📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মুসলমানদের অর্থনৈতিক সমস্যা

📄 মুসলমানদের অর্থনৈতিক সমস্যা


ভারতীয় মুসলমানদের চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে অর্থনৈতিক সমস্যা। ইতিহাসের দর্শন ও বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের কাহিনী অধ্যয়নে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অর্থনৈতিক অবস্থা যেকোন জাতির চিন্তা-চেতনা, স্বাস্থ্য, ও বুদ্ধি বৃত্তিক ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রভাব বিস্তার করে। যে জাতি আর্থিক দুরাবস্থা, ক্ষুৎ দারিদ্র্য, অন্নাভাবের শিকার হয়, সে জাতি উন্নতির দিশা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, ভবিষ্যত হয় অন্ধকার এবং নব প্রজন্ম হতাশ ও সাহসহারা হয়ে গুরুদায়িত্ব পালনে অক্ষম থেকে যায়। যারা উন্নত ও দুঃসাহসী জাতির সারি থেকে দূরে সরে দাঁড়ায় শিগগির তারা পশ্চাদপদ, মর্যাদাহীন ও ভীরু জাতির কাতারে শামিল হয়। তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা ও ধীশক্তির তীক্ষ্ণতা নিঃশেষ হয়ে যায়। ইংরেজদের রাজত্বকালে ভারতীয় মুসলমানদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল সরকারী উচ্চ পদ ও বড় মাপের ব্যবসা। দেশ বিভাগের পর জমিদারী শেষ হয়ে যায় এবং এ পদক্ষেপ ভারতীয় সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনে সঠিক ছিল। সরকারী পদ ও চাকুরীতে মুসলমানদের অনুপাত দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক জীবনের ভবিষ্যত তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর বিভিন্ন বিভাগে বিশেষত পুলিশ, সেনাবাহিনী ও দায়িত্বশীল পদে লোক নিয়োগের অনুপাতিক হারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে অপরিচিত যেকোন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে, হয়তো এদেশ হতে মুসলমানগণ হিজরত করে চলে গেছেন অথবা যারা আছেন তারা এতই গন্ডমুর্খ যে, সরকারী চাকুরী করার যোগ্যতাই তাঁরা রাখেন না। কিছু দিনের মধ্যে পুরনো মুসলমান অফিসার বিভিন্ন দফতর হতে সম্পূর্ণরূপে বহিস্কৃত হয়ে যাবেন। ১৫ কোটি মানুষের বিশাল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কোন দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব আমলাতন্ত্রে ও সরকারের প্রশাসনযন্ত্রে আর দেখা যাবেনা। আমাদের বক্তব্যের সপক্ষে কতিপয় কর্তৃপক্ষীয় তথ্য-উপাত্ত পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। প্রথম উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহের লাল নেহেরুর ওই ভাষণের অংশ বিশেষ উল্লেখ করছি যা তিনি ১৯৫৮ সালের ১১ মে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সম্মেলনে প্রদান করেছিলেন:

"I called for statistics from the Sates to ascertain the percentage of minorities in the recruitments to public services. I found that the representation of Muslims was progressively declining, one of the reasons being the procedure adopted for competitive examinations that are held for recruitment to all- India services. In these examinations insistence is laid on the knowledge of Hindi and candidates who fail to qualify in it are rejected. Question papers are also required to be answered in Hindi and candidates belonging to minority communities it hard to come up to the standard of literary Hindi."

"সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের নিয়োগের আনুপাতি হার নিরুপনের জন্য আমি বিভিন্ন রাজ্যের পরিসংখ্যান তলব করি। আমি লক্ষ্য করি যে, চাকুরীতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে; সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বর্তমান নিয়মপদ্ধতি তার অন্যতম কারণ। এসব পরীক্ষায় হিন্দীর ভাষাজ্ঞানের উপর জোর দেয়া হয় এবং যেসব পরীক্ষার্থী এতে অকৃতকার্য হয় তাদেরকে চাকুরী প্রদান করা হয়না। প্রশ্নের উত্তর হিন্দী ভাষা চাওয়া হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীগণের পক্ষে উচ্চাঙ্গের হিন্দী সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।"

দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে ১৯৫২ সালে দিল্লি রাজ্য সভার (Delhi State Legislature) কার্যবিবরণী। এক প্রশ্নের উত্তরে সংসদকে জানানো হয় যে, '১৯৪৬ সালে দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৪৭০ জন আর বর্তমানে মাত্র ৫৬ জন। ১৯৪৬ সাল থেকে দু'জন মুসলিম কনষ্টেবল এবং একজন হেড কনষ্টেবলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পুলিশের মোট সংখ্যা হচ্ছে ২০৫৮ জন।' অর্থাৎ ১৯৪৬ সাল হতে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ছ'বছরে মাত্র তিনজন মুসলিম দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে নেয়া হয়েছে।

তৃতীয় উদাহরণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী মি. মহাবীর তিয়াগীর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ভাষণ। প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন: The percentage of Muslims in the Armed Forces, which was 32 at the time of Partition, has now come down to 2. To correct this state of things, I have instructed that due regard should be paid to their recruitment.

"দেশ বিভাগের সময় সেনাবাহিনীতে যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩২ জন বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ জনে। এ অবস্থা সংশোধনের জন্য আমি সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের নিয়োগের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”

উপরিউক্ত বাস্তব তথ্যের আলোকে অনুমান করা যায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে কতজন মুসলমান কর্মরত রয়েছেন, যদিও এখনো মুসলমানদের মধ্যে যোগ্যতা ও দক্ষতা পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। অতীতেও দক্ষতা ও কর্তব্য নিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের ব্যাপক খ্যাতি ছিল এবং বর্তমানেও তাদের পড়া-লেখা ও যোগ্যতার মান ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের সংবিধান যদিও ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমান সুবিধার গ্যারান্টি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারে ভিন্ন ও উল্টো। বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ভারতে চাকুরী না পেয়ে মুসলমানদের ছেলে মেয়েরা হতাশ। বহু শিক্ষিত যুবক দেশ ত্যাগ করে প্রতি বছর পাকিস্তানে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতদসত্ত্বেও আশা করা যায় সংবিধানের বৈশিষ্ট্যাবলী বর্তমান অস্বাভাবিক অবস্থার অবসানে সক্ষম কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে সংবিধানের মৌল চেতনার পরিপন্থী। তবে এর জন্য পূর্বশত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগণ তাদের আবেগকে সংযত করে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব যদি মেনে নেন তাহলে অতীতের তিক্ত স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব।

ভারতীয় মুসলমানদের চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে অর্থনৈতিক সমস্যা। ইতিহাসের দর্শন ও বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের কাহিনী অধ্যয়নে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অর্থনৈতিক অবস্থা যেকোন জাতির চিন্তা-চেতনা, স্বাস্থ্য, ও বুদ্ধি বৃত্তিক ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রভাব বিস্তার করে। যে জাতি আর্থিক দুরাবস্থা, ক্ষুৎ দারিদ্র্য, অন্নাভাবের শিকার হয়, সে জাতি উন্নতির দিশা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, ভবিষ্যত হয় অন্ধকার এবং নব প্রজন্ম হতাশ ও সাহসহারা হয়ে গুরুদায়িত্ব পালনে অক্ষম থেকে যায়। যারা উন্নত ও দুঃসাহসী জাতির সারি থেকে দূরে সরে দাঁড়ায় শিগগির তারা পশ্চাদপদ, মর্যাদাহীন ও ভীরু জাতির কাতারে শামিল হয়। তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা ও ধীশক্তির তীক্ষ্ণতা নিঃশেষ হয়ে যায়। ইংরেজদের রাজত্বকালে ভারতীয় মুসলমানদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল সরকারী উচ্চ পদ ও বড় মাপের ব্যবসা। দেশ বিভাগের পর জমিদারী শেষ হয়ে যায় এবং এ পদক্ষেপ ভারতীয় সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনে সঠিক ছিল। সরকারী পদ ও চাকুরীতে মুসলমানদের অনুপাত দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক জীবনের ভবিষ্যত তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর বিভিন্ন বিভাগে বিশেষত পুলিশ, সেনাবাহিনী ও দায়িত্বশীল পদে লোক নিয়োগের অনুপাতিক হারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে অপরিচিত যেকোন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে, হয়তো এদেশ হতে মুসলমানগণ হিজরত করে চলে গেছেন অথবা যারা আছেন তারা এতই গন্ডমুর্খ যে, সরকারী চাকুরী করার যোগ্যতাই তাঁরা রাখেন না। কিছু দিনের মধ্যে পুরনো মুসলমান অফিসার বিভিন্ন দফতর হতে সম্পূর্ণরূপে বহিস্কৃত হয়ে যাবেন। ১৫ কোটি মানুষের বিশাল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কোন দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব আমলাতন্ত্রে ও সরকারের প্রশাসনযন্ত্রে আর দেখা যাবেনা। আমাদের বক্তব্যের সপক্ষে কতিপয় কর্তৃপক্ষীয় তথ্য-উপাত্ত পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। প্রথম উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহের লাল নেহেরুর ওই ভাষণের অংশ বিশেষ উল্লেখ করছি যা তিনি ১৯৫৮ সালের ১১ মে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সম্মেলনে প্রদান করেছিলেন:

"I called for statistics from the Sates to ascertain the percentage of minorities in the recruitments to public services. I found that the representation of Muslims was progressively declining, one of the reasons being the procedure adopted for competitive examinations that are held for recruitment to all- India services. In these examinations insistence is laid on the knowledge of Hindi and candidates who fail to qualify in it are rejected. Question papers are also required to be answered in Hindi and candidates belonging to minority communities it hard to come up to the standard of literary Hindi."

"সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের নিয়োগের আনুপাতি হার নিরুপনের জন্য আমি বিভিন্ন রাজ্যের পরিসংখ্যান তলব করি। আমি লক্ষ্য করি যে, চাকুরীতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে; সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বর্তমান নিয়মপদ্ধতি তার অন্যতম কারণ। এসব পরীক্ষায় হিন্দীর ভাষাজ্ঞানের উপর জোর দেয়া হয় এবং যেসব পরীক্ষার্থী এতে অকৃতকার্য হয় তাদেরকে চাকুরী প্রদান করা হয়না। প্রশ্নের উত্তর হিন্দী ভাষা চাওয়া হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীগণের পক্ষে উচ্চাঙ্গের হিন্দী সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।"

দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে ১৯৫২ সালে দিল্লি রাজ্য সভার (Delhi State Legislature) কার্যবিবরণী। এক প্রশ্নের উত্তরে সংসদকে জানানো হয় যে, '১৯৪৬ সালে দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৪৭০ জন আর বর্তমানে মাত্র ৫৬ জন। ১৯৪৬ সাল থেকে দু'জন মুসলিম কনষ্টেবল এবং একজন হেড কনষ্টেবলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পুলিশের মোট সংখ্যা হচ্ছে ২০৫৮ জন।' অর্থাৎ ১৯৪৬ সাল হতে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ছ'বছরে মাত্র তিনজন মুসলিম দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে নেয়া হয়েছে।

তৃতীয় উদাহরণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী মি. মহাবীর তিয়াগীর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ভাষণ। প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন: The percentage of Muslims in the Armed Forces, which was 32 at the time of Partition, has now come down to 2. To correct this state of things, I have instructed that due regard should be paid to their recruitment.

"দেশ বিভাগের সময় সেনাবাহিনীতে যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩২ জন বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ জনে। এ অবস্থা সংশোধনের জন্য আমি সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের নিয়োগের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”

উপরিউক্ত বাস্তব তথ্যের আলোকে অনুমান করা যায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে কতজন মুসলমান কর্মরত রয়েছেন, যদিও এখনো মুসলমানদের মধ্যে যোগ্যতা ও দক্ষতা পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। অতীতেও দক্ষতা ও কর্তব্য নিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের ব্যাপক খ্যাতি ছিল এবং বর্তমানেও তাদের পড়া-লেখা ও যোগ্যতার মান ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের সংবিধান যদিও ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমান সুবিধার গ্যারান্টি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারে ভিন্ন ও উল্টো। বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ভারতে চাকুরী না পেয়ে মুসলমানদের ছেলে মেয়েরা হতাশ। বহু শিক্ষিত যুবক দেশ ত্যাগ করে প্রতি বছর পাকিস্তানে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতদসত্ত্বেও আশা করা যায় সংবিধানের বৈশিষ্ট্যাবলী বর্তমান অস্বাভাবিক অবস্থার অবসানে সক্ষম কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে সংবিধানের মৌল চেতনার পরিপন্থী। তবে এর জন্য পূর্বশত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগণ তাদের আবেগকে সংযত করে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব যদি মেনে নেন তাহলে অতীতের তিক্ত স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মুসলিম পারিবারিক আইন

📄 মুসলিম পারিবারিক আইন


ভারতে বসবাসরত মুসলমানগণ নিজেদের ধর্মীয় বলয়ে অবস্থান করে ব্যক্তিত্ব (Personalities) ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবেন কিনা এমন একটি প্রশ্ন সাম্প্রতিককালে দেখা দেয়। সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর একটি চরমপন্থী শ্রেণীর মনোভাব হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য একই দেওয়ানী-আইন (Uniform Civil Code) হওয়া চাই। এটা ছাড়া জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টি হতে পারেনা। এ বিপদ আশঙ্কার মাত্রা ছাড়িয়ে বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে হাযির হলো মুসলমানদের সামনে। সরকারের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তির মাঝে প্রদত্ত ভীতি ও অভিমত একই দেওয়ানী আইন প্রবর্তনের দাবীকে শক্তি যোগায়। আবদুল হামিদ দিলওয়ায়ী নাম জনৈক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি চিহ্নিত গ্রুপও ওই একই দাবী জানাতে থাকে এবং রীতিমত আন্দোলনের সৃষ্টি করে। এ দাবী মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক নৈরাজ্য ও ইসলামী শরীয়তের সাথে বিদ্রোহের শামিল। আল্লাহর নির্ধারিত বিধান যারা লঙ্ঘন করে তারা মুসলমান অভিধায় পরিচিত হতে পারেনা। মহান আল্লাহ বলেন 'আল্লাহর নাযিলকৃত বিধি-বিধান অনুযায়ী যারা নিজেদের জীবন পরিচালনা করে না তারা কাফির।"¹

উপর্যুক্ত আশঙ্কাকে সামনে রেখে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ড গঠিত হয়। বিহার ও উড়িষ্যার আমীরে শরীয়ত মরহুম মাওলানা সাইয়েদ মিন্নাত আলী রহমানী ছিলেন এ বোর্ড গঠণের অন্যতম পুরোধা। ১৯৭২ সালের ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত বোর্ডের প্রথম সাধারণ সম্মেলনে নিখিল ভারতের বিভিন্ন মাসলাকের ও সংগঠনের বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। সাম্প্রতিককালে মুসলমানদের এত বড় সম্মেলন আর হয়নি। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান পরিচালল আল্লামা ক্বারী তৈয়ব (রহ.) বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হন। নব গঠিত বোর্ডের অধীনে ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় স্থানে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মুসলমানদেরকে তাদের সমস্যা ও বিপদের আশঙ্কা সম্পর্কে সচেতন করতে ও দাবী আদায়ে সু সংগঠিত করতে বোর্ডের ভুমিকা ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৮৩ সালের ১৭ জুলাই আল্লামা কারী মুহাম্মদ তৈয়ব (রহ.) এর ইন্তেকাল করেন। ওই বছরের ২৭-২৮ ডিসেম্বর মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত অল- ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ডের বার্ষিক সম্মেলনে আমার অনুপস্থিতিতে আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং ১৯৮৫ সালের ৬,৭,৮ এপ্রিল কোলকাতায় বোর্ডের পরবর্তী বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সারা ভারত থেকে পাঁচ লাখের মত মুসলমান অংশ গ্রহণ নেন। কোলকাতা সম্মেলনের দু'সপ্তাহ পর ১৯৮৫ সালের ২৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর খোরপোষ সংক্রান্ত সে বিতর্কিত রায় প্রদান করেন যা ধর্মীয় বিধানে সরাসরি হস্তক্ষেপ। পবিত্র কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা, ইসলামী শরীয়তের অমর্যাদার শামিল। এ রায় ভারতীয় মুসলমানদের ঈমানী ভিত, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দুর্বিনীতভাবে নাড়া দেয়। সুপ্রিম কোর্ট নিজের সীমালঙ্ঘন করে এ বিপদজনক পদক্ষেপ নেন এমন কতিপয় লোকের কৃত পবিত্র কুরআনের অনুবাদ ভাষ্যের উপর ভিত্তি করে, যাদের তাফসীরের উপর পান্ডিত্য থাকা দূরের কথা সাধারণ আরবী জানেন কিনা তাও সন্দেহ। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আলিম, প্রাজ্ঞ মুফতী ও বিদগ্ধ মুফাসসীরদের অভিমত আমলে নেয়া হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ বিচারক 'মুতা বিল মারুফ' এর অনুবাদ করেছেন 'ভরণপোষণ' (Maintenance) দিয়ে। যার কারণে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর আমৃত্যু ব্যয়ভার তালাকদানকারী স্বামীকে বহন করতে হবে। যদিও পবিত্র কুরআনের ইংরেজী অনুবাদকদের মধ্যে অধিকাংশ বিজ্ঞ, সতর্ক ভাষ্যকারগণ 'ভরণপোষণ' এর পরিবর্তে 'সম্মান জনক ও ন্যায্য মালপত্র' শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর সারা জীবনের ভরণ- পোষনের দায়িত্ব পূর্বেকার স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক করে দিলে পরিণতি হবে দূঃখজনক ও ভয়াবহ। ফলে স্বামী তার অপছন্দনীয় স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরিবর্তে দোদুল্যমান অবস্থায় রেখে দেবে। স্ত্রীর চোখের পানিতে বুক ভেসে যাবে। ইজ্জত ও স্বাধীনভাবে স্বামীর সংসারও করতে পারবেনা, এমনকি দ্বিতীয় বিয়েও করতে পারবেনা। নীতিগতভাবে যেকোন বিদেশী ভাষায় পবিত্র কুরআনের এক বা দু'টি ভাষা অনুবাদের উদ্ধৃতি নিয়ে পবিত্র কুরআনের শব্দ ও শরীয়তের পরিভাষায় ব্যাখ্যা প্রদান এবং তাকে ভিত্তি করে শরীয়তের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দেয়া একটি বিপদজনক পদক্ষেপ এবং এর প্রতিক্রিয়া হয় দূর-প্রসারী। যার ফলে একটি জাতির পুরো শরীয়ত এবং তার ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা গভীর সংকটে নিপতিত হয়ে যায়। পারিবারিক ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। শরীয়তের বিধান সংশোধন ও বাতিল করার দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্টের বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে পুরো ভারতজুড়ে আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হয়। এটা ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। এতে কোন সহিংসতা, আক্রমণাত্মক, আপত্তিকর কর্মকান্ড ছিলনা। বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, ক্ষোভ প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিার নিকট তারবার্তা প্রেরণের মধ্যে আন্দোলন সীমিত ছিল। অপরদিকে ইংরেজী ও হিন্দী সংবাদপত্র সমূহ এ সমস্যায় যথাসাধ্য তেজবীর্যের সাথে বিরোধিতা করেছে যার উদাহরণ দেশ বিভাগের সময় পর্যন্ত দেখা যায়নি। সংবাদপত্র ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো এ ব্যাপারে মুসলমানদের তীব্র অনুভূতি, পারিবারক জীবনে ইসলামী আইনের প্রভাব, তালাক প্রাপ্তা মুসলিম মহিলাদের অবস্থাকে এমনভাবে চিত্রায়িত করে যে, মনে হয়, যেন মুসলমানরা বিদেশী আগ্রাসী শক্তির হামলার শিকার হলো, যেন ভয়ানক ভূমিকম্প সাজানো বাগানকে লন্ডভন্ড করে দিল এবং আগ্নেয়গিরির উদগিরিত লাভার তলে সব কিছু চাপা পড়ে গেল।

সৃষ্ট পরিস্থিতির ভয়াবহতা মাত্রাজ্ঞানের (Sense of proportion) স্বাভাবিক রীতিকে পর্যন্ত পর্যুদস্ত করে দিল। মুসলিম মহিলাদের অধিকার ও খোর-পোষের ব্যাপারে ভারতীয় সংবাদপত্র জগতের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং হিন্দু মহিলাদের সামাজিক দূরাবস্থার ব্যাপারে তাদের ইচ্ছাকৃত নীরবতা দায়িত্ব ও নীতিবোধের পরিচায়ক নয়। বি.বি.সি. হিন্দী সার্ভিস ভারত থেকে প্রকাশিত একটি হিন্দী মাসিক পত্রিকার এক মহিলা সম্পাদিকার যে সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে তাতে হিন্দু মহিলাদের অসহায়ত্বের বীভৎস চিত্র ভেসে উঠে। সাক্ষাৎকারে মহিলা সম্পাদিকা বলেন, 'বিগত তিন বছরে পুরো ভারতে যৌতুক না দেয়ার অপরধে ১১ হাজার নববধূকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিগত বছর গুলোর তুলনায় কেবল ১৯৯০ সালে সাত হাজার নববধূকে আগুনে পোড়া হয়।”¹ জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র দৈনিক 'কাওমী আওয়াজ' এর প্রতিবেদন অনুসারে দিল্লিতে গড়ে প্রতিদিন একজন নবপরিণিতা বধূকে হয়তো পুড়ে মারা হয় নইলে অন্যভাবে হত্যা করা হয়। সতীদাহ প্রথার শিকার অসহায় বিধবার প্রাণ নাশের ঘটনাতো হর হামেশা সংঘটিত হচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের তালাক প্রাপ্তা মহিলাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে ভারতীয় সংবাদপত্র জগতের এত হৈ চৈ ও হাঙ্গামা অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। অথচ সংখ্যালঘু মুসলিম মহিলাদের মধ্যে তালাক প্রাপ্তাদের সংখ্যা অতি নগন্য।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জনসভা, বিক্ষোভ মিছিল ও তারবার্তা প্রেরণের পাশাপাশি মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ডের সভাপতি ও মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের ক্ষোভ ও দূঃখের কথা ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী এব্যাপারে অত্যন্ত সহানুভূতি ও আন্তরিকতার পরিচয় দেন। অতীতে অন্য কোন রাষ্ট্রীয় কর্ণধারের মধ্যে কোন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এমন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি। পরিশেষে তালাকপ্রাপ্তা মহিলার খোরপোষ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জনগণের লড়াই বিজয় লাভ করে। ১১ ঘণ্টা দীর্ঘ উত্তপ্ত আলোচনার পর ১৯৮৬ সালের ৫ ও ৬ মে বিপুল ভোটাধিক্যে 'তালাক প্রাপ্তা মুসলিম অধিকার সংরক্ষণ বিল' মধ্যরাতে পার্লামেন্টে পাশ হয়। এভাবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ড তাদের আন্দোলনের একটি ধাপ কামিয়াবীর সাথে অতিক্রম করে। কিন্তু সফলতা ছিল আংশিক ও সীমাবদ্ধ কারণ মুসলমানদের মাথার উপর Uniform Civil Code এর খড়গ ছিল ঝুলন্ত। ওটা চালু হয়ে গেলে বিলের কার্যকারিতা হ্রাস পাবে। মুসলিম পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ করার বহু দরজা খুলে যাবে।

ভারতীয় সংবিধানের ৪৪ ধারায় 'একই নাগরিক আইন' Uniform Civil Code অন্তর্ভূক্ত রয়েছে এবং এটাকে সংবিধানের 'নির্দেশনামূলক নীতি'র (Directive principles) মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে: 'রাষ্ট্র পুরো ভারতের জনগণের জন্য 'একই নাগরিক আইন' (Uniform Civil Code) প্রবর্তনে সচেষ্ট থাকবে।' বাস্তবে 'একই নাগরিক আইন' দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র সহায়ক শক্তি নয়। শহর কেন্দ্রিক যেকোন আদালতে গেলে দেখা যাবে একই ধর্মাবলম্বী একই পার্সোনাল ল' এর অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কিভাবে লড়াই করছে, কিভাবে আইনের আশ্রয় প্রার্থনা করছে এবং এভাবে একে অপরের জান-মালেরও দুশমনে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞ E. Boden Heimer এর বক্তব্য সবিশেষ প্রণিধান যোগ্য: 'কোন আইনী ব্যবস্থা যার লক্ষ হচ্ছে মানব জীনে একই ধারা প্রবর্তন করা, এতে যদি জনগোষ্ঠীর একটি বৃহত্তর অংশের মধ্যে বঞ্চনা ও না ইনসাফীর ধারণা সৃষ্টি হয় তাহলে সে আইনকে ভঙ্গ ও লঙ্ঘনের হাত থেকে রক্ষা করা ও নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্য নেহায়েত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।'¹

একথা মুসলমানদের ঈমান আকীদার অংশ যে, তাদের পারিবারিক আইন ওই আল্লাহর তৈরী যিনি পবিত্র কুরআন অবতরণ করেছেন, আকিদাও ইবাদতের বিধি বিধান দান করেছেন। গোটা কুরআন এসব বর্ণনায় ভর্তি। এ আকিদার প্রতি ঈমান আনতে মুসলমান নারী পুরুষ একান্তভাবে বাধ্য। এছাড়া কেউ মুসলমান থাকতে পারেনা। এ আইন সর্বজ্ঞ ও সর্বত্র বিরাজমান মহান আল্লাহর তৈরী যিনি মানুষের স্রষ্টা ও বিশ্বজগতের স্রষ্টা। তিনি মানুষের প্রয়োজন ও দূর্বলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত।

দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য এটা অত্যন্ত জরুরী যে, অপ্রয়োজনীয় মানসিক অস্থিরতা, সন্দেহ ও ভীতিপ্রদ পরিবেশের সমাপ্তি ঘটুক। কোন দেশের পুরো জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যখন নিজেদের ভবিষ্যত, জীবনধারা, আকিদা, বিশ্বাস, শরীয়তের বিধি বিধান সম্পর্কে সন্দেহ ও সংশয়ে পতিত হয় তখন সে দেশে ও কখনো উন্নতি করতে পারেনা। যে দক্ষতা ও প্রাণশক্তি দেশের সংহতি, অগ্রগতি ও উন্নয়নে ব্যয় হতে পারতো সেটা সন্দেহ, সংশয় দূর করার কাজে যদি নিঃশেষিত হয় তাহলে এর চাইতে দূর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে? যদি মুসলমানদের এ আশঙ্কা হয় যে, আমাদের মত আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মও ধর্ম ও ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনে অধিকার ও স্বাধীনতা পাবেনা তখন তাদের মধ্যে এমন উদ্বেগজনক অস্থিরতার জন্ম নেবে যা কেবল মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর হবেনা বরং দেশ ও জাতির জন্য হবে বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক। এহেন পরিস্থিতি শান্তি, স্থিতি, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান, দেশের উন্নয়ন ও যৌথ কর্মপ্রয়াসের পথে বড় ধরণের অন্ত রায় ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে।

টিকাঃ
১. আল-কুরআন, সূরা মায়েদা : ৪৪
১. বি.বি.সি. হিন্দী সার্ভিস হতে ১৯৯১ সালের আগষ্ট প্রভাতী অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত।
১. E. Boden Heimer, Jurisprudence, Harvard, 1967, p.212

ভারতে বসবাসরত মুসলমানগণ নিজেদের ধর্মীয় বলয়ে অবস্থান করে ব্যক্তিত্ব (Personalities) ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবেন কিনা এমন একটি প্রশ্ন সাম্প্রতিককালে দেখা দেয়। সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর একটি চরমপন্থী শ্রেণীর মনোভাব হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য একই দেওয়ানী-আইন (Uniform Civil Code) হওয়া চাই। এটা ছাড়া জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টি হতে পারেনা। এ বিপদ আশঙ্কার মাত্রা ছাড়িয়ে বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে হাযির হলো মুসলমানদের সামনে। সরকারের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তির মাঝে প্রদত্ত ভীতি ও অভিমত একই দেওয়ানী আইন প্রবর্তনের দাবীকে শক্তি যোগায়। আবদুল হামিদ দিলওয়ায়ী নাম জনৈক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি চিহ্নিত গ্রুপও ওই একই দাবী জানাতে থাকে এবং রীতিমত আন্দোলনের সৃষ্টি করে। এ দাবী মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক নৈরাজ্য ও ইসলামী শরীয়তের সাথে বিদ্রোহের শামিল। আল্লাহর নির্ধারিত বিধান যারা লঙ্ঘন করে তারা মুসলমান অভিধায় পরিচিত হতে পারেনা। মহান আল্লাহ বলেন 'আল্লাহর নাযিলকৃত বিধি-বিধান অনুযায়ী যারা নিজেদের জীবন পরিচালনা করে না তারা কাফির।"¹

উপর্যুক্ত আশঙ্কাকে সামনে রেখে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ড গঠিত হয়। বিহার ও উড়িষ্যার আমীরে শরীয়ত মরহুম মাওলানা সাইয়েদ মিন্নাত আলী রহমানী ছিলেন এ বোর্ড গঠণের অন্যতম পুরোধা। ১৯৭২ সালের ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত বোর্ডের প্রথম সাধারণ সম্মেলনে নিখিল ভারতের বিভিন্ন মাসলাকের ও সংগঠনের বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। সাম্প্রতিককালে মুসলমানদের এত বড় সম্মেলন আর হয়নি। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান পরিচালল আল্লামা ক্বারী তৈয়ব (রহ.) বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হন। নব গঠিত বোর্ডের অধীনে ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় স্থানে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মুসলমানদেরকে তাদের সমস্যা ও বিপদের আশঙ্কা সম্পর্কে সচেতন করতে ও দাবী আদায়ে সু সংগঠিত করতে বোর্ডের ভুমিকা ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৮৩ সালের ১৭ জুলাই আল্লামা কারী মুহাম্মদ তৈয়ব (রহ.) এর ইন্তেকাল করেন। ওই বছরের ২৭-২৮ ডিসেম্বর মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত অল- ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ডের বার্ষিক সম্মেলনে আমার অনুপস্থিতিতে আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং ১৯৮৫ সালের ৬,৭,৮ এপ্রিল কোলকাতায় বোর্ডের পরবর্তী বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সারা ভারত থেকে পাঁচ লাখের মত মুসলমান অংশ গ্রহণ নেন। কোলকাতা সম্মেলনের দু'সপ্তাহ পর ১৯৮৫ সালের ২৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর খোরপোষ সংক্রান্ত সে বিতর্কিত রায় প্রদান করেন যা ধর্মীয় বিধানে সরাসরি হস্তক্ষেপ। পবিত্র কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা, ইসলামী শরীয়তের অমর্যাদার শামিল। এ রায় ভারতীয় মুসলমানদের ঈমানী ভিত, আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দুর্বিনীতভাবে নাড়া দেয়। সুপ্রিম কোর্ট নিজের সীমালঙ্ঘন করে এ বিপদজনক পদক্ষেপ নেন এমন কতিপয় লোকের কৃত পবিত্র কুরআনের অনুবাদ ভাষ্যের উপর ভিত্তি করে, যাদের তাফসীরের উপর পান্ডিত্য থাকা দূরের কথা সাধারণ আরবী জানেন কিনা তাও সন্দেহ। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আলিম, প্রাজ্ঞ মুফতী ও বিদগ্ধ মুফাসসীরদের অভিমত আমলে নেয়া হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ বিচারক 'মুতা বিল মারুফ' এর অনুবাদ করেছেন 'ভরণপোষণ' (Maintenance) দিয়ে। যার কারণে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর আমৃত্যু ব্যয়ভার তালাকদানকারী স্বামীকে বহন করতে হবে। যদিও পবিত্র কুরআনের ইংরেজী অনুবাদকদের মধ্যে অধিকাংশ বিজ্ঞ, সতর্ক ভাষ্যকারগণ 'ভরণপোষণ' এর পরিবর্তে 'সম্মান জনক ও ন্যায্য মালপত্র' শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীর সারা জীবনের ভরণ- পোষনের দায়িত্ব পূর্বেকার স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক করে দিলে পরিণতি হবে দূঃখজনক ও ভয়াবহ। ফলে স্বামী তার অপছন্দনীয় স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরিবর্তে দোদুল্যমান অবস্থায় রেখে দেবে। স্ত্রীর চোখের পানিতে বুক ভেসে যাবে। ইজ্জত ও স্বাধীনভাবে স্বামীর সংসারও করতে পারবেনা, এমনকি দ্বিতীয় বিয়েও করতে পারবেনা। নীতিগতভাবে যেকোন বিদেশী ভাষায় পবিত্র কুরআনের এক বা দু'টি ভাষা অনুবাদের উদ্ধৃতি নিয়ে পবিত্র কুরআনের শব্দ ও শরীয়তের পরিভাষায় ব্যাখ্যা প্রদান এবং তাকে ভিত্তি করে শরীয়তের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দেয়া একটি বিপদজনক পদক্ষেপ এবং এর প্রতিক্রিয়া হয় দূর-প্রসারী। যার ফলে একটি জাতির পুরো শরীয়ত এবং তার ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা গভীর সংকটে নিপতিত হয়ে যায়। পারিবারিক ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। শরীয়তের বিধান সংশোধন ও বাতিল করার দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্টের বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে পুরো ভারতজুড়ে আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হয়। এটা ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। এতে কোন সহিংসতা, আক্রমণাত্মক, আপত্তিকর কর্মকান্ড ছিলনা। বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, ক্ষোভ প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিার নিকট তারবার্তা প্রেরণের মধ্যে আন্দোলন সীমিত ছিল। অপরদিকে ইংরেজী ও হিন্দী সংবাদপত্র সমূহ এ সমস্যায় যথাসাধ্য তেজবীর্যের সাথে বিরোধিতা করেছে যার উদাহরণ দেশ বিভাগের সময় পর্যন্ত দেখা যায়নি। সংবাদপত্র ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো এ ব্যাপারে মুসলমানদের তীব্র অনুভূতি, পারিবারক জীবনে ইসলামী আইনের প্রভাব, তালাক প্রাপ্তা মুসলিম মহিলাদের অবস্থাকে এমনভাবে চিত্রায়িত করে যে, মনে হয়, যেন মুসলমানরা বিদেশী আগ্রাসী শক্তির হামলার শিকার হলো, যেন ভয়ানক ভূমিকম্প সাজানো বাগানকে লন্ডভন্ড করে দিল এবং আগ্নেয়গিরির উদগিরিত লাভার তলে সব কিছু চাপা পড়ে গেল।

সৃষ্ট পরিস্থিতির ভয়াবহতা মাত্রাজ্ঞানের (Sense of proportion) স্বাভাবিক রীতিকে পর্যন্ত পর্যুদস্ত করে দিল। মুসলিম মহিলাদের অধিকার ও খোর-পোষের ব্যাপারে ভারতীয় সংবাদপত্র জগতের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং হিন্দু মহিলাদের সামাজিক দূরাবস্থার ব্যাপারে তাদের ইচ্ছাকৃত নীরবতা দায়িত্ব ও নীতিবোধের পরিচায়ক নয়। বি.বি.সি. হিন্দী সার্ভিস ভারত থেকে প্রকাশিত একটি হিন্দী মাসিক পত্রিকার এক মহিলা সম্পাদিকার যে সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে তাতে হিন্দু মহিলাদের অসহায়ত্বের বীভৎস চিত্র ভেসে উঠে। সাক্ষাৎকারে মহিলা সম্পাদিকা বলেন, 'বিগত তিন বছরে পুরো ভারতে যৌতুক না দেয়ার অপরধে ১১ হাজার নববধূকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিগত বছর গুলোর তুলনায় কেবল ১৯৯০ সালে সাত হাজার নববধূকে আগুনে পোড়া হয়।”¹ জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র দৈনিক 'কাওমী আওয়াজ' এর প্রতিবেদন অনুসারে দিল্লিতে গড়ে প্রতিদিন একজন নবপরিণিতা বধূকে হয়তো পুড়ে মারা হয় নইলে অন্যভাবে হত্যা করা হয়। সতীদাহ প্রথার শিকার অসহায় বিধবার প্রাণ নাশের ঘটনাতো হর হামেশা সংঘটিত হচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের তালাক প্রাপ্তা মহিলাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে ভারতীয় সংবাদপত্র জগতের এত হৈ চৈ ও হাঙ্গামা অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। অথচ সংখ্যালঘু মুসলিম মহিলাদের মধ্যে তালাক প্রাপ্তাদের সংখ্যা অতি নগন্য।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জনসভা, বিক্ষোভ মিছিল ও তারবার্তা প্রেরণের পাশাপাশি মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ডের সভাপতি ও মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের ক্ষোভ ও দূঃখের কথা ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী এব্যাপারে অত্যন্ত সহানুভূতি ও আন্তরিকতার পরিচয় দেন। অতীতে অন্য কোন রাষ্ট্রীয় কর্ণধারের মধ্যে কোন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এমন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি। পরিশেষে তালাকপ্রাপ্তা মহিলার খোরপোষ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে জনগণের লড়াই বিজয় লাভ করে। ১১ ঘণ্টা দীর্ঘ উত্তপ্ত আলোচনার পর ১৯৮৬ সালের ৫ ও ৬ মে বিপুল ভোটাধিক্যে 'তালাক প্রাপ্তা মুসলিম অধিকার সংরক্ষণ বিল' মধ্যরাতে পার্লামেন্টে পাশ হয়। এভাবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল' বোর্ড তাদের আন্দোলনের একটি ধাপ কামিয়াবীর সাথে অতিক্রম করে। কিন্তু সফলতা ছিল আংশিক ও সীমাবদ্ধ কারণ মুসলমানদের মাথার উপর Uniform Civil Code এর খড়গ ছিল ঝুলন্ত। ওটা চালু হয়ে গেলে বিলের কার্যকারিতা হ্রাস পাবে। মুসলিম পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ করার বহু দরজা খুলে যাবে।

ভারতীয় সংবিধানের ৪৪ ধারায় 'একই নাগরিক আইন' Uniform Civil Code অন্তর্ভূক্ত রয়েছে এবং এটাকে সংবিধানের 'নির্দেশনামূলক নীতি'র (Directive principles) মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে: 'রাষ্ট্র পুরো ভারতের জনগণের জন্য 'একই নাগরিক আইন' (Uniform Civil Code) প্রবর্তনে সচেষ্ট থাকবে।' বাস্তবে 'একই নাগরিক আইন' দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র সহায়ক শক্তি নয়। শহর কেন্দ্রিক যেকোন আদালতে গেলে দেখা যাবে একই ধর্মাবলম্বী একই পার্সোনাল ল' এর অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কিভাবে লড়াই করছে, কিভাবে আইনের আশ্রয় প্রার্থনা করছে এবং এভাবে একে অপরের জান-মালেরও দুশমনে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞ E. Boden Heimer এর বক্তব্য সবিশেষ প্রণিধান যোগ্য: 'কোন আইনী ব্যবস্থা যার লক্ষ হচ্ছে মানব জীনে একই ধারা প্রবর্তন করা, এতে যদি জনগোষ্ঠীর একটি বৃহত্তর অংশের মধ্যে বঞ্চনা ও না ইনসাফীর ধারণা সৃষ্টি হয় তাহলে সে আইনকে ভঙ্গ ও লঙ্ঘনের হাত থেকে রক্ষা করা ও নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্য নেহায়েত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।'¹

একথা মুসলমানদের ঈমান আকীদার অংশ যে, তাদের পারিবারিক আইন ওই আল্লাহর তৈরী যিনি পবিত্র কুরআন অবতরণ করেছেন, আকিদাও ইবাদতের বিধি বিধান দান করেছেন। গোটা কুরআন এসব বর্ণনায় ভর্তি। এ আকিদার প্রতি ঈমান আনতে মুসলমান নারী পুরুষ একান্তভাবে বাধ্য। এছাড়া কেউ মুসলমান থাকতে পারেনা। এ আইন সর্বজ্ঞ ও সর্বত্র বিরাজমান মহান আল্লাহর তৈরী যিনি মানুষের স্রষ্টা ও বিশ্বজগতের স্রষ্টা। তিনি মানুষের প্রয়োজন ও দূর্বলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত।

দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য এটা অত্যন্ত জরুরী যে, অপ্রয়োজনীয় মানসিক অস্থিরতা, সন্দেহ ও ভীতিপ্রদ পরিবেশের সমাপ্তি ঘটুক। কোন দেশের পুরো জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যখন নিজেদের ভবিষ্যত, জীবনধারা, আকিদা, বিশ্বাস, শরীয়তের বিধি বিধান সম্পর্কে সন্দেহ ও সংশয়ে পতিত হয় তখন সে দেশে ও কখনো উন্নতি করতে পারেনা। যে দক্ষতা ও প্রাণশক্তি দেশের সংহতি, অগ্রগতি ও উন্নয়নে ব্যয় হতে পারতো সেটা সন্দেহ, সংশয় দূর করার কাজে যদি নিঃশেষিত হয় তাহলে এর চাইতে দূর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে? যদি মুসলমানদের এ আশঙ্কা হয় যে, আমাদের মত আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মও ধর্ম ও ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনে অধিকার ও স্বাধীনতা পাবেনা তখন তাদের মধ্যে এমন উদ্বেগজনক অস্থিরতার জন্ম নেবে যা কেবল মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর হবেনা বরং দেশ ও জাতির জন্য হবে বেদনাদায়ক ও ধ্বংসাত্মক। এহেন পরিস্থিতি শান্তি, স্থিতি, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান, দেশের উন্নয়ন ও যৌথ কর্মপ্রয়াসের পথে বড় ধরণের অন্ত রায় ও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে।

টিকাঃ
১. আল-কুরআন, সূরা মায়েদা : ৪৪
১. বি.বি.সি. হিন্দী সার্ভিস হতে ১৯৯১ সালের আগষ্ট প্রভাতী অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত।
১. E. Boden Heimer, Jurisprudence, Harvard, 1967, p.212

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ঐতিহাসিক মসজিদগুলোকে মন্দিরে পরিণত করা দাবী

📄 ঐতিহাসিক মসজিদগুলোকে মন্দিরে পরিণত করা দাবী


বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ১৯৮৪ সালে ৭,৮ এপ্রিল এক গুপ্ত সম্মেলন আহবান করে। এতে সারা ভারতের বিপুল সংখ্যক চরমপন্থী হিন্দু অংশ গ্রহণ করে। সম্মেলনে মুসলিম জাতি গোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে বিনাশ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব পাশ হয়। সম্মেলনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারতের বুক থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ (Ethnic cleansing) এবং স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে তারা যেন পরিচয় দিতে না পারে। বেনারসের জ্ঞানবাকী মসজিদ, মথুরার ঈদগাহ ও অযোধ্যার বাবরী মসজিদকে মুসলমানদের হাত থেকে মুক্ত করে যথাক্রমে প্রথমটাকে বিষুনাথের মন্দির, দ্বিতীয়টিকে কৃষ্ণ জন্মভূমি ও তৃতীয়টিকে রাম জন্মভূমিতে পরিণত করার দাবী জানানো হয়। ইতোমধ্যে বিশ্বহিন্দু পরিষদ দিল্লির কুতুব মিনার আগ্রার তাজমহলের নিচে মন্দির থাকার কাল্পনিক তথ্য প্রচার করে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন ভেঙে ফেলার দাবী জানায়।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (RSS) সাধারণ হিন্দু জনগণকে একথা বুঝাবার চেষ্টা করে যে, বর্তমানে যেখানে বাবরী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত সেখানে ষোড়শ শতাব্দীর আগে জহিরুদ্দীন মুহামমদ বাবর এটা ভেঙ্গে মসজিদ তৈরী করেন। গোটা ভারতের ইংরেজী ও হিন্দী সংবাদপত্র সমূহ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় রামজন্ম ভূমির পক্ষে উম্মত্ত প্রচারণা চালাতে থাকে। ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারী মসজিদের তালা আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়। আগে থেকেই মসজিদের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মুর্তি স্থাপন করা হয়। এটা ছিল বড় ধরণের ঘুর্ণিঝড়ের বিপদ সঙ্কেত। আতঙ্ক ও দূর্যোগের ঘণঘটায় আচ্ছন্ন পরিবেশে দ্বীনি, জাতীয় গবেষণা, শিক্ষা বিষয়ক কোন কাজ হতে পারেনা। সম্পদ্রায় হিসেবে মুসলামনদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বই সংকটের আবর্তে পড়ে যায়। বাবরী মসজিদ রাম জন্ম ভূমিতে তৈরী হয়েছে এ গুজব ও প্রোপাগান্ডা খন্ডন করে লক্ষ্ণৌর ইসলামিক রিসার্চ ও পাবলিকেশন একাডেমী, আজমগড়ের দারুল মুসান্নিফীনের পক্ষ হতে বিজ্ঞ হিন্দু ও মুসলমানের লেখায় সমৃদ্ধ অনেক, প্রবন্ধ-নিবন্ধ বেরিয়েছে। এসব নিবন্ধে বিজ্ঞ লেখকগণ প্রমাণ করেছেন যে, বাবর কোন মন্দিরকে ধ্বংস করে মসজিদ বানিয়েছেন এমন কোন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। থাকলেও তা বিতর্কিত স্থানের বাইরে। এ বিষয়ে আজমগড়ের দারুল মুসান্নিফীনের পরিচালক মাওলানা সাইয়েদ সাবাহুদ্দীন এম.এ রচিত 'বাবরী মসজিদ তারিখী পাস মান্যার আওর পেশ নযর কী রৌশনী মে' বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে। এছাড়া ড.আর. এল. শাকলা, চৈতানন্দ দাশ প্রমুখ বিজ্ঞ লেখকগণও বাবরী মসজিদ ও রামমন্দির ইস্যু নিয়ে পক্ষপাতহীন ও বাস্তবোচিত নিবন্ধ লিখে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ১৯৮৪ সালে ৭,৮ এপ্রিল এক গুপ্ত সম্মেলন আহবান করে। এতে সারা ভারতের বিপুল সংখ্যক চরমপন্থী হিন্দু অংশ গ্রহণ করে। সম্মেলনে মুসলিম জাতি গোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে বিনাশ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব পাশ হয়। সম্মেলনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারতের বুক থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ (Ethnic cleansing) এবং স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে তারা যেন পরিচয় দিতে না পারে। বেনারসের জ্ঞানবাকী মসজিদ, মথুরার ঈদগাহ ও অযোধ্যার বাবরী মসজিদকে মুসলমানদের হাত থেকে মুক্ত করে যথাক্রমে প্রথমটাকে বিষুনাথের মন্দির, দ্বিতীয়টিকে কৃষ্ণ জন্মভূমি ও তৃতীয়টিকে রাম জন্মভূমিতে পরিণত করার দাবী জানানো হয়। ইতোমধ্যে বিশ্বহিন্দু পরিষদ দিল্লির কুতুব মিনার আগ্রার তাজমহলের নিচে মন্দির থাকার কাল্পনিক তথ্য প্রচার করে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন ভেঙে ফেলার দাবী জানায়।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (RSS) সাধারণ হিন্দু জনগণকে একথা বুঝাবার চেষ্টা করে যে, বর্তমানে যেখানে বাবরী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত সেখানে ষোড়শ শতাব্দীর আগে জহিরুদ্দীন মুহামমদ বাবর এটা ভেঙ্গে মসজিদ তৈরী করেন। গোটা ভারতের ইংরেজী ও হিন্দী সংবাদপত্র সমূহ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় রামজন্ম ভূমির পক্ষে উম্মত্ত প্রচারণা চালাতে থাকে। ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারী মসজিদের তালা আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়। আগে থেকেই মসজিদের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মুর্তি স্থাপন করা হয়। এটা ছিল বড় ধরণের ঘুর্ণিঝড়ের বিপদ সঙ্কেত। আতঙ্ক ও দূর্যোগের ঘণঘটায় আচ্ছন্ন পরিবেশে দ্বীনি, জাতীয় গবেষণা, শিক্ষা বিষয়ক কোন কাজ হতে পারেনা। সম্পদ্রায় হিসেবে মুসলামনদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বই সংকটের আবর্তে পড়ে যায়। বাবরী মসজিদ রাম জন্ম ভূমিতে তৈরী হয়েছে এ গুজব ও প্রোপাগান্ডা খন্ডন করে লক্ষ্ণৌর ইসলামিক রিসার্চ ও পাবলিকেশন একাডেমী, আজমগড়ের দারুল মুসান্নিফীনের পক্ষ হতে বিজ্ঞ হিন্দু ও মুসলমানের লেখায় সমৃদ্ধ অনেক, প্রবন্ধ-নিবন্ধ বেরিয়েছে। এসব নিবন্ধে বিজ্ঞ লেখকগণ প্রমাণ করেছেন যে, বাবর কোন মন্দিরকে ধ্বংস করে মসজিদ বানিয়েছেন এমন কোন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। থাকলেও তা বিতর্কিত স্থানের বাইরে। এ বিষয়ে আজমগড়ের দারুল মুসান্নিফীনের পরিচালক মাওলানা সাইয়েদ সাবাহুদ্দীন এম.এ রচিত 'বাবরী মসজিদ তারিখী পাস মান্যার আওর পেশ নযর কী রৌশনী মে' বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে। এছাড়া ড.আর. এল. শাকলা, চৈতানন্দ দাশ প্রমুখ বিজ্ঞ লেখকগণও বাবরী মসজিদ ও রামমন্দির ইস্যু নিয়ে পক্ষপাতহীন ও বাস্তবোচিত নিবন্ধ লিখে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ঘুমন্ত অস্থিরতাকে জাগিয়ে তোলা অনুচিত

📄 ঘুমন্ত অস্থিরতাকে জাগিয়ে তোলা অনুচিত


আমি প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে লিখিত এক পত্রে বলেছিলাম: ইতিহাসের চাকাকে উল্টো দিকে ঘুরাতে গেলে অপ্রয়োজনীয় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এটা একটি ঘুমন্ত বাঘ, তাকে জাগানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় গুলোর বিষয়ে ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ থেকে সত্য-মিথ্যা তথ্যাদি বের করে পুরণো অবয়বে ফিরে নেয়ার দাবী- একটি বড় ধরনের উত্তেজনার জন্ম দেবে এবং এর ধারাবাহিকতা শেষ হবার নয়। আমি প্রথম এ পরামর্শই দিয়েছি। অতঃপর প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী রাজীবগান্ধীকেও বলেছি যে, সরকার প্রকাশ্যে ঘোষণা করুক যে, প্রতিটি সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলো ১৯৪৭ সালে ১৫ আগষ্টের পূর্ববর্তী অবস্থায় থাকবে। কোন সম্প্রদায়ের অপর সম্প্রদায়ের উপাসনালয় দখল করার অথবা কল্পিত পুরণো অবয়বে ফিরে নেয়ার অনুমতি দেয়া যাবেনা।

বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আমার আন্তরিক পরামর্শ তাঁরা যেন উপাসনালয় ও পবিত্র স্থান সমূহের পরিবর্তন ও পরিবর্দ্ধন করার বা আধিপত্য বিস্তারের অনুমতি না দেন। ইতিহাসকে পেছনের দিকে নেয়ার পরিবর্তে সামনে দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ কারণ- জীবন চলমান ও প্রবাহমান। পৃথিবী দ্রুততর সাথে উন্নতির পথে ধাবিত হচ্ছে। আমাদের দেশ বিশেষভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর সমস্যায় জর্জরিত। কল্যানকামিতা, মানবতা, শান্তিপ্রিয়তা ও নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এদেশকে পৃথিবীর নৈতিক নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হতে হবে। এটা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বাভাবিকতা। পৃথিবীর বৃহত্তর শক্তিগুলো এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে এবং দুর্নামের ভাগী হয়েছে অনেকাংশে।

আমি প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে লিখিত এক পত্রে বলেছিলাম: ইতিহাসের চাকাকে উল্টো দিকে ঘুরাতে গেলে অপ্রয়োজনীয় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এটা একটি ঘুমন্ত বাঘ, তাকে জাগানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় গুলোর বিষয়ে ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ থেকে সত্য-মিথ্যা তথ্যাদি বের করে পুরণো অবয়বে ফিরে নেয়ার দাবী- একটি বড় ধরনের উত্তেজনার জন্ম দেবে এবং এর ধারাবাহিকতা শেষ হবার নয়। আমি প্রথম এ পরামর্শই দিয়েছি। অতঃপর প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী রাজীবগান্ধীকেও বলেছি যে, সরকার প্রকাশ্যে ঘোষণা করুক যে, প্রতিটি সম্প্রদায়ের উপাসনালয়গুলো ১৯৪৭ সালে ১৫ আগষ্টের পূর্ববর্তী অবস্থায় থাকবে। কোন সম্প্রদায়ের অপর সম্প্রদায়ের উপাসনালয় দখল করার অথবা কল্পিত পুরণো অবয়বে ফিরে নেয়ার অনুমতি দেয়া যাবেনা।

বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আমার আন্তরিক পরামর্শ তাঁরা যেন উপাসনালয় ও পবিত্র স্থান সমূহের পরিবর্তন ও পরিবর্দ্ধন করার বা আধিপত্য বিস্তারের অনুমতি না দেন। ইতিহাসকে পেছনের দিকে নেয়ার পরিবর্তে সামনে দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ কারণ- জীবন চলমান ও প্রবাহমান। পৃথিবী দ্রুততর সাথে উন্নতির পথে ধাবিত হচ্ছে। আমাদের দেশ বিশেষভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর সমস্যায় জর্জরিত। কল্যানকামিতা, মানবতা, শান্তিপ্রিয়তা ও নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এদেশকে পৃথিবীর নৈতিক নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হতে হবে। এটা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বাভাবিকতা। পৃথিবীর বৃহত্তর শক্তিগুলো এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে এবং দুর্নামের ভাগী হয়েছে অনেকাংশে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px