📄 হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-এর বক্তব্য
রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. তার ইমদাদুস সুলুক বইয়ে একটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন, ”আক্বিদায়ে হুলুল কি তারদীদ” অর্থাৎ হুলুলের আকিদার খণ্ডন। রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. লিখেছেন,
"অনেক মূর্খকে অভিশপ্ত শয়তান মুজাসসিমা তথা দেহবাদী ফেরকায় নিপতিত করে। প্রথমে শয়তান মানুষের অন্তরে এই কথা ঢেলে দেয় যে, তুমি যে আকার ও আকৃতি তোমার ধ্যানে দেখছো, এটি হুবহু আল্লাহরই আকৃতি। এরপরে তাকে বাতিল আকৃতি দেখায়। নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহর আকার ও আকৃতির বিশ্বাস থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহর আকার ও আকৃতি আছে, এধরনের বাতিল বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল করে দেয়। কখনও এমন হয় যে এই মূর্খ আসমান ও জমিনের মাঝে একটি সিংহাসন বসা বিভিন্ন আকৃতি দেখতে পায়। বিষয়টি হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। মূর্খ লোকটি আগুন ও সিংহাসন দেখে ধোঁকায় পড়ে যায়। সে একে নিজের প্রভু মনে করে সিজদা করতে শুরু করে। এভাবে সে মুজাসসিমা (দেহবাদী) ফেরকার নিকৃষ্ট আকিদায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।" [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯১]
পরবর্তীতে তিনি লিখেছেন, "দেহবাদী নিকৃষ্ট আকিদার মুসীবত থেকে বাঁচার জন্য গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমদের নিকট শ্রেষ্ঠ দলিল রয়েছে। এসব দলিলের সারকথা হলো, সমস্ত নবী, পূর্ববর্তী সমস্ত উম্মত, বর্তমানের সকল মু'মিন-মুসলমান, সমস্ত আলেম ও শায়খ, ছোট-বড় সকলেই এক বাক্যে এ বিষয়ের উপর ঐকমত্য পোষণ করেছে এবং এ ব্যাপারে সকলের ইজমা রয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বা ও গুণাবলী জিসম বা দেহ থেকে পবিত্র। তিনি দেহ বিশিষ্ট সমস্ত সৃষ্টি ও এর আপেক্ষিক উপাদানের কোন কিছুর সাথে ন্যূনতম কোন সাদৃশ্য রাখেন না। সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহর নতুন অস্তিত্ব দানের মাধ্যমে অস্তিত্ব এসেছে। এগুলো আল্লাহ তায়ালাই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এগুলোর স্রষ্টা, তিনি অনাদি ও অনন্ত। স্পষ্ট কথা হলো, একটি বাতিল বিষয়ের আল্লাহর সকল প্রিয় বান্দাদের ঐকমত্য ও ইজমা কীভাবে হতে পারে? কখনও এটি হতে পারে না। সুতরাং এই মূর্খের আকিদা মূলত ভ্রান্ত। [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯১-১৯২]
হুলুলের আকিদা খণ্ডন: শয়তান অনেক মূর্খকে হুলুলের আকিদায় ফেলে দেয়। শয়তান তার অন্তরে বিভিন্ন ধরনের প্ররোচনা দিতে থাকে। অমূলক চিন্তা-ভাবনায় তাকে নিমজ্জিত করার চেষ্টা করে। শয়তানের এসব ভ্রান্ত প্ররোচনায় সে নিকৃষ্ট আকিদা-বিশ্বাসকে সঠিক মনে করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, শয়তান তাকে বলে, তোমার অন্তরাত্মায় যেসব অপ্রাকৃতিক জিনিস অবলোকন করছে এগুলো তোমারই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা। এজন্য তোমার বহির্জগতে এগুলো দেখতে পাও না। এরপর যখন সে ধ্যানে নিমগ্ন হয়, তখন নিজের অভ্যন্তরীণ কোন অপ্রাকৃতিক বস্তু দেখে, তখন সে মনে করে এগুলো তার অন্তরাত্মারই অংশ। মোরাকাবার সময় তার অন্তরে যে নূর দেখে একে সে নিজের অন্তরের অংশ মনে করে। ফলে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, আল্লাহ তার অন্তরে প্রবেশ করেছেন। আমরা এধরনের নিকৃষ্ট বিশ্বাস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
অনেক সময় কোন মূর্খের উপর যখন আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রবল হয়, তখন তার হাতে বিভিন্ন কারামত ও অলৌকিক জিনিস প্রকাশ পেতে শুরু করে। এ অবস্থায় শয়তান তার অন্তরে কু-মন্ত্রণা দেয় যে, তোমার এই আধ্যাত্মিক অবস্থাটা মূলত: আল্লাহ তায়ালাই। আল্লাহ তায়ালা তোমার মাঝে প্রবেশ করেছেন এবং এভাবে তার ক্ষমতা ও কুদরত প্রকাশ করেছেন। তখন এই মূর্খ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে হুলুলের আকিদা রাখতে শুরু করে। [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯২]
গাঙ্গুহী রহ. হুলুলের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে আলোচনা করে লেখেন, "স্পষ্টত: আল্লাহ তায়ালা সব কিছুকে বেষ্টন করে আছেন, তিনি সকল বস্তুর সাথে রয়েছেন, তিনি সব কিছুর নিকটবর্তী। অণু পরিমাণ বস্তুও আল্লাহর নিকট গোপন নয়। আসমান বা জমিনের একটি পরমাণুও আল্লাহর কাছে গোপন নয়। এরপরও আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টি থেকে পৃথক। সমস্ত মাখলুক বা সৃষ্টি আল্লাহর থেকে পৃথক। আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে মাখলুক প্রবেশ করা কিংবা কোন মাখলুকের মাঝে আল্লাহর প্রবেশ করা, দু'টোই অসম্ভব। সমস্ত নবী, ওলী ও উলামা হুলুলের আকিদার বিরোধী। এ বিষয়ে তারা সকলেই একমত। সুতরাং হুলুলের আকিদায় বিশ্বাসী এক ব্যক্তির আকিদা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সুতরাং এই আকিদা ভালোভাবেই স্মরণ রাখবে। " [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯৪]
রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. আকিদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে খুবই উচ্চাঙ্গের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি মুজাসসিমাদের কুফুরী আকিদা সম্পর্কে লিখেছেন, "অনেক মূর্খের সাথে শয়তান এধরনের আচরণ করে যে, প্রথমে তার অন্তরে এই কথাটি ঢেলে দেয়, আল্লাহ তায়ালা যে কোন আকৃতিতে আত্ম প্রকাশ করেন। এটি আল্লাহর আকৃতি। এই মূর্খ লোকটি যখন অন্তর থেকে এই বিশ্বাস লালন করতে শুরু করে, তখন সে মুজাসসিমা ফেরকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থাৎ আল্লাহর জন্য দেহ সাব্যস্ত করে সে কাফের হয়ে গেছে। [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৮৭]