📄 ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বক্তব্য
ইমাম আবু হানিফা রহ. এর আল-ফিকহুল আবসাতে রয়েছে, : "قلت: أرأيت لو قيل أين الله تعالى ؟ فقال - أي أبو حنيفة - : يقال له كان الله تعالى ولا مكان قبل أن يخلق الخلق، وكان الله تعالى ولم يكن أين ولا خلق ولا شيء، وهو خالق كل شيء"
অর্থ: যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয় আল্লাহ তায়ালা কোথায়? ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উত্তরে বলেন, তাকে বলা হবে, সৃষ্টির অস্তিত্বের পূর্বে, যখন কোন স্থানই ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তখনও ছিলেন যখন কোন সৃষ্টি ছিলো না, এমনকি 'কোথায়' বলার মতো স্থানও ছিলো না। সৃষ্টির একটি পরমাণুও যখন ছিলো না তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। তিনিই সব কিছুর সৃষ্টা"— [আল-ফিকহুল আবসাত, পৃ. ৫৭, আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারীর তাহকীক]
এটিই সমস্ত আহলে সুন্নতের আকিদা। যখন কোন স্থান ছিলো না, তখন আল্লাহ তায়ালা ছিলেন কি না? অবশ্যই ছিলেন। আল্লাহর অবস্থানের জন্য কোন স্থানের প্রয়োজন হয়নি। তেমনি এখনও আল্লাহর অবস্থানের জন্য কোন স্থান বা দিকের প্রয়োজন নেই। কিছু অজ্ঞ লোক মনে করে থাকে, আল্লাহ তায়ালাকে স্থান ও দিক থেকে পবিত্র বিশ্বাস করলে তো আল্লাহ কোথাও নেই বলা হয়। এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বই নাকি অস্বীকার করা হয়। এদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, যখন কোন স্থান বা দিকই ছিলো না, তখন আল্লাহ কোথায় ছিলেন? সে যদি এটা বিশ্বাস না করে যে, আল্লাহ তায়ালা স্থান ও দিক সৃষ্টির পূর্বে ছিলেন, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে কাফের হয়ে যাবে। কোন সৃষ্টির অস্তিত্বের পূর্বে আল্লাহর অবস্থানের জন্য যখন কোন স্থানের প্রয়োজন হয়নি, তাহলে এখন কেন আল্লাহ তায়ালাকে স্থানের অনুগামী বানানো হবে? এসব লোকের বোধোদয়ের জন্য বিখ্যাত তাবেয়ী ও ইমাম আবু হানিফা রহ. তার ছোট্ট একটি বক্তব্য দ্বারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা স্থান ও দিক থেকে পবিত্র।
ইমাম আবু হানিফা রহ. আরও বলেন,
"ولقاء الله تعالى لأهل الجنة بلا كيف ولا تشبيه ولا جهة حق"
অর্থ: জান্নাতবাসীর জন্য কোন সাদৃশ্য, অবস্থা ও দিক ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার দর্শন সত্য।— [কিতাবুল ওসিয়্যা, পৃ. ৪, শরহে ফিকহুল আকবার, মোল্লা আলী কারী, পৃ. ১৩৮]
ইমাম আবু হানিফা রহ. স্পষ্ট লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালা দিক থেকে মুক্ত। পরকালে আল্লাহ তায়ালাকে দেখা যাবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালাকে দেখার জন্য বিশেষ কোন দিকে থাকার প্রয়োজন নেই। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মতো বিখ্যাত তাবেয়ীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তাবেয়ীগণের আকিদাও এমন ছিলো। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা স্থান ও দিক থেকে মুক্ত।
ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন,
"ونقر بأن الله سبحانه وتعالى على العرش استوى من غير أن يكون له حاجة إليه واستقرار عليه، وهو حافظ العرش وغير العرش من غير احتياج، فلو كان محتاجا لما قدر على إيجاد العالم وتدبيره كالمخلوقين، ولو كان محتاجا إلى الجلوس والقرار فقبل خلق العرش أين كان الله تعالى الله عن ذلك علوا كبيرا" اه
আমরা স্বীকার করি যে, আল্লাহ তায়ালা আরশের উপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। আরশের প্রতি কোনরূপ প্রয়োজন ও আরশের উপর স্থিতিগ্রহণ ব্যতীত। তিনি আরশ ও অন্যান্য মাখলুকের এগুলোর প্রতি তিনি বিন্দুমাত্র মুখাপেক্ষী নন। তিনি যদি আরশ ও অন্যান্য মাখলুকের মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও লালন-পালন করতে পারতেন না। কোন মাখলুক যেমন অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়ার কারণে কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি যদি আরশের উপর উপবেশন ও এর উপর স্থির হওয়ার মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে আরশ সৃষ্টির পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন? মহান আল্লাহ এধরনের ধ্যান-ধারণা থেকে মহাপবিত্র।— [আল-ওসিয়্যা, পৃ. ২, তাহকীক, আল্লামা যাহিদ আল-কাউসারী রহ.]
উল্লেখ্য দিকের ধারণা একটি আপেক্ষিক বিষয়। দিক বলতে আমাদের নিজেদের অবস্থানের সাপেক্ষে অন্য একটি স্থানকে আমরা বুঝিয়ে থাকি। আমি যদি কোন বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলায় থাকি, তাহলে নীচের দিক বলতে আসলে আমার নীচের প্রথম তলার জায়গা বোঝায়। উপর বলতে আমার মাথার উপরের কোন একটি জায়গা বুঝিয়ে থাকি। এজন্য আরবীতে দিক বলতে আসলে তরফুল মাকান বা কোন জায়গার একটা অংশ বোঝায়।
কোন জায়গার অংশ ব্যতীত দিকের পৃথক কোন অস্তিত্ব নেই। যে দিকই বোঝানো হবে, সেটি মূলত: একটি জায়গা। আমরা জানি, মহাবিশ্বের সকল জায়গা আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। সকল জায়গার একটি অংশ বা দিকও আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। মহাবিশ্বের কোন কিছুই ছিলো না। সব কিছুইকে আল্লাহ তায়ালা অস্তিত্ব দিয়েছেন। এমন কোন জায়গা নেই, যেটি আল্লাহর সৃষ্টি নয়। আবার কোন জায়গার এমন কোন অংশ বা দিকও নেই যাকে আল্লাহ তায়ালা অস্তিত্ব দেননি।
সুতরাং যতো জায়গা, জায়গার অংশ বিশেষ বা দিক রয়েছে সব কিছুই মাখলুক বা আল্লাহর সৃষ্টি। কোন জায়গা বা দিকই অনাদি তথা অসীম থেকে বিদ্যমান নয়। কেউ যদি বিশ্বাস করে কোন জায়গা, জায়গার কোন অংশ তথা দিকও অসীম থেকে বিদ্যমান তাহলে সে অবশ্যই কাফের। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যখন কোন সৃষ্টি ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। আল্লাহর জন্য সৃষ্টির অস্তিত্ব আবশ্যক নয়। কেউ যদি মনে করে, আসমান-জমিন, আরশ-কুরসী ছাড়া আল্লাহর অস্তিত্ব সম্ভব নয়, তার জন্য তওবা করে ইমান নবায়ন করা জরুরি। কেউ যদি মনে করে, সৃষ্টির অস্তিত্বকে অস্বীকার করলে আল্লাহরই কোন অস্তিত্ব থাকে না, তবে এ ব্যক্তিও আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকারকারী।
কেউ যদি আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে বলে, “যে জিনিষ উপরে নয়, নীচে নয়, ডানে নয়, বামে নয়, সামনেও নয় পিছনেও নেই, আসলে সেই জিনিষের অস্তিত্বই নেই।” আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে এধরনের বক্তব্য কুফুরী। কেউ যদি বুঝে-শুনে এভাবে আল্লাহর অস্তিত্বকে সৃষ্টির অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল বানিয়ে দেয়, তবে তার কুফুরীর ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকবে না। বাস্তবে সমস্ত দিক যেহেতু কোন স্থানেরই অংশ, সুতরাং আল্লাহ তায়ালা সমস্ত স্থান ও দিক থেকে মুক্ত। সমস্ত স্থান ও দিক মাখলুক হওয়ার কারণে আল্লাহ তায়ালার সত্তার মাঝে কোন স্থান বা জায়গা প্রবেশ করে না। আল্লাহর সত্তার মাঝে কোন স্থান, স্থানের কোন অংশ বা দিক প্রবেশ করেছে বলে কেউ যদি বিশ্বাস করে, তবে সেও কুফুরী করবে। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মাখলুক থেকে মুক্ত। তিনিও কোন মাখলুকে মাঝে প্রবেশ করেন না।
কেউ যদি বিশ্বাস করে, কোন নির্দিষ্ট দিক আল্লাহর সত্তার গুণ, তাহলে সে মূলত: একটি নির্দিষ্ট জায়গাকে আল্লাহর সত্তার অংশ বানিয়েছে। কোন সৃষ্টিকে আল্লাহর সত্তার গুণ বা অংশ মনে করাও কুফুরী। এই সৃষ্টি কোন জায়গা, জায়গার অংশ বা দিক, আরশ-কুরসী, মানুষ, গাছ-পালা যাই হোক না কেন। কেউ যদি বিশ্বাস করে, নীচের দিক অর্থাৎ নীচের কিছু জায়গা আল্লাহর সত্তার গুণ তবে এটি কুফুরী। একইভাবে কেউ যদি বলে উপরের দিক বা উপরের কোন জায়গা আল্লাহর সত্তার গুণ, তবে এটিও কুফুরী।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, الله خالق كل شيء
অর্থ: সকল কিছুর স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা। [সূরা জুমার, আয়াত নং ৬২]
সমস্ত স্থান ও দিকের স্রষ্টাও আল্লাহ। কোন স্থান বা দিকই অসৃষ্ট নয়। উপরের দিক, নীচের দিক, ডান-বাম সব কিছুর স্রষ্টা হলেন আল্লাহ। সুতরাং উপর বা নীচ যে কোন দিককে আল্লাহর সত্তার গুণ বলার অর্থ হলো, স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে একাকার করা। এটি স্পষ্ট কুফুরী।
📄 ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. এর বক্তব্য
আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বিখ্যাত ইমাম হলেন ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী রহ.। সালাফে-সালেহীনের আকিদা-বিশ্বাস সংকলন ও ভ্রান্ত আকিদা খন্ডনে তাঁর অমর কীর্তি আজও অম্লান। মুসলিম বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমান আকিদার ক্ষেত্রে এই মহান ইমামের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকে গ্রহণ করেছেন। প্রায় সমস্ত হানাফী এই ইমামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণ করে নিজেদেরকে ধন্য মনে করে থাকেন। কুরআন-হাদীস থেকে গৃহীত আকিদা-বিশ্বাস অত্যন্ত সুবিন্যস্ত ও সাবলীল ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপনের কারণে আজ তিনি কোটি মুসলমানের মহান ইমাম। মৌলিক দিক থেকে আশআরী ও মাতুরিদি আকিদা এক ও অভিন্ন হওয়াই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ইসলামী আকিদা বিশ্লেষণে ইমাম মাতুরিদীর অবস্থানের সাথে সহীহ আকিদার সমস্ত মুসলিম একমত পোষণ করেছে। হাজার বছর ধরে এই আকিদা-বিশ্বাস লালন করে সমস্ত বাতিল ফেরকা থেকে মুক্ত থেকে জান্নাতের পথ সুগম করেছে।
আকিদার উপর ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী রহ. এর অসংখ্য কিতাব রয়েছে। কিছু কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। অনেক কিতাব এখনও হস্তলিপিতে রয়েছে। ইমাম মাতুরিদী রহ. এর বিখ্যাত একটি কিতাব হলো, কিতাবুত তাউহীদ। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের সঠিক আকিদা বর্ণনা ও বাতিল ফেরকার দাঁতভাঙা জবাব প্রদানে এটি অদ্বিতীয় একটি কিতাব। ইসলামি আকিদার পাশাপাশি ইমাম মাতুরিদী রহ. ফিকহ ও তাফসীর শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। বৃহৎ কলেবরের বিখ্যাত তাফসীর লিখেছেন। তা'বিলাতু আহলিস সুন্নাহ। তুরষ্ক থেকে এটি ১৮ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
ইমাম মাতুরিদি রহ. তার অবিস্মরণীয় গ্রন্থ কিতাবুত তাউহীদ -এ লিখেছেন, “আল্লাহর অবস্থানের ক্ষেত্রে মুসলমানদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
১. তাদের কেউ কেউ ধারণা করছে যে, আল্লাহ তায়ালা আরশে স্থিতি গ্রহণ করেছেন। তাদের নিকট আরশ হলো একটি সিংহাসন। যেটি ফেরেশতাগণ বহন করে এবং এর চার দিকে প্রদক্ষিণ করে। কেননা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, "সেদিন আপনার প্রভূর আরশকে আটজন ফেরেশতা বহন করবে”।— (সূরা হাক্কা, আয়াত-১৭)। অপর আয়াতে রয়েছে, [অর্থ:] আপনি ফেরেশতাদেরকে আরশ প্রদক্ষিণ করতে দেখবেন।— (সূরা-ঝুমার, আয়াত-৭৫)। অন্য আয়াতে রয়েছে, যে সকল ফেরেশতা আরশ বহন করে এবং আরশের চার পাশে প্রদক্ষিণ করে.... (সূরা মু'মিন, আয়াত-৭)। এরা পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বাহার পাঁচ নং আয়াতে রয়েছে, "দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর ইস্তাওয়া করেছেন"। এছাড়া তাদের দলিল হলো, মানুষ দুয়ার সময় উপরের দিকে হাত উত্তোলন করে এবং উপর থেকে নিজেদের কল্যাণের আশা রাখে। এদের বক্তব্য হলো, আল্লাহ তায়ালা পূর্বে আরশে ছিলেন না, পরবর্তীতে আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কেননা, আল্লহা তায়ালা বলেছেন, “অত:পর তিনি আরশে ইস্তাওয়া করলেন” (সূরা আ'রাফ, আয়াত নং ৫৪)।
২. কেউ কেউ বিশ্বাস করে, আল্লাহ তায়ালা সব জায়গায় রয়েছেন। এরা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত দ্বারা দলিল দিয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, "তিন ব্যক্তি যদি কথোপকথন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা হলেন চতুর্থজন”। (সূরা মুজাদালা, আয়াত নং ৭)। অপর আয়াতে রয়েছে, "আমি তাদের ঘাড়ের রগের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী”। (সূরা ক্বাফ, আয়াত নং ১৬)। অন্য আয়াতে রয়েছে, "আমি তোমাদের চেয়ে মৃত ব্যক্তির অধিক নিকটবর্তী। অথচ তোমরা দেখো না"। (সূরা ওয়াক্বিয়া, আয়াত নং ৮৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, [অর্থ], তিনি সেই মহান আল্লাহ, যিনি আসমানেও প্রভু, জমিনেও প্রভূ (সূরা জুখরুফ, আয়াত নং ৮৪)। এরা ধারণা করেছে যে, যদি আল্লাহ তায়ালাকে সব জায়গায় বিরাজমান না বলা হয়, তাহলে এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালাকে সীমিত করা হয়। প্রত্যেক সীমিত জিনিস তার চেয়ে বড় জিনিস থেকে ছোট। এটি আল্লাহর জন্য একটি ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত। এদের এই অসার বক্তব্যে আল্লাহ তায়ালাকে স্থানের মুখাপেক্ষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সেই সাথে আল্লাহর জন্য সীমা সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা, কোন কিছু যদি বাস্তবে কোন স্থানে অবস্থান করে, তাহলে উক্ত বস্তুটির ঐ স্থান থেকে বড় হওয়াটা সম্ভব নয়। কেননা, এটি যদি স্থান থেকে বড় হয়, তাহলে উক্ত স্থানে তার অবস্থান সম্ভব নয়। কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকবে, অথচ সে স্থান থেকে বড় হবে, এটি একটি হাস্যকর বিষয়। সুতরাং যারা আল্লাহ তায়ালাকে সব জায়গায় বলেন, তারাও আল্লাহ তায়ালাকে সব জায়গার মধ্যে সীমিত করে দিয়েছেন। এদের বক্তব্য অনুযায়ী মহাবিশ্বের সীমা ও আল্লাহর সীমা একই হওয়া আবশ্যক হয়। আর মহান আল্লাহ তায়ালা এধরনের ধ্যান-ধারণা থেকে মহাপবিত্র।
৩. তৃতীয় দলের বক্তব্য হলো, আল্লাহ তায়ালা সকল স্থান ও জায়গা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। রুপক অর্থে কখনও কোন স্থানের দিকে আল্লাহ তায়ালাকে সম্পৃক্ত করলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালা উক্ত স্থানের সংরক্ষণ ও লালন-পালনকারী।— [কিতাবুত তাউহীদ, ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. (মৃত:৩৩৩ হিজরী), পৃ. ১৩১, প্রকাশনী, মাকতাবাতুল ইরশাদ, ইস্তাম্বুল, প্রকাশকাল, ২০০১]
আহলে সুন্নতের বরেণ্য ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. পরবর্তীতে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাস স্পষ্টভাষায় তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, "আল্লাহ তায়ালার অবস্থানের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মূলনীতি হলো, যখন কোন স্থান ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। কোন জায়গার অস্তিত্ব না থাকলেও আল্লাহর অস্তিত্ব সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা অনাদি থেকে বিদ্যমান রয়েছেন। কোন সৃষ্টি বা স্থান যখন ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব ছিলো। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা এখনও স্থান থেকে মুক্ত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কোন স্থানের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও আজালী তথা অসীম থেকে ছিলেন। মহান আল্লাহর সত্ত্বা বা গুণাবলী পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজন, হ্রাস-বৃদ্ধি ও বিলুপ্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত”।— [কিতাবুত তাউহীদ, ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. (মৃত:৩৩৩ হিজরী), পৃ. ১৩২, প্রকাশনী, মাকতাবাতুল ইরশাদ, ইস্তাম্বুল, প্রকাশকাল, ২০০১]
এই আলোচনার পর ইমাম মাতুরিদি রহ. আহলে সুন্নতের বিরোধী আকিদা পোষণকারী উভয় দলের বক্তব্য খন্ডন করেছেন তার কিতাবুত তাউহীদে। যারা আল্লাহ তায়ালাকে আরশে বিশ্বাস করে এবং যারা আল্লাহর তায়ালাকে সব জায়গায় বিশ্বাস করে, উভয় দলের বক্তব্য তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় খন্ডন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। উলামায়ে কেরামের জন্য মাতুরিদি রহ. এর আলোচনাটি দলিল সমৃদ্ধ একটি সুপাঠ্য গবেষণা বলে মনে করি। আগ্রহী পাঠকগণ অবশ্যই ইমাম মাতুরিদি রহ: আলোচনাগুলি দেখে নিবেন।
📄 ইমাম গাজালী রহ. এর বক্তব্য
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী রহ. জাহাম ইবনে সাফওয়ানের বক্তব্য খন্ডন করতে গিয়ে বলেন,
ولا ترتبك في مواقع غلطه فمنه غلط من قال: إنه في كل مكان. وكل من نسبه إلى مكان أو جهة فقد زل فضل ورجع غاية نظره إلى التصرف في محسوسات البهائم ولم يجاوز الأجسام وعلائقها
অর্থ: তুমি জাহাম ইবনে সাফওয়ানের আকিদাগত ভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকো। কিছু লোকের ভ্রান্ত বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা সব জায়গায় রয়েছেন। যারা আল্লাহ তায়ালাকে কোন জায়গা অথবা দিকের সাথে সম্পৃক্ত করেছে, তাদের পদস্খলন হয়েছে। তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। সে তার সমস্ত চিন্তাভাবনাকে জীব-জন্তুর ইন্দ্রিয় ক্ষমতার মধ্যেই কেন্দ্রীভূত করে রেখেছে। তার চিন্তাশক্তি দেহ ও দেহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গণ্ডি থেকেও মুক্ত হয়নি।— [আল-আরবায়ীন ফি উসুলীদ্দীন, পৃ. ১৯৮]