📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 আকিদা কি?

📄 আকিদা কি?


আল্লামা তাহির আল জাযাইরি রহ. বলেন, ইসলামী আকিদা হচ্ছে এমন কিছু বিষয়ের সমষ্টি যেগুলোর উপরে মুমিন মুসলমানগণ অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন অর্থাৎ এগুলোর অকাট্যতা, সত্যতা ও বিশুদ্ধতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন।— [আল জাওয়াহিরুল কালামিয়্যাহ ফি ইযাহিল আকিদাতিল ইসলামিয়্যাহ]

৮ম শতকের প্রসিদ্ধ অভিধানবেত্তা আহমদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-ফাইউমী (৭৭০হি) তার আল-মিসবাহুল মুনীর গ্রন্থে লিখেছেন:
العقيدة ما يدين الإنسان به، وله عقيدة حسنة : سالمة من الشك
"মানুষ ধর্ম হিসেবে যা গ্রহণ করে তাকে 'আকীদা' বলা হয়। বলা হয় 'তার ভালো আকিদা আছে', অর্থাৎ তার সন্দেহমুক্ত বিশ্বাস আছে।

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 আমরা হানাফী মাযহাবের অনুসারী হয়েও কেন আকীদায় মাতুরীদী আশয়ারী?

📄 আমরা হানাফী মাযহাবের অনুসারী হয়েও কেন আকীদায় মাতুরীদী আশয়ারী?


এ বিষয়টা অনেকে বুঝে উঠতে পারছেন না, তাই অনেকে কথিত সহিহ আকিদার দাবিদার শায়খগণ বরাবরের মতো প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

হানাফি মাজহাব মানে কি ইমাম আবু হানিফার মাযহাব? ব্যাপকভাবে এই ধারণাই প্রচলিত। তবে এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মাযহাব হলো একটি পথ, পদ্ধতি ও ধারার নাম। ইমাম আবু হানিফা এই ধারার শীর্ষস্থানীয় একজন ব্যক্তিত্ব। এক্ষেত্রে তার উদ্যোগেই সর্বপ্রথম কুরআন ও সুন্নাহর ফিকহকে সংকলিত ও সুবিন্যস্ত করা হয়। নুসুস (কুরআন ও হাদিসের পাঠ) বোঝার জন্য মূলনীতি প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, এই মাযহাব একান্ত তার। বরং হানাফি মাযহাব হলো হাজার হাজার বিদগ্ধ ফকিহ ও উসুল শাস্ত্রবিদের গবেষণালব্ধ একটি ধারা ও পন্থার নাম।

হানাফি মাযহাব যদি শুধু ইমাম আবু হানিফার মাযহাব হতো, তাহলে সবক্ষেত্রে তার বক্তব্যই তো চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু এমনটি তো হয়নি। তার হাজারো বক্তব্য ও অভিমত পরিত্যাজ্য হয়ে আছে। এখনো নিত্যনতুন যত সমস্যার শরয়ি সমাধান এই মাযহাবের আলোকে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোও কি ইমাম আবু হানিফা দিয়ে গিয়েছিলেন? তিনি একাই যদি এর কর্ণধার হয়ে থাকেন, তাহলে পরবর্তীতে শত শত মুজতাহিদ এসে এই মাযহাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কী কাজ করলেন?

কারও নামের দিকে নিসবত করলেই কোনো জিনিস একান্ত তার প্রাইভেট প্রোপার্টি হয়ে যায় না। সমকামীকে আরবিতে বলা হয় 'লুতি'। এখন আক্ষরিক অর্থ করতে গেলে তো এই শব্দের অর্থ দাঁড়াবে, লুত আ.-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। অথচ বাস্তবতা হলো, সমকামিতা (নাউজুবিল্লাহ) তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। মুহাক্কিকগণ যদিও সতর্কতাস্বরূপ এই শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করেন; কিন্তু হাজারো বছর ধরে ব্যাকরণের কায়দা অনুসারে এই শব্দের ব্যবহার চলে আসছে। তো বলছিলাম, নিসবত বিভিন্ন বিবেচনায়ই হতে পারে। পরিভাষাকে বুঝতে হলে মূলনীতি অনুসারে বুঝতে হবে; এর যেনতেন মনগড়া ব্যাখ্যা সবক্ষেত্রে গৃহীত হবে না।

কারও কারও ধারণা, হানাফি মাযহাব মানে শুধু ফিকহি মাযহাব; আকিদার মাযহাব নয়। অথচ এটা তো হাস্যকরও বটে। মুকাল্লিদরা ইমামদের অনুসরণ করে। ইমামরা কি তাদেরকে দীনের মূল বিষয় না শিখিয়ে শুধু শাখাগত বিষয় শেখাবেন? আকিদা ছাড়া মানুষ চলে কীভাবে? তাদের প্রণীত কুরআন-সুন্নাহ গবেষণার মূলনীতির আলোকে গবেষণালব্ধ ফিকহ যদি বেরিয়ে আসতে পারে; তবে অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন আকিদা কেন বেরিয়ে আসবে না? উপরন্তু মুজতাহিদে মুতলাক ইমাম আবু হানিফা নিজে একজন মুতাকাল্লিম ছিলেন। তার পরবর্তী মুজতাহিদ ফিল মাযহাব যারা, তারাও মুতাকাল্লিম ছিলেন। খোদ আবু হানিফা আকিদার কিতাব রচনা করে গেছেন। এরপর ইমাম তহাবি ছাড়াও আরও শত শত ইমাম মাযহাবের উসুলের আলোকে আকিদার গ্রন্থাদি রচনা করেছেন। কোনো ব্যক্তিকে হানাফি বলা হলে এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, সে আকিদা ও ফিকহে হানাফি মাযহাব অনুসরণ করে। কেউ যদি উভয় ক্ষেত্রে অনুসরণ না করে কোনো এক ক্ষেত্রে অনুসরণ করে, তাহলে সেটা আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। যেমন, আল্লামা জারুল্লাহ জামাখশারি আংশিক হানাফি ছিলেন। তিনি ফিকহে হানাফি হলেও আকিদায় মুতাজিলি ছিলেন। তাই তার এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বিবৃত করে দেওয়া হয়। কারণ, সাধারণভাবে হানাফি বললে উভয় ক্ষেত্রে এই মাযহাবের অনুসারী বলেই বোঝায়।

এখন কেউ বলতে পারে, তাহলে এ কথা প্রচলিত হলো কীভাবে যে, হানাফিরা আকিদায় মাতুরিদি। প্রথম কথা হলো, নিসবতের বিষয়টি আপেক্ষিক। ওপরে আমরা এর উদাহরণও দেখিয়েছি। আকিদা তো চলে আসছে ইমাম আবু হানিফা থেকেই। সংক্ষিপ্ত গ্রন্থাদিও রচিত হয়েছে অনেক। কিন্তু আবু হানিফার তিরোধানের এক শতাব্দীরও কম সময়ে মুসলিম বিশ্বে আকিদাকেন্দ্রিক বড় বড় ফিতনা বিস্তার লাভ করে। তখন পূর্ববর্তীদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিক্ষাগুলোকে একত্র করে গ্রন্থবদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে। ইমাম মাতুরিদি রহ. এই কাজটি করেছেন। তিনি নিত্যনতুন আকিদা আবিষ্কার করেননি এবং এর সুযোগও কারও জন্য নেই। তবে তিনি পূর্ববর্তীদের আকিদা-বিষয়ক শিক্ষা ও আলোচনাগুলো একত্র করেন। সেগুলোকে যুগোপযোগী উপস্থাপনায় দলিল-প্রমাণের সঙ্গে গ্রন্থবদ্ধ রূপ দেন। আকিদা-বিষয়ক যে বিপুল ও সুবিশাল গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন, তার পূর্বে বিগত হওয়া একই মাজহাবের অন্যান্য ইমামগণ যদি এই খেদমতটি আঞ্জাম দিয়ে যেতেন, তাহলে তাকে আর আলাদাভাবে কসরত করতে হতো না।

ইমাম আবু হানিফা রহ. খুব বেশিকিছু গ্রন্থবদ্ধ করে যেতে পারেননি। হানাফি মাযহাবের ফিকহি অংশের ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর শিষ্য ইমাম মুহাম্মাদের গ্রন্থাবলির ওপর; বিশেষত জাহিরুর রিওয়ায়াত নামে প্রসিদ্ধ ছয়টি গ্রন্থের ওপর। তাই বলে এটা হানাফি মাযহাব থেকে বেরিয়ে মুহাম্মাদি মাযহাব হয়ে যায়নি। একইভাবে ইমাম মাতুরিদি কর্তৃক আকিদার খেদমত বিস্তৃতি লাভ করার দ্বারা এটা তার স্বতন্ত্র মাযহাব হয়ে যায়নি; বরং হানাফি মাযহাব হিসেবেই রয়েছে। এ জন্য তো ইমাম ইবনুল হুমাম রহ.-এর মতো বিদগ্ধ হানাফি ফকিহকেও লিখতে দেখা যায়, 'হকপন্থীদের উভয় দল হানাফি ও আশআরিরা একমত হয়েছে যে,...।' হিদায়া'র ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল কাদিরে প্রদত্ত তার এই বক্তব্যের ওপর তো কোনো হানাফিই আপত্তি করেনি। বরং এমন বক্তব্য ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ইমামের রচনায়।

কেউ বলতে পারে, ইমাম মাতুরিদি রহ. আকিদায় যুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন, তাই তিনি বিদআতি। এ কথার জবাবে আমরা বলব, আকিদার পক্ষে যুক্তি প্রদানের অগণিত নজির তো আমরা কুরআন ও সুন্নাহর পাতায় পাতায়ই দেখতে পাই। আল্লাহ তাআলা নিজেই তাওহিদুর রুবুবিয়্যাহ বা উলুহিয়্যাহর ওপর অসংখ্য যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। মুতাজিলাদের সঙ্গে মাতুরিদিদের পার্থক্য কোথায়? উভয় দল যদি যুক্তিপূজারীই হতো, তাহলে তাদের মধ্যে সাপ-বেজির সম্পর্ক কেন হলো? শুনে শুনে আর কতকাল অন্ধ বিরোধিতা করবেন? আল্লাহর দেওয়া আকলটা কোনোদিনও কি খাটাবেন না?

ইমাম মাতুরিদি কি যুক্তির ওপর ভিত্তি করে নিত্যনতুন আকিদা আবিষ্কার করেছেন নাকি প্রমাণিত আকিদার পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনার পাশাপাশি ফিতনাকারীদের ফিতনা নিরোধের জন্য এবং সংশয়গ্রস্তদের অন্তরের উপশমের জন্য যুক্তির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য দেখিয়েছেন? তিনি তো মডারেট লেখক আরিফ আজাদদের মতো যুক্তির ধাক্কায় ইসলামি আকিদাকে বিকৃত করেননি; বরং তার যুক্তিগুলোও ছিল সুদৃঢ় ও নিয়মানুগ। বর্তমানকালের এসব সেলিব্রিটি লেখক মনগড়া যুক্তি দ্বারা ইসলামি আকিদাকে উপস্থাপন করতে গিয়ে প্রায়শই ইসলামকে বিকৃত করে ফেলে; এরপরও এসব কালামপন্থীরা (যারা ইল্লত ও হিকমতের পার্থক্যটুকুও বোঝে না) সাধুবাদ পায়। আর কুরআন ও সুন্নাহর একনিষ্ঠ গবেষক বিদগ্ধ মুজতাহিদ ইমামরা দিনমান তোমাদের গালি খায়। এসব ডাবল স্ট্যান্ডার্ডবাজির শেষ কোথায়?

কেউ বলতে পারে, অমুক আর তমুক কালামের নিন্দা করেছেন। এর জবাবে বলব, শুধু তারাই নয়; বরং আজকে যাদেরকে কালামপন্থী বলে গালি দিচ্ছ, তারাও কালামের নিন্দা করেছেন। কিন্তু কোন কালাম নিন্দনীয় ও কোন কালাম আকিদাশস্ত্রের অপর নাম হিসেবে প্রশংসনীয়, তা কখনো জানার চেষ্টা করোনি। হাকিমুল উম্মত থানবি রহ.-এর 'আশরাফুল জওয়াব' এবং 'আল-ইনতিবাহাতুল মুফিদা' পড়লে সবাই প্রশংসায় মেতে ওঠে। নাস্তিকদের কুপোকাত করতে দেখে প্রফুল্ল বোধ করতে থাকে। কিন্তু এরা জানে না, এগুলোও কালাম। থানবি রহ. ইলমুল কালামকে যুগোপযোগী করেছেন, এর আলোকে বাতিলের সঙ্গে মুনাজারা-মুনাকাশা করেছেন। শুধু জাকির নায়েকই নয়, বাতিলপন্থীদের সংশয় নিবারণে কাজ করা এ ধরনের সব সেলিব্রিটির কথায় কথায় কালাম দেখানো যাবে।

কওমি মাদরাসার পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্ধারিত শরহে আকায়িদ কালামশাস্ত্রের কিতাব; কিন্তু এ কিতাবেই আবার কালামের নিন্দা করা হয়েছে। এরপর দুই কালামের পার্থক্য দেখানো হয়েছে। গ্রিক দর্শন প্রভাবিত কালামুল মুতাকাদ্দিমিন এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে গঠিত কালামুল মুতাআখখিরিন সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একই নামের দুই ব্যক্তি; একজন দেখা যায় চোর, আরেকজন দেখা যায় মহা দরবেশ। এখন এক কালামের ব্যাপারে প্রদত্ত উক্তিকে কেউ যদি অপব্যাখ্যা করে অন্য কালামের নামে চালিয়ে দেয়, তাহলে তাকে মাথামোটা অথর্ব ছাড়া আর কী নামে আখ্যায়িত করা যায়? সালাফগণের লেখায় পাতায় পাতায় আকিদা বিশেষজ্ঞ ইমামগণকে 'মুতাকাল্লিম' নামে স্মরণ করতে দেখা যায়। জালিমরা এখন এই শব্দেরই বা কী ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবে?

মোদ্দাকথা, আবু হানিফার আকিদাই মাতুরিদি আকিদা, তহাবির আকিদাই মাতুরিদি আকিদা। হানাফি আকিদা ও মাতুরিদি আকিদা সমার্থক দুটো শব্দ। দুই বিবেচনায় দুই নিসবত করা হয়; তবে উভয় নামই যথার্থ। হ্যাঁ, শাখাগত বিষয়ে এক মাজহাবের দুই মুজতাহিদের মধ্যেও কখনো মতানৈক্য হতে পারে। এটা আকিদার ক্ষেত্রেও হতে পারে, ফিকহের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এরপর পরবর্তী উম্মাহ সেটাকেই বিশ্লেষণসাপেক্ষে গ্রহণ করে, যেটা হকের অধিক নিকটবর্তী। মাজহাব কখনো ব্যক্তিপূজা শেখায় না। সুতরাং দালিলিক মতবিরোধ ছিল, আছে এবং কিয়ামত অবধি থাকবে। একমাত্র জড়গ্রস্ত ছাড়া আর কেউ দালিলিক মতভিন্নতার পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে না।

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 আশয়ারী মাতুরীদীর আকীদায় চার ইমামের বিপরীত কিছু নেই

📄 আশয়ারী মাতুরীদীর আকীদায় চার ইমামের বিপরীত কিছু নেই


শায়েখ ডক্টর শরীফ হাতিম বিন আরিফ আল আওনী হাফি (উস্তাদ, উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি, মক্কাতুল মুকাররামা) তিনি লিখেন, কোন আলিম যখন নিজেকে ফিকহের ক্ষেত্রে চার ফকীহের একজনের দিকে আর আকীদায় ভিন্ন কেউ যেমন আশয়ারী মাতুরীদীর দিকে এবং তরীকতের ক্ষেত্রে কোন সূফী বুযুর্গের দিকে নিজেকে সম্বন্ধিত করেন তখন অনেক সালাফী অবাক হয় এবং তাদের নিম্নোক্ত কথায় বিস্ময় প্রকাশ করে যে, "আশয়ারীর আকীদা মালিকের ফিকহ আর সালিক জুনায়েদের তরীকা"

এক্ষেত্রে তাদের বিস্ময়ের জায়গাটা হল, ফিকহের ইমামদের ফিকহের ব্যাপারে যেমন তারা সন্তুষ্ট হয়েছে তেমনিভাবে তারা ফিকহের ইমামদের আকীদায় কেন সন্তুষ্ট হচ্ছে না অথচ তারা নিঃসন্দেহে অধিক জ্ঞানী এবং শ্রেষ্ঠ। কেন তারা এ ফকীহদের থেকে যেমনিভাবে ইবাদত ও লেনদেনের ফিকহ শিক্ষা করেছে তেমনিভাবে তাদের ইবাদত, যুহদ এবং আখলাকের পথ অবলম্বন করছে না?

এ বিস্ময়ের ক্ষেত্রে আসলে তাদের ভুল হচ্ছে ও প্রতিপক্ষের বক্তব্য অনুধাবনে মূলত ত্রুটি হচ্ছে এবং এটা বারবার হচ্ছে। কারণ, তারা ফিকহে চার ফকীহের কারো দিকে সম্পৃক্ত হওয়া সত্ত্বেও যখন আকীদার ক্ষেত্রে নিজেকে আশয়ারী মাতুরীদীর দিকে সম্পৃক্ত করছেন তাহলে তারা আশয়ারী মাতুরীদীর আকীদার মাঝে আবু হানিফা, মালিক, শাফিয়ীর আকীদার বিরোধী কিছু দেখছেন না বরং আশয়ারী মাতুরীদীকে সালাফের মতের যোগ্য অনুসারী হিসেবেই দেখছেন, তবে তারা সালাফের আকীদার বিশ্লেষণ করেছেন, এর পক্ষে বিস্তারিত দলিল পেশ করেছেন এবং বিভিন্ন সংশয়ের অপনোদন করেছেন।

তাদের উভয়ের দিকে নিজকে সম্পৃক্ত করাটা এ বিশ্বাসের কারণে নয় যে তারা ফিকহের ইমামদের আকীদার বিরোধী কিছু বলেছেন এবং এ কারণেও নয় যেমনটি কতেক নিন্দুক ধারণা করে যে তারা নিজস্ব কিছু বিদয়াতী আকীদা পেশ করেছেন। সুতরাং তাদের কাছে আকীদার ক্ষেত্রে আশয়ারী মাতুরীদীর দিকে সম্বন্ধিত হওয়াটা হুবহু ফিকহের ক্ষেত্রে ফিকহের ইমামদের দিকে সম্বন্ধিত হওয়ার মত একই বিষয়।

যদি কোন হাম্বলীকে বলা হয়, তুমি খালাফের উপর সালাফের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাবে তাবেয়ীদের অনুসারীদের উপর সাহাবিদের ফিকহের শ্রেষ্ঠত্ব মানা সত্ত্বেও কেন তুমি আহমদ বিন হাম্বলের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত কর? যদি তুমি সত্যিকারের সালাফী হয়ে থাক তাহলে নিজেকে হাম্বলীদের দিকে সম্পৃক্ত না করে সালাফের দিকে সম্পৃক্ত কর। তখন সে বলবে মূলত আমি আহমদের দিকে সম্বন্ধিত হওয়া এবং বিশেষভাবে তার ফিকহ গ্রহণ করার কারণ হল তিনি আমার নিকট সর্বোত্তম ও সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি যিনি আমার কাছে সালাফের ফিকহ সহজে পেশ করেছেন, সে অনুসারে মাসয়ালা বের করেছেন এবং সমাধানমূলক ফয়সালা প্রদান করেছেন।

ঠিক একই কথা প্রযোজ্য জুনাইদ কিংবা অন্যান্য শরীয়ত অনুসারী সূফীদের প্রতি নিজেকে সম্বন্ধিত করার ক্ষেত্রে (তাসাউফের নামে ভ্রান্তিতে লিপ্ত সূফীরা নয়)। সুতরাং যারা তার কিংবা অন্যান্য যাহিদ আবিদদের দিকে নিজেদের সম্পৃক্ত করে থাকে তারা মূলত যুহদের ক্ষেত্রে তাদের পদাংক অনুসরণ করে থাকে এবং তাদের এ তরীকায় সালাফের তরীকার বিপরীত কিছু দেখে না, তবে তারা এক্ষেত্রে কিছুটা বিশ্লেষণ এবং সূক্ষ্ম পর্যালোচনা করেছেন।

সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি এ সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে আপত্তি তুলতে চায় সে যেন আপত্তির কারণ স্পষ্ট করে বলে যাতে করে তা পর্যালোচনা করা যায়, যেমন অমুকের আকীদার সাথে সালাফের আকীদায় মিল নেই কিংবা অমুকের যুহদের পদ্ধতির সাথে সালাফের পদ্ধতির মিল নেই, এটা দলীল প্রমান সহ পেশ করতে হবে।..... আর যদি আমরা এখনও আশয়ারীর দিকে সম্পৃক্ততার কারণে আপত্তি করতে থাকি এবং ভাবতে থাকি আশয়ারীদের আকীদা শাফেয়ীর আকীদার চেয়ে ভিন্ন এবং তাদের স্ববিরোধিতার অভিযোগ তুলতে থাকি যেমনটা অহরহ ঘটছে তাহলে এটা হবে বিরাট ভুল এবং অবাস্তব ভাবনা যা সঠিক আলোচনার সহায়ক নয়।

এরকমটা বিভিন্ন মাসয়ালার ক্ষেত্রে বারবার ঘটে চলেছে বরং এ ভুল ভাবনাটা কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে অন্যদের ব্যাপারে এমন কিছু বিষয় জড়িয়ে দিচ্ছে যেক্ষেত্রে তারাও স্পষ্টভাবে বলে থাকেন যে তারা এটা মানেন না।— [রাওয়ায়ে মিন কিতাবাতিশ শায়খ হাতিম আওনী খণ্ড-২ পৃষ্ঠা ৪০৪-৪০৫]

📘 ভ্রান্তির বেড়াজালে নব্য সালাফী আকিদা 📄 চার মাযহাবের সকলই আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত

📄 চার মাযহাবের সকলই আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত


এখানে কারো মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে, ইসলামী আকীদা বিশ্বাস নিয়ে মতভেদ করে তেয়াত্তর দলে বিভক্ত মুসলমানদের বাহাত্তর দলই যেহেতু ভ্রান্ত হওয়ার কারণে জাহান্নামে যাবে, তাহলে কি ইসলামী আমলের বেলায় মুসলমানগণ চার মাযহাবে বিভক্ত হওয়ার কারণেও কোন একটা মাত্র মাযহাবের অনুসারীগণ জান্নাতী আর বাকিরা জাহান্নামী হবে? এ সম্পর্কে হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ লেখেনঃ-

قال الشيخ في البذل المراد من هذا الفرق الفرق المذموم الواقع في أصول الدين، وأما اختلاف الأئمة في الفروع فليس بمذموم، بل هو من رحمة الله - سبحانه - فإنك ترى أن الفرق المختلفة في الفروع كلها متحدة في الأصول ولا يضل بعضهم بعضا، وأما المنفرقون في الأصول فيكفر بعضهم بعضا

অর্থাৎ, শায়খ খলীল আহমদ সাহারানপুরী রহ, আবু দাউদ শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ বজলুল মজহুদে বলেন, আলোচ্য হাদীসে মুসলমানদের দলাদলি বলতে ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস সংক্রান্ত দলাদলি বুঝানো হয়েছে। পক্ষান্তরে মাযহাবের ইমামগণ ইসলামী আমলের ব্যাপারে যে মতভেদ করেছেন, সেটা নিন্দনীয় নয়; বরং আল্লাহ পাকের বিশেষ রহমত। তাই আপনি দেখবেন, আমল সংক্রান্ত ব্যাপারে যারা মতভেদ করেছেন তাদের সকলেই আকীদার ব্যাপারে একমত হওয়ায় তাদের এক মাযহাবের অনুসারীরা অন্য মাযহাবের অনুসারীগণকে পথভ্রষ্ট বলেন না। অথচ আকীদার ব্যাপারে মতভেদকারী বাহাত্তর দলের একদল আরেক দলকে কাফির বলে।— [হাশিয়া আল কাউকাবুদ দুররি: ২/১২৮]

এখানে মাযহাবের ইমামগণের মতভেদকে আল্লাহর রহমত বলা হয়েছে। কারণ রাসূল সা, সহীহ হাদীসে এ পর্যায়ের মতভেদের উভয় পক্ষেই সাওয়াব আছে বলে উল্লেখ করেছেন এবং সাহাবাগণের এমন মতভেদকে সমর্থন দিয়েছেন— [বুখারী শরীফ: হাদীস নং- ৬৯১৯, মুসলিম শরীফ : হাদীস নং- ৪৫৮৪]

বিশেষতঃ চার মাযহাব সম্পর্কে তাফসীরে আহমদিয়া উল্লেখ আছে : قد وقع الإجماع على أن الاتباع إنما يجوز لأربع، لا يجوز الاتباع لمن حدث مجتهدا مخالفا لهم والإنصاف أن انحصار المذاهب في الأربعة واتباعهم فضل إلهي وقبولية من عند الله تعالى، لامجال فيه لتوجيهات والأدلة

অর্থাৎ, এ কথার উপর উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, অনুসরণ শুধুমাত্র চার মাযহাবের করা যাবে। এ ছাড়া নতুন কোন মুজতাহিদ যদি চার মাযহাবের পরিপন্থী কিছু বলেন, তবে তার অনুসরণ করা বৈধ হবে না। আর ইনসাফভিত্তিক কথা হল, মাযহাব চারটিতে সীমাবদ্ধ হওয়া এবং এগুলির অনুসরণ আল্লাহ পাকের বিশেষ অনুগ্রহ এবং তাঁর কাছে কবুল হওয়ার ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে কোন প্রমাণ পেশ করা বা ব্যাখ্যা প্রদানেরও প্রয়োজনীয়তা বাকি নেই— [তাফসীরে আহমদী/ কৃত আল্লামা মোল্লা জীওন রহঃ ৫২৬-৫২৭, সূরা আম্বিয়া-৭৮]

এর কারণ, চার মাযহাবের ইমামগণ ছাড়া আর যত মুজতাহিদ ছিলেন, তাদের কারো মাযহাব পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেনি। অর্থাৎ সব বিষয়ের সমাধান আমাদের মাযহাবে স্থান পায়নি বলে তাঁদের মাযহাব গুলো সুবিন্যস্ত হয়নি। বরং এমনটা হয়েছে শুধু চার মাযহাবের বেলায়।— [তাক্বলীদ কি শরয়ী হাইসিয়াত : ৭৮-৮৫]

সুতরাং চার মাযহাবের ইজতিহাদ গত মতভেদের কারণে এগুলির কোন অনুসারীর গুনাহগার হয়ে জাহান্নামী হওয়ার প্রশ্নই আসে না। বরং মাযহাব চতুষ্টয়ের অনুসারীরাই সাওয়াবের অধিকারী হয়ে জান্নাতী হবে। মোটকথা, আক্বাইদের বেলায় চার মাযহাবের সকলেই যেহেতু ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদা বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ এবং আমলের বেলায় তাদের মতভেদটাও সুন্নতে রাসূল এবং জমাতে সাহাবা দ্বারা সমর্থিত, তাই চার মাযহাবের সবাই আহলে সুন্নত ওয়াল জমাতের অন্তর্ভুক্ত। যাই হোক, চার মাযহাবের এখতেলাফটা হাদিস ইফতিরাকুল উম্মত এর আওতাভুক্ত নয়।

প্রকাশ থাকা আবশ্যক যে, কেউ যদি ফিকাহর বেলায় চার মাযহাবের কোন একটার অনুসারী হয়েও আকীদার বেলায় আহলে সুন্নতের অনুসারী না হয়, তাহলে সে প্রকৃত অর্থে মাযহাব চতুষ্টয়ের কোন একটার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে না। কারণ মুসলমান হওয়ার আগে যেমন কোন মানুষ আহলে সুন্নত ওয়াল জমাত হতে পারে না, তেমনিভাবে আহলে সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে কেউ চার মাযহাবের কোন একটার অনুসারী হতে পারে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px