📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 হুলুল?

📄 হুলুল?


হুলুল শব্দের অর্থ প্রবেশ করা। একটা বস্তু অন্য আরেকটির মাঝে প্রবেশ করার পর যদি উভয় বস্তু তাদের নিজ সত্ত্বা অবশিষ্ট রেখে বিদ্যমান থাকে তাহলে তাকে হুলুল বলে। অর্থাৎ যে বস্তু কোন কিছুর মাঝে ঢুকছে সেটিও তার নিজ সত্ত্বা ঠিক রাখবে আবার যার মাঝে প্রবেশ করছে, সেটিও তার নিজ সত্ত্বা অবশিষ্ট রাখবে। বিষয়টিকে আরবীতে হুলুল বলে। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে হুলুলের আকিদা সম্পূর্ণ কুফুরী। যেমন, কেউ যদি বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তায়ালা স্থানগতভাবে আসমানে রয়েছেন তাহলে এটি হুলুল হবে। কারণ আসমান একটি মাখলুক বা সৃষ্টি। কোন সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর সত্ত্বা প্রবেশ করেছেন বা আছেন এজাতীয় বিশ্বাসই মূলত: হুলুল।

বাস্তব ক্ষেত্রে হুলুলের একটি উদাহরণ হলো, চিনি ও বালির মিশ্রণ। এ মিশ্রণে চিনি ও বালি নিজ সত্ত্বা অবশিষ্ট রেখে অবস্থান করে থাকে। রসায়নের ভাষায় এধরনের মিশ্রণকে অসমসত্ত্ব মিশ্রণ বা Heterogeneous mix বলে। খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা আ. সম্পর্কে বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর সত্ত্বা হযরত ঈসা আ. এর মাঝে প্রবেশ করেছে। এটিও মূলত: হুলুল এর আকিদা থেকে এসেছে। মোট কথা, কোন সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর সত্ত্বা প্রবেশ করেছে, এজাতীয় বিশ্বাস রাখা হলো হুলুল। এই আকিদা নি:সন্দেহে কুফুরী।

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 ইতেহাদ?

📄 ইতেহাদ?


ইত্তেহাদ শব্দের অর্থ মিশে যাওয়া, একীভূত হওয়া। পরিভাষায়, দু'টি বস্তুর একটি যদি আরেকটির মাঝে প্রবেশের পর একটি বস্তু যদি নিজ সত্ত্বা অন্যটির মাঝে বিলীন করে দেয় অর্থাৎ একটা আরেকটার সাথে মিশে যায়, তাহলে একে ইত্তেহাদ বলে। ইত্তেহাদের উদাহরণ হলো, চিনি ও পানির মিশ্রণ। এক্ষেত্রে চিনির অস্তিত্ব পানির সাথে একীভূত হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে কেউ যদি এই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহর সত্ত্বা সৃষ্টির প্রত্যেক অণুতে বিন্দুতে মিশে আছে, কিংবা সৃষ্টির সব কিছুকে সে আল্লাহ বলে বিশ্বাস রাখে, তবে এটি ইত্তেহাদের আকিদা হবে।

হুলুল ও ইত্তেহাদ দু'টোই কুফুরী আকিদা। যারা ওয়াহদাতুল উজুদকে কুফুরী আকিদা বলার চেষ্টা করেন, তারা মূলত: এই দু'টি কুফুরী আকিদার কারণে একে কুফুরী বলেছেন। কিন্তু কেউ যদি এই দুটি আকিদা থেকে মুক্ত হয়ে ওয়াহদাতুল উজুদের আকিদায় বিশ্বাস রাখে, তবে তা কখনও কুফুরী হবে না।

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 আশরাফ আলী থানবী রহ.-এর বক্তব্য

📄 আশরাফ আলী থানবী রহ.-এর বক্তব্য


আশরাফ আলী থানবী রহ. বিভিন্ন কিতাবে ওয়াহদাতুল উজুদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এমনকি তিনি এর উপর একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। বাওয়াদিরুন নাওয়াদির কিতাবের ৬৪০ পৃষ্ঠায় থানবী রহ. এর এ পুস্তিকাটি রয়েছে। আশরাফ থানবী রহ. স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াহদাতুল উজুদের আকিদা হুলুল ও ইত্তেহাদ থেকে মুক্ত। তিনি বিভিন্ন জায়গায় বলেন, আমরা কখনও হুলুল ও ইত্তেহাদের আকিদা রাখি না। থানবী রহ. এধরনের স্পষ্ট বক্তব্য থাকার পরও লা-মাযহাবী শায়েখ মতিউর মাদানী দেওবন্দী আলেমদের উপর মিথ্যাচার করেছে।

ওয়াহদাতুল উজুদের ব্যাখ্যার সাথে হুলুল (স্রষ্টার প্রবেশবাদ) ও ইত্তেহাদ (স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক হওয়া) এর কোন সম্পর্ক নেই। তারা শুধু আল্লাহর একক ও স্বাধীন অস্তিত্বের কথা বলে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারও স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। শুধু ধারণাগত অস্তিত্ব রয়েছে। ওয়াহদাতুল উজুদের ব্যাখ্যাকারগণ ইত্তেহাদের প্রবক্তা নন যে, মহাবিশ্ব আল্লাহর অস্তিত্বের সাথে একীভূত হয়ে বিদ্যমান রয়েছে। তাদের বক্তব্য হুলুল থেকেও মুক্ত। কেননা হুলুলের ক্ষেত্রে যেটি প্রবেশ করছে এবং যার মধ্যে প্রবেশ করছে, দু'টোই বিদ্যমান থাকে, এরপর তাদের মাঝে একধরনের মিশ্রণ সৃষ্টি হয়। [বাওয়াদিরুন নাওয়াদির, পৃ. ৬৪৮]

থানবী রহ. এর এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে দেওবন্দী উলামায়ে কেরাম হুলুল ও ইত্তেহাদের আকিদা রাখে না। হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত আশরাফ আলী থানবী রহ. তার শরীয়ত ও ত্বরীকত বইয়ে লিখেছেন, "একইভাবে এক্ষেত্রে বুঝে নেয়া দরকার যে, ওয়াহদাতুল উজুদ বা হামা উস্ত (সব কিছুই তিনি) এর দ্বারা কখনও এটি উদ্দেশ্য নয় যে, আল্লাহ ও সৃষ্টি সব এক। বরং উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টির অস্তিত্ব গণনায় আনার মতো কিছুই নয়। বরং একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই ধর্তব্য। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর যতো সৃষ্টি রয়েছে, তাদেরও অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু সৃষ্টির কারও অস্তিত্ব স্বাধীন ও পরিপূর্ণ অস্তিত্বের তুলনায় কেমন যেন কোন অস্তিত্বই নেই। যাকে বাহ্য অস্তিত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা হলো, প্রত্যেকটি গুণের দু'টি স্তর রয়েছে। ১. পরিপূর্ণ ও ২. অপূর্ণ। আর স্বীকৃত নিয়ম হলো, পরিপূর্ণ গুণের তুলনায় অপূর্ণ গুণটিকে কেমন যেন অস্তিত্বহীন ধরা হয়। এর দৃষ্টান্ত হলো, একজন নিম্ন পর্যায়ের বিচারক তার আদালতে নিজের ক্ষমতা জাহির করছিলো। এই পদে থেকে সে সাধারণ কোন প্রজাকে কোন মূল্য দেয় না। হঠাৎ দেশের বাদশাহ ঐ আদালতে এসে উপস্থিত হলো। বাদশাহকে দেখেই সে দিশেহারা হয়ে গেলো। নিজের সব অহংকার, আত্মগরিমা ও বড়ত্বের দাবী সব কিছু মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেলো। সুতরাং একজন সাধারণ বিচারক যখন নিজের পদকে বাদশাহর পদের সাথে তুলনা করে, তখন নিজের পদের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পায় না। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখ থেকে আওয়াজ বের হয় না, মাথা তুলে তাকাতেও পারে না। এই সময় যদিও তার পদ একেবারে অস্তিত্বহীন নয়, তবে তা গণনায় আনার মতোও কিছু নয়।" [শরীয়ত ও ত্বরীকত, পৃ. ৩১০]

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-এর বক্তব্য

📄 হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-এর বক্তব্য


রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. তার ইমদাদুস সুলুক বইয়ে একটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন, ”আক্বিদায়ে হুলুল কি তারদীদ” অর্থাৎ হুলুলের আকিদার খণ্ডন। রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. লিখেছেন,

"অনেক মূর্খকে অভিশপ্ত শয়তান মুজাসসিমা তথা দেহবাদী ফেরকায় নিপতিত করে। প্রথমে শয়তান মানুষের অন্তরে এই কথা ঢেলে দেয় যে, তুমি যে আকার ও আকৃতি তোমার ধ্যানে দেখছো, এটি হুবহু আল্লাহরই আকৃতি। এরপরে তাকে বাতিল আকৃতি দেখায়। নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহর আকার ও আকৃতির বিশ্বাস থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহর আকার ও আকৃতি আছে, এধরনের বাতিল বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল করে দেয়। কখনও এমন হয় যে এই মূর্খ আসমান ও জমিনের মাঝে একটি সিংহাসন বসা বিভিন্ন আকৃতি দেখতে পায়। বিষয়টি হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। মূর্খ লোকটি আগুন ও সিংহাসন দেখে ধোঁকায় পড়ে যায়। সে একে নিজের প্রভু মনে করে সিজদা করতে শুরু করে। এভাবে সে মুজাসসিমা (দেহবাদী) ফেরকার নিকৃষ্ট আকিদায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।" [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯১]

পরবর্তীতে তিনি লিখেছেন, "দেহবাদী নিকৃষ্ট আকিদার মুসীবত থেকে বাঁচার জন্য গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমদের নিকট শ্রেষ্ঠ দলিল রয়েছে। এসব দলিলের সারকথা হলো, সমস্ত নবী, পূর্ববর্তী সমস্ত উম্মত, বর্তমানের সকল মু'মিন-মুসলমান, সমস্ত আলেম ও শায়খ, ছোট-বড় সকলেই এক বাক্যে এ বিষয়ের উপর ঐকমত্য পোষণ করেছে এবং এ ব্যাপারে সকলের ইজমা রয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বা ও গুণাবলী জিসম বা দেহ থেকে পবিত্র। তিনি দেহ বিশিষ্ট সমস্ত সৃষ্টি ও এর আপেক্ষিক উপাদানের কোন কিছুর সাথে ন্যূনতম কোন সাদৃশ্য রাখেন না। সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহর নতুন অস্তিত্ব দানের মাধ্যমে অস্তিত্ব এসেছে। এগুলো আল্লাহ তায়ালাই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা এগুলোর স্রষ্টা, তিনি অনাদি ও অনন্ত। স্পষ্ট কথা হলো, একটি বাতিল বিষয়ের আল্লাহর সকল প্রিয় বান্দাদের ঐকমত্য ও ইজমা কীভাবে হতে পারে? কখনও এটি হতে পারে না। সুতরাং এই মূর্খের আকিদা মূলত ভ্রান্ত। [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯১-১৯২]

হুলুলের আকিদা খণ্ডন: শয়তান অনেক মূর্খকে হুলুলের আকিদায় ফেলে দেয়। শয়তান তার অন্তরে বিভিন্ন ধরনের প্ররোচনা দিতে থাকে। অমূলক চিন্তা-ভাবনায় তাকে নিমজ্জিত করার চেষ্টা করে। শয়তানের এসব ভ্রান্ত প্ররোচনায় সে নিকৃষ্ট আকিদা-বিশ্বাসকে সঠিক মনে করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, শয়তান তাকে বলে, তোমার অন্তরাত্মায় যেসব অপ্রাকৃতিক জিনিস অবলোকন করছে এগুলো তোমারই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা। এজন্য তোমার বহির্জগতে এগুলো দেখতে পাও না। এরপর যখন সে ধ্যানে নিমগ্ন হয়, তখন নিজের অভ্যন্তরীণ কোন অপ্রাকৃতিক বস্তু দেখে, তখন সে মনে করে এগুলো তার অন্তরাত্মারই অংশ। মোরাকাবার সময় তার অন্তরে যে নূর দেখে একে সে নিজের অন্তরের অংশ মনে করে। ফলে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, আল্লাহ তার অন্তরে প্রবেশ করেছেন। আমরা এধরনের নিকৃষ্ট বিশ্বাস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

অনেক সময় কোন মূর্খের উপর যখন আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রবল হয়, তখন তার হাতে বিভিন্ন কারামত ও অলৌকিক জিনিস প্রকাশ পেতে শুরু করে। এ অবস্থায় শয়তান তার অন্তরে কু-মন্ত্রণা দেয় যে, তোমার এই আধ্যাত্মিক অবস্থাটা মূলত: আল্লাহ তায়ালাই। আল্লাহ তায়ালা তোমার মাঝে প্রবেশ করেছেন এবং এভাবে তার ক্ষমতা ও কুদরত প্রকাশ করেছেন। তখন এই মূর্খ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে হুলুলের আকিদা রাখতে শুরু করে। [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯২]

গাঙ্গুহী রহ. হুলুলের বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কে আলোচনা করে লেখেন, "স্পষ্টত: আল্লাহ তায়ালা সব কিছুকে বেষ্টন করে আছেন, তিনি সকল বস্তুর সাথে রয়েছেন, তিনি সব কিছুর নিকটবর্তী। অণু পরিমাণ বস্তুও আল্লাহর নিকট গোপন নয়। আসমান বা জমিনের একটি পরমাণুও আল্লাহর কাছে গোপন নয়। এরপরও আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টি থেকে পৃথক। সমস্ত মাখলুক বা সৃষ্টি আল্লাহর থেকে পৃথক। আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে মাখলুক প্রবেশ করা কিংবা কোন মাখলুকের মাঝে আল্লাহর প্রবেশ করা, দু'টোই অসম্ভব। সমস্ত নবী, ওলী ও উলামা হুলুলের আকিদার বিরোধী। এ বিষয়ে তারা সকলেই একমত। সুতরাং হুলুলের আকিদায় বিশ্বাসী এক ব্যক্তির আকিদা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সুতরাং এই আকিদা ভালোভাবেই স্মরণ রাখবে। " [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৯৪]

রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. আকিদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে খুবই উচ্চাঙ্গের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি মুজাসসিমাদের কুফুরী আকিদা সম্পর্কে লিখেছেন, "অনেক মূর্খের সাথে শয়তান এধরনের আচরণ করে যে, প্রথমে তার অন্তরে এই কথাটি ঢেলে দেয়, আল্লাহ তায়ালা যে কোন আকৃতিতে আত্ম প্রকাশ করেন। এটি আল্লাহর আকৃতি। এই মূর্খ লোকটি যখন অন্তর থেকে এই বিশ্বাস লালন করতে শুরু করে, তখন সে মুজাসসিমা ফেরকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। অর্থাৎ আল্লাহর জন্য দেহ সাব্যস্ত করে সে কাফের হয়ে গেছে। [ইমদাদুস সুলুক, পৃ. ১৮৭]

ফন্ট সাইজ
15px
17px