📄 আমরা হানাফী মাযহাবের অনুসারী হয়েও কেন আকীদায় মাতুরীদী আশয়ারী?
এ বিষয়টা অনেকে বুঝে উঠতে পারছেন না, তাই অনেকে কথিত সহিহ আকিদার দাবিদার শায়খগণ বরাবরের মতো প্রশ্ন ছুড়ে দেন।
হানাফি মাজহাব মানে কি ইমাম আবু হানিফার মাযহাব? ব্যাপকভাবে এই ধারণাই প্রচলিত। তবে এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মাযহাব হলো একটি পথ, পদ্ধতি ও ধারার নাম। ইমাম আবু হানিফা এই ধারার শীর্ষস্থানীয় একজন ব্যক্তিত্ব। এক্ষেত্রে তার উদ্যোগেই সর্বপ্রথম কুরআন ও সুন্নাহর ফিকহকে সংকলিত ও সুবিন্যস্ত করা হয়। নুসুস (কুরআন ও হাদিসের পাঠ) বোঝার জন্য মূলনীতি প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, এই মাযহাব একান্ত তার। বরং হানাফি মাযহাব হলো হাজার হাজার বিদগ্ধ ফকিহ ও উসুল শাস্ত্রবিদের গবেষণালব্ধ একটি ধারা ও পন্থার নাম।
হানাফি মাযহাব যদি শুধু ইমাম আবু হানিফার মাযহাব হতো, তাহলে সবক্ষেত্রে তার বক্তব্যই তো চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু এমনটি তো হয়নি। তার হাজারো বক্তব্য ও অভিমত পরিত্যাজ্য হয়ে আছে। এখনো নিত্যনতুন যত সমস্যার শরয়ি সমাধান এই মাযহাবের আলোকে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোও কি ইমাম আবু হানিফা দিয়ে গিয়েছিলেন? তিনি একাই যদি এর কর্ণধার হয়ে থাকেন, তাহলে পরবর্তীতে শত শত মুজতাহিদ এসে এই মাযহাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কী কাজ করলেন?
কারও নামের দিকে নিসবত করলেই কোনো জিনিস একান্ত তার প্রাইভেট প্রোপার্টি হয়ে যায় না। সমকামীকে আরবিতে বলা হয় 'লুতি'। এখন আক্ষরিক অর্থ করতে গেলে তো এই শব্দের অর্থ দাঁড়াবে, লুত আ.-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। অথচ বাস্তবতা হলো, সমকামিতা (নাউজুবিল্লাহ) তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। মুহাক্কিকগণ যদিও সতর্কতাস্বরূপ এই শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করেন; কিন্তু হাজারো বছর ধরে ব্যাকরণের কায়দা অনুসারে এই শব্দের ব্যবহার চলে আসছে। তো বলছিলাম, নিসবত বিভিন্ন বিবেচনায়ই হতে পারে। পরিভাষাকে বুঝতে হলে মূলনীতি অনুসারে বুঝতে হবে; এর যেনতেন মনগড়া ব্যাখ্যা সবক্ষেত্রে গৃহীত হবে না।
কারও কারও ধারণা, হানাফি মাযহাব মানে শুধু ফিকহি মাযহাব; আকিদার মাযহাব নয়। অথচ এটা তো হাস্যকরও বটে। মুকাল্লিদরা ইমামদের অনুসরণ করে। ইমামরা কি তাদেরকে দীনের মূল বিষয় না শিখিয়ে শুধু শাখাগত বিষয় শেখাবেন? আকিদা ছাড়া মানুষ চলে কীভাবে? তাদের প্রণীত কুরআন-সুন্নাহ গবেষণার মূলনীতির আলোকে গবেষণালব্ধ ফিকহ যদি বেরিয়ে আসতে পারে; তবে অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন আকিদা কেন বেরিয়ে আসবে না? উপরন্তু মুজতাহিদে মুতলাক ইমাম আবু হানিফা নিজে একজন মুতাকাল্লিম ছিলেন। তার পরবর্তী মুজতাহিদ ফিল মাযহাব যারা, তারাও মুতাকাল্লিম ছিলেন। খোদ আবু হানিফা আকিদার কিতাব রচনা করে গেছেন। এরপর ইমাম তহাবি ছাড়াও আরও শত শত ইমাম মাযহাবের উসুলের আলোকে আকিদার গ্রন্থাদি রচনা করেছেন। কোনো ব্যক্তিকে হানাফি বলা হলে এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, সে আকিদা ও ফিকহে হানাফি মাযহাব অনুসরণ করে। কেউ যদি উভয় ক্ষেত্রে অনুসরণ না করে কোনো এক ক্ষেত্রে অনুসরণ করে, তাহলে সেটা আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। যেমন, আল্লামা জারুল্লাহ জামাখশারি আংশিক হানাফি ছিলেন। তিনি ফিকহে হানাফি হলেও আকিদায় মুতাজিলি ছিলেন। তাই তার এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বিবৃত করে দেওয়া হয়। কারণ, সাধারণভাবে হানাফি বললে উভয় ক্ষেত্রে এই মাযহাবের অনুসারী বলেই বোঝায়।
এখন কেউ বলতে পারে, তাহলে এ কথা প্রচলিত হলো কীভাবে যে, হানাফিরা আকিদায় মাতুরিদি। প্রথম কথা হলো, নিসবতের বিষয়টি আপেক্ষিক। ওপরে আমরা এর উদাহরণও দেখিয়েছি। আকিদা তো চলে আসছে ইমাম আবু হানিফা থেকেই। সংক্ষিপ্ত গ্রন্থাদিও রচিত হয়েছে অনেক। কিন্তু আবু হানিফার তিরোধানের এক শতাব্দীরও কম সময়ে মুসলিম বিশ্বে আকিদাকেন্দ্রিক বড় বড় ফিতনা বিস্তার লাভ করে। তখন পূর্ববর্তীদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিক্ষাগুলোকে একত্র করে গ্রন্থবদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে। ইমাম মাতুরিদি রহ. এই কাজটি করেছেন। তিনি নিত্যনতুন আকিদা আবিষ্কার করেননি এবং এর সুযোগও কারও জন্য নেই। তবে তিনি পূর্ববর্তীদের আকিদা-বিষয়ক শিক্ষা ও আলোচনাগুলো একত্র করেন। সেগুলোকে যুগোপযোগী উপস্থাপনায় দলিল-প্রমাণের সঙ্গে গ্রন্থবদ্ধ রূপ দেন। আকিদা-বিষয়ক যে বিপুল ও সুবিশাল গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন, তার পূর্বে বিগত হওয়া একই মাজহাবের অন্যান্য ইমামগণ যদি এই খেদমতটি আঞ্জাম দিয়ে যেতেন, তাহলে তাকে আর আলাদাভাবে কসরত করতে হতো না।
ইমাম আবু হানিফা রহ. খুব বেশিকিছু গ্রন্থবদ্ধ করে যেতে পারেননি। হানাফি মাযহাবের ফিকহি অংশের ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর শিষ্য ইমাম মুহাম্মাদের গ্রন্থাবলির ওপর; বিশেষত জাহিরুর রিওয়ায়াত নামে প্রসিদ্ধ ছয়টি গ্রন্থের ওপর। তাই বলে এটা হানাফি মাযহাব থেকে বেরিয়ে মুহাম্মাদি মাযহাব হয়ে যায়নি। একইভাবে ইমাম মাতুরিদি কর্তৃক আকিদার খেদমত বিস্তৃতি লাভ করার দ্বারা এটা তার স্বতন্ত্র মাযহাব হয়ে যায়নি; বরং হানাফি মাযহাব হিসেবেই রয়েছে। এ জন্য তো ইমাম ইবনুল হুমাম রহ.-এর মতো বিদগ্ধ হানাফি ফকিহকেও লিখতে দেখা যায়, 'হকপন্থীদের উভয় দল হানাফি ও আশআরিরা একমত হয়েছে যে,...।' হিদায়া'র ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল কাদিরে প্রদত্ত তার এই বক্তব্যের ওপর তো কোনো হানাফিই আপত্তি করেনি। বরং এমন বক্তব্য ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ইমামের রচনায়।
কেউ বলতে পারে, ইমাম মাতুরিদি রহ. আকিদায় যুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন, তাই তিনি বিদআতি। এ কথার জবাবে আমরা বলব, আকিদার পক্ষে যুক্তি প্রদানের অগণিত নজির তো আমরা কুরআন ও সুন্নাহর পাতায় পাতায়ই দেখতে পাই। আল্লাহ তাআলা নিজেই তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ বা উলুহিয়্যাহর ওপর অসংখ্য যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। মুতাজিলাদের সঙ্গে মাতুরিদিদের পার্থক্য কোথায়? উভয় দল যদি যুক্তিপূজারীই হতো, তাহলে তাদের মধ্যে সাপ-বেজির সম্পর্ক কেন হলো? শুনে শুনে আর কতকাল অন্ধ বিরোধিতা করবেন? আল্লাহর দেওয়া আকলটা কোনোদিনও কি খাটাবেন না?
ইমাম মাতুরিদি কি যুক্তির ওপর ভিত্তি করে নিত্যনতুন আকিদা আবিষ্কার করেছেন নাকি প্রমাণিত আকিদার পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনার পাশাপাশি ফিতনাকারীদের ফিতনা নিরোধের জন্য এবং সংশয়গ্রস্তদের অন্তরের উপশমের জন্য যুক্তির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য দেখিয়েছেন? তিনি তো মডারেট লেখক আরিফ আজাদদের মতো যুক্তির ধাক্কায় ইসলামি আকিদাকে বিকৃত করেননি; বরং তার যুক্তিগুলোও ছিল সুদৃঢ় ও নিয়মানুগ। বর্তমানকালের এসব সেলিব্রিটি লেখক মনগড়া যুক্তি দ্বারা ইসলামি আকিদাকে উপস্থাপন করতে গিয়ে প্রায়শই ইসলামকে বিকৃত করে ফেলে; এরপরও এসব কালামপন্থীরা (যারা ইল্লত ও হিকমতের পার্থক্যটুকুও বোঝে না) সাধুবাদ পায়। আর কুরআন ও সুন্নাহর একনিষ্ঠ গবেষক বিদগ্ধ মুজতাহিদ ইমামরা দিনমান তোমাদের গালি খায়। এসব ডাবল স্ট্যান্ডার্ডবাজির শেষ কোথায়?
কেউ বলতে পারে, অমুক আর তমুক কালামের নিন্দা করেছেন। এর জবাবে বলব, শুধু তারাই নয়; বরং আজকে যাদেরকে কালামপন্থী বলে গালি দিচ্ছ, তারাও কালামের নিন্দা করেছেন। কিন্তু কোন কালাম নিন্দনীয় ও কোন কালাম আকিদাশস্ত্রের অপর নাম হিসেবে প্রশংসনীয়, তা কখনো জানার চেষ্টা করোনি। হাকিমুল উম্মত থানবি রহ.-এর 'আশরাফুল জওয়াব' এবং 'আল-ইনতিবাহাতুল মুফিদা' পড়লে সবাই প্রশংসায় মেতে ওঠে। নাস্তিকদের কুপোকাত করতে দেখে প্রফুল্ল বোধ করতে থাকে। কিন্তু এরা জানে না, এগুলোও কালাম। থানবি রহ. ইলমুল কালামকে যুগোপযোগী করেছেন, এর আলোকে বাতিলের সঙ্গে মুনাজারা-মুনাকাশা করেছেন। শুধু জাকির নায়েকই নয়, বাতিলপন্থীদের সংশয় নিবারণে কাজ করা এ ধরনের সব সেলিব্রিটির কথায় কথায় কালাম দেখানো যাবে।
কওমি মাদরাসার পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্ধারিত শরহে আকায়িদ কালামশাস্ত্রের কিতাব; কিন্তু এ কিতাবেই আবার কালামের নিন্দা করা হয়েছে। এরপর দুই কালামের পার্থক্য দেখানো হয়েছে। গ্রিক দর্শন প্রভাবিত কালামুল মুতাকাদ্দিমিন এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে গঠিত কালামুল মুতাআখখিরিন সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একই নামের দুই ব্যক্তি; একজন দেখা যায় চোর, আরেকজন দেখা যায় মহা দরবেশ। এখন এক কালামের ব্যাপারে প্রদত্ত উক্তিকে কেউ যদি অপব্যাখ্যা করে অন্য কালামের নামে চালিয়ে দেয়, তাহলে তাকে মাথামোটা অথর্ব ছাড়া আর কী নামে আখ্যায়িত করা যায়? সালাফগণের লেখায় পাতায় পাতায় আকিদা বিশেষজ্ঞ ইমামগণকে 'মুতাকাল্লিম' নামে স্মরণ করতে দেখা যায়। জালিমরা এখন এই শব্দেরই বা কী ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবে?
মোদ্দাকথা, আবু হানিফার আকিদাই মাতুরিদি আকিদা, তহাবির আকিদাই মাতুরিদি আকিদা। হানাফি আকিদা ও মাতুরিদি আকিদা সমার্থক দুটো শব্দ। দুই বিবেচনায় দুই নিসবত করা হয়; তবে উভয় নামই যথার্থ। হ্যাঁ, শাখাগত বিষয়ে এক মাজহাবের দুই মুজতাহিদের মধ্যেও কখনো মতানৈক্য হতে পারে। এটা আকিদার ক্ষেত্রেও হতে পারে, ফিকহের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এরপর পরবর্তী উম্মাহ সেটাকেই বিশ্লেষণসাপেক্ষে গ্রহণ করে, যেটা হকের অধিক নিকটবর্তী। মাজহাব কখনো ব্যক্তিপূজা শেখায় না। সুতরাং দালিলিক মতবিরোধ ছিল, আছে এবং কিয়ামত অবধি থাকবে। একমাত্র জড়গ্রস্ত ছাড়া আর কেউ দালিলিক মতভিন্নতার পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে না।
📄 আশয়ারী মাতুরীদীর আকীদায় চার ইমামের বিপরীত কিছু নেই
শায়েখ ডক্টর শরীফ হাতিম বিন আরিফ আল আওনী হাফি (উস্তাদ, উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি, মক্কাতুল মুকাররামা) তিনি লিখেন, কোন আলিম যখন নিজেকে ফিকহের ক্ষেত্রে চার ফকীহের একজনের দিকে আর আকীদায় ভিন্ন কেউ যেমন আশয়ারী মাতুরীদীর দিকে এবং তরীকতের ক্ষেত্রে কোন সূফী বুযুর্গের দিকে নিজেকে সম্বন্ধিত করেন তখন অনেক সালাফী অবাক হয় এবং তাদের নিম্নোক্ত কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে যে, "আশয়ারীর আকীদা মালিকের ফিকহ আর সালিক জুনায়েদের তরীকা"
এক্ষেত্রে তাদের বিস্ময়ের জায়গাটা হল, ফিকহের ইমামদের ফিকহের ব্যাপারে যেমন তারা সন্তুষ্ট হয়েছে তেমনিভাবে তারা ফিকহের ইমামদের আকীদায় কেন সন্তুষ্ট হচ্ছে না অথচ তারা নিঃসন্দেহে অধিক জ্ঞানী এবং শ্রেষ্ঠ। কেন তারা এ ফকীহদের থেকে যেমনিভাবে ইবাদত ও লেনদেনের ফিকহ শিক্ষা করেছে তেমনিভাবে তাদের ইবাদত, যুহদ এবং আখলাকের পথ অবলম্বন করছে না?
এ বিস্ময়ের ক্ষেত্রে আসলে তাদের ভুল হচ্ছে ও প্রতিপক্ষের বক্তব্য অনুধাবনে মূলত ত্রুটি হচ্ছে এবং এটা বারবার হচ্ছে। কারণ, তারা ফিকহে চার ফকীহের কারো দিকে সম্পৃক্ত হওয়া সত্ত্বেও যখন আকীদার ক্ষেত্রে নিজেকে আশয়ারী মাতুরীদীর দিকে সম্পৃক্ত করছেন তাহলে তারা আশয়ারী মাতুরীদীর আকীদার মাঝে আবু হানিফা, মালিক, শাফিয়ীর আকীদার বিরোধী কিছু দেখছেন না বরং আশয়ারী মাতুরীদীকে সালাফের মতের যোগ্য অনুসারী হিসেবেই দেখছেন, তবে তারা সালাফের আকীদার বিশ্লেষণ করেছেন, এর পক্ষে বিস্তারিত দলিল পেশ করেছেন এবং বিভিন্ন সংশয়ের অপনোদন করেছেন।
তাদের উভয়ের দিকে নিজকে সম্পৃক্ত করাটা এ বিশ্বাসের কারণে নয় যে তারা ফিকহের ইমামদের আকীদার বিরোধী কিছু বলেছেন এবং এ কারণেও নয় যেমনটি কতেক নিন্দুক ধারণা করে যে তারা নিজস্ব কিছু বিদয়াতী আকীদা পেশ করেছেন। সুতরাং তাদের কাছে আকীদার ক্ষেত্রে আশয়ারী মাতুরীদীর দিকে সম্বন্ধিত হওয়াটা হুবহু ফিকহের ক্ষেত্রে ফিকহের ইমামদের দিকে সম্বন্ধিত হওয়ার মত একই বিষয়।
যদি কোন হাম্বলীকে বলা হয়, তুমি খালাফের উপর সালাফের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাবে তাবেয়ীদের অনুসারীদের উপর সাহাবিদের ফিকহের শ্রেষ্ঠত্ব মানা সত্ত্বেও কেন তুমি আহমদ বিন হাম্বলের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত কর? যদি তুমি সত্যিকারের সালাফী হয়ে থাক তাহলে নিজেকে হাম্বলীদের দিকে সম্পৃক্ত না করে সালাফের দিকে সম্পৃক্ত কর। তখন সে বলবে মূলত আমি আহমদের দিকে সম্বন্ধিত হওয়া এবং বিশেষভাবে তার ফিকহ গ্রহণ করার কারণ হল তিনি আমার নিকট সর্বোত্তম ও সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি যিনি আমার কাছে সালাফের ফিকহ সহজে পেশ করেছেন, সে অনুসারে মাসয়ালা বের করেছেন এবং সমাধানমূলক ফয়সালা প্রদান করেছেন।
ঠিক একই কথা প্রযোজ্য জুনাইদ কিংবা অন্যান্য শরীয়ত অনুসারী সূফীদের প্রতি নিজেকে সম্বন্ধিত করার ক্ষেত্রে (তাসাউফের নামে ভ্রান্তিতে লিপ্ত সূফীরা নয়)। সুতরাং যারা তার কিংবা অন্যান্য যাহিদ আবিদদের দিকে নিজেদের সম্পৃক্ত করে থাকে তারা মূলত যুহদের ক্ষেত্রে তাদের পদাংক অনুসরণ করে থাকে এবং তাদের এ তরীকায় সালাফের তরীকার বিপরীত কিছু দেখে না, তবে তারা এক্ষেত্রে কিছুটা বিশ্লেষণ এবং সূক্ষ্ম পর্যালোচনা করেছেন।
সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি এ সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে আপত্তি তুলতে চায় সে যেন আপত্তির কারণ স্পষ্ট করে বলে যাতে করে তা পর্যালোচনা করা যায়, যেমন অমুকের আকীদার সাথে সালাফের আকীদায় মিল নেই কিংবা অমুকের যুহদের পদ্ধতির সাথে সালাফের পদ্ধতির মিল নেই, এটা দলীল প্রমান সহ পেশ করতে হবে।..... আর যদি আমরা এখনও আশয়ারীর দিকে সম্পৃক্ততার কারণে আপত্তি করতে থাকি এবং ভাবতে থাকি আশয়ারীদের আকীদা শাফেয়ীর আকীদার চেয়ে ভিন্ন এবং তাদের স্ববিরোধিতার অভিযোগ তুলতে থাকি যেমনটা অহরহ ঘটছে তাহলে এটা হবে বিরাট ভুল এবং অবাস্তব ভাবনা যা সঠিক আলোচনার সহায়ক নয়।
এরকমটা বিভিন্ন মাসয়ালার ক্ষেত্রে বারবার ঘটে চলেছে বরং এ ভুল ভাবনাটা কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে অন্যদের ব্যাপারে এমন কিছু বিষয় জড়িয়ে দিচ্ছে যেক্ষেত্রে তারাও স্পষ্টভাবে বলে থাকেন যে তারা এটা মানেন না।— [রাওয়ায়ে মিন কিতাবাতিশ শায়খ হাতিম আওনী খণ্ড-২ পৃষ্ঠা ৪০৪-৪০৫]
📄 চার মাযহাবের সকলই আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত
এখানে কারো মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে, ইসলামী আকীদা বিশ্বাস নিয়ে মতভেদ করে তেয়াত্তর দলে বিভক্ত মুসলমানদের বাহাত্তর দলই যেহেতু ভ্রান্ত হওয়ার কারণে জাহান্নামে যাবে, তাহলে কি ইসলামী আমলের বেলায় মুসলমানগণ চার মাযহাবে বিভক্ত হওয়ার কারণেও কোন একটা মাত্র মাযহাবের অনুসারীগণ জান্নাতী আর বাকিরা জাহান্নামী হবে? এ সম্পর্কে হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ লেখেনঃ-
قال الشيخ في البذل المراد من هذا الفرق الفرق المذموم الواقع في أصول الدين، وأما اختلاف الأئمة في الفروع فليس بمذموم، بل هو من رحمة الله - سبحانه - فإنك ترى أن الفرق المختلفة في الفروع كلها متحدة في الأصول ولا يضل بعضهم بعضا، وأما المنفرقون في الأصول فيكفر بعضهم بعضا
অর্থাৎ, শায়খ খলীল আহমদ সাহারানপুরী রহ, আবু দাউদ শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ বজলুল মজহুদে বলেন, আলোচ্য হাদীসে মুসলমানদের দলাদলি বলতে ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস সংক্রান্ত দলাদলি বুঝানো হয়েছে। পক্ষান্তরে মাযহাবের ইমামগণ ইসলামী আমলের ব্যাপারে যে মতভেদ করেছেন, সেটা নিন্দনীয় নয়; বরং আল্লাহ পাকের বিশেষ রহমত। তাই আপনি দেখবেন, আমল সংক্রান্ত ব্যাপারে যারা মতভেদ করেছেন তাদের সকলেই আকীদার ব্যাপারে একমত হওয়ায় তাদের এক মাযহাবের অনুসারীরা অন্য মাযহাবের অনুসারীগণকে পথভ্রষ্ট বলেন না। অথচ আকীদার ব্যাপারে মতভেদকারী বাহাত্তর দলের একদল আরেক দলকে কাফির বলে।— [হাশিয়া আল কাউকাবুদ দুররি: ২/১২৮]
এখানে মাযহাবের ইমামগণের মতভেদকে আল্লাহর রহমত বলা হয়েছে। কারণ রাসূল সা, সহীহ হাদীসে এ পর্যায়ের মতভেদের উভয় পক্ষেই সাওয়াব আছে বলে উল্লেখ করেছেন এবং সাহাবাগণের এমন মতভেদকে সমর্থন দিয়েছেন— [বুখারী শরীফ: হাদীস নং- ৬৯১৯, মুসলিম শরীফ : হাদীস নং- ৪৫৮৪]
বিশেষতঃ চার মাযহাব সম্পর্কে তাফসীরে আহমদিয়া উল্লেখ আছে : قد وقع الإجماع على أن الاتباع إنما يجوز لأربع، لا يجوز الاتباع لمن حدث مجتهدا مخالفا لهم والإنصاف أن انحصار المذاهب في الأربعة واتباعهم فضل إلهي وقبولية من عند الله تعالى، لامجال فيه لتوجيهات والأدلة
অর্থাৎ, এ কথার উপর উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, অনুসরণ শুধুমাত্র চার মাযহাবের করা যাবে। এ ছাড়া নতুন কোন মুজতাহিদ যদি চার মাযহাবের পরিপন্থী কিছু বলেন, তবে তার অনুসরণ করা বৈধ হবে না। আর ইনসাফভিত্তিক কথা হল, মাযহাব চারটিতে সীমাবদ্ধ হওয়া এবং এগুলির অনুসরণ আল্লাহ পাকের বিশেষ অনুগ্রহ এবং তাঁর কাছে কবুল হওয়ার ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে কোন প্রমাণ পেশ করা বা ব্যাখ্যা প্রদানেরও প্রয়োজনীয়তা বাকি নেই— [তাফসীরে আহমদী/ কৃত আল্লামা মোল্লা জীওন রহঃ ৫২৬-৫২৭, সূরা আম্বিয়া-৭৮]
এর কারণ, চার মাযহাবের ইমামগণ ছাড়া আর যত মুজতাহিদ ছিলেন, তাদের কারো মাযহাব পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেনি। অর্থাৎ সব বিষয়ের সমাধান আমাদের মাযহাবে স্থান পায়নি বলে তাঁদের মাযহাব গুলো সুবিন্যস্ত হয়নি। বরং এমনটা হয়েছে শুধু চার মাযহাবের বেলায়।— [তাক্বলীদ কি শরয়ী হাইসিয়াত : ৭৮-৮৫]
সুতরাং চার মাযহাবের ইজতিহাদ গত মতভেদের কারণে এগুলির কোন অনুসারীর গুনাহগার হয়ে জাহান্নামী হওয়ার প্রশ্নই আসে না। বরং মাযহাব চতুষ্টয়ের অনুসারীরাই সাওয়াবের অধিকারী হয়ে জান্নাতী হবে। মোটকথা, আক্বাইদের বেলায় চার মাযহাবের সকলেই যেহেতু ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদা বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ এবং আমলের বেলায় তাদের মতভেদটাও সুন্নতে রাসূল এবং জমাতে সাহাবা দ্বারা সমর্থিত, তাই চার মাযহাবের সবাই আহলে সুন্নত ওয়াল জমাতের অন্তর্ভুক্ত। যাই হোক, চার মাযহাবের এখতেলাফটা হাদিস ইফতিরাকুল উম্মত এর আওতাভুক্ত নয়।
প্রকাশ থাকা আবশ্যক যে, কেউ যদি ফিকাহর বেলায় চার মাযহাবের কোন একটার অনুসারী হয়েও আকীদার বেলায় আহলে সুন্নতের অনুসারী না হয়, তাহলে সে প্রকৃত অর্থে মাযহাব চতুষ্টয়ের কোন একটার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে না। কারণ মুসলমান হওয়ার আগে যেমন কোন মানুষ আহলে সুন্নত ওয়াল জমাত হতে পারে না, তেমনিভাবে আহলে সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে কেউ চার মাযহাবের কোন একটার অনুসারী হতে পারে না।
📄 আল্লাহ তায়ালার অবস্থান সম্পর্কে দেওবন্দী আলেমগণের সুস্পষ্ট বক্তব্য
বিখ্যাত মুফাসসির আব্দুল হক হক্কানী রহ (১২৬৭-১৩৩৫ হিজরী). এর বক্তব্যঃ
ইসলামী আকিদা বিষয়ে আব্দুল হক দেহলবী রহ. (তাফসীরে হক্কানী এর লেখক) এর বিখ্যাত একটি কিতাব রয়েছে। আকাইদুল ইসলাম। এটি ১৩০২ হিজরী সালে উদুর্তে ছাপা হয়। মাতবায়ে আনসারে দিল্লী থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এই কিতাবের শুরুতে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. এর সংক্ষিপ্ত অভিমত রয়েছে। কিতাবটি সম্পর্কে কাসেম নানুতুবী রহ. বলেন,
“উর্দু ভাষায় এটি একটি অদ্বিতীয় কিতাব। আমি কিতাবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি। সত্য কথা হলো, উর্দু ভাষায় ইতোপূর্বে এধরণের কোন কিতাব লেখা হয়নি। বিষয়বস্তুর দিক থেকেও এধরনের কোন কিতাব প্রকাশিত হয়নি। কিতাবটি লেখকের গভীর পান্ডিত্যের উজ্জল সাক্ষর। প্রবাদ রয়েছে, মানুষকে তার বক্তব্য ও লেখনী থেকে চেনা যায়। অতিরিক্ত ভূমিকা লেখা অর্থহীন। পাঠক নিজেই দেখে নিন, কিতাবটি কতো অসাধারণ।"
উলামায়ে দেওবন্দের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও সুফী আব্দুল হক দেহলবী রহ. তার আকাইদুল ইসলাম-এ লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব ও অবস্থানের জন্য কোন স্থানের প্রয়োজন নেই। কেননা দেহবিশিষ্ট ও স্থানিক বস্তুর জন্যই কেবল অবস্থানের জন্য জায়গার প্রয়োজন হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা দেহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। সুতরাং তিনি আসমানে থাকেন না। তিনি জমিনে অবস্থান করেন না। পূর্ব-পশ্চিম কোথাও তিনি থাকেন না। বরং সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর নিকট একটি অণু-পরমাণুতুল্য। সুতরাং তিনি এই ক্ষুদ্র সৃষ্টির মাঝে কেন অবস্থান করবেন? তবে সৃষ্টির সব কিছুই আল্লাহর সামনে পূর্ণ উদ্ভাসিত। কোন কিছুই তাঁর থেকে সুপ্ত বা অজ্ঞাত নয়। সকল স্থান ও জায়গা আল্লাহর নিকট সমান।
আব্দুল হক দেহলবী রহ. বলেন, আল্লাহ তায়ালা কারও সমগোত্রীয় নন। তাঁর সাথে তুলনীয় কিছুই নেই। তিনি কোন বস্তুর সাথে মিশ্রিত বা একীভূতও নন। আল্লাহর সত্তা কোন কিছুর সাথে মিশ্রিত বা একীভূত নন, এই কথার ব্যাখায় তিনি বলেন, “আল্লাহর সত্তার সাথে কোন কিছু একীভূত নয়। কেননা, আল্লাহর সত্তা ছাড়া সব কিছুই সৃষ্টি। আর সৃষ্টির কোন কিছু আল্লাহর সত্তার সাথে মিশ্রিত হতে পারে, এধরণের ধারণা রাখা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কিছু অজ্ঞ লোক বলে থাকে, মানুষ, গাছ-পালা, পাথর সব কিছুই আল্লাহ। তাদের এধরণের বিশ্বাস সুস্পষ্ট কুফুরী। কিছু কিছু সূফী ওয়াহদাতুল উজুদের কথা বলেছেন। তাদের থেকেও একথা প্রমাণিত নয় যে, সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহ। কেননা এসব সূফীগণ জিদ্দাতুল উজুদের প্রবক্তা। জিদ্দাতুল উজুদের অর্থ হলো, প্রকৃত, স্বাধীন ও একচ্ছত্র অস্তিত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। আল্লাহর দেয়া অস্তিত্বের কারণে সৃষ্টি ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব লাভ করেছে। বাস্তবে সৃষ্টির অস্তিত্ব স্বাধীন ও মৌলিক নয়। সুতরাং ওয়াহদাতুল উজুদের প্রবক্তা সূফীগণ স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে অভিন্ন বিশ্বাস করেন না। কারণ, এটি সুস্পষ্ট কুফুরী।“
আব্দুল হক দেহলবী রহ. আরও স্পষ্টভাষায় লিখেছেন, “কেউ যদি বলে, ওয়াহদাতুল উজুদের মাধ্যমে স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক ও অভিন্ন হওয়া প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা বলব, এটি সুস্পষ্ট কুফুরী। যেই এ মতবাদের প্রবক্তা হোক, আমরা এটিকে অবশ্যই কুফুরী বিশ্বাস করি। আমরা পবিত্র কুরআনের উপর ইমান এনেছি। এ ব্যক্তি এর সম্পূর্ণ বিরোধী”।
একটি জিনিস অনন্য কিছুর মাঝে প্রবেশ ও এর সাথে মিশে যাওয়াকে পরিভাষায় হুলুল বলে। যেমন কাপড়ের সাথে কালো বা সাদা রঙ মিশে যায়। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ ও মিশে যাওয়া অবাস্তব ও অসম্ভব। একটি বস্তু অন্য কিছুর মাঝে প্রবেশ করলে এটি প্রবেশকৃত বস্তুর মুখাপেক্ষী হয়। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা যদি কোন সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেন, তাহলে তিনিও উক্ত সৃষ্টির মুখাপেক্ষী হবেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। একইভাবে আল্লাহ তায়ালার মাঝেও কোন সৃষ্টি প্রবেশ করে না। কোন সৃষ্টি যদি আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে প্রবেশ করতো, তাহলে তিনি নশ্বর সৃষ্টির অবস্থানের জায়গা ও ধারক হতেন। আর কোন সৃষ্টি বা নশ্বর বস্তুর ধারক বা পাত্রও একটি সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা এগুলো থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। সুতরাং পাত্রের মাঝে যেভাবে পানি থাকে অথবা কাপড়ের সাথে রঙ মিশে থাকে, এভাবে আল্লাহ তায়ালা কোন সৃষ্টির মাঝে অনুপ্রবেশ থেকে পবিত্র। গরম পানি ঠান্ডা পানির সাথে মিশে যেভাবে একাকার হয়ে যায় অথবা বরফ গলে যেমন পানি হয়ে যায়, এভাবে কোন সৃষ্টি আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ ও মিশে যায় না। কিছু অজ্ঞ লোক বলে থাকে, সৃষ্টি বিশেষভাবে কামেল আল্লাহর ওলী, আল্লাহর সত্তার সাথে এমনভাবে মিশে যায়, যেমন বরফ পানির সাথে মিশে যায়, অথবা একফোঁটা পানি মহাসমুদ্রের মাঝে হারিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ বিশ্বাস করে, আল্লাহর ওলী ও আল্লাহ এক ও অভিন্ন। কেননা, আল্লাহর ওলীরা আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ করে একীভূত হয়ে যায়। এধরনের সকল আকিদা-বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও সুস্পষ্ট কুফুরী।
ইদ্রীস কান্ধলবী রহ এর বক্তব্যঃ
বিখ্যাত আলেম ইদ্রীস কান্ধলবী রহ. তাঁর বিখ্যাত কিতাব আকাইদুল ইসলামে লিখেছেন, “মহান আল্লাহ তায়ালা সমস্ত অপূর্ণতা, দোষ-ত্রুটি, নশ্বরতা ও ধ্বংসশীল সব ধরনের বিষয় থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি দেহ বিশিষ্ট নন। তিনি কোন স্থানে অবস্থান করেন না। সময়ের সীমাবদ্ধতা দ্বারাও তিনি সীমিত নন। মৌল উপাদান (অণু-পরমাণু), দেহ (দৈঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট বস্তু) ও আপেক্ষিক উপাদান এ এগুলোর আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্য থেকেও আল্লাহ তায়ালা মুক্ত ও পবিত্র। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে স্থানে অবস্থান ও সময়ের দ্বারা সীমিত হওয়ার বিষয়টি অবাস্তব ও অকল্পনীয়। এসব কিছুই মহান আল্লাহর সৃষ্টি।
ইদ্রীস কান্ধলবী রহ. আরও লিখেছেন, “আল্লাহ তায়ালা কোন সৃষ্টির সাথে একীভূত নন। কোন সৃষ্টিও আল্লাহর সাথে একীভূত নয়। কোন সৃষ্টি আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালাও কোন সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেন না। খ্রিস্টানদের নিকট আল্লাহ তায়ালা ইসা আ. এর মাঝে প্রবেশ করেছে। হিন্দুদের নিকট আল্লাহ তায়ালা মানুষ, জীব-জন্তু, গাছ-পালা ও পাহাড়-পর্বতের মাঝে প্রবেশ করে। সামেরীর বিশ্বাস ছিলো, আল্লাহ তায়ালা বাছুরের মাঝে প্রবেশ করেছে। ইন্ডিয়ার গাভী পূজারীরা মূলত: মিশরের সামেরীর অনুসারী। হিন্দুদের অস্পৃশ্যতার ধারণাটাও সামেরীর থেকে এসেছে। সে বলতো, আমাকে কেউ স্পর্শ করো না। একইভাবে হিন্দুরা কোন মুসলমানকে দেখলে বলে, আমাকে স্পর্শ করো না। মোটকথা, হিন্দুদের গরুপূজা, অস্পৃশ্যতা এগুলোর উৎসমূল মুসা আ. এর সময়ের সামেরী থেকে পাওয়া যায়।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহ. সামেরীর আলোচনায় লিখেছেন, সে হুলুলিয়া ফেরকার অন্তর্ভূক্ত ছিলো। যারা সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর প্রবেশের বিশ্বাস রাখে। ভারত উপমহাদেশের হিন্দুরাও তার অনুসারী। বরং উপমহাদেশের হিন্দুরা তার চেয়েও অগ্রসর। কেননা, সামেরী থেকে একথা প্রমাণিত নয় যে, সে গাভীর পেশাব পান করতো। গরু-গাভী নির্বুদ্ধিতার উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাউকে যদি নির্বোধ বলতে হয়, তাহলে আমরা তাকে গরু বলি। হিন্দুদের অবস্থা দেখো। এক দিকে তো একটা অবলা প্রাণিকে নিজেদের প্রভূ বানিয়েছে। আবার জীব-জন্তুর মধ্যে এমন একটাকে বাছাই করেছে যেটি নির্বুদ্ধিতার ক্ষেত্রে বিশেষ উপমা। হিন্দুদের এই প্রভূ বাছাই থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে, নির্বুদ্ধিতার দিক থেকে এরা গরু-গাভীর থেকে অধম। অথচ কোন দিক থেকে সৃষ্টি বা মানুষ স্রষ্টা থেকে উন্নত ও পরিপূর্ণ হওয়া অসম্ভব ও অকল্পনীয়।
বিখ্যাত মুফাসসির আব্দুল হক হক্কানী রহ (১২৬৭-১৩৩৫ হিজরী). এর বক্তব্যঃ
ইসলামী আকিদা বিষয়ে আব্দুল হক দেহলবী রহ. (তাফসীরে হক্কানী এর লেখক) এর বিখ্যাত একটি কিতাব রয়েছে। আকাইদুল ইসলাম। এটি ১৩০২ হিজরী সালে উদুর্তে ছাপা হয়। মাতবায়ে আনসারে দিল্লী থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এই কিতাবের শুরুতে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. এর সংক্ষিপ্ত অভিমত রয়েছে। কিতাবটি সম্পর্কে কাসেম নানুতুবী রহ. বলেন,
“উর্দু ভাষায় এটি একটি অদ্বিতীয় কিতাব। আমি কিতাবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি। সত্য কথা হলো, উর্দু ভাষায় ইতোপূর্বে এধরণের কোন কিতাব লেখা হয়নি। বিষয়বস্তুর দিক থেকেও এধরনের কোন কিতাব প্রকাশিত হয়নি। কিতাবটি লেখকের গভীর পান্ডিত্যের উজ্জল সাক্ষর। প্রবাদ রয়েছে, মানুষকে তার বক্তব্য ও লেখনী থেকে চেনা যায়। অতিরিক্ত ভূমিকা লেখা অর্থহীন। পাঠক নিজেই দেখে নিন, কিতাবটি কতো অসাধারণ।"
উলামায়ে দেওবন্দের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও সুফী আব্দুল হক দেহলবী রহ. তার আকাইদুল ইসলাম-এ লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব ও অবস্থানের জন্য কোন স্থানের প্রয়োজন নেই। কেননা দেহবিশিষ্ট ও স্থানিক বস্তুর জন্যই কেবল অবস্থানের জন্য জায়গার প্রয়োজন হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা দেহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। সুতরাং তিনি আসমানে থাকেন না। তিনি জমিনে অবস্থান করেন না। পূর্ব-পশ্চিম কোথাও তিনি থাকেন না। বরং সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর নিকট একটি অণু-পরমাণুতুল্য। সুতরাং তিনি এই ক্ষুদ্র সৃষ্টির মাঝে কেন অবস্থান করবেন? তবে সৃষ্টির সব কিছুই আল্লাহর সামনে পূর্ণ উদ্ভাসিত। কোন কিছুই তাঁর থেকে সুপ্ত বা অজ্ঞাত নয়। সকল স্থান ও জায়গা আল্লাহর নিকট সমান।
আব্দুল হক দেহলবী রহ. বলেন, আল্লাহ তায়ালা কারও সমগোত্রীয় নন। তাঁর সাথে তুলনীয় কিছুই নেই। তিনি কোন বস্তুর সাথে মিশ্রিত বা একীভূতও নন। আল্লাহর সত্তা কোন কিছুর সাথে মিশ্রিত বা একীভূত নন, এই কথার ব্যাখায় তিনি বলেন, “আল্লাহর সত্তার সাথে কোন কিছু একীভূত নয়। কেননা, আল্লাহর সত্তা ছাড়া সব কিছুই সৃষ্টি। আর সৃষ্টির কোন কিছু আল্লাহর সত্তার সাথে মিশ্রিত হতে পারে, এধরণের ধারণা রাখা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কিছু অজ্ঞ লোক বলে থাকে, মানুষ, গাছ-পালা, পাথর সব কিছুই আল্লাহ। তাদের এধরণের বিশ্বাস সুস্পষ্ট কুফুরী। কিছু কিছু সূফী ওয়াহদাতুল উজুদের কথা বলেছেন। তাদের থেকেও একথা প্রমাণিত নয় যে, সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহ। কেননা এসব সূফীগণ জিদ্দাতুল উজুদের প্রবক্তা। জিদ্দাতুল উজুদের অর্থ হলো, প্রকৃত, স্বাধীন ও একচ্ছত্র অস্তিত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। আল্লাহর দেয়া অস্তিত্বের কারণে সৃষ্টি ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব লাভ করেছে। বাস্তবে সৃষ্টির অস্তিত্ব স্বাধীন ও মৌলিক নয়। সুতরাং ওয়াহদাতুল উজুদের প্রবক্তা সূফীগণ স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে অভিন্ন বিশ্বাস করেন না। কারণ, এটি সুস্পষ্ট কুফুরী।“
আব্দুল হক দেহলবী রহ. আরও স্পষ্টভাষায় লিখেছেন, “কেউ যদি বলে, ওয়াহদাতুল উজুদের মাধ্যমে স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক ও অভিন্ন হওয়া প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা বলব, এটি সুস্পষ্ট কুফুরী। যেই এ মতবাদের প্রবক্তা হোক, আমরা এটিকে অবশ্যই কুফুরী বিশ্বাস করি। আমরা পবিত্র কুরআনের উপর ইমান এনেছি। এ ব্যক্তি এর সম্পূর্ণ বিরোধী”।
একটি জিনিস অনন্য কিছুর মাঝে প্রবেশ ও এর সাথে মিশে যাওয়াকে পরিভাষায় হুলুল বলে। যেমন কাপড়ের সাথে কালো বা সাদা রঙ মিশে যায়। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ ও মিশে যাওয়া অবাস্তব ও অসম্ভব। একটি বস্তু অন্য কিছুর মাঝে প্রবেশ করলে এটি প্রবেশকৃত বস্তুর মুখাপেক্ষী হয়। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা যদি কোন সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেন, তাহলে তিনিও উক্ত সৃষ্টির মুখাপেক্ষী হবেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। একইভাবে আল্লাহ তায়ালার মাঝেও কোন সৃষ্টি প্রবেশ করে না। কোন সৃষ্টি যদি আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে প্রবেশ করতো, তাহলে তিনি নশ্বর সৃষ্টির অবস্থানের জায়গা ও ধারক হতেন। আর কোন সৃষ্টি বা নশ্বর বস্তুর ধারক বা পাত্রও একটি সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা এগুলো থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। সুতরাং পাত্রের মাঝে যেভাবে পানি থাকে অথবা কাপড়ের সাথে রঙ মিশে থাকে, এভাবে আল্লাহ তায়ালা কোন সৃষ্টির মাঝে অনুপ্রবেশ থেকে পবিত্র। গরম পানি ঠান্ডা পানির সাথে মিশে যেভাবে একাকার হয়ে যায় অথবা বরফ গলে যেমন পানি হয়ে যায়, এভাবে কোন সৃষ্টি আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ ও মিশে যায় না। কিছু অজ্ঞ লোক বলে থাকে, সৃষ্টি বিশেষভাবে কামেল আল্লাহর ওলী, আল্লাহর সত্তার সাথে এমনভাবে মিশে যায়, যেমন বরফ পানির সাথে মিশে যায়, অথবা একফোঁটা পানি মহাসমুদ্রের মাঝে হারিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ বিশ্বাস করে, আল্লাহর ওলী ও আল্লাহ এক ও অভিন্ন। কেননা, আল্লাহর ওলীরা আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ করে একীভূত হয়ে যায়। এধরনের সকল আকিদা-বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও সুস্পষ্ট কুফুরী।
ইদ্রীস কান্ধলবী রহ এর বক্তব্যঃ
বিখ্যাত আলেম ইদ্রীস কান্ধলবী রহ. তাঁর বিখ্যাত কিতাব আকাইদুল ইসলামে লিখেছেন, “মহান আল্লাহ তায়ালা সমস্ত অপূর্ণতা, দোষ-ত্রুটি, নশ্বরতা ও ধ্বংসশীল সব ধরনের বিষয় থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি দেহ বিশিষ্ট নন। তিনি কোন স্থানে অবস্থান করেন না। সময়ের সীমাবদ্ধতা দ্বারাও তিনি সীমিত নন। মৌল উপাদান (অণু-পরমাণু), দেহ (দৈঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট বস্তু) ও আপেক্ষিক উপাদান এ এগুলোর আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্য থেকেও আল্লাহ তায়ালা মুক্ত ও পবিত্র। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে স্থানে অবস্থান ও সময়ের দ্বারা সীমিত হওয়ার বিষয়টি অবাস্তব ও অকল্পনীয়। এসব কিছুই মহান আল্লাহর সৃষ্টি।
ইদ্রীস কান্ধলবী রহ. আরও লিখেছেন, “আল্লাহ তায়ালা কোন সৃষ্টির সাথে একীভূত নন। কোন সৃষ্টিও আল্লাহর সাথে একীভূত নয়। কোন সৃষ্টি আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালাও কোন সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেন না। খ্রিস্টানদের নিকট আল্লাহ তায়ালা ইসা আ. এর মাঝে প্রবেশ করেছে। হিন্দুদের নিকট আল্লাহ তায়ালা মানুষ, জীব-জন্তু, গাছ-পালা ও পাহাড়-পর্বতের মাঝে প্রবেশ করে। সামেরীর বিশ্বাস ছিলো, আল্লাহ তায়ালা বাছুরের মাঝে প্রবেশ করেছে। ইন্ডিয়ার গাভী পূজারীরা মূলত: মিশরের সামেরীর অনুসারী। হিন্দুদের অস্পৃশ্যতার ধারণাটাও সামেরীর থেকে এসেছে। সে বলতো, আমাকে কেউ স্পর্শ করো না। একইভাবে হিন্দুরা কোন মুসলমানকে দেখলে বলে, আমাকে স্পর্শ করো না। মোটকথা, হিন্দুদের গরুপূজা, অস্পৃশ্যতা এগুলোর উৎসমূল মুসা আ. এর সময়ের সামেরী থেকে পাওয়া যায়।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহ. সামেরীর আলোচনায় লিখেছেন, সে হুলুলিয়া ফেরকার অন্তর্ভূক্ত ছিলো। যারা সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর প্রবেশের বিশ্বাস রাখে। ভারত উপমহাদেশের হিন্দুরাও তার অনুসারী। বরং উপমহাদেশের হিন্দুরা তার চেয়েও অগ্রসর। কেননা, সামেরী থেকে একথা প্রমাণিত নয় যে, সে গাভীর পেশাব পান করতো। গরু-গাভী নির্বুদ্ধিতার উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাউকে যদি নির্বোধ বলতে হয়, তাহলে আমরা তাকে গরু বলি। হিন্দুদের অবস্থা দেখো। এক দিকে তো একটা অবলা প্রাণিকে নিজেদের প্রভূ বানিয়েছে। আবার জীব-জন্তুর মধ্যে এমন একটাকে বাছাই করেছে যেটি নির্বুদ্ধিতার ক্ষেত্রে বিশেষ উপমা। হিন্দুদের এই প্রভূ বাছাই থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে, নির্বুদ্ধিতার দিক থেকে এরা গরু-গাভীর থেকে অধম। অথচ কোন দিক থেকে সৃষ্টি বা মানুষ স্রষ্টা থেকে উন্নত ও পরিপূর্ণ হওয়া অসম্ভব ও অকল্পনীয়।
বিখ্যাত মুফাসসির আব্দুল হক হক্কানী রহ (১২৬৭-১৩৩৫ হিজরী). এর বক্তব্যঃ
ইসলামী আকিদা বিষয়ে আব্দুল হক দেহলবী রহ. (তাফসীরে হক্কানী এর লেখক) এর বিখ্যাত একটি কিতাব রয়েছে। আকাইদুল ইসলাম। এটি ১৩০২ হিজরী সালে উদুর্তে ছাপা হয়। মাতবায়ে আনসারে দিল্লী থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এই কিতাবের শুরুতে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. এর সংক্ষিপ্ত অভিমত রয়েছে। কিতাবটি সম্পর্কে কাসেম নানুতুবী রহ. বলেন,
“উর্দু ভাষায় এটি একটি অদ্বিতীয় কিতাব। আমি কিতাবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি। সত্য কথা হলো, উর্দু ভাষায় ইতোপূর্বে এধরণের কোন কিতাব লেখা হয়নি। বিষয়বস্তুর দিক থেকেও এধরনের কোন কিতাব প্রকাশিত হয়নি। কিতাবটি লেখকের গভীর পান্ডিত্যের উজ্জল সাক্ষর। প্রবাদ রয়েছে, মানুষকে তার বক্তব্য ও লেখনী থেকে চেনা যায়। অতিরিক্ত ভূমিকা লেখা অর্থহীন। পাঠক নিজেই দেখে নিন, কিতাবটি কতো অসাধারণ।"
উলামায়ে দেওবন্দের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও সুফী আব্দুল হক দেহলবী রহ. তার আকাইদুল ইসলাম-এ লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব ও অবস্থানের জন্য কোন স্থানের প্রয়োজন নেই। কেননা দেহবিশিষ্ট ও স্থানিক বস্তুর জন্যই কেবল অবস্থানের জন্য জায়গার প্রয়োজন হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা দেহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। সুতরাং তিনি আসমানে থাকেন না। তিনি জমিনে অবস্থান করেন না। পূর্ব-পশ্চিম কোথাও তিনি থাকেন না। বরং সমগ্র মহাবিশ্ব তাঁর নিকট একটি অণু-পরমাণুতুল্য। সুতরাং তিনি এই ক্ষুদ্র সৃষ্টির মাঝে কেন অবস্থান করবেন? তবে সৃষ্টির সব কিছুই আল্লাহর সামনে পূর্ণ উদ্ভাসিত। কোন কিছুই তাঁর থেকে সুপ্ত বা অজ্ঞাত নয়। সকল স্থান ও জায়গা আল্লাহর নিকট সমান।
আব্দুল হক দেহলবী রহ. বলেন, আল্লাহ তায়ালা কারও সমগোত্রীয় নন। তাঁর সাথে তুলনীয় কিছুই নেই। তিনি কোন বস্তুর সাথে মিশ্রিত বা একীভূতও নন। আল্লাহর সত্তা কোন কিছুর সাথে মিশ্রিত বা একীভূত নন, এই কথার ব্যাখায় তিনি বলেন, “আল্লাহর সত্তার সাথে কোন কিছু একীভূত নয়। কেননা, আল্লাহর সত্তা ছাড়া সব কিছুই সৃষ্টি। আর সৃষ্টির কোন কিছু আল্লাহর সত্তার সাথে মিশ্রিত হতে পারে, এধরণের ধারণা রাখা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কিছু অজ্ঞ লোক বলে থাকে, মানুষ, গাছ-পালা, পাথর সব কিছুই আল্লাহ। তাদের এধরণের বিশ্বাস সুস্পষ্ট কুফুরী। কিছু কিছু সূফী ওয়াহদাতুল উজুদের কথা বলেছেন। তাদের থেকেও একথা প্রমাণিত নয় যে, সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহ। কেননা এসব সূফীগণ জিদ্দাতুল উজুদের প্রবক্তা। জিদ্দাতুল উজুদের অর্থ হলো, প্রকৃত, স্বাধীন ও একচ্ছত্র অস্তিত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। আল্লাহর দেয়া অস্তিত্বের কারণে সৃষ্টি ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব লাভ করেছে। বাস্তবে সৃষ্টির অস্তিত্ব স্বাধীন ও মৌলিক নয়। সুতরাং ওয়াহদাতুল উজুদের প্রবক্তা সূফীগণ স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে অভিন্ন বিশ্বাস করেন না। কারণ, এটি সুস্পষ্ট কুফুরী।“
আব্দুল হক দেহলবী রহ. আরও স্পষ্টভাষায় লিখেছেন, “কেউ যদি বলে, ওয়াহদাতুল উজুদের মাধ্যমে স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক ও অভিন্ন হওয়া প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা বলব, এটি সুস্পষ্ট কুফুরী। যেই এ মতবাদের প্রবক্তা হোক, আমরা এটিকে অবশ্যই কুফুরী বিশ্বাস করি। আমরা পবিত্র কুরআনের উপর ইমান এনেছি। এ ব্যক্তি এর সম্পূর্ণ বিরোধী”।
একটি জিনিস অনন্য কিছুর মাঝে প্রবেশ ও এর সাথে মিশে যাওয়াকে পরিভাষায় হুলুল বলে। যেমন কাপড়ের সাথে কালো বা সাদা রঙ মিশে যায়। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ ও মিশে যাওয়া অবাস্তব ও অসম্ভব। একটি বস্তু অন্য কিছুর মাঝে প্রবেশ করলে এটি প্রবেশকৃত বস্তুর মুখাপেক্ষী হয়। একইভাবে আল্লাহ তায়ালা যদি কোন সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেন, তাহলে তিনিও উক্ত সৃষ্টির মুখাপেক্ষী হবেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। একইভাবে আল্লাহ তায়ালার মাঝেও কোন সৃষ্টি প্রবেশ করে না। কোন সৃষ্টি যদি আল্লাহর সত্ত্বার মাঝে প্রবেশ করতো, তাহলে তিনি নশ্বর সৃষ্টির অবস্থানের জায়গা ও ধারক হতেন। আর কোন সৃষ্টি বা নশ্বর বস্তুর ধারক বা পাত্রও একটি সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা এগুলো থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত। সুতরাং পাত্রের মাঝে যেভাবে পানি থাকে অথবা কাপড়ের সাথে রঙ মিশে থাকে, এভাবে আল্লাহ তায়ালা কোন সৃষ্টির মাঝে অনুপ্রবেশ থেকে পবিত্র। গরম পানি ঠান্ডা পানির সাথে মিশে যেভাবে একাকার হয়ে যায় অথবা বরফ গলে যেমন পানি হয়ে যায়, এভাবে কোন সৃষ্টি আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ ও মিশে যায় না। কিছু অজ্ঞ লোক বলে থাকে, সৃষ্টি বিশেষভাবে কামেল আল্লাহর ওলী, আল্লাহর সত্তার সাথে এমনভাবে মিশে যায়, যেমন বরফ পানির সাথে মিশে যায়, অথবা একফোঁটা পানি মহাসমুদ্রের মাঝে হারিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ বিশ্বাস করে, আল্লাহর ওলী ও আল্লাহ এক ও অভিন্ন। কেননা, আল্লাহর ওলীরা আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ করে একীভূত হয়ে যায়। এধরনের সকল আকিদা-বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও সুস্পষ্ট কুফুরী।
ইদ্রীস কান্ধলবী রহ এর বক্তব্যঃ
বিখ্যাত আলেম ইদ্রীস কান্ধলবী রহ. তাঁর বিখ্যাত কিতাব আকাইদুল ইসলামে লিখেছেন, “মহান আল্লাহ তায়ালা সমস্ত অপূর্ণতা, দোষ-ত্রুটি, নশ্বরতা ও ধ্বংসশীল সব ধরনের বিষয় থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি দেহ বিশিষ্ট নন। তিনি কোন স্থানে অবস্থান করেন না। সময়ের সীমাবদ্ধতা দ্বারাও তিনি সীমিত নন। মৌল উপাদান (অণু-পরমাণু), দেহ (দৈঘ্য-প্রস্থ বিশিষ্ট বস্তু) ও আপেক্ষিক উপাদান এ এগুলোর আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্য থেকেও আল্লাহ তায়ালা মুক্ত ও পবিত্র। আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে স্থানে অবস্থান ও সময়ের দ্বারা সীমিত হওয়ার বিষয়টি অবাস্তব ও অকল্পনীয়। এসব কিছুই মহান আল্লাহর সৃষ্টি।
ইদ্রীস কান্ধলবী রহ. আরও লিখেছেন, “আল্লাহ তায়ালা কোন সৃষ্টির সাথে একীভূত নন। কোন সৃষ্টিও আল্লাহর সাথে একীভূত নয়। কোন সৃষ্টি আল্লাহর সত্তার মাঝে প্রবেশ করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালাও কোন সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেন না। খ্রিস্টানদের নিকট আল্লাহ তায়ালা ইসা আ. এর মাঝে প্রবেশ করেছে। হিন্দুদের নিকট আল্লাহ তায়ালা মানুষ, জীব-জন্তু, গাছ-পালা ও পাহাড়-পর্বতের মাঝে প্রবেশ করে। সামেরীর বিশ্বাস ছিলো, আল্লাহ তায়ালা বাছুরের মাঝে প্রবেশ করেছে। ইন্ডিয়ার গাভী পূজারীরা মূলত: মিশরের সামেরীর অনুসারী। হিন্দুদের অস্পৃশ্যতার ধারণাটাও সামেরীর থেকে এসেছে। সে বলতো, আমাকে কেউ স্পর্শ করো না। একইভাবে হিন্দুরা কোন মুসলমানকে দেখলে বলে, আমাকে স্পর্শ করো না। মোটকথা, হিন্দুদের গরুপূজা, অস্পৃশ্যতা এগুলোর উৎসমূল মুসা আ. এর সময়ের সামেরী থেকে পাওয়া যায়।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহ. সামেরীর আলোচনায় লিখেছেন, সে হুলুলিয়া ফেরকার অন্তর্ভূক্ত ছিলো। যারা সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর প্রবেশের বিশ্বাস রাখে। ভারত উপমহাদেশের হিন্দুরাও তার অনুসারী। বরং উপমহাদেশের হিন্দুরা তার চেয়েও অগ্রসর। কেননা, সামেরী থেকে একথা প্রমাণিত নয় যে, সে গাভীর পেশাব পান করতো। গরু-গাভী নির্বুদ্ধিতার উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাউকে যদি নির্বোধ বলতে হয়, তাহলে আমরা তাকে গরু বলি। হিন্দুদের অবস্থা দেখো। এক দিকে তো একটা অবলা প্রাণিকে নিজেদের প্রভূ বানিয়েছে। আবার জীব-জন্তুর মধ্যে এমন একটাকে বাছাই করেছে যেটি নির্বুদ্ধিতার ক্ষেত্রে বিশেষ উপমা। হিন্দুদের এই প্রভূ বাছাই থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে, নির্বুদ্ধিতার দিক থেকে এরা গরু-গাভীর থেকে অধম। অথচ কোন দিক থেকে সৃষ্টি বা মানুষ স্রষ্টা থেকে উন্নত ও পরিপূর্ণ হওয়া অসম্ভব ও অকল্পনীয়।