নিয়ে একথা বলা কুফুরী হবে যে, আল্লাহ তায়ালা ভুলে যান।
ঙ। হাদীসে এসেছে, আমি ইয়ামান থেকে আল্লাহর শ্বাস-প্রশ্বাস পাচ্ছি। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ নিলেও কুফুরী হবে। এধরণের আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে তা'বীল না করলে কুফুরী-শিরকী আবশ্যক হয়। এসব ক্ষেত্রে তা'বীল করা জরুরি।
৩। কোন আয়াত বা হাদীসের বাহ্যিক অর্থ যদি আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য না হয়, তাহলে এই বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগের বিষয়ে সমস্ত সালাফ একমত। যেমন, আল্লাহর ক্ষেত্রে নুজুল দ্বারা কখনও উপর থেকে নীচে নামা উদ্দেশ্য হবে না। শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করাও তা'বীল। কারণ তা'বীল বলা হয়, صرف اللفظ عن ظاهره অর্থ: শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করা। সিফাতের ক্ষেত্রে এধরণের তা'বীলের কথা সমস্ত সালাফই বলেছেন। পরিভাষায় একে তা'বীলে ইজমালী বা সামগ্রিক তা'বীল বলে। সুতরাং কোন শব্দের বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য না হলে ঐ শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগের বিষয়ে সমস্ত সালাফ একমত ছিলেন। তা'বীলে ইজমালী না করলে দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদ আবশ্যক হবে। উভয়টি মারাত্মক কুফুরী। সালাফের মধ্যে যারা সিফাত সাব্যস্ত করেছেন অথবা যারা তাফয়ীজ করেছেন, তাদের সকলেই তা'বীলে ইজমালী করেছেন। তা'বীলে ইজমালী একটা ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়।
৪। অনেক ক্ষেত্রে তা'বীলে ইজমালীর পাশাপাশি তা'বীলে তাফসীলি করাও উত্তম। তা'বীলে তাফসীলি হল, শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করার পর সম্ভাব্য অন্য কোন রুপক অর্থ গ্রহণ করা। যেমন, আরবী ইয়াদ এর বাহ্যিক অর্থ হাত। কিন্তু আরবীসহ বিভিন্ন ভাষায় হাতের অনেক ব্যবহার আছে। কাউকে কৃপণ বোঝানোর জন্য আমরা বলি, তার হাত খাট। কোন নেতার ক্ষমতা বোঝানোর জন্য বলি, তার হাত অনেক লম্বা। আরবীতেও এধরণের অসংখ্য রুপকের ব্যবহার আছে। যেসব জায়গায় আনুষঙ্গিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বক্তা রুপক অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে তা'বীলে তাফসীলি করতে হবে। যেমন, হাদীসে এসেছে, إن قلوب بني آدم كلها بين إصبعين من أصابع الرحمن অর্থ: বনী আদমের অন্তরসমুহ আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মধ্যে। এই হাদীস দ্বারা এটা কখনও উদ্দেশ্য নয় যে, প্রত্যেক মানুষের অন্তরে আল্লাহর দুই আঙ্গুল রয়েছে। বক্তব্য থেকে উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। মানুষের অন্তরের উপর আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। এখানে আল্লাহর আঙ্গুল সাব্যস্ত করা, প্রত্যেকের মানুষের অন্তরে আল্লাহর আঙ্গুল আছে, এটা বলা উদ্দেশ্য নয়। বক্তার বক্তব্য থেকে তা' বীলে তাফসীলি স্পষ্ট হওয়ার কারণে এখানে তা'বীল করাটা উত্তম।
৫। কিছু শব্দ বাস্তবে কোন সিফাত বা গুণ বোঝায় না। কিন্তু রুপক অর্থে কখনও গুণের অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, হাত, পা, চোখ। এগুলো পৃথিবীর কোন ভাষাতেই আক্ষরিক অর্থে গুণ বোঝায় না। এর আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করে একে গুণের অর্থে নেয়া সম্ভব। তবে এটি অপ্রচলিত তা'বীল হিসেবে গণ্য হবে। হাত শব্দ ব্যবহার করে যদি আমি ক্ষমতা, নেয়ামত ইত্যাদি রুপক অর্থ নেই, তাহলে সেটি প্রচলিত রুপক হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু আমি যদি হাতের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করে বলি, হাত একটি গুণ, তাহলে এটা আরবী ভাষার প্রচলিত রুপকের মধ্যে থাকবে না। ইমাম আ'মাদী রহ: এর মতে হাত, পা এগুলোকে সিফাত বা গুণ বলা হল, অপ্রচলিত ও দূরবর্তী রুপক (তাজাউঝে বায়ীদ)। সালাফের মধ্যে যারা হাত, পা, চোখকে সিফাত বলেছেন, তারা মূলত: দূরবর্তী তা'বীল করেছেন। বাহ্যিকভাবে যদিও মনে হয়, তারা তা'বীল করছেন না বা তা'বীলের বিরোধীতা করছেন, কিন্তু বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল। ১। তারা যখন শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করছেন, তখন এটি তা' বীলে ইজমালী। ২। এরপর যখন ঐ শব্দকে সিফাত বা গুণ বলছেন, তখন এটি তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল। কারণ শব্দটি আসলে কোন গুণ বোঝায় না। ইয়াদ নামে আরবীতে কোন গুণ নেই। কাদাম নামে কোন গুণ নেই। ইয়াদ বা কাদাম আরবী ভাষায় কোন গুণ না বোঝানো সত্ত্বেও একে গুণের অর্থে নেয়াটা ব্যাপক তা'বীল। যা প্রচলিত তা'বীল থেকেও দূরবর্তী। সালাফের মধ্যে যারা হাত, পা, চোখকে সিফাত বলতেন, তারা মূলত: তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল করেছেন। আর বাস্তবতা হল, দূরবর্তী বা অপ্রচলিত তা'বীলের চেয়ে প্রচলিত তা'বীল উত্তম। এজন্য ইয়াদকে সিফাত বলার চেয়ে ইয়াদকে ক্ষমতা বা অন্য কোন অর্থে তা' বীল করা উত্তম। ইমাম আ'মাদী রহ: এবিষয়ে আরও বিস্তারিত লিখেছেন তার 'আবকারুল আফকার' নামক কিতাবে।
৬। সালাফসহ আহলে সুন্নতের বহু আলিমের মতে এগুলো মুতাশাবিহাত এর অন্তর্ভূক্ত। এগুলো যদি মুতাশাবিহাত হয়, তাহলে এর দ্বারা সিফাত প্রমাণ করা কতটুকু সঠিক? মুতাশাবিহ বিষয় কি কোন কিছু প্রমাণে দলিল হওয়ার যোগ্য? ইমাম শাতবী রহ: এর মতে মুতাশাবিহকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে কোন কিছু প্রমাণ করা বিদয়াত। কারও কাছে যদি এ সংক্রান্ত আয়াত বা হাদীস মুতাশাবিহ হয়, তাহলে তার জন্য এগুলো দ্বারা সিফাত প্রমাণ করার সুযোগ থাকে না। এজন্য যেসব আয়াত বা হাদীসে হাত, পা, চোখ ইত্যাদির কথা আছে, এগুলোকে মুতাশাবিহ গণ্য করলে এর দ্বারা কোন সিফাত প্রমাণ করার সুযোগ নেই। সিফাত প্রমাণের জন্য মুহকাম আয়াত বা হাদীস প্রয়োজন। আর এগুলো যেহেতু মুহকাম নয়, এজন্য এগুলো দ্বারা সিফাত প্রমাণ করাটা দলিলের বিবেচনায় দুর্বল।
৭। হাত, পা, চোখ এগুলো মূলত: সিফাত হিসেবে আসেনি। ইজাফত হিসেবে এসেছে। যেমন, হাসানের বই। এখানে বই হাসানের দিকে সম্পৃক্ত হয়েছে ইজাফত হিসেবে। গুণ হিসেবে নয়। এই ইজাফতকে সিফাত বা গুণ বলার জন্য পৃথক দলিল প্রয়োজন। আর এসব ইজাফতকে সিফাত বলার ভাষাগত, যৌক্তিক বা শরয়ী কোন দলিল নেই। শরয়ী বা আকলী দলিল ছাড়া ইজাফাতকে সিফাত বলাটা যৌক্তিক হতে পারে না।
৮। আল্লাহর হাত, আল্লাহর চোখ, আল্লাহর রুহ সবগুলিই ইজাফাত। শব্দের ব্যবহারে সামান্যতম কোন পার্থক্য নেই। যারা হাত বা চোখকে সিফাত বলেন, তারা রুহকে আল্লাহর সিফাত বলেন না। যদিও বাংলাদেশী কিছু আহলে হাদীসদের আকিদার কিতাবে রুহ বা আত্মাকেও আল্লাহর সিফাত বলা হয়েছে। একই ধরণের ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও পাত, পা, চোখকে সিফাত কেন বলা হবে এবং রুহ বা আত্মাকে আল্লাহর সিফাত কেন বলা হবে না? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তিনি আদম আ: এর মাঝে তার রুহ ফুৎকারের মাধ্যমে প্রবেশ করিয়েছেন। এই আয়াত থেকে রুহকে আল্লাহর সিফাত বলা হবে না কেন? আর আল্লাহর সেই সিফাত আদম আ: এর মাঝে প্রবেশ করানো হয়েছে, এই বিশ্বাসকে কুফুরী বলা হবে কেন?
৯। সালাফের অনেকে তা'বীলে তাফসিলির বিরোধীতা করেছেন, তা'বীল সম্ভাবনাময় হওয়ার কারণে। সুনিশ্চিত না হওয়ার কারণে তারা তা' বীলের বিরোধীতা করেছেন। ইজাফাতের মাধ্যমে যদি সিফাত সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে এক্ষেত্রেও বিষয়টি সম্ভাবনাময় থাকে। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে না যে, এটি আল্লাহর সিফাত। ইয়াদ আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে একথা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না যে, আল্লাহর হাত রয়েছে। আরবী ভাষায় এধরণের বহু ব্যবহার রয়েছে। যেমন, কুরআনে 'দিনের চেহারা', 'তার পা', 'নম্রতার ডানা', 'কুরআনের দুই হাত' ইত্যাদি বহু ব্যবহার রয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে না যে, দিনের চেহারা রয়েছে। সত্যের পা রয়েছে। একইভাবে আল্লাহর দিকে হাত সম্পৃক্ত হলেই এটা প্রমাণ করে না যে, আল্লাহর হাত রয়েছে। কুরআনের দিকে দুই হাত সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কেউ তো এটা বলে না যে, কুরআনের দুই হাত আছে? আল্লাহর ক্ষেত্রে হাতের ইজাফাত হলেই কেন বলা হবে যে, আল্লাহর হাত রয়েছে? সম্ভাবনার কারণে তা'বীল যদি বর্জনীয় হয়, তাহলে একই কারণে এসব আয়াত বা হাদীস থেকে সিফাত প্রমাণও বর্জনীয় হওয়া উচিত।
১০। যে কোন সিফাত আল্লাহর বিশেষ পরিচয় ও মহত্ব তুলে ধরে। আল্লাহ সর্বময় জ্ঞানী। এর দ্বারা আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব বোঝা যায়। কিন্তু হাত, পা, চোখ এগুলো কোন মহত্ব বা বড়ত্ব প্রকাশ করে না। এগুলোকে অনেক সময় আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করতেই মানুষ দ্বিধা করে। এছাড়া এজাতীয় যত আয়াত ও হাদীস আছে, সবগুলি মিলালেও পরিপূর্ণ কোন পরিচয় স্পষ্ট হয় না। বহু হাত, এক পা, বহু চোখ, দেহের এক পাশ, এক পায়ের পিন্ডলী এগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করলেও এটি একটি অসম্পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরে। আল্লাহর সিফাতের মূলই ছিল আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা, এগুলোকে সিফাত বলার কারণে এর দ্বারা অস্পষ্টতা বেড়েছে। মূল বিষয় হল, এগুলো আল্লাহর কোন বিশেষ পরিচয় বা মহত্ব তুলে ধরে না। এগুলোকে সিফাত সাব্যস্ত করার মূল আবেদনটি এখানে অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নুকস বা ত্রুটি হিসেবে গণ্য করা হয়। যেমন, হাত। মানুষের হাত তার একটি দুর্বলতাকে দূর করার জন্য এসেছে। কোন কিছু ধরার জন্য সে হাতের মুখাপেক্ষী। হাত মানুষের দুর্বলতার প্রতীক। এই অভিযোগটি তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর জন্য হাত সাব্যস্ত করে।
পুরো আলোচনার উপসংহার হল, যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ বোঝায় না, বরং অঙ্গ বা দেহের অংশ বোঝায় এগুলোর ক্ষেত্রে তা'বীল করা উত্তম। তবে তা'বীলের শর্ত ঠিক রেখে তা'বীল করতে হবে। আরবী ভাষায় এর সমর্থন থাকতে হবে। আনুসঙ্গিক আলোচনার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। এ বিষয়ে ইমাম ইজ ইবনে আব্দুস সালাম রহ: বলেন, طريقة التاويل بشرطه اقربهما الي الحق অর্থ: তা'বীল ও তাফয়ীজের মধ্যে শর্ত মেনে তা'বীলের পদ্ধতি সত্যের অধিক নিকটবর্তী। -[আল-বাহরুল মুহীত, খ-৩, পৃ-৪৪০]
প্রশ্ন: সিফাতে খাবারিয়্যার ক্ষেত্রে আশআরী-মাতুরিদি আকিদা আসলে কী?
উত্তর: সালাফের আকিদাই মুলত: আশআরী-মাতুরিদি আকিদা। সালাফ থেকে প্রমাণিত প্রত্যেকটি মতই আশআরী-মাতুরিদিগণ গ্রহণ করেছেন। সালাফের সাথে আশআরী-মাতুরিদি আকিদার মৌলিক কোন বিরোধ নেই। সালাফের মৌলিক মাজহাব ছিল তানজীহ। আল্লাহ তায়ালাকে যে কোন ধরণের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত বিশ্বাস করা। তানজীহের পর ইসবাত, তাফয়ীজ, তা'বীল সবগুলোকেই তারা সমর্থন করেন।
প্রশ্ন: বর্তমান সালাফীরা আশআরী-মাতুরিদি আকিদার বিরোধীতা করে কেন?
উত্তর: এর কয়েকটি কারণ আছে। যেমন: ১। সালাফীরা তাদের আকিদার মূল বানিয়েছে শব্দের আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাসের উপর। সালাফ, আশআরী-মাতুরিদি সকলেই শব্দের আক্ষরিক অর্থ বর্জনের উপর একমত। ইয়াদ বলে তারা হাতের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। তারা স্পষ্ট করেছেন, ইয়াদ কখনও দেহের কোন অঙ্গ নয়। সালাফীদের সাথে এই মৌলিক জায়গায় বিরোধের কারণে তারা আশআরী-মাতুরিদি আকিদার বিরোধীতা করে। ২। সালাফের অনুসরণে আশআরী-মাতুরিদিগণ বলেন, আল্লাহর জাত ও সিফাতের কোন কাইফ নেই। কিন্তু সালাফীরা বলে কাইফ আছে, কিন্তু কাইফ অজ্ঞাত। ৩। বহু আয়াত ও হাদীসে সালাফ থেকেই অসংখ্য তা'বীল বর্ণিত আছে। এসব তা'বীল আরবী ভাষাও সমর্থন করে। আশআরী-মাতুরিদিগণ এসব তা'বীলকে সমর্থন করেন। পক্ষান্তরে সালাফীরা এসব তা'বীল সালাফ থেকে বর্ণিত হলেও তারা এগুলো গ্রহণ বা সমর্থন করে না। সালাফীদের স্বীকৃত আকিদার সমর্থনে কোন তা'বীল হলে, তারা শুধু এগুলো গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের আকিদার বিরোধী হলে তা'বীলের বিপক্ষে যায়। আশআরী-মাতুরিদিগন গ্রহণযোগ্য তা'বীলগুলো গ্রহণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা সালাফীদের মত দ্বিমুখী আচরণ বা স্ববিরোধীতা করেন না।
প্রশ্ন: সিফাতে খাবারিয়্যার ক্ষেত্রে সালাফের মাজহাব কী ছিল?
উত্তর: সালাফদের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব ছিল তানজীহ। সকলেই আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত বিশ্বাস করতেন। এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করতেন না। সুতরাং সালাফের সমস্ত বক্তব্য সামনে রাখলে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সকলের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব ছিল তানজীহ। যেমন নুজুল বা অবতরণ। আল্লাহর নুজুল যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়, এব্যাপারে সকলেই একমত। একইভাবে আল্লাহর নুজুল উপর থেকে নীচে নামান নয়। সালাফদের কেউ কেউ ইয়াদকে (হাত) সিফাত বলেছেন। কিন্তু তাদের সকলেই এ বিষয়ে একমত ছিলেন, ইয়াদ কোন অঙ্গ বা দেহের কোন অংশ নয়। মোটকথা, তানজীহ (সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে আল্লাহ তায়ালাকে মুক্ত বিশ্বাস করা) হল সালাফের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব।
প্রশ্ন: তানজীহের পর সালাফ কী করতেন?
উত্তর: এ বিষয়ে সালাফের মধ্যেই মতবিরোধ আছে। মোটামুটি তিনটি মত পাওয়া যায়।
১। ইসবাত মায়াত তানজীহ।
২। তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ।
৩। তা'বীল মায়াত তানজীহ।
ইসবাত মায়াত তানজীহ:
ইসবাত মায়াত তানজীহ হল, প্রথমে তারা শব্দের আক্ষরিক অর্থ থেকে আল্লাহকে মুক্ত ঘোষণা করতেন। এরপর তারা ঐ শব্দকে আল্লাহর সিফাত বলতেন। তবে শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর ঐ শব্দের কী অর্থ হবে, তা আল্লাহ দিকে ন্যস্ত করতেন। এক্ষেত্রে মূলত: তারা তা'বীল ও তাফয়ীজ করতেন। অর্থাৎ শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়া হল তা'বীল। ঐ শব্দকে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করা হল ইসবাত। ঐ শব্দের আসল অর্থ ও উদ্দেশ্য কী হবে সেটা আল্লার দিকে ন্যস্ত করা হল তাফয়ীজ। উদাহরণ: ইয়াদ। অর্থ হল, হাত। আরবী 'ইয়াদ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, এটি দেহের অঙ্গ বা অংশ। সালাফদের সকলেই এই অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। ইয়াদ ব্যবহার কতে অঙ্গ বা অংশ উদ্দেশ্য না নেয়া হল এক ধরনের তা'বীল। এরপর কেউ কেউ ইয়াদকে সিফাত বলেছেন। এটা হল ইসবাত (সিফাত সাব্যস্তকরণ)। ইয়াদের বাহ্যিক অর্থ (অঙ্গ) পরিত্যাগ করার পর ইয়াদ দ্বারা আসলে কী উদ্দেশ্য সেটা আল্লাহ জানেন। এভাবে ইয়াদের আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াকে বলে তাফয়ীজ। একই সাথে তা'বীল, ইসবাত ও তাফয়ীজ পাওয়া গেল। এটা কিছু কিছু সালাফের মত ছিল।
তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ:
তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ হল, শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর কী অর্থ হবে সেটা আল্লাহর উপর ন্যস্ত করা। এক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর অন্য কোন অর্থ তারা নির্ধারণ করতেন না। আবার এটাও বলতেন না যে, এটা আল্লাহর সিফাত। যেমন, আরবীতে ইয়াদ এর প্রায় পঁচিশটা অর্থ রয়েছে। ফাতহুল বারীতে ইবনে হাজার আসকালানী রহ: ইয়াদ এর পঁচিশটা অর্থ লিখেছেন। ইয়াদের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর এই পঁচিশটার কোনটা উদ্দেশ্য অথবা অন্য কোন অর্থ উদ্দেশ্য কি না, সেটা তারা নির্ধারণ না করে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতেন। এক্ষেত্রে তা'বীল ও তাফয়ীজ পাওয়া যায়। শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগের কারণে এটি তা'বীল। আবার সম্পূর্ণ বিষয়কে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করার কারণে এটি তাফয়ীজ।
তা'বীল মায়াত তানজীহ:
তা'বীল মায়াত তানজীহ হল, শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করার পর সম্ভাবনাময় কোন একটা অর্থ গ্রহণ করা। শুরুতেই তারা এর আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। এটা হল তা'বীলে ইজমালী। এরপর তারা উক্ত শব্দের অন্যান্য ব্যবহার দেখতেন। এক্ষেত্রে আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা অর্থ গ্রহণ করতেন। যেমন, ইয়াদ বা হাত। প্রথমে তারা আক্ষরিক অর্থ বাদ দিতেন। এরপর আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা অর্থ নিতেন। যেমন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের সম্পর্কে বলেছেন; তারা বলে, আল্লার হাত বন্ধ (কৃপণ অর্থে)। এর প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহর উভয় হাত লম্বা। এখানে ইবনে কাসীর সহ অনেক মুফাসসির 'আল্লারহ উভয় হাত প্রশস্ত' কে রুপক অর্থে নিয়েছেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তায়ালা অধিক দানশীল। ব্যবহার অনুযায়ী কখন ইয়াদ অর্থ শক্তি। কখনও নিয়ামত। কখনও ক্ষমতা। এধরণের প্রায় পচিশটা অর্থ ও এর ব্যবহার রয়েছে আরবী ভাষায়। স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী অর্থ গ্রহণ করা। এটাকে তা'বীলে তাফসিলি বলে।
প্রশ্ন: উপরের তিনটি মতই কি সালাফ থেকে প্রমাণিত?
উত্তর: অবশ্যই। তবে তাদের কেউ কেউ একেকটা প্রাধান্য দিয়েছেন। সকলেই একটা বিষয়ের একমত হননি। তবে তিনটি বিষয়ই সালাফ থেকে প্রমাণিত।
প্রশ্ন: প্রসিদ্ধ মত কোনটি?
উত্তর: তিনটি বিষয় সালাফদের থেকে প্রমাণিত হলেও প্রসিদ্ধ মত হল তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ।
প্রশ্ন: কেউ কেউ বলে সালাফ তা'বীল করতেন না?
উত্তর: এটা তাদের নামে মিথ্যাচার। সালাফ থেকে দু'ধরণের তা'বীলই প্রমাণিত। ১। তা'বীলে ইজমালী। ২। তা'বীলে তাফসালী।
শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করা হল তা'বীলে ইজমালী (সামগ্রিক তা'বীল)। এটা সমস্ত সালাফ করেছেন। শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর সম্ভাবনাময় কোন একটা অর্থ গ্রহণ করা হল তা'বীলে তাফসালী। এটাও অসংখ্য সালাফ থেকে প্রমাণিত।
প্রশ্ন: বর্তমান সালাফীদের সাথে সালাফের বিরোধ কোথায়?
উত্তর: ১। সালাফ তানজীহ করতেন। কিন্তু বর্তমান সালাফীরা তানজীহ করে না। সালাফ আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন, কিন্তু সালাফীদের মূল হল, তারা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করে। ২। সকল সালাফ কাইফকে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সালাফীরা কাইফ সাব্যস্ত করে। তবে তারা বলে কাইফ অজ্ঞাত। কিন্তু সালাফ বলতেন, কোন কাইফ নেই। তারা বলে, কাইফ আছে কিন্তু অজ্ঞাত। ৩। অধিকাংশ সালাফ তাফয়ীজ মা'য়াত তানজীহ করতেন। কিন্তু সালাফীদের কাছে তাফয়ীজ হল নিকৃষ্ট বিদয়াত। ৪। সালাফ শব্দের আক্ষরি অর্থ পরিত্যাগ করার কারণে দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদ থেকে মুক্ত ছিলেন, কিন্তু বর্তমান সালাফীরা আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করার কারণে বিশ্বাসের দিক থেকে অধিকাংশ সালাফী দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদী।
প্রশ্ন: সালাফীদেরকে দেহবাদী বা সাদৃশ্যবাদী হয় কেন?
উত্তর: কারণ তারা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করে। আর আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর জন্য হাত সাব্যস্ত করলে সেটা দেহবাদই হয়।
প্রশ্ন: তারা যে বলে, আল্লাহর হাত আল্লাহর হাতের মত?
উত্তর: হাতের আক্ষরি অর্থ পরিত্যাগ না করে একথা বলে কোন লাভ নেই। হাতের আক্ষরিক অর্থ হল, এটা দেহের একটা অংশ বা অঙ্গ। যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ আছে। আপনি যদি হাতের মূল অর্থ বাদ না দেন, আর বলেন, আল্লাহর হাত আল্লাহর মতই, তাহলেও সাদৃশ্যবাদ থাকে। আপনি আসলে মনে করছেন, আমাদের হাত ছোট-খাট। কিন্তু আল্লাহ অসীম হওয়ার কারণে তার হাত প্রকান্ড। এর দ্বারা আপনি শুধু হাতের ধরণের পার্থক্য করেছেন। মূল হাত আপনি আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছেন। আমরা বলি, হাত দ্বারা কখনও দেহের অংশ বা অঙ্গ উদ্দেশ্য নয়। মোটকথা হল, বাহ্যিক অর্থ সম্পূর্ণভাবে বাদ না দিতে পারলে আপনি সাদৃশ্যবাদ থেকে মুক্ত নন। আপনি যতই বলেন, আপনি আল্লাহর হাত তার শান অনুযায়ী। কারণ আল্লাহর শানই হল, তিনি একক। অঙ্গ বা অংশ থেকে মুক্ত।
প্রশ্ন: উপরের তিনটি মতের মধ্যে কোনটি উত্তম।
উত্তর: তানজীহের বিষয়ে কোন মতবিরোধ নেই। এ বিষয়ে সকলেই একমত। সুতরাং তানজীহ অবশ্যই থাকতে হবে। এরপর আরবী ভাষার ব্যবহার অনুযায়ী যদি তা'বীল খুব স্পষ্ট হয়, তাহলে তা'বীল করাটাই উত্তম। আর যদি সম্ভাব্য অর্থ আরবী ভাষা সমর্থন না করে তাহলে সেক্ষেত্রে তাফয়ীজ করা হবে। তবে বিষয়টি যেহেতু ইজতিহাদী (গবেষণা নির্ভর), এজন্য তানজীহ করার পর যে কোন একটা মত গ্রহণের সুযোগ আছে। তবে যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ নয় বরং দেহের অংশ বা অঙ্গ বোঝায়, সেসব ক্ষেত্রে তা'বীল করাই উত্তম।
প্রশ্ন: সিফাতের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ: এর মাজহাব কী ছিল?
উত্তর: ইমাম আবু হানিফা রহ: কিছু ক্ষেত্রে ইসবাত মায়াত তানজীহ করেছেন। যেমন, ইয়াদকে সিফাত বলে তার আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে বলেছেন 'ইয়াদ' কোন অঙ্গ নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে তা'বীল মায়াত তানজীহ করেছেন। যেমন, আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন, আল্লাহর নৈকট্য স্থানগত নয়। আবার পাপী বান্দা আল্লাহর থেকে দূরে। এই দূরত্ব স্থানগত নয়। এখানে স্পষ্ট তা'বীল মায়াত তানজীহ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ: এর থেকে যদি ফিকহুল আকবার ও আবসাত প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি তার মাজহাব হবে। নতুবা ইমাম আবু হানিফা রহ: এর আকিদা হিসেবে সেটাই মূল ধরা হবে, যা ইমাম ত্বহাবী রহ: আকিদাতুত ত্বাহীবিয়া তে লিখেছেন। কারণ তিনি শুরুতেই বলেছেন, এই আকিদাগুলো ইমাম আবু হানিফা রহ, ইমাম আবু ইউসুফ রহ: ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ: এর আকিদা। যেহেতু আল-ফিকহুল আকবার ও আবসাতের প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ রয়েছে, এজন্য এগুলোর উপর ভিত্তি করে ইমাম আবু হানিফা রহ: এর সুনিশ্চিত মাজহাব নির্ধারণ করাটা কঠিন। ইমাম ত্বহাবী রহ: যেহেতু স্পষ্ট করেছেন যে, আকিদাতুত ত্বহাবীর আকিদাগুলি ইমাম আবু হানিফা রহ: ও তার ছাত্রদ্বয়ের, এজন্য আকিদাতুত ত্বাহাবীকে মূল ধরাটাই অগ্রগণ্য।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ বোঝায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে তা'বীল করা উত্তম। যেমন, হাত, পা, চোখ, পায়ের পিন্ডলী। অথচ আমরা জানি, তা'বীল করলে সিফাত অস্বীকার করা হয়। তা'বীল করে কি আপনি সিফাত অস্বীকার করছেন না?
উত্তর: এসব শব্দ থেকে সিফাত প্রমাণের বিষয়টা গবেষণা নির্ভর (ইজতেহাদী)। আর এ গবেষণা ভুল ও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টা যে গবেষণা নির্ভর এটা বোঝার জন্য কয়েকটা উদাহরণ দেই।
উদাহরণ-১: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, فأينما تولوا فثم وجه الله ( তোমরা যেদিকেই ফিরো, সেদিকে আল্লাহর চেহারা রয়েছে (আক্ষরিক অনুবাদ)। এই আয়াতে আল্লাহর চেহারা দ্বারা কী উদ্দেশ্য? আয়াত কি আল্লাহর চেহারা প্রমাণের জন্য এসেছে? ১। ইবনে তাইমিয়া রহ: এই আয়াতকে সিফাতের আয়াত মনে করতেন না। তিনি আল্লাহর চেহারা এর ব্যাখ্যা করেছেন কিবলা দ্বারা। এর স্বপক্ষে তিনি অনেক সালাফের বক্তব্যও এনেছেন। এ আয়াতটি তার নিকট সিফাতের আয়াত নয়। আল্লাহর চেহারা দ্বারা সিফাত উদ্দেশ্য নয়। এটি ছিল ইবনে তাইমিয়া রহ: এর ইজতিহাদ বা গবেষণা। ২। আবার ইবনে তাইমিয়া রহ: এর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম রহ: আয়াতটিকে সিফাতের আয়াত মনে করতেন। তার মতে, আল্লাহর চেহারা দ্বারা বাস্তবেই আল্লাহর চেহারা উদ্দেশ্য। চেহারা আল্লাহর একটি সিফাত বা গুণ। এটি হল ইবনুল কাইয়্যিম রহ: এর ইজতিহাদ। স্পষ্টত: উস্তাদ ও ছাত্রের ইজতিহাদে বিস্তর পার্থক্য লক্ষণীয়। একই আয়াত একজনের কাছে সিফাত, অন্যজনের কাছে সিফাত নয়। এটা মূলত: ইজতিহাদের পার্থক্যের কারণে হয়েছে।
উদাহরণ-২: হাদীসে এসেছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণির মানুষকে তার ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। হাদীসের শব্দে ছায়া আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আল্লাহর ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষকে জায়গা দিবেন। ১। হাদীছে যেহেতু আল্লাহর ছায়া বলা হয়েছে, এজন্য শায়খ ইবনে বাজ রহ: এর মতে ছায়া আল্লাহর একটি সিফাত। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর ছায়া আছে। এটা ছিল তার ইজতিহাদ। ২। অপর দিকে সৌদি আরবের মান্যবর সালাফী আলেম শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ: এর কঠোর বিরোধীতা করেছেন। তার মতে, ছায়া আল্লাহর সিফাত নয়। কিয়ামতের দিন মূলত: আরশের ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষকে জায়গা দেয়া হবে।
উদাহরণ-৩: সালাফীদের মৌলিক বিশ্বাস হল, আল্লাহর দু'টি হাত রয়েছে। এই দুই হাতের একটি কি ডান হাত এবং অপরটি কি বাম হাত? এ বিষয়ে শায়খদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ১। শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ: ও শায়খ ইবনে বাজ রহ: এর মতে আল্লাহর বাম হাত আছে। তারা মুসলিম শরীফের একটি হাদীস থেকে এর প্রমাণ দিয়ে থাকেন। যেখানে বাম হাত আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ২। শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহ: এর মতে আল্লাহর কোন বাম হাত নেই। এ বিষয়ে মুসলিম শরীফের হাদীসটি শায (বিচ্ছিন্ন বর্ণনা)। তিনি এ বর্ণনা গ্রহণ করেননি। এ বিষয়ে আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
মোটকথা, সিফাত প্রমাণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ইজতিহাদী বা গবেষণা নির্ভর। এটা শরীয়তের অকাট্য বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত বিষয় না। কারও কাছে কোন একটা আয়াত বা হাদীস সিফাত এর প্রমাণ হলেও অন্যের কাছে সেটি সিফাতের দলিল নয়। যার কাছে বিষয়টি সিফাত, তিনি দাবী করছেন যে এটি আল্লাহর সিফাত। কিন্তু যার গবেষণায় এটি সিফাত নয়, তিনি বলছেন, আয়াত বা হাদীস সিফাত প্রমাণ করছে না। বিষয়টি গবেষণা নির্ভর হওয়ার কারণে একজনের গবেষণার কারণে অন্যকে সিফাত অস্বীকারকারী বলার কোন সুযোগ নেই। কারণ অস্বীকারের প্রশ্ন পরে আসবে। তার কাছে তো বিষয়টি সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়। এক্ষেত্রে একজনের গবেষণাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া যেমন অন্যায়, একইভাবে যার কাছে বিষয়টি সিফাত হিসেবে প্রমাণিত নয়, তাকে সিফাত অস্বীকারকারী বলাটাও অন্যায়। আপনার প্রশ্নের উত্তর হল, যিনি তা'বীল করছেন, তিনি উক্ত আয়াত বা হাদীসকে সিফাতের আয়াত বা হাদীস মনে করছেন না। তার ইজতিহাদে এই আয়াত বা হাদীস আল্লাহর কোন গুণ প্রমাণের জন্য আসেনি। আপনার ইজতিহাদে হয়ত বিষয়টা কোন গুণ প্রমাণ করছে, কিন্তু যিনি তা'বীল করছেন তার কাছে এটি গুণ প্রমাণ করছে না। যেমন, শায়খ ইবনে বাজ রহঃ ছায়াকে আল্লাহর গুণ মনে করলেও ইবনে উসাইমিন রহঃ ছায়াকে আল্লাহর গুণ মনে করেননি। এক্ষেত্রে আপনি কাকে সিফাত অস্বীকারকারী বলবেন? আর ইবনে বাজ রহঃ এর এই ইজতিহাদ কি সবার মেনে নেয়া জরুরি? মূলকথা হল, সিফাত প্রমাণের বিষয়টি গবেষণার উপর নির্ভর করছে। যার গবেষণায় বিষয়টি সিফাত নয় এবং তিনি এর তা'বীল করেছেন, তাকে আপনার গবেষণার কারণে সিফাত অস্বীকারকারী বলার সুযোগ নেই। এর দ্বারা আপনি আপনার গবেষণা সবাইকে মানতে বাধ্য করছেন। বাস্তবে অন্য সবাই আপনার গবেষণা মানতে বাধ্য নয়। আহলে সুন্নতের অসংখ্য আলেমের ইজতিহাদ হল, হাত, পা, চোখ, পায়ের পিন্ডলী, দেহের পাশ এগুলো সিফাত নয়। যেসব আয়াত বা হাদীসে এগুলো আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, এগুলো আল্লাহর সিফাত প্রমাণের জন্য আসেনি। তাদের কাছে বিষয়গুলো সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়। এখন আপনার গবেষণায় বা অন্য কোন আলিমের গবেষণায় এগুলো সিফাত হতে পারে। আপনার গবেষণার কারণে যাদের কাছে এগুলো সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়, তারা সিফাত অস্বীকারকারী হবে কেন? আপনি হয়ত দু'পক্ষের গবেষণার মধ্যে যে কোন একটা প্রাধান্য দিতে পারেন। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আপনার ইজতিহাদের কারণে অন্য পক্ষ সিফাত অস্বীকারকারী হবে না।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে তা'বীল মায়াত তানজীহ প্রাধান্য পাবে। ইসবাত ও তাফয়ীজের উপর একে প্রাধান্য দেয়ার কারণ কী? অথচ সালাফ ইসবাত মায়াত তানজীহকে প্রাধান্য দিয়েছেন?
উত্তর: যেহেতু বিষয়টা ইজতেহাদী, এজন্য এবিষয়ে যেকোন একটা মতকে প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ আছে। আর তিনটি বিষয়ই যেহেতু সালাফ থেকে প্রমাণিত, এজন্য কোন একটাকে প্রাধান্য দিলেও সেটা সালাফেরই মত হিসেবে গণ্য হবে। কিছু কিছু সালাফ তাফয়ীজকে প্রাধান্য দিয়েছেন, এর অর্থ এই নয় যে, যেসব সালাফ তা'বীল করেছেন, তাদের মাজহাবটি ভুল। সালাফের কেউ কেউ হয়ত তা'বীলের বিরোধীতা করেছেন, কিন্তু অন্যান্য সালাফ থেকে তা'বীল প্রমাণিত। তাদের বিরোধীতার কারণে একথা বলার সুযোগ নেই যে, তা'বীল সালাফের মাজহাব নয়। মোটকথা, তানজীহের পর ইসবাত, তাফয়ীজ, তা'বীল থেকে যে মতটিই গ্রহণ করা হবে, সেটা সালাফেরই মত হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু সবগুলিই সালাফ থেকে প্রমাণিত। আবার কোন একটি মতকে প্রাধান্য দিলে মূলত: সালাফের একটা মতকে আরেকটার উপর প্রাধান্য দেয়া হল। কিছু ক্ষেত্রে তা'বীলকে তাফয়ীজের উপর প্রাধান্য দেয়ার কিছু মৌলিক কারণ উল্লেখ করছি।
১। অনেক আয়াত বা হাদীসে রুপক অর্থটাই মূল। রুপক অর্থ না নিলে আয়াত বা হাদীসের বক্তব্য বিকৃত হয়, সেক্ষেত্রে অবশ্য তা'বীল করতে হবে। যেমন,
ক) সূরা কাসাসের ৮৮ নং আয়াত। আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এখানে সালাফ থেকে দু'টি তা'বীল বর্ণিত আছে। আল্লাহর সত্ত্বা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হবে। এখানে চেহারা দ্বারা সত্ত্বা উদ্দেশ্য। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কৃত নেক আমল। দ্বিতীয় তা'বীলটি ইমামা বোখারী রহ: সহীহ বোখারীতে উল্লেখ করেছেন। এ আয়াতে তা'বীল না করে বাহ্যিক অর্থ নিলে আয়াতের অর্থ বিকৃত হয়।
খ) পবিত্র কুরআনের সুরা দাহরে (আয়াত-৯) আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ এই আয়াতের আক্ষরিক অর্থ হল, আমরা তোমাদেরকে আল্লাহর চেহারার জন্য আহার্য দান করি। মূল অর্থ হল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। এ আয়াতে 'আল্লাহর চেহারা' দ্বারা যদি তা'বীল না করে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাহলে আয়াতের অর্থ ও উদ্দেশ্য বিকৃত করা হয়। এধরণের তাহরীফে মা'নাবী (পরোক্ষ বিকৃতি) আবশ্যক হলে আয়াতের তা'বীল করা জরুরি।
গ) কেউ কেউ সূরা হুদের ৩৭ নং আয়াত দ্বারা আল্লাহর চোখ প্রমাণের চেষ্টা করেছে। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে আল্লাহর বহু চোখ সাব্যস্ত করা হয়। আবার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের কারণে আয়াতের বক্তব্য বিকৃত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا আয়াতের বাহ্যিক অর্থ হল, হে নূহ, আমার চোখসমূহ দ্বারা নৌকা তৈরি করো। আয়াত দ্বারা বহু চোখ সাব্যস্ত হয়। আবার সেই চোখসমূহ দ্বারা নৌকা তৈরির আদেশটিও অসম্ভব। আয়াতের মূল উদ্দেশ্য ও অর্থ এটি হতে পারে না। এজন্য এ আয়াতে তা'বীল না করলে তাহরীফ আবশ্যক হয়। তাফসীরে ইবনে কাসীরে এর অর্থ করা হয়েছে, আমার সম্মুখে বা তত্ত্বাবধানে নৌকা তৈরি করো।
২। যেসব ক্ষেত্রে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী-শিরকী আবশ্যক হয়, সেসব ক্ষেত্রে তা'বীল করা জরুরি। যেমন,
ক। হাদীসে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি বান্দার হাত হয়ে যায়। আমি বান্দার পা হয়ে যায়। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী আবশ্যক হয়।
খ। কুরআনে এসেছে, আল্লাহ হলেন আসমান-জমিনের নূর বা আলো। এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী আবশ্যক হয়।
গ। হাদীসে এসেছে, তোমরা সময়কে গালি দিও না। কারণ আল্লাহ হলেন সময়। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী হবে।
ঘ। কুরআনে এসেছে, কাফেররা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আল্লাহ তায়ালাও তাদেরকে ভুলে গেছেন। এ আয়াত থেকে বাহ্যিক অর্থ নিয়ে একথা বলা কুফুরী হবে যে, আল্লাহ তায়ালা ভুলে যান।
ঙ। হাদীসে এসেছে, আমি ইয়ামান থেকে আল্লাহর শ্বাস-প্রশ্বাস পাচ্ছি। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ নিলেও কুফুরী হবে। এধরণের আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে তা'বীল না করলে কুফুরী-শিরকী আবশ্যক হয়। এসব ক্ষেত্রে তা'বীল করা জরুরি।
৩। কোন আয়াত বা হাদীসের বাহ্যিক অর্থ যদি আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য না হয়, তাহলে এই বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগের বিষয়ে সমস্ত সালাফ একমত। যেমন, আল্লাহর ক্ষেত্রে নুজুল দ্বারা কখনও উপর থেকে নীচে নামা উদ্দেশ্য হবে না। শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করাও তা'বীল। কারণ তা'বীল বলা হয়, صرف اللفظ عن ظاهره অর্থ: শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করা। সিফাতের ক্ষেত্রে এধরণের তা'বীলের কথা সমস্ত সালাফই বলেছেন। পরিভাষায় একে তা'বীলে ইজমালী বা সামগ্রিক তা'বীল বলে। সুতরাং কোন শব্দের বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য না হলে ঐ শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগের বিষয়ে সমস্ত সালাফ একমত ছিলেন। তা'বীলে ইজমালী না করলে দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদ আবশ্যক হবে। উভয়টি মারাত্মক কুফুরী। সালাফের মধ্যে যারা সিফাত সাব্যস্ত করেছেন অথবা যারা তাফয়ীজ করেছেন, তাদের সকলেই তা'বীলে ইজমালী করেছেন। তা'বীলে ইজমালী একটা ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়।
৪। অনেক ক্ষেত্রে তা'বীলে ইজমালীর পাশাপাশি তা'বীলে তাফসীলি করাও উত্তম। তা'বীলে তাফসীলি হল, শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করার পর সম্ভাব্য অন্য কোন রুপক অর্থ গ্রহণ করা। যেমন, আরবী ইয়াদ এর বাহ্যিক অর্থ হাত। কিন্তু আরবীসহ বিভিন্ন ভাষায় হাতের অনেক ব্যবহার আছে। কাউকে কৃপণ বোঝানোর জন্য আমরা বলি, তার হাত খাট। কোন নেতার ক্ষমতা বোঝানোর জন্য বলি, তার হাত অনেক লম্বা। আরবীতেও এধরণের অসংখ্য রুপকের ব্যবহার আছে। যেসব জায়গায় আনুষঙ্গিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বক্তা রুপক অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে তা'বীলে তাফসীলি করতে হবে। যেমন, হাদীসে এসেছে, إن قلوب بني آدم كلها بين إصبعين من أصابع الرحمن অর্থ: বনী আদমের অন্তরসমুহ আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মধ্যে। এই হাদীস দ্বারা এটা কখনও উদ্দেশ্য নয় যে, প্রত্যেক মানুষের অন্তরে আল্লাহর দুই আঙ্গুল রয়েছে। বক্তব্য থেকে উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। মানুষের অন্তরের উপর আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। এখানে আল্লাহর আঙ্গুল সাব্যস্ত করা, প্রত্যেকের মানুষের অন্তরে আল্লাহর আঙ্গুল আছে, এটা বলা উদ্দেশ্য নয়। বক্তার বক্তব্য থেকে তা' বীলে তাফসীলি স্পষ্ট হওয়ার কারণে এখানে তা'বীল করাটা উত্তম।
৫। কিছু শব্দ বাস্তবে কোন সিফাত বা গুণ বোঝায় না। কিন্তু রুপক অর্থে কখনও গুণের অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, হাত, পা, চোখ। এগুলো পৃথিবীর কোন ভাষাতেই আক্ষরিক অর্থে গুণ বোঝায় না। এর আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করে একে গুণের অর্থে নেয়া সম্ভব। তবে এটি অপ্রচলিত তা'বীল হিসেবে গণ্য হবে। হাত শব্দ ব্যবহার করে যদি আমি ক্ষমতা, নেয়ামত ইত্যাদি রুপক অর্থ নেই, তাহলে সেটি প্রচলিত রুপক হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু আমি যদি হাতের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করে বলি, হাত একটি গুণ, তাহলে এটা আরবী ভাষার প্রচলিত রুপকের মধ্যে থাকবে না। ইমাম আ'মাদী রহ: এর মতে হাত, পা এগুলোকে সিফাত বা গুণ বলা হল, অপ্রচলিত ও দূরবর্তী রুপক (তাজাউঝে বায়ীদ)। সালাফের মধ্যে যারা হাত, পা, চোখকে সিফাত বলেছেন, তারা মূলত: দূরবর্তী তা'বীল করেছেন। বাহ্যিকভাবে যদিও মনে হয়, তারা তা'বীল করছেন না বা তা'বীলের বিরোধীতা করছেন, কিন্তু বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল। ১। তারা যখন শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করছেন, তখন এটি তা' বীলে ইজমালী। ২। এরপর যখন ঐ শব্দকে সিফাত বা গুণ বলছেন, তখন এটি তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল। কারণ শব্দটি আসলে কোন গুণ বোঝায় না। ইয়াদ নামে আরবীতে কোন গুণ নেই। কাদাম নামে কোন গুণ নেই। ইয়াদ বা কাদাম আরবী ভাষায় কোন গুণ না বোঝানো সত্ত্বেও একে গুণের অর্থে নেয়াটা ব্যাপক তা'বীল। যা প্রচলিত তা'বীল থেকেও দূরবর্তী। সালাফের মধ্যে যারা হাত, পা, চোখকে সিফাত বলতেন, তারা মূলত: তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল করেছেন। আর বাস্তবতা হল, দূরবর্তী বা অপ্রচলিত তা'বীলের চেয়ে প্রচলিত তা'বীল উত্তম। এজন্য ইয়াদকে সিফাত বলার চেয়ে ইয়াদকে ক্ষমতা বা অন্য কোন অর্থে তা' বীল করা উত্তম। ইমাম আ'মাদী রহ: এবিষয়ে আরও বিস্তারিত লিখেছেন তার 'আবকারুল আফকার' নামক কিতাবে।
৬। সালাফসহ আহলে সুন্নতের বহু আলিমের মতে এগুলো মুতাশাবিহাত এর অন্তর্ভূক্ত। এগুলো যদি মুতাশাবিহাত হয়, তাহলে এর দ্বারা সিফাত প্রমাণ করা কতটুকু সঠিক? মুতাশাবিহ বিষয় কি কোন কিছু প্রমাণে দলিল হওয়ার যোগ্য? ইমাম শাতবী রহ: এর মতে মুতাশাবিহকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে কোন কিছু প্রমাণ করা বিদয়াত। কারও কাছে যদি এ সংক্রান্ত আয়াত বা হাদীস মুতাশাবিহ হয়, তাহলে তার জন্য এগুলো দ্বারা সিফাত প্রমাণ করার সুযোগ থাকে না। এজন্য যেসব আয়াত বা হাদীসে হাত, পা, চোখ ইত্যাদির কথা আছে, এগুলোকে মুতাশাবিহ গণ্য করলে এর দ্বারা কোন সিফাত প্রমাণ করার সুযোগ নেই। সিফাত প্রমাণের জন্য মুহকাম আয়াত বা হাদীস প্রয়োজন। আর এগুলো যেহেতু মুহকাম নয়, এজন্য এগুলো দ্বারা সিফাত প্রমাণ করাটা দলিলের বিবেচনায় দুর্বল।
৭। হাত, পা, চোখ এগুলো মূলত: সিফাত হিসেবে আসেনি। ইজাফত হিসেবে এসেছে। যেমন, হাসানের বই। এখানে বই হাসানের দিকে সম্পৃক্ত হয়েছে ইজাফত হিসেবে। গুণ হিসেবে নয়। এই ইজাফতকে সিফাত বা গুণ বলার জন্য পৃথক দলিল প্রয়োজন। আর এসব ইজাফতকে সিফাত বলার ভাষাগত, যৌক্তিক বা শরয়ী কোন দলিল নেই। শরয়ী বা আকলী দলিল ছাড়া ইজাফাতকে সিফাত বলাটা যৌক্তিক হতে পারে না।
৮। আল্লাহর হাত, আল্লাহর চোখ, আল্লাহর রুহ সবগুলিই ইজাফাত। শব্দের ব্যবহারে সামান্যতম কোন পার্থক্য নেই। যারা হাত বা চোখকে সিফাত বলেন, তারা রুহকে আল্লাহর সিফাত বলেন না। যদিও বাংলাদেশী কিছু আহলে হাদীসদের আকিদার কিতাবে রুহ বা আত্মাকেও আল্লাহর সিফাত বলা হয়েছে। একই ধরণের ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও পাত, পা, চোখকে সিফাত কেন বলা হবে এবং রুহ বা আত্মাকে আল্লাহর সিফাত কেন বলা হবে না? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তিনি আদম আ: এর মাঝে তার রুহ ফুৎকারের মাধ্যমে প্রবেশ করিয়েছেন। এই আয়াত থেকে রুহকে আল্লাহর সিফাত বলা হবে না কেন? আর আল্লাহর সেই সিফাত আদম আ: এর মাঝে প্রবেশ করানো হয়েছে, এই বিশ্বাসকে কুফুরী বলা হবে কেন?
৯। সালাফের অনেকে তা'বীলে তাফসিলির বিরোধীতা করেছেন, তা'বীল সম্ভাবনাময় হওয়ার কারণে। সুনিশ্চিত না হওয়ার কারণে তারা তা' বীলের বিরোধীতা করেছেন। ইজাফাতের মাধ্যমে যদি সিফাত সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে এক্ষেত্রেও বিষয়টি সম্ভাবনাময় থাকে। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে না যে, এটি আল্লাহর সিফাত। ইয়াদ আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে একথা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না যে, আল্লাহর হাত রয়েছে। আরবী ভাষায় এধরণের বহু ব্যবহার রয়েছে। যেমন, কুরআনে 'দিনের চেহারা', 'তার পা', 'নম্রতার ডানা', 'কুরআনের দুই হাত' ইত্যাদি বহু ব্যবহার রয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে না যে, দিনের চেহারা রয়েছে। সত্যের পা রয়েছে। একইভাবে আল্লাহর দিকে হাত সম্পৃক্ত হলেই এটা প্রমাণ করে না যে, আল্লাহর হাত রয়েছে। কুরআনের দিকে দুই হাত সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কেউ তো এটা বলে না যে, কুরআনের দুই হাত আছে? আল্লাহর ক্ষেত্রে হাতের ইজাফাত হলেই কেন বলা হবে যে, আল্লাহর হাত রয়েছে? সম্ভাবনার কারণে তা'বীল যদি বর্জনীয় হয়, তাহলে একই কারণে এসব আয়াত বা হাদীস থেকে সিফাত প্রমাণও বর্জনীয় হওয়া উচিত।
১০। যে কোন সিফাত আল্লাহর বিশেষ পরিচয় ও মহত্ব তুলে ধরে। আল্লাহ সর্বময় জ্ঞানী। এর দ্বারা আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব বোঝা যায়। কিন্তু হাত, পা, চোখ এগুলো কোন মহত্ব বা বড়ত্ব প্রকাশ করে না। এগুলোকে অনেক সময় আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করতেই মানুষ দ্বিধা করে। এছাড়া এজাতীয় যত আয়াত ও হাদীস আছে, সবগুলি মিলালেও পরিপূর্ণ কোন পরিচয় স্পষ্ট হয় না। বহু হাত, এক পা, বহু চোখ, দেহের এক পাশ, এক পায়ের পিন্ডলী এগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করলেও এটি একটি অসম্পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরে। আল্লাহর সিফাতের মূলই ছিল আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা, এগুলোকে সিফাত বলার কারণে এর দ্বারা অস্পষ্টতা বেড়েছে। মূল বিষয় হল, এগুলো আল্লাহর কোন বিশেষ পরিচয় বা মহত্ব তুলে ধরে না। এগুলোকে সিফাত সাব্যস্ত করার মূল আবেদনটি এখানে অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নুকস বা ত্রুটি হিসেবে গণ্য করা হয়। যেমন, হাত। মানুষের হাত তার একটি দুর্বলতাকে দূর করার জন্য এসেছে। কোন কিছু ধরার জন্য সে হাতের মুখাপেক্ষী। হাত মানুষের দুর্বলতার প্রতীক। এই অভিযোগটি তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর জন্য হাত সাব্যস্ত করে।
পুরো আলোচনার উপসংহার হল, যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ বোঝায় না, বরং অঙ্গ বা দেহের অংশ বোঝায় এগুলোর ক্ষেত্রে তা'বীল করা উত্তম। তবে তা'বীলের শর্ত ঠিক রেখে তা'বীল করতে হবে। আরবী ভাষায় এর সমর্থন থাকতে হবে। আনুসঙ্গিক আলোচনার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। এ বিষয়ে ইমাম ইজ ইবনে আব্দুস সালাম রহ: বলেন, طريقة التاويل بشرطه اقربهما الي الحق অর্থ: তা'বীল ও তাফয়ীজের মধ্যে শর্ত মেনে তা'বীলের পদ্ধতি সত্যের অধিক নিকটবর্তী। -[আল-বাহরুল মুহীত, খ-৩, পৃ-৪৪০]
প্রশ্ন: সিফাতে খাবারিয়্যার ক্ষেত্রে আশআরী-মাতুরিদি আকিদা আসলে কী?
উত্তর: সালাফের আকিদাই মুলত: আশআরী-মাতুরিদি আকিদা। সালাফ থেকে প্রমাণিত প্রত্যেকটি মতই আশআরী-মাতুরিদিগণ গ্রহণ করেছেন। সালাফের সাথে আশআরী-মাতুরিদি আকিদার মৌলিক কোন বিরোধ নেই। সালাফের মৌলিক মাজহাব ছিল তানজীহ। আল্লাহ তায়ালাকে যে কোন ধরণের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত বিশ্বাস করা। তানজীহের পর ইসবাত, তাফয়ীজ, তা'বীল সবগুলোকেই তারা সমর্থন করেন।
প্রশ্ন: বর্তমান সালাফীরা আশআরী-মাতুরিদি আকিদার বিরোধীতা করে কেন?
উত্তর: এর কয়েকটি কারণ আছে। যেমন: ১। সালাফীরা তাদের আকিদার মূল বানিয়েছে শব্দের আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাসের উপর। সালাফ, আশআরী-মাতুরিদি সকলেই শব্দের আক্ষরিক অর্থ বর্জনের উপর একমত। ইয়াদ বলে তারা হাতের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। তারা স্পষ্ট করেছেন, ইয়াদ কখনও দেহের কোন অঙ্গ নয়। সালাফীদের সাথে এই মৌলিক জায়গায় বিরোধের কারণে তারা আশআরী-মাতুরিদি আকিদার বিরোধীতা করে। ২। সালাফের অনুসরণে আশআরী-মাতুরিদিগণ বলেন, আল্লাহর জাত ও সিফাতের কোন কাইফ নেই। কিন্তু সালাফীরা বলে কাইফ আছে, কিন্তু কাইফ অজ্ঞাত। ৩। বহু আয়াত ও হাদীসে সালাফ থেকেই অসংখ্য তা'বীল বর্ণিত আছে। এসব তা'বীল আরবী ভাষাও সমর্থন করে। আশআরী-মাতুরিদিগণ এসব তা'বীলকে সমর্থন করেন। পক্ষান্তরে সালাফীরা এসব তা'বীল সালাফ থেকে বর্ণিত হলেও তারা এগুলো গ্রহণ বা সমর্থন করে না। সালাফীদের স্বীকৃত আকিদার সমর্থনে কোন তা'বীল হলে, তারা শুধু এগুলো গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের আকিদার বিরোধী হলে তা'বীলের বিপক্ষে যায়। আশআরী-মাতুরিদিগন গ্রহণযোগ্য তা'বীলগুলো গ্রহণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা সালাফীদের মত দ্বিমুখী আচরণ বা স্ববিরোধীতা করেন না।
প্রশ্ন: সিফাতে খাবারিয়্যার ক্ষেত্রে সালাফের মাজহাব কী ছিল?
উত্তর: সালাফদের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব ছিল তানজীহ। সকলেই আল্লাহ তায়ালাকে সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত বিশ্বাস করতেন। এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করতেন না। সুতরাং সালাফের সমস্ত বক্তব্য সামনে রাখলে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সকলের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব ছিল তানজীহ। যেমন নুজুল বা অবতরণ। আল্লাহর নুজুল যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়, এব্যাপারে সকলেই একমত। একইভাবে আল্লাহর নুজুল উপর থেকে নীচে নামান নয়। সালাফদের কেউ কেউ ইয়াদকে (হাত) সিফাত বলেছেন। কিন্তু তাদের সকলেই এ বিষয়ে একমত ছিলেন, ইয়াদ কোন অঙ্গ বা দেহের কোন অংশ নয়। মোটকথা, তানজীহ (সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে আল্লাহ তায়ালাকে মুক্ত বিশ্বাস করা) হল সালাফের ঐকমত্যপূর্ণ মাজহাব।
প্রশ্ন: তানজীহের পর সালাফ কী করতেন?
উত্তর: এ বিষয়ে সালাফের মধ্যেই মতবিরোধ আছে। মোটামুটি তিনটি মত পাওয়া যায়।
১। ইসবাত মায়াত তানজীহ।
২। তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ।
৩। তা'বীল মায়াত তানজীহ।
ইসবাত মায়াত তানজীহ:
ইসবাত মায়াত তানজীহ হল, প্রথমে তারা শব্দের আক্ষরিক অর্থ থেকে আল্লাহকে মুক্ত ঘোষণা করতেন। এরপর তারা ঐ শব্দকে আল্লাহর সিফাত বলতেন। তবে শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর ঐ শব্দের কী অর্থ হবে, তা আল্লাহ দিকে ন্যস্ত করতেন। এক্ষেত্রে মূলত: তারা তা'বীল ও তাফয়ীজ করতেন। অর্থাৎ শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়া হল তা'বীল। ঐ শব্দকে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করা হল ইসবাত। ঐ শব্দের আসল অর্থ ও উদ্দেশ্য কী হবে সেটা আল্লার দিকে ন্যস্ত করা হল তাফয়ীজ। উদাহরণ: ইয়াদ। অর্থ হল, হাত। আরবী 'ইয়াদ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, এটি দেহের অঙ্গ বা অংশ। সালাফদের সকলেই এই অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। ইয়াদ ব্যবহার কতে অঙ্গ বা অংশ উদ্দেশ্য না নেয়া হল এক ধরনের তা'বীল। এরপর কেউ কেউ ইয়াদকে সিফাত বলেছেন। এটা হল ইসবাত (সিফাত সাব্যস্তকরণ)। ইয়াদের বাহ্যিক অর্থ (অঙ্গ) পরিত্যাগ করার পর ইয়াদ দ্বারা আসলে কী উদ্দেশ্য সেটা আল্লাহ জানেন। এভাবে ইয়াদের আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াকে বলে তাফয়ীজ। একই সাথে তা'বীল, ইসবাত ও তাফয়ীজ পাওয়া গেল। এটা কিছু কিছু সালাফের মত ছিল।
তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ:
তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ হল, শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর কী অর্থ হবে সেটা আল্লাহর উপর ন্যস্ত করা। এক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর অন্য কোন অর্থ তারা নির্ধারণ করতেন না। আবার এটাও বলতেন না যে, এটা আল্লাহর সিফাত। যেমন, আরবীতে ইয়াদ এর প্রায় পঁচিশটা অর্থ রয়েছে। ফাতহুল বারীতে ইবনে হাজার আসকালানী রহ: ইয়াদ এর পঁচিশটা অর্থ লিখেছেন। ইয়াদের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর এই পঁচিশটার কোনটা উদ্দেশ্য অথবা অন্য কোন অর্থ উদ্দেশ্য কি না, সেটা তারা নির্ধারণ না করে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতেন। এক্ষেত্রে তা'বীল ও তাফয়ীজ পাওয়া যায়। শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগের কারণে এটি তা'বীল। আবার সম্পূর্ণ বিষয়কে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করার কারণে এটি তাফয়ীজ।
তা'বীল মায়াত তানজীহ:
তা'বীল মায়াত তানজীহ হল, শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করার পর সম্ভাবনাময় কোন একটা অর্থ গ্রহণ করা। শুরুতেই তারা এর আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। এটা হল তা'বীলে ইজমালী। এরপর তারা উক্ত শব্দের অন্যান্য ব্যবহার দেখতেন। এক্ষেত্রে আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা অর্থ গ্রহণ করতেন। যেমন, ইয়াদ বা হাত। প্রথমে তারা আক্ষরিক অর্থ বাদ দিতেন। এরপর আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা অর্থ নিতেন। যেমন, কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের সম্পর্কে বলেছেন; তারা বলে, আল্লার হাত বন্ধ (কৃপণ অর্থে)। এর প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহর উভয় হাত লম্বা। এখানে ইবনে কাসীর সহ অনেক মুফাসসির 'আল্লারহ উভয় হাত প্রশস্ত' কে রুপক অর্থে নিয়েছেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তায়ালা অধিক দানশীল। ব্যবহার অনুযায়ী কখন ইয়াদ অর্থ শক্তি। কখনও নিয়ামত। কখনও ক্ষমতা। এধরণের প্রায় পচিশটা অর্থ ও এর ব্যবহার রয়েছে আরবী ভাষায়। স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী অর্থ গ্রহণ করা। এটাকে তা'বীলে তাফসিলি বলে।
প্রশ্ন: উপরের তিনটি মতই কি সালাফ থেকে প্রমাণিত?
উত্তর: অবশ্যই। তবে তাদের কেউ কেউ একেকটা প্রাধান্য দিয়েছেন। সকলেই একটা বিষয়ের একমত হননি। তবে তিনটি বিষয়ই সালাফ থেকে প্রমাণিত।
প্রশ্ন: প্রসিদ্ধ মত কোনটি?
উত্তর: তিনটি বিষয় সালাফদের থেকে প্রমাণিত হলেও প্রসিদ্ধ মত হল তাফয়ীজ মায়াত তানজীহ।
প্রশ্ন: কেউ কেউ বলে সালাফ তা'বীল করতেন না?
উত্তর: এটা তাদের নামে মিথ্যাচার। সালাফ থেকে দু'ধরণের তা'বীলই প্রমাণিত। ১। তা'বীলে ইজমালী। ২। তা'বীলে তাফসালী।
শব্দের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করা হল তা'বীলে ইজমালী (সামগ্রিক তা'বীল)। এটা সমস্ত সালাফ করেছেন। শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর সম্ভাবনাময় কোন একটা অর্থ গ্রহণ করা হল তা'বীলে তাফসালী। এটাও অসংখ্য সালাফ থেকে প্রমাণিত।
প্রশ্ন: বর্তমান সালাফীদের সাথে সালাফের বিরোধ কোথায়?
উত্তর: ১। সালাফ তানজীহ করতেন। কিন্তু বর্তমান সালাফীরা তানজীহ করে না। সালাফ আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন, কিন্তু সালাফীদের মূল হল, তারা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করে। ২। সকল সালাফ কাইফকে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সালাফীরা কাইফ সাব্যস্ত করে। তবে তারা বলে কাইফ অজ্ঞাত। কিন্তু সালাফ বলতেন, কোন কাইফ নেই। তারা বলে, কাইফ আছে কিন্তু অজ্ঞাত। ৩। অধিকাংশ সালাফ তাফয়ীজ মা'য়াত তানজীহ করতেন। কিন্তু সালাফীদের কাছে তাফয়ীজ হল নিকৃষ্ট বিদয়াত। ৪। সালাফ শব্দের আক্ষরি অর্থ পরিত্যাগ করার কারণে দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদ থেকে মুক্ত ছিলেন, কিন্তু বর্তমান সালাফীরা আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করার কারণে বিশ্বাসের দিক থেকে অধিকাংশ সালাফী দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদী।
প্রশ্ন: সালাফীদেরকে দেহবাদী বা সাদৃশ্যবাদী হয় কেন?
উত্তর: কারণ তারা আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করে। আর আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর জন্য হাত সাব্যস্ত করলে সেটা দেহবাদই হয়।
প্রশ্ন: তারা যে বলে, আল্লাহর হাত আল্লাহর হাতের মত?
উত্তর: হাতের আক্ষরি অর্থ পরিত্যাগ না করে একথা বলে কোন লাভ নেই। হাতের আক্ষরিক অর্থ হল, এটা দেহের একটা অংশ বা অঙ্গ। যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ আছে। আপনি যদি হাতের মূল অর্থ বাদ না দেন, আর বলেন, আল্লাহর হাত আল্লাহর মতই, তাহলেও সাদৃশ্যবাদ থাকে। আপনি আসলে মনে করছেন, আমাদের হাত ছোট-খাট। কিন্তু আল্লাহ অসীম হওয়ার কারণে তার হাত প্রকান্ড। এর দ্বারা আপনি শুধু হাতের ধরণের পার্থক্য করেছেন। মূল হাত আপনি আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছেন। আমরা বলি, হাত দ্বারা কখনও দেহের অংশ বা অঙ্গ উদ্দেশ্য নয়। মোটকথা হল, বাহ্যিক অর্থ সম্পূর্ণভাবে বাদ না দিতে পারলে আপনি সাদৃশ্যবাদ থেকে মুক্ত নন। আপনি যতই বলেন, আপনি আল্লাহর হাত তার শান অনুযায়ী। কারণ আল্লাহর শানই হল, তিনি একক। অঙ্গ বা অংশ থেকে মুক্ত।
প্রশ্ন: উপরের তিনটি মতের মধ্যে কোনটি উত্তম।
উত্তর: তানজীহের বিষয়ে কোন মতবিরোধ নেই। এ বিষয়ে সকলেই একমত। সুতরাং তানজীহ অবশ্যই থাকতে হবে। এরপর আরবী ভাষার ব্যবহার অনুযায়ী যদি তা'বীল খুব স্পষ্ট হয়, তাহলে তা'বীল করাটাই উত্তম। আর যদি সম্ভাব্য অর্থ আরবী ভাষা সমর্থন না করে তাহলে সেক্ষেত্রে তাফয়ীজ করা হবে। তবে বিষয়টি যেহেতু ইজতিহাদী (গবেষণা নির্ভর), এজন্য তানজীহ করার পর যে কোন একটা মত গ্রহণের সুযোগ আছে। তবে যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ নয় বরং দেহের অংশ বা অঙ্গ বোঝায়, সেসব ক্ষেত্রে তা'বীল করাই উত্তম।
প্রশ্ন: সিফাতের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রহ: এর মাজহাব কী ছিল?
উত্তর: ইমাম আবু হানিফা রহ: কিছু ক্ষেত্রে ইসবাত মায়াত তানজীহ করেছেন। যেমন, ইয়াদকে সিফাত বলে তার আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে বলেছেন 'ইয়াদ' কোন অঙ্গ নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে তা'বীল মায়াত তানজীহ করেছেন। যেমন, আল্লাহর নৈকট্য ও দূরত্বের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন, আল্লাহর নৈকট্য স্থানগত নয়। আবার পাপী বান্দা আল্লাহর থেকে দূরে। এই দূরত্ব স্থানগত নয়। এখানে স্পষ্ট তা'বীল মায়াত তানজীহ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ: এর থেকে যদি ফিকহুল আকবার ও আবসাত প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি তার মাজহাব হবে। নতুবা ইমাম আবু হানিফা রহ: এর আকিদা হিসেবে সেটাই মূল ধরা হবে, যা ইমাম ত্বহাবী রহ: আকিদাতুত ত্বাহীবিয়া তে লিখেছেন। কারণ তিনি শুরুতেই বলেছেন, এই আকিদাগুলো ইমাম আবু হানিফা রহ, ইমাম আবু ইউসুফ রহ: ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ: এর আকিদা। যেহেতু আল-ফিকহুল আকবার ও আবসাতের প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ রয়েছে, এজন্য এগুলোর উপর ভিত্তি করে ইমাম আবু হানিফা রহ: এর সুনিশ্চিত মাজহাব নির্ধারণ করাটা কঠিন। ইমাম ত্বহাবী রহ: যেহেতু স্পষ্ট করেছেন যে, আকিদাতুত ত্বহাবীর আকিদাগুলি ইমাম আবু হানিফা রহ: ও তার ছাত্রদ্বয়ের, এজন্য আকিদাতুত ত্বাহাবীকে মূল ধরাটাই অগ্রগণ্য।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ বোঝায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে তা'বীল করা উত্তম। যেমন, হাত, পা, চোখ, পায়ের পিন্ডলী। অথচ আমরা জানি, তা'বীল করলে সিফাত অস্বীকার করা হয়। তা'বীল করে কি আপনি সিফাত অস্বীকার করছেন না?
উত্তর: এসব শব্দ থেকে সিফাত প্রমাণের বিষয়টা গবেষণা নির্ভর (ইজতেহাদী)। আর এ গবেষণা ভুল ও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টা যে গবেষণা নির্ভর এটা বোঝার জন্য কয়েকটা উদাহরণ দেই।
উদাহরণ-১: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, فأينما تولوا فثم وجه الله ( তোমরা যেদিকেই ফিরো, সেদিকে আল্লাহর চেহারা রয়েছে (আক্ষরিক অনুবাদ)। এই আয়াতে আল্লাহর চেহারা দ্বারা কী উদ্দেশ্য? আয়াত কি আল্লাহর চেহারা প্রমাণের জন্য এসেছে? ১। ইবনে তাইমিয়া রহ: এই আয়াতকে সিফাতের আয়াত মনে করতেন না। তিনি আল্লাহর চেহারা এর ব্যাখ্যা করেছেন কিবলা দ্বারা। এর স্বপক্ষে তিনি অনেক সালাফের বক্তব্যও এনেছেন। এ আয়াতটি তার নিকট সিফাতের আয়াত নয়। আল্লাহর চেহারা দ্বারা সিফাত উদ্দেশ্য নয়। এটি ছিল ইবনে তাইমিয়া রহ: এর ইজতিহাদ বা গবেষণা। ২। আবার ইবনে তাইমিয়া রহ: এর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিম রহ: আয়াতটিকে সিফাতের আয়াত মনে করতেন। তার মতে, আল্লাহর চেহারা দ্বারা বাস্তবেই আল্লাহর চেহারা উদ্দেশ্য। চেহারা আল্লাহর একটি সিফাত বা গুণ। এটি হল ইবনুল কাইয়্যিম রহ: এর ইজতিহাদ। স্পষ্টত: উস্তাদ ও ছাত্রের ইজতিহাদে বিস্তর পার্থক্য লক্ষণীয়। একই আয়াত একজনের কাছে সিফাত, অন্যজনের কাছে সিফাত নয়। এটা মূলত: ইজতিহাদের পার্থক্যের কারণে হয়েছে।
উদাহরণ-২: হাদীসে এসেছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণির মানুষকে তার ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। হাদীসের শব্দে ছায়া আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আল্লাহর ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষকে জায়গা দিবেন। ১। হাদীছে যেহেতু আল্লাহর ছায়া বলা হয়েছে, এজন্য শায়খ ইবনে বাজ রহ: এর মতে ছায়া আল্লাহর একটি সিফাত। তিনি মনে করতেন, আল্লাহর ছায়া আছে। এটা ছিল তার ইজতিহাদ। ২। অপর দিকে সৌদি আরবের মান্যবর সালাফী আলেম শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ: এর কঠোর বিরোধীতা করেছেন। তার মতে, ছায়া আল্লাহর সিফাত নয়। কিয়ামতের দিন মূলত: আরশের ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষকে জায়গা দেয়া হবে।
উদাহরণ-৩: সালাফীদের মৌলিক বিশ্বাস হল, আল্লাহর দু'টি হাত রয়েছে। এই দুই হাতের একটি কি ডান হাত এবং অপরটি কি বাম হাত? এ বিষয়ে শায়খদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ১। শায়খ ইবনে উসাইমিন রহ: ও শায়খ ইবনে বাজ রহ: এর মতে আল্লাহর বাম হাত আছে। তারা মুসলিম শরীফের একটি হাদীস থেকে এর প্রমাণ দিয়ে থাকেন। যেখানে বাম হাত আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ২। শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহ: এর মতে আল্লাহর কোন বাম হাত নেই। এ বিষয়ে মুসলিম শরীফের হাদীসটি শায (বিচ্ছিন্ন বর্ণনা)। তিনি এ বর্ণনা গ্রহণ করেননি। এ বিষয়ে আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
মোটকথা, সিফাত প্রমাণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ইজতিহাদী বা গবেষণা নির্ভর। এটা শরীয়তের অকাট্য বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত বিষয় না। কারও কাছে কোন একটা আয়াত বা হাদীস সিফাত এর প্রমাণ হলেও অন্যের কাছে সেটি সিফাতের দলিল নয়। যার কাছে বিষয়টি সিফাত, তিনি দাবী করছেন যে এটি আল্লাহর সিফাত। কিন্তু যার গবেষণায় এটি সিফাত নয়, তিনি বলছেন, আয়াত বা হাদীস সিফাত প্রমাণ করছে না। বিষয়টি গবেষণা নির্ভর হওয়ার কারণে একজনের গবেষণার কারণে অন্যকে সিফাত অস্বীকারকারী বলার কোন সুযোগ নেই। কারণ অস্বীকারের প্রশ্ন পরে আসবে। তার কাছে তো বিষয়টি সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়। এক্ষেত্রে একজনের গবেষণাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া যেমন অন্যায়, একইভাবে যার কাছে বিষয়টি সিফাত হিসেবে প্রমাণিত নয়, তাকে সিফাত অস্বীকারকারী বলাটাও অন্যায়। আপনার প্রশ্নের উত্তর হল, যিনি তা'বীল করছেন, তিনি উক্ত আয়াত বা হাদীসকে সিফাতের আয়াত বা হাদীস মনে করছেন না। তার ইজতিহাদে এই আয়াত বা হাদীস আল্লাহর কোন গুণ প্রমাণের জন্য আসেনি। আপনার ইজতিহাদে হয়ত বিষয়টা কোন গুণ প্রমাণ করছে, কিন্তু যিনি তা'বীল করছেন তার কাছে এটি গুণ প্রমাণ করছে না। যেমন, শায়খ ইবনে বাজ রহঃ ছায়াকে আল্লাহর গুণ মনে করলেও ইবনে উসাইমিন রহঃ ছায়াকে আল্লাহর গুণ মনে করেননি। এক্ষেত্রে আপনি কাকে সিফাত অস্বীকারকারী বলবেন? আর ইবনে বাজ রহঃ এর এই ইজতিহাদ কি সবার মেনে নেয়া জরুরি? মূলকথা হল, সিফাত প্রমাণের বিষয়টি গবেষণার উপর নির্ভর করছে। যার গবেষণায় বিষয়টি সিফাত নয় এবং তিনি এর তা'বীল করেছেন, তাকে আপনার গবেষণার কারণে সিফাত অস্বীকারকারী বলার সুযোগ নেই। এর দ্বারা আপনি আপনার গবেষণা সবাইকে মানতে বাধ্য করছেন। বাস্তবে অন্য সবাই আপনার গবেষণা মানতে বাধ্য নয়। আহলে সুন্নতের অসংখ্য আলেমের ইজতিহাদ হল, হাত, পা, চোখ, পায়ের পিন্ডলী, দেহের পাশ এগুলো সিফাত নয়। যেসব আয়াত বা হাদীসে এগুলো আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, এগুলো আল্লাহর সিফাত প্রমাণের জন্য আসেনি। তাদের কাছে বিষয়গুলো সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়। এখন আপনার গবেষণায় বা অন্য কোন আলিমের গবেষণায় এগুলো সিফাত হতে পারে। আপনার গবেষণার কারণে যাদের কাছে এগুলো সিফাত হিসেবেই প্রমাণিত নয়, তারা সিফাত অস্বীকারকারী হবে কেন? আপনি হয়ত দু'পক্ষের গবেষণার মধ্যে যে কোন একটা প্রাধান্য দিতে পারেন। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আপনার ইজতিহাদের কারণে অন্য পক্ষ সিফাত অস্বীকারকারী হবে না।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে তা'বীল মায়াত তানজীহ প্রাধান্য পাবে। ইসবাত ও তাফয়ীজের উপর একে প্রাধান্য দেয়ার কারণ কী? অথচ সালাফ ইসবাত মায়াত তানজীহকে প্রাধান্য দিয়েছেন?
উত্তর: যেহেতু বিষয়টা ইজতেহাদী, এজন্য এবিষয়ে যেকোন একটা মতকে প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ আছে। আর তিনটি বিষয়ই যেহেতু সালাফ থেকে প্রমাণিত, এজন্য কোন একটাকে প্রাধান্য দিলেও সেটা সালাফেরই মত হিসেবে গণ্য হবে। কিছু কিছু সালাফ তাফয়ীজকে প্রাধান্য দিয়েছেন, এর অর্থ এই নয় যে, যেসব সালাফ তা'বীল করেছেন, তাদের মাজহাবটি ভুল। সালাফের কেউ কেউ হয়ত তা'বীলের বিরোধীতা করেছেন, কিন্তু অন্যান্য সালাফ থেকে তা'বীল প্রমাণিত। তাদের বিরোধীতার কারণে একথা বলার সুযোগ নেই যে, তা'বীল সালাফের মাজহাব নয়। মোটকথা, তানজীহের পর ইসবাত, তাফয়ীজ, তা'বীল থেকে যে মতটিই গ্রহণ করা হবে, সেটা সালাফেরই মত হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু সবগুলিই সালাফ থেকে প্রমাণিত। আবার কোন একটি মতকে প্রাধান্য দিলে মূলত: সালাফের একটা মতকে আরেকটার উপর প্রাধান্য দেয়া হল। কিছু ক্ষেত্রে তা'বীলকে তাফয়ীজের উপর প্রাধান্য দেয়ার কিছু মৌলিক কারণ উল্লেখ করছি।
১। অনেক আয়াত বা হাদীসে রুপক অর্থটাই মূল। রুপক অর্থ না নিলে আয়াত বা হাদীসের বক্তব্য বিকৃত হয়, সেক্ষেত্রে অবশ্য তা'বীল করতে হবে। যেমন,
ক) সূরা কাসাসের ৮৮ নং আয়াত। আল্লাহর চেহারা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। এখানে সালাফ থেকে দু'টি তা'বীল বর্ণিত আছে। আল্লাহর সত্ত্বা ব্যতীত সব কিছু ধ্বংস হবে। এখানে চেহারা দ্বারা সত্ত্বা উদ্দেশ্য। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কৃত নেক আমল। দ্বিতীয় তা'বীলটি ইমামা বোখারী রহ: সহীহ বোখারীতে উল্লেখ করেছেন। এ আয়াতে তা'বীল না করে বাহ্যিক অর্থ নিলে আয়াতের অর্থ বিকৃত হয়।
খ) পবিত্র কুরআনের সুরা দাহরে (আয়াত-৯) আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ এই আয়াতের আক্ষরিক অর্থ হল, আমরা তোমাদেরকে আল্লাহর চেহারার জন্য আহার্য দান করি। মূল অর্থ হল, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। এ আয়াতে 'আল্লাহর চেহারা' দ্বারা যদি তা'বীল না করে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাহলে আয়াতের অর্থ ও উদ্দেশ্য বিকৃত করা হয়। এধরণের তাহরীফে মা'নাবী (পরোক্ষ বিকৃতি) আবশ্যক হলে আয়াতের তা'বীল করা জরুরি।
গ) কেউ কেউ সূরা হুদের ৩৭ নং আয়াত দ্বারা আল্লাহর চোখ প্রমাণের চেষ্টা করেছে। আয়াতের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে আল্লাহর বহু চোখ সাব্যস্ত করা হয়। আবার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের কারণে আয়াতের বক্তব্য বিকৃত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَاصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا আয়াতের বাহ্যিক অর্থ হল, হে নূহ, আমার চোখসমূহ দ্বারা নৌকা তৈরি করো। আয়াত দ্বারা বহু চোখ সাব্যস্ত হয়। আবার সেই চোখসমূহ দ্বারা নৌকা তৈরির আদেশটিও অসম্ভব। আয়াতের মূল উদ্দেশ্য ও অর্থ এটি হতে পারে না। এজন্য এ আয়াতে তা'বীল না করলে তাহরীফ আবশ্যক হয়। তাফসীরে ইবনে কাসীরে এর অর্থ করা হয়েছে, আমার সম্মুখে বা তত্ত্বাবধানে নৌকা তৈরি করো।
২। যেসব ক্ষেত্রে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী-শিরকী আবশ্যক হয়, সেসব ক্ষেত্রে তা'বীল করা জরুরি। যেমন,
ক। হাদীসে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি বান্দার হাত হয়ে যায়। আমি বান্দার পা হয়ে যায়। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী আবশ্যক হয়।
খ। কুরআনে এসেছে, আল্লাহ হলেন আসমান-জমিনের নূর বা আলো। এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী আবশ্যক হয়।
গ। হাদীসে এসেছে, তোমরা সময়কে গালি দিও না। কারণ আল্লাহ হলেন সময়। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফুরী হবে।
ঘ। কুরআনে এসেছে, কাফেররা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আল্লাহ তায়ালাও তাদেরকে ভুলে গেছেন। এ আয়াত থেকে বাহ্যিক অর্থ নিয়ে একথা বলা কুফুরী হবে যে, আল্লাহ তায়ালা ভুলে যান।
ঙ। হাদীসে এসেছে, আমি ইয়ামান থেকে আল্লাহর শ্বাস-প্রশ্বাস পাচ্ছি। এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ নিলেও কুফুরী হবে। এধরণের আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে তা'বীল না করলে কুফুরী-শিরকী আবশ্যক হয়। এসব ক্ষেত্রে তা'বীল করা জরুরি।
৩। কোন আয়াত বা হাদীসের বাহ্যিক অর্থ যদি আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য না হয়, তাহলে এই বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগের বিষয়ে সমস্ত সালাফ একমত। যেমন, আল্লাহর ক্ষেত্রে নুজুল দ্বারা কখনও উপর থেকে নীচে নামা উদ্দেশ্য হবে না। শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করাও তা'বীল। কারণ তা'বীল বলা হয়, صرف اللفظ عن ظاهره অর্থ: শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করা। সিফাতের ক্ষেত্রে এধরণের তা'বীলের কথা সমস্ত সালাফই বলেছেন। পরিভাষায় একে তা'বীলে ইজমালী বা সামগ্রিক তা'বীল বলে। সুতরাং কোন শব্দের বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য না হলে ঐ শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগের বিষয়ে সমস্ত সালাফ একমত ছিলেন। তা'বীলে ইজমালী না করলে দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদ আবশ্যক হবে। উভয়টি মারাত্মক কুফুরী। সালাফের মধ্যে যারা সিফাত সাব্যস্ত করেছেন অথবা যারা তাফয়ীজ করেছেন, তাদের সকলেই তা'বীলে ইজমালী করেছেন। তা'বীলে ইজমালী একটা ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়।
৪। অনেক ক্ষেত্রে তা'বীলে ইজমালীর পাশাপাশি তা'বীলে তাফসীলি করাও উত্তম। তা'বীলে তাফসীলি হল, শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করার পর সম্ভাব্য অন্য কোন রুপক অর্থ গ্রহণ করা। যেমন, আরবী ইয়াদ এর বাহ্যিক অর্থ হাত। কিন্তু আরবীসহ বিভিন্ন ভাষায় হাতের অনেক ব্যবহার আছে। কাউকে কৃপণ বোঝানোর জন্য আমরা বলি, তার হাত খাট। কোন নেতার ক্ষমতা বোঝানোর জন্য বলি, তার হাত অনেক লম্বা। আরবীতেও এধরণের অসংখ্য রুপকের ব্যবহার আছে। যেসব জায়গায় আনুষঙ্গিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বক্তা রুপক অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে তা'বীলে তাফসীলি করতে হবে। যেমন, হাদীসে এসেছে, إن قلوب بني آدم كلها بين إصبعين من أصابع الرحمن অর্থ: বনী আদমের অন্তরসমুহ আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মধ্যে। এই হাদীস দ্বারা এটা কখনও উদ্দেশ্য নয় যে, প্রত্যেক মানুষের অন্তরে আল্লাহর দুই আঙ্গুল রয়েছে। বক্তব্য থেকে উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। মানুষের অন্তরের উপর আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। এখানে আল্লাহর আঙ্গুল সাব্যস্ত করা, প্রত্যেকের মানুষের অন্তরে আল্লাহর আঙ্গুল আছে, এটা বলা উদ্দেশ্য নয়। বক্তার বক্তব্য থেকে তা' বীলে তাফসীলি স্পষ্ট হওয়ার কারণে এখানে তা'বীল করাটা উত্তম।
৫। কিছু শব্দ বাস্তবে কোন সিফাত বা গুণ বোঝায় না। কিন্তু রুপক অর্থে কখনও গুণের অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, হাত, পা, চোখ। এগুলো পৃথিবীর কোন ভাষাতেই আক্ষরিক অর্থে গুণ বোঝায় না। এর আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করে একে গুণের অর্থে নেয়া সম্ভব। তবে এটি অপ্রচলিত তা'বীল হিসেবে গণ্য হবে। হাত শব্দ ব্যবহার করে যদি আমি ক্ষমতা, নেয়ামত ইত্যাদি রুপক অর্থ নেই, তাহলে সেটি প্রচলিত রুপক হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু আমি যদি হাতের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করে বলি, হাত একটি গুণ, তাহলে এটা আরবী ভাষার প্রচলিত রুপকের মধ্যে থাকবে না। ইমাম আ'মাদী রহ: এর মতে হাত, পা এগুলোকে সিফাত বা গুণ বলা হল, অপ্রচলিত ও দূরবর্তী রুপক (তাজাউঝে বায়ীদ)। সালাফের মধ্যে যারা হাত, পা, চোখকে সিফাত বলেছেন, তারা মূলত: দূরবর্তী তা'বীল করেছেন। বাহ্যিকভাবে যদিও মনে হয়, তারা তা'বীল করছেন না বা তা'বীলের বিরোধীতা করছেন, কিন্তু বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল। ১। তারা যখন শব্দের বাহ্যিক অর্থ পরিত্যাগ করছেন, তখন এটি তা' বীলে ইজমালী। ২। এরপর যখন ঐ শব্দকে সিফাত বা গুণ বলছেন, তখন এটি তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল। কারণ শব্দটি আসলে কোন গুণ বোঝায় না। ইয়াদ নামে আরবীতে কোন গুণ নেই। কাদাম নামে কোন গুণ নেই। ইয়াদ বা কাদাম আরবী ভাষায় কোন গুণ না বোঝানো সত্ত্বেও একে গুণের অর্থে নেয়াটা ব্যাপক তা'বীল। যা প্রচলিত তা'বীল থেকেও দূরবর্তী। সালাফের মধ্যে যারা হাত, পা, চোখকে সিফাত বলতেন, তারা মূলত: তা'বীলে বায়ীদ বা দূরবর্তী তা'বীল করেছেন। আর বাস্তবতা হল, দূরবর্তী বা অপ্রচলিত তা'বীলের চেয়ে প্রচলিত তা'বীল উত্তম। এজন্য ইয়াদকে সিফাত বলার চেয়ে ইয়াদকে ক্ষমতা বা অন্য কোন অর্থে তা' বীল করা উত্তম। ইমাম আ'মাদী রহ: এবিষয়ে আরও বিস্তারিত লিখেছেন তার 'আবকারুল আফকার' নামক কিতাবে।
৬। সালাফসহ আহলে সুন্নতের বহু আলিমের মতে এগুলো মুতাশাবিহাত এর অন্তর্ভূক্ত। এগুলো যদি মুতাশাবিহাত হয়, তাহলে এর দ্বারা সিফাত প্রমাণ করা কতটুকু সঠিক? মুতাশাবিহ বিষয় কি কোন কিছু প্রমাণে দলিল হওয়ার যোগ্য? ইমাম শাতবী রহ: এর মতে মুতাশাবিহকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে কোন কিছু প্রমাণ করা বিদয়াত। কারও কাছে যদি এ সংক্রান্ত আয়াত বা হাদীস মুতাশাবিহ হয়, তাহলে তার জন্য এগুলো দ্বারা সিফাত প্রমাণ করার সুযোগ থাকে না। এজন্য যেসব আয়াত বা হাদীসে হাত, পা, চোখ ইত্যাদির কথা আছে, এগুলোকে মুতাশাবিহ গণ্য করলে এর দ্বারা কোন সিফাত প্রমাণ করার সুযোগ নেই। সিফাত প্রমাণের জন্য মুহকাম আয়াত বা হাদীস প্রয়োজন। আর এগুলো যেহেতু মুহকাম নয়, এজন্য এগুলো দ্বারা সিফাত প্রমাণ করাটা দলিলের বিবেচনায় দুর্বল।
৭। হাত, পা, চোখ এগুলো মূলত: সিফাত হিসেবে আসেনি। ইজাফত হিসেবে এসেছে। যেমন, হাসানের বই। এখানে বই হাসানের দিকে সম্পৃক্ত হয়েছে ইজাফত হিসেবে। গুণ হিসেবে নয়। এই ইজাফতকে সিফাত বা গুণ বলার জন্য পৃথক দলিল প্রয়োজন। আর এসব ইজাফতকে সিফাত বলার ভাষাগত, যৌক্তিক বা শরয়ী কোন দলিল নেই। শরয়ী বা আকলী দলিল ছাড়া ইজাফাতকে সিফাত বলাটা যৌক্তিক হতে পারে না।
৮। আল্লাহর হাত, আল্লাহর চোখ, আল্লাহর রুহ সবগুলিই ইজাফাত। শব্দের ব্যবহারে সামান্যতম কোন পার্থক্য নেই। যারা হাত বা চোখকে সিফাত বলেন, তারা রুহকে আল্লাহর সিফাত বলেন না। যদিও বাংলাদেশী কিছু আহলে হাদীসদের আকিদার কিতাবে রুহ বা আত্মাকেও আল্লাহর সিফাত বলা হয়েছে। একই ধরণের ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও পাত, পা, চোখকে সিফাত কেন বলা হবে এবং রুহ বা আত্মাকে আল্লাহর সিফাত কেন বলা হবে না? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তিনি আদম আ: এর মাঝে তার রুহ ফুৎকারের মাধ্যমে প্রবেশ করিয়েছেন। এই আয়াত থেকে রুহকে আল্লাহর সিফাত বলা হবে না কেন? আর আল্লাহর সেই সিফাত আদম আ: এর মাঝে প্রবেশ করানো হয়েছে, এই বিশ্বাসকে কুফুরী বলা হবে কেন?
৯। সালাফের অনেকে তা'বীলে তাফসিলির বিরোধীতা করেছেন, তা'বীল সম্ভাবনাময় হওয়ার কারণে। সুনিশ্চিত না হওয়ার কারণে তারা তা' বীলের বিরোধীতা করেছেন। ইজাফাতের মাধ্যমে যদি সিফাত সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে এক্ষেত্রেও বিষয়টি সম্ভাবনাময় থাকে। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে না যে, এটি আল্লাহর সিফাত। ইয়াদ আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে একথা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না যে, আল্লাহর হাত রয়েছে। আরবী ভাষায় এধরণের বহু ব্যবহার রয়েছে। যেমন, কুরআনে 'দিনের চেহারা', 'তার পা', 'নম্রতার ডানা', 'কুরআনের দুই হাত' ইত্যাদি বহু ব্যবহার রয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে না যে, দিনের চেহারা রয়েছে। সত্যের পা রয়েছে। একইভাবে আল্লাহর দিকে হাত সম্পৃক্ত হলেই এটা প্রমাণ করে না যে, আল্লাহর হাত রয়েছে। কুরআনের দিকে দুই হাত সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কেউ তো এটা বলে না যে, কুরআনের দুই হাত আছে? আল্লাহর ক্ষেত্রে হাতের ইজাফাত হলেই কেন বলা হবে যে, আল্লাহর হাত রয়েছে? সম্ভাবনার কারণে তা'বীল যদি বর্জনীয় হয়, তাহলে একই কারণে এসব আয়াত বা হাদীস থেকে সিফাত প্রমাণও বর্জনীয় হওয়া উচিত।
১০। যে কোন সিফাত আল্লাহর বিশেষ পরিচয় ও মহত্ব তুলে ধরে। আল্লাহ সর্বময় জ্ঞানী। এর দ্বারা আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব বোঝা যায়। কিন্তু হাত, পা, চোখ এগুলো কোন মহত্ব বা বড়ত্ব প্রকাশ করে না। এগুলোকে অনেক সময় আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করতেই মানুষ দ্বিধা করে। এছাড়া এজাতীয় যত আয়াত ও হাদীস আছে, সবগুলি মিলালেও পরিপূর্ণ কোন পরিচয় স্পষ্ট হয় না। বহু হাত, এক পা, বহু চোখ, দেহের এক পাশ, এক পায়ের পিন্ডলী এগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করলেও এটি একটি অসম্পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরে। আল্লাহর সিফাতের মূলই ছিল আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা, এগুলোকে সিফাত বলার কারণে এর দ্বারা অস্পষ্টতা বেড়েছে। মূল বিষয় হল, এগুলো আল্লাহর কোন বিশেষ পরিচয় বা মহত্ব তুলে ধরে না। এগুলোকে সিফাত সাব্যস্ত করার মূল আবেদনটি এখানে অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নুকস বা ত্রুটি হিসেবে গণ্য করা হয়। যেমন, হাত। মানুষের হাত তার একটি দুর্বলতাকে দূর করার জন্য এসেছে। কোন কিছু ধরার জন্য সে হাতের মুখাপেক্ষী। হাত মানুষের দুর্বলতার প্রতীক। এই অভিযোগটি তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর জন্য হাত সাব্যস্ত করে।
পুরো আলোচনার উপসংহার হল, যেসব বিষয় বাস্তবে কোন গুণ বোঝায় না, বরং অঙ্গ বা দেহের অংশ বোঝায় এগুলোর ক্ষেত্রে তা'বীল করা উত্তম। তবে তা'বীলের শর্ত ঠিক রেখে তা'বীল করতে হবে। আরবী ভাষায় এর সমর্থন থাকতে হবে। আনুসঙ্গিক আলোচনার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। এ বিষয়ে ইমাম ইজ ইবনে আব্দুস সালাম রহ: বলেন, طريقة التاويل بشرطه اقربهما الي الحق অর্থ: তা'বীল ও তাফয়ীজের মধ্যে শর্ত মেনে তা'বীলের পদ্ধতি সত্যের অধিক নিকটবর্তী। -[আল-বাহরুল মুহীত, খ-৩, পৃ-৪৪০]
প্রশ্ন: সিফাতে খাবারিয়্যার ক্ষেত্রে আশআরী-মাতুরিদি আকিদা আসলে কী?
উত্তর: সালাফের আকিদাই মুলত: আশআরী-মাতুরিদি আকিদা। সালাফ থেকে প্রমাণিত প্রত্যেকটি মতই আশআরী-মাতুরিদিগণ গ্রহণ করেছেন। সালাফের সাথে আশআরী-মাতুরিদি আকিদার মৌলিক কোন বিরোধ নেই। সালাফের মৌলিক মাজহাব ছিল তানজীহ। আল্লাহ তায়ালাকে যে কোন ধরণের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত বিশ্বাস করা। তানজীহের পর ইসবাত, তাফয়ীজ, তা'বীল সবগুলোকেই তারা সমর্থন করেন।
প্রশ্ন: বর্তমান সালাফীরা আশআরী-মাতুরিদি আকিদার বিরোধীতা করে কেন?
উত্তর: এর কয়েকটি কারণ আছে। যেমন: ১। সালাফীরা তাদের আকিদার মূল বানিয়েছে শব্দের আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাসের উপর। সালাফ, আশআরী-মাতুরিদি সকলেই শব্দের আক্ষরিক অর্থ বর্জনের উপর একমত। ইয়াদ বলে তারা হাতের আক্ষরিক অর্থ পরিত্যাগ করেছেন। তারা স্পষ্ট করেছেন, ইয়াদ কখনও দেহের কোন অঙ্গ নয়। সালাফীদের সাথে এই মৌলিক জায়গায় বিরোধের কারণে তারা আশআরী-মাতুরিদি আকিদার বিরোধীতা করে। ২। সালাফের অনুসরণে আশআরী-মাতুরিদিগণ বলেন, আল্লাহর জাত ও সিফাতের কোন কাইফ নেই। কিন্তু সালাফীরা বলে কাইফ আছে, কিন্তু কাইফ অজ্ঞাত। ৩। বহু আয়াত ও হাদীসে সালাফ থেকেই অসংখ্য তা'বীল বর্ণিত আছে। এসব তা'বীল আরবী ভাষাও সমর্থন করে। আশআরী-মাতুরিদিগণ এসব তা'বীলকে সমর্থন করেন। পক্ষান্তরে সালাফীরা এসব তা'বীল সালাফ থেকে বর্ণিত হলেও তারা এগুলো গ্রহণ বা সমর্থন করে না। সালাফীদের স্বীকৃত আকিদার সমর্থনে কোন তা'বীল হলে, তারা শুধু এগুলো গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের আকিদার বিরোধী হলে তা'বীলের বিপক্ষে যায়। আশআরী-মাতুরিদিগন গ্রহণযোগ্য তা'বীলগুলো গ্রহণ করে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা সালাফীদের মত দ্বিমুখী আচরণ বা স্ববিরোধীতা করেন না।
📄 কওমি মাদরাসা পড়ুয়া মানহাজি দাবিদার কিছু নাদানদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা
লিখেছেন: শায়খ আইনুল হক কাশিমী হাফীঃ
হাম্বলি মাজহাবের আলেমগণ আকিদাগত দিক দিয়ে সালাফি। হাম্বলি মাজহাবের মূলনীতিই হলো হাদিসের অনুসরণ। কোনোরকম হাদিসটি গ্রহণযোগ্য হলেই সেই হাদিসের মতই হলো হাম্বলি মাজহাব। এজন্য প্রায়ই দেখা যায়, একই মাসআলায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর একাধিক মত রয়েছে। কারণ, এই মাসআলায় একাধিক সহিহ হাদিস পাওয়া গেছে। সে হিসেবে আকিদার ক্ষেত্রেও হাম্বলিরা ব্যখ্যার পক্ষে নন; তারা নুসুসকে (কুরআন-হাদিসের টেক্সট) তার স্ব অবস্থায় রেখে আকিদাপোষণ করেন। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিকে যান না।
পক্ষান্তরে হানাফি, মালিকি ও শাফিয়ি আলেমগণ আকিদাগত দিক দিয়ে আশআরি-মাতুরিদি। কারণ, এই তিন মাজহাবের মূলনীতি হলো, হাদিসসমূহের বাহ্যিকতা অনুসরণ না করে মর্মকথা অনুসরণ করা। এজন্য হাদিসগ্রহণের মূলনীতি ও ফিকহের মূলনীতির আলোকে তারা হাদিসের পর্যালোচনা করে একটি মত অবলম্বন করেন। সেই হিসেবে আকিদার ক্ষেত্রেও তারা নুসুসের ব্যখ্যা- বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করেই তবে একটা আকিদাপোষণ করেন।
এখানেও একটা ছোটখাটো পার্থক্য রয়ে গেছে। আকিদাগত দিক দিয়ে মালিকি ও শাফিয়িদেরকে একত্রে আশআরি বলে। ইমাম আবুল হাসান আশআরির দিকে সম্বন্ধ করে। আর শুধুমাত্র হানাফিদেরকে মাতুরিদি বলা হয়। ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদির দিকে সম্বন্ধ করে। আশআরি ও মাতুরিদিদের মধ্যে মৌলিক ১২ টি আকিদাগত মাসআলায় মতবিরোধ রয়েছে। অন্যথায় আর কোনো বেশকম নেই। সালাফিদের বেলায় এরা উভয়েই এক। তাদের আকিদাপালনের মূলনীতি এক ও অভিন্ন হওয়ার কারণে।
মনে রাখতে হবে, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে যদ্রুপ হাম্বলি আলেমদের তুলনায় হানাফি-মালিকি-শাফিয়ি আলেমদের আধিক্যই বেশি; তদ্রুপ তাদের মধ্যে সালাফিদের তুলনায় আশআরি-মাতুরিদিদের সংখ্যাই বেশি। ফিকহি বিষয়ে তাদের দ্বারা যেমন দীনের বেশি খিদমত হয়েছে, আকিদাগত বিষয়েও অনুরূপ হয়েছে। আপনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ— যেকোনো বিষয়ের বড় বড় আলেমদের জীবনবৃত্তান্ত পড়তে গেলেই দেখবেন, এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন আশআরি-মাতুরিদি।
হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি ও হাম্বলি আলেমদের মধ্যে যেভাবে ফিকহকে কেন্দ্র করে মাজহাবগত মতবিরোধ ছিল, তদ্রুপ আকিদাকে কেন্দ্র করে আকিদাগত মতবিরোধও ছিল। সবই ছিল কিতাবাদির পাতায়। সকলেই কিতাবের পাতায় নিজ নিজ মতকে দালিলিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিরোধীপক্ষের দলিল খণ্ডন করেছেন। কিন্তু কেউ কাউকে তাকফির করেননি। এমনকী তখনকার বিভিন্ন গোমরাহ গোষ্ঠীকে তাকফির করতেও সাতপাঁচ ভাবতেন। তবুও এইসব আকিদাগত জটিল বিষয়গুলোকে পাবলিক প্লেসে টেনে এনে ফিতনা ছড়াননি। মতানৈক্য সবই কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। যে অঞ্চলে যে ফিকহ ও আকিদার প্রচলন ছিল, সে অনুযায়ী সেখানকার আম জনতাকে দীনের দাওয়াত দিয়েছেন।
কিন্তু আফসোসজনক হলেও সত্য যে, ফিকহি বিষয়ে যেভাবে লা-মাজহাব/মাজহাববিদ্বেষের ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে, ঠিক তদ্রুপ আকিদাগত বিষয়েও রীতিমতো ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে! উম্মাহর ৮০% মাজহাবালম্বী মুসলমানকে যেভাবে মুশরিক বানানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে, তদ্রুপ ৮০% আশআরি-মাতুরিদি মুসলমানকেও মুশরিক বলার অপচেষ্টা করা হচ্ছে! মাজহাবকে যেভাবে ফিতনা বানানো হচ্ছে, আকিদাকেও তদ্রুপ ফিতনা বানিয়ে নেওয়া হচ্ছে! তাহলে কি আশআরি-মাতুরিদি বড় বড় আলেমগণের আকিদা ঠিক ছিল না? যেমন ইমাম কুরতুবি, আসকালানি, সুয়ুতি, আইনি, ইবনে কাসির, বাইহাকি ইবনুল হুমাম প্রমুখদের!
বড় আশ্চর্য লাগে, সালাফি ও আসারি নামের কিছু উজবুক ইদানীং এই আকিদা নিয়ে অনলাইনে কাদা ছুড়াছুঁড়ি করছে! এদের কথা নাহয় বাদ দিলাম; কওমি মাদরাসা পড়ুয়া মানহাজি দাবিদার কিছু নাদানও আশআরি-মাতুরিদেরকে আকিদাবিনষ্ট, এমনকী প্রকারান্তে মুশরিক বলার দুঃসাহস দেখাচ্ছে! এরা পাইছে টা কী? দীনকে পুরাই উপহাসের বস্তু বানিয়ে চলছে! আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো অনলাইনের কিছু অকালপক্ব শাইখের লেকচার শুনে এরা মনে করে আকিদার মস্তবড় ইমাম বনে গেছে! আকিদা বিষয়ে এরা কয়টা কিতাব পড়েছে? দু-চারটা কিতাব পড়লেও তো এমন ফিতনা করতে পারত না!
লিখেছেন: শায়খ আইনুল হক কাশিমী হাফীঃ
হাম্বলি মাজহাবের আলেমগণ আকিদাগত দিক দিয়ে সালাফি। হাম্বলি মাজহাবের মূলনীতিই হলো হাদিসের অনুসরণ। কোনোরকম হাদিসটি গ্রহণযোগ্য হলেই সেই হাদিসের মতই হলো হাম্বলি মাজহাব। এজন্য প্রায়ই দেখা যায়, একই মাসআলায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর একাধিক মত রয়েছে। কারণ, এই মাসআলায় একাধিক সহিহ হাদিস পাওয়া গেছে। সে হিসেবে আকিদার ক্ষেত্রেও হাম্বলিরা ব্যখ্যার পক্ষে নন; তারা নুসুসকে (কুরআন-হাদিসের টেক্সট) তার স্ব অবস্থায় রেখে আকিদাপোষণ করেন। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিকে যান না।
পক্ষান্তরে হানাফি, মালিকি ও শাফিয়ি আলেমগণ আকিদাগত দিক দিয়ে আশআরি-মাতুরিদি। কারণ, এই তিন মাজহাবের মূলনীতি হলো, হাদিসসমূহের বাহ্যিকতা অনুসরণ না করে মর্মকথা অনুসরণ করা। এজন্য হাদিসগ্রহণের মূলনীতি ও ফিকহের মূলনীতির আলোকে তারা হাদিসের পর্যালোচনা করে একটি মত অবলম্বন করেন। সেই হিসেবে আকিদার ক্ষেত্রেও তারা নুসুসের ব্যখ্যা- বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করেই তবে একটা আকিদাপোষণ করেন।
এখানেও একটা ছোটখাটো পার্থক্য রয়ে গেছে। আকিদাগত দিক দিয়ে মালিকি ও শাফিয়িদেরকে একত্রে আশআরি বলে। ইমাম আবুল হাসান আশআরির দিকে সম্বন্ধ করে। আর শুধুমাত্র হানাফিদেরকে মাতুরিদি বলা হয়। ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদির দিকে সম্বন্ধ করে। আশআরি ও মাতুরিদিদের মধ্যে মৌলিক ১২ টি আকিদাগত মাসআলায় মতবিরোধ রয়েছে। অন্যথায় আর কোনো বেশকম নেই। সালাফিদের বেলায় এরা উভয়েই এক। তাদের আকিদাপালনের মূলনীতি এক ও অভিন্ন হওয়ার কারণে।
মনে রাখতে হবে, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে যদ্রুপ হাম্বলি আলেমদের তুলনায় হানাফি-মালিকি-শাফিয়ি আলেমদের আধিক্যই বেশি; তদ্রুপ তাদের মধ্যে সালাফিদের তুলনায় আশআরি-মাতুরিদিদের সংখ্যাই বেশি। ফিকহি বিষয়ে তাদের দ্বারা যেমন দীনের বেশি খিদমত হয়েছে, আকিদাগত বিষয়েও অনুরূপ হয়েছে। আপনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ— যেকোনো বিষয়ের বড় বড় আলেমদের জীবনবৃত্তান্ত পড়তে গেলেই দেখবেন, এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন আশআরি-মাতুরিদি।
হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি ও হাম্বলি আলেমদের মধ্যে যেভাবে ফিকহকে কেন্দ্র করে মাজহাবগত মতবিরোধ ছিল, তদ্রুপ আকিদাকে কেন্দ্র করে আকিদাগত মতবিরোধও ছিল। সবই ছিল কিতাবাদির পাতায়। সকলেই কিতাবের পাতায় নিজ নিজ মতকে দালিলিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিরোধীপক্ষের দলিল খণ্ডন করেছেন। কিন্তু কেউ কাউকে তাকফির করেননি। এমনকী তখনকার বিভিন্ন গোমরাহ গোষ্ঠীকে তাকফির করতেও সাতপাঁচ ভাবতেন। তবুও এইসব আকিদাগত জটিল বিষয়গুলোকে পাবলিক প্লেসে টেনে এনে ফিতনা ছড়াননি। মতানৈক্য সবই কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। যে অঞ্চলে যে ফিকহ ও আকিদার প্রচলন ছিল, সে অনুযায়ী সেখানকার আম জনতাকে দীনের দাওয়াত দিয়েছেন।
কিন্তু আফসোসজনক হলেও সত্য যে, ফিকহি বিষয়ে যেভাবে লা-মাজহাব/মাজহাববিদ্বেষের ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে, ঠিক তদ্রুপ আকিদাগত বিষয়েও রীতিমতো ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে! উম্মাহর ৮০% মাজহাবালম্বী মুসলমানকে যেভাবে মুশরিক বানানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে, তদ্রুপ ৮০% আশআরি-মাতুরিদি মুসলমানকেও মুশরিক বলার অপচেষ্টা করা হচ্ছে! মাজহাবকে যেভাবে ফিতনা বানানো হচ্ছে, আকিদাকেও তদ্রুপ ফিতনা বানিয়ে নেওয়া হচ্ছে! তাহলে কি আশআরি-মাতুরিদি বড় বড় আলেমগণের আকিদা ঠিক ছিল না? যেমন ইমাম কুরতুবি, আসকালানি, সুয়ুতি, আইনি, ইবনে কাসির, বাইহাকি ইবনুল হুমাম প্রমুখদের!
বড় আশ্চর্য লাগে, সালাফি ও আসারি নামের কিছু উজবুক ইদানীং এই আকিদা নিয়ে অনলাইনে কাদা ছুড়াছুঁড়ি করছে! এদের কথা নাহয় বাদ দিলাম; কওমি মাদরাসা পড়ুয়া মানহাজি দাবিদার কিছু নাদানও আশআরি-মাতুরিদেরকে আকিদাবিনষ্ট, এমনকী প্রকারান্তে মুশরিক বলার দুঃসাহস দেখাচ্ছে! এরা পাইছে টা কী? দীনকে পুরাই উপহাসের বস্তু বানিয়ে চলছে! আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো অনলাইনের কিছু অকালপক্ব শাইখের লেকচার শুনে এরা মনে করে আকিদার মস্তবড় ইমাম বনে গেছে! আকিদা বিষয়ে এরা কয়টা কিতাব পড়েছে? দু-চারটা কিতাব পড়লেও তো এমন ফিতনা করতে পারত না!
লিখেছেন: শায়খ আইনুল হক কাশিমী হাফীঃ
হাম্বলি মাজহাবের আলেমগণ আকিদাগত দিক দিয়ে সালাফি। হাম্বলি মাজহাবের মূলনীতিই হলো হাদিসের অনুসরণ। কোনোরকম হাদিসটি গ্রহণযোগ্য হলেই সেই হাদিসের মতই হলো হাম্বলি মাজহাব। এজন্য প্রায়ই দেখা যায়, একই মাসআলায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর একাধিক মত রয়েছে। কারণ, এই মাসআলায় একাধিক সহিহ হাদিস পাওয়া গেছে। সে হিসেবে আকিদার ক্ষেত্রেও হাম্বলিরা ব্যখ্যার পক্ষে নন; তারা নুসুসকে (কুরআন-হাদিসের টেক্সট) তার স্ব অবস্থায় রেখে আকিদাপোষণ করেন। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিকে যান না।
পক্ষান্তরে হানাফি, মালিকি ও শাফিয়ি আলেমগণ আকিদাগত দিক দিয়ে আশআরি-মাতুরিদি। কারণ, এই তিন মাজহাবের মূলনীতি হলো, হাদিসসমূহের বাহ্যিকতা অনুসরণ না করে মর্মকথা অনুসরণ করা। এজন্য হাদিসগ্রহণের মূলনীতি ও ফিকহের মূলনীতির আলোকে তারা হাদিসের পর্যালোচনা করে একটি মত অবলম্বন করেন। সেই হিসেবে আকিদার ক্ষেত্রেও তারা নুসুসের ব্যখ্যা- বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করেই তবে একটা আকিদাপোষণ করেন।
এখানেও একটা ছোটখাটো পার্থক্য রয়ে গেছে। আকিদাগত দিক দিয়ে মালিকি ও শাফিয়িদেরকে একত্রে আশআরি বলে। ইমাম আবুল হাসান আশআরির দিকে সম্বন্ধ করে। আর শুধুমাত্র হানাফিদেরকে মাতুরিদি বলা হয়। ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদির দিকে সম্বন্ধ করে। আশআরি ও মাতুরিদিদের মধ্যে মৌলিক ১২ টি আকিদাগত মাসআলায় মতবিরোধ রয়েছে। অন্যথায় আর কোনো বেশকম নেই। সালাফিদের বেলায় এরা উভয়েই এক। তাদের আকিদাপালনের মূলনীতি এক ও অভিন্ন হওয়ার কারণে।
মনে রাখতে হবে, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে যদ্রুপ হাম্বলি আলেমদের তুলনায় হানাফি-মালিকি-শাফিয়ি আলেমদের আধিক্যই বেশি; তদ্রুপ তাদের মধ্যে সালাফিদের তুলনায় আশআরি-মাতুরিদিদের সংখ্যাই বেশি। ফিকহি বিষয়ে তাদের দ্বারা যেমন দীনের বেশি খিদমত হয়েছে, আকিদাগত বিষয়েও অনুরূপ হয়েছে। আপনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ— যেকোনো বিষয়ের বড় বড় আলেমদের জীবনবৃত্তান্ত পড়তে গেলেই দেখবেন, এঁদের বেশিরভাগই ছিলেন আশআরি-মাতুরিদি।
হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি ও হাম্বলি আলেমদের মধ্যে যেভাবে ফিকহকে কেন্দ্র করে মাজহাবগত মতবিরোধ ছিল, তদ্রুপ আকিদাকে কেন্দ্র করে আকিদাগত মতবিরোধও ছিল। সবই ছিল কিতাবাদির পাতায়। সকলেই কিতাবের পাতায় নিজ নিজ মতকে দালিলিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিরোধীপক্ষের দলিল খণ্ডন করেছেন। কিন্তু কেউ কাউকে তাকফির করেননি। এমনকী তখনকার বিভিন্ন গোমরাহ গোষ্ঠীকে তাকফির করতেও সাতপাঁচ ভাবতেন। তবুও এইসব আকিদাগত জটিল বিষয়গুলোকে পাবলিক প্লেসে টেনে এনে ফিতনা ছড়াননি। মতানৈক্য সবই কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। যে অঞ্চলে যে ফিকহ ও আকিদার প্রচলন ছিল, সে অনুযায়ী সেখানকার আম জনতাকে দীনের দাওয়াত দিয়েছেন।
কিন্তু আফসোসজনক হলেও সত্য যে, ফিকহি বিষয়ে যেভাবে লা-মাজহাব/মাজহাববিদ্বেষের ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে, ঠিক তদ্রুপ আকিদাগত বিষয়েও রীতিমতো ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে! উম্মাহর ৮০% মাজহাবালম্বী মুসলমানকে যেভাবে মুশরিক বানানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে, তদ্রুপ ৮০% আশআরি-মাতুরিদি মুসলমানকেও মুশরিক বলার অপচেষ্টা করা হচ্ছে! মাজহাবকে যেভাবে ফিতনা বানানো হচ্ছে, আকিদাকেও তদ্রুপ ফিতনা বানিয়ে নেওয়া হচ্ছে! তাহলে কি আশআরি-মাতুরিদি বড় বড় আলেমগণের আকিদা ঠিক ছিল না? যেমন ইমাম কুরতুবি, আসকালানি, সুয়ুতি, আইনি, ইবনে কাসির, বাইহাকি ইবনুল হুমাম প্রমুখদের!
বড় আশ্চর্য লাগে, সালাফি ও আসারি নামের কিছু উজবুক ইদানীং এই আকিদা নিয়ে অনলাইনে কাদা ছুড়াছুঁড়ি করছে! এদের কথা নাহয় বাদ দিলাম; কওমি মাদরাসা পড়ুয়া মানহাজি দাবিদার কিছু নাদানও আশআরি-মাতুরিদেরকে আকিদাবিনষ্ট, এমনকী প্রকারান্তে মুশরিক বলার দুঃসাহস দেখাচ্ছে! এরা পাইছে টা কী? দীনকে পুরাই উপহাসের বস্তু বানিয়ে চলছে! আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো অনলাইনের কিছু অকালপক্ব শাইখের লেকচার শুনে এরা মনে করে আকিদার মস্তবড় ইমাম বনে গেছে! আকিদা বিষয়ে এরা কয়টা কিতাব পড়েছে? দু-চারটা কিতাব পড়লেও তো এমন ফিতনা করতে পারত না!