📄 দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতিবন্ধকতা
ইসলাম যে একটি মিশনারী ধর্ম - একথা কারও অজানা নয়। দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় ইসলাম বিস্তৃতি ও লাভ করেছে। নিঃস্বার্থ ধর্ম প্রচারক, আমানতদার ব্যবসায়ী ও সত্যনিষ্ঠ সুফী-দরবেশদের তাবলীগের বরকতে যত মানুষ ভারতে ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছেন তাদের সংখ্যা ঐসব মুসলমানদের চাইতে বেশী যারা এখানে এসেছিলেন সরাসরি আরব, ইরান ও তুরস্কের মতো মুসলিম দেশ থেকে। ইসলামের নীরব ও নিঃস্বার্থ প্রচার ও ভারতীয় মুসলমানদের জন্য নতুন প্রাণ ও নতুন শোণিতধারা যুগিয়েছে নিয়মিত। একমাত্র দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধনে এমন নতুন অতিথি এসেছেন যারা পরবর্তীতে নিজেদের সৃষ্টিশীল মেধা ও অসাধারণ যোগ্যতার বলে মুসলিম বিশ্বের নজীর বিহীন ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হন।
ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে এমন বহু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাদের দূরে অথবা কাছে কোথাও না কোথাও হিন্দু পরিবারের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে। নিকট অতীতে 'তুহফাতুল হিন্দ' এর গ্রন্থকার মাওলানা ওবাইদুল্লাহ্ পাটিয়ালভী (রহ.), মাওলানা ওবাইদুল্লাহ সিন্ধী (রহ.), ড. স্যার মুহাম্মদ ইকবাল (রহ.), মাওলানা সানাউল্লাহ্ অমৃতসরী (রহ.) ও শায়খুত তাফসীর মাওলানা আহমদ আলী লাহোরীর (রহ.) মত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের নাম এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। খুব কম মুসলমানই জানেন যে, এসব বুযুর্গবৃন্দ হিন্দু পরিবারের সাথে সম্পর্কিত। পরবর্তীতে তারা ইসলামের শ্বাশত আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ইসলাম কবুল করেন।
ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের এ ধারাবাহিকতা ভারতে মুসলিম শাসনের পতনযুগে এবং বৃটিশ শাসনের সমাপ্তি দিনগুলো পর্যন্ত সফলতার সাথে অব্যাহত ছিল। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক অমুসলিম স্বেচ্ছায় ও স্ব প্রণোদিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এর কারণ হচ্ছে যুক্তিনির্ভর শিক্ষা, তাওহীদবাদী চেতনা, সামাজিক ন্যায় বিচার ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের গৌরবোজ্জ্বল আদর্শের ফলে ইসলাম অপরাপর ধর্মের উপর শ্রেষ্টত্ব বজায় রাখে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় অস্পৃশ্যতা ও বর্ণপ্রথার আদৌ কোন স্থান নেই। পবিত্র কুরআন, সীরাতে রাসূল এবং ইসলামের শিক্ষা গণমানুষের অন্তর ও বিবেককে জয় করে নিয়েছে।
পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি যদি এভাবে চলতে থাকতো তাহলে সম্ভবত শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয় বরং পুরো এশিয়ায় ইসলাম বৃহত্তর ধর্মীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতো। কিন্তু হিন্দু ও মুসলমানদের রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়ে গেলো যা পরবর্তীতে দু'সম্প্রদায়ের অন্তরে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার আগুন জ্বালিয়ে দিলো। একে অপরের মাঝখানে সন্দেহ, ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর তৈরী হয়ে গেলো। যার ফলশ্রুতিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু'টি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হলো। ভারত বর্ষের বিভক্তি সঠিক ছিল না ভুল ছিল? অথবা সমস্যার কোন বিকল্প সমাধান ছিল কিনা অথবা এ সমাধান গ্রহণযোগ্য হতো কিনা এ প্রসঙ্গ নিয়ে এ মুহুর্তে আমি কোন আলোচনা করতে চাইনা। পুরে বিষয়টি ভারতবের্ষর ইতিহাস রচয়িতাদের জন্য সংরক্ষিত রইল যারা পক্ষপাতহীনভাবে ঘটনার আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পাবেন। আমি কেবল এতটুকু বলতে চাই যে, তৎকালীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলী ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক এমন এক বিরূপ পরিস্থিতির জন্ম দিল যার ফলে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অমোচনীয় তিক্ততা বৃদ্ধি পেলো এবং একে অপরকে ঘৃণা ও সেেন্দহের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো।
সম্পকের এ তিক্ততা প্রতিপক্ষের ধর্ম- আকীদার সাথে হোক অথবা সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে হোক অথবা চিন্তা- চেতনার সাথে হোক সেটা বড় কথা নয়। সুতরাং অসহিষ্ণুতা ও অনাস্থার এ অনুভূতি ভারতবর্ষে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের পথে বিরাট এক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে দিল। ইসলামের ব্যাপারে ভারতবর্ষে একটি সাধারণ ধারণা জন্ম নিলো যে, ইসলাম এমন একটি দেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম যা প্রতিপক্ষ হওয়ার উপযোগী অথবা এমন এক জাতির ধর্ম যারা অতীতে রাজনীতির টানাপোড়েন ও তিক্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলো। সে দুর্দিনের দুঃসহ স্মৃতি এখনো অন্তরে দগদগে ক্ষত হয়ে রক্ত ঝরায়। অনেক সময় পাকিস্তানে এমন ঘটনাবলী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় যা পড়লে অন্তর পুরনো ব্যথায় বিষিয়ে উঠে।
এটাই ভারতীয় মুসলমানদের অনেক বড় সমস্যা কিন্তু এতে সন্দেহ নেই যে, দিন যত যাবে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক তত উন্নত হবে, আবেগের উপর বুদ্ধি ও বিবেচনার প্রভাব যত দৃঢ়তর হবে ততই বিরাজমান সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে। হতাশার মেঘ কেটে যাবে এবং ইসলামের আবেদন ও জনপ্রিয়তা আবার ফিরে আসবে। তবে শর্ত হচ্ছে মুসলমানদেরকে বাস্তবোচিত পদক্ষেপ, নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থভাবে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চালিয়ে যেতে হবে এবং রাজনেতিক সুবিধে ও ক্ষমতায় আরোহনের কোন চিন্তা না থাকা চাই। দুনিয়া আখেরাতের মুক্তিকে সামনে রেখে মুসলমানদেরকে ওয়াজ নসীহতের ও সর্বপ্লাবী ভালবাসার প্রেরণায় উজ্জীবিত হতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মুসলমানদেরকে দেশবাসীর সামনে উন্নত নৈতিক চরিত্র ও ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিপালনের বাস্তব দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে হবে। হিন্দি ও ভারতের আঞ্চলিক ভাষায় হৃদয়গ্রাহী ও সাড়াজাগানো বর্ণনারীতিতে রাসূলের জীবন চরিত ও ইসলামী সাহিত্য তৈরী করে সমাজের সামনে পেশ করতে হবে। মুসলমানদেরকে আন্তরিকতা, বিপুল উদ্দীপনা ও দায়িত্বানুভূতির সাথে জাতীয় উন্নয়ন, দেশ পুনর্গঠন ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক কাজে অংশ নিতে হবে। এটা অত্যন্ত জরুরী।
ইসলাম যে একটি মিশনারী ধর্ম - একথা কারও অজানা নয়। দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় ইসলাম বিস্তৃতি ও লাভ করেছে। নিঃস্বার্থ ধর্ম প্রচারক, আমানতদার ব্যবসায়ী ও সত্যনিষ্ঠ সুফী-দরবেশদের তাবলীগের বরকতে যত মানুষ ভারতে ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছেন তাদের সংখ্যা ঐসব মুসলমানদের চাইতে বেশী যারা এখানে এসেছিলেন সরাসরি আরব, ইরান ও তুরস্কের মতো মুসলিম দেশ থেকে। ইসলামের নীরব ও নিঃস্বার্থ প্রচার ও ভারতীয় মুসলমানদের জন্য নতুন প্রাণ ও নতুন শোণিতধারা যুগিয়েছে নিয়মিত। একমাত্র দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধনে এমন নতুন অতিথি এসেছেন যারা পরবর্তীতে নিজেদের সৃষ্টিশীল মেধা ও অসাধারণ যোগ্যতার বলে মুসলিম বিশ্বের নজীর বিহীন ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হন।
ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে এমন বহু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাদের দূরে অথবা কাছে কোথাও না কোথাও হিন্দু পরিবারের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে। নিকট অতীতে 'তুহফাতুল হিন্দ' এর গ্রন্থকার মাওলানা ওবাইদুল্লাহ্ পাটিয়ালভী (রহ.), মাওলানা ওবাইদুল্লাহ সিন্ধী (রহ.), ড. স্যার মুহাম্মদ ইকবাল (রহ.), মাওলানা সানাউল্লাহ্ অমৃতসরী (রহ.) ও শায়খুত তাফসীর মাওলানা আহমদ আলী লাহোরীর (রহ.) মত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের নাম এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। খুব কম মুসলমানই জানেন যে, এসব বুযুর্গবৃন্দ হিন্দু পরিবারের সাথে সম্পর্কিত। পরবর্তীতে তারা ইসলামের শ্বাশত আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ইসলাম কবুল করেন।
ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের এ ধারাবাহিকতা ভারতে মুসলিম শাসনের পতনযুগে এবং বৃটিশ শাসনের সমাপ্তি দিনগুলো পর্যন্ত সফলতার সাথে অব্যাহত ছিল। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক অমুসলিম স্বেচ্ছায় ও স্ব প্রণোদিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এর কারণ হচ্ছে যুক্তিনির্ভর শিক্ষা, তাওহীদবাদী চেতনা, সামাজিক ন্যায় বিচার ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের গৌরবোজ্জ্বল আদর্শের ফলে ইসলাম অপরাপর ধর্মের উপর শ্রেষ্টত্ব বজায় রাখে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় অস্পৃশ্যতা ও বর্ণপ্রথার আদৌ কোন স্থান নেই। পবিত্র কুরআন, সীরাতে রাসূল এবং ইসলামের শিক্ষা গণমানুষের অন্তর ও বিবেককে জয় করে নিয়েছে।
পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি যদি এভাবে চলতে থাকতো তাহলে সম্ভবত শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয় বরং পুরো এশিয়ায় ইসলাম বৃহত্তর ধর্মীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতো। কিন্তু হিন্দু ও মুসলমানদের রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়ে গেলো যা পরবর্তীতে দু'সম্প্রদায়ের অন্তরে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতার আগুন জ্বালিয়ে দিলো। একে অপরের মাঝখানে সন্দেহ, ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর তৈরী হয়ে গেলো। যার ফলশ্রুতিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু'টি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হলো। ভারত বর্ষের বিভক্তি সঠিক ছিল না ভুল ছিল? অথবা সমস্যার কোন বিকল্প সমাধান ছিল কিনা অথবা এ সমাধান গ্রহণযোগ্য হতো কিনা এ প্রসঙ্গ নিয়ে এ মুহুর্তে আমি কোন আলোচনা করতে চাইনা। পুরে বিষয়টি ভারতবের্ষর ইতিহাস রচয়িতাদের জন্য সংরক্ষিত রইল যারা পক্ষপাতহীনভাবে ঘটনার আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পাবেন। আমি কেবল এতটুকু বলতে চাই যে, তৎকালীণ রাজনৈতিক ঘটনাবলী ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক এমন এক বিরূপ পরিস্থিতির জন্ম দিল যার ফলে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে অমোচনীয় তিক্ততা বৃদ্ধি পেলো এবং একে অপরকে ঘৃণা ও সেেন্দহের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো।
সম্পকের এ তিক্ততা প্রতিপক্ষের ধর্ম- আকীদার সাথে হোক অথবা সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে হোক অথবা চিন্তা- চেতনার সাথে হোক সেটা বড় কথা নয়। সুতরাং অসহিষ্ণুতা ও অনাস্থার এ অনুভূতি ভারতবর্ষে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের পথে বিরাট এক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে দিল। ইসলামের ব্যাপারে ভারতবর্ষে একটি সাধারণ ধারণা জন্ম নিলো যে, ইসলাম এমন একটি দেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম যা প্রতিপক্ষ হওয়ার উপযোগী অথবা এমন এক জাতির ধর্ম যারা অতীতে রাজনীতির টানাপোড়েন ও তিক্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলো। সে দুর্দিনের দুঃসহ স্মৃতি এখনো অন্তরে দগদগে ক্ষত হয়ে রক্ত ঝরায়। অনেক সময় পাকিস্তানে এমন ঘটনাবলী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় যা পড়লে অন্তর পুরনো ব্যথায় বিষিয়ে উঠে।
এটাই ভারতীয় মুসলমানদের অনেক বড় সমস্যা কিন্তু এতে সন্দেহ নেই যে, দিন যত যাবে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক তত উন্নত হবে, আবেগের উপর বুদ্ধি ও বিবেচনার প্রভাব যত দৃঢ়তর হবে ততই বিরাজমান সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে। হতাশার মেঘ কেটে যাবে এবং ইসলামের আবেদন ও জনপ্রিয়তা আবার ফিরে আসবে। তবে শর্ত হচ্ছে মুসলমানদেরকে বাস্তবোচিত পদক্ষেপ, নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থভাবে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চালিয়ে যেতে হবে এবং রাজনেতিক সুবিধে ও ক্ষমতায় আরোহনের কোন চিন্তা না থাকা চাই। দুনিয়া আখেরাতের মুক্তিকে সামনে রেখে মুসলমানদেরকে ওয়াজ নসীহতের ও সর্বপ্লাবী ভালবাসার প্রেরণায় উজ্জীবিত হতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মুসলমানদেরকে দেশবাসীর সামনে উন্নত নৈতিক চরিত্র ও ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিপালনের বাস্তব দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে হবে। হিন্দি ও ভারতের আঞ্চলিক ভাষায় হৃদয়গ্রাহী ও সাড়াজাগানো বর্ণনারীতিতে রাসূলের জীবন চরিত ও ইসলামী সাহিত্য তৈরী করে সমাজের সামনে পেশ করতে হবে। মুসলমানদেরকে আন্তরিকতা, বিপুল উদ্দীপনা ও দায়িত্বানুভূতির সাথে জাতীয় উন্নয়ন, দেশ পুনর্গঠন ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক কাজে অংশ নিতে হবে। এটা অত্যন্ত জরুরী।
📄 অন্যায় ও পক্ষপাতদুষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা
দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা। এ সমস্যা মুসলমানদের জাতীয় জীবন ও তাদের ভবিষ্যতের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দ্বীনের তাবলীগের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাতে কেবল ইসলামের বিস্তৃতি ও অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। এতে মুসলমানদের বিশেষ সংস্কৃতি, বিশেষ তাহযীব ও বিশেষ আকীদা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
গণতান্ত্রিক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে প্রত্যেক ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব বিশ্বাস, ধর্মমত ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের দৃষ্টিতে দেশের প্রতিটি নাগরিক ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে সমান অধিকার পাওয়ার দাবীদার। এ সংবিধান এমন একটি দেশের জন্য প্রণীত হয়েছে যেখানে বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন ধর্ম ও বিভিন্ন সংস্কৃতির অনুসারী বসবাস করেন। এ দৃষ্টিকোণে উক্ত সংবিধানের ধারা উপধারা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। ভারতের জন্য এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণীত হওয়া দরকার ছিল যেখানে রাষ্ট্র ও প্রশাসন বিশেষ কোন ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা না করে সবধর্মকে সমান দৃষ্টিতে দেখবেন এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় সব ধর্মের আদর্শের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। ভারতবর্ষের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে সব ধর্মের আদর্শের প্রতিনিধিত্বশীল একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন হয়তো সম্ভব নয়। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ হতো এটাই ভাল ছিল, যেখানে কোন বিশেষ ধর্মের পক্ষে ওকালতি করা হবেনা। ভারতের সংবিধান প্রণেতাগণের বিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টির প্রশংসার দাবী রাখে কারণ তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ ব্যবস্থা বৃটিশ শাসিত ভারতে চালু ছিল। বাস্তবে রাষ্ট্রের পক্ষপাত মুক্ত ব্যবস্থায় কোন সম্প্রদায়ের আপত্তি ও অভিযোগ থাকতে পারেনা। মুসলমানগণও এ ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। কিন্তু দূঃখের সাথে বলতে হয় যে, শিক্ষা পদ্ধতির ব্যাপারে সংবিধানের ধারা উপধারা ও সরকারী ঘোষণা কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
পাঠ্যপুস্তক প্রণেতাগণ এমন এক কারিকুলাম তৈরী করেন যা সংবিধানের মৌল চেতনার পরিপন্থী। তাঁরা ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকীদা বিশ্বাস ও দেবদেবীর কাহিনী (Mythology) দ্বারা পাঠ্যক্রম ভর্তি করে দেন। পৌত্তলিক চিন্তাধারা ও বিশ্বাস কুরআনের উল্লেখযোগ্য শিক্ষা, তাওহীদ ও রাসুলুল্লাহর (সা.) আদর্শের পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক। পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করলে সহজে বুঝা যায় এর প্রণেতাগণ ভারত বর্ষের মতো বহুধর্মের দেশকে ব্রাহ্মণের দেশ মনে করেছেন এবং ব্রাহ্মণ্যপ্রীতিকে বিবেচনায় রেখেছেন। তারা দেবতা, অবতার, উৎসব, মেলা, মন্দির, তীর্থকেন্দ্র, উপনিষদীয় রীতি-পদ্ধতিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
অধ্যয়নের জন্য যেসব গ্রন্থ নির্ধারিত হয়েছে তাতে একটি বিশেষ ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবন কাহিনী সন্নিবেশিত হয়েছে যাতে ছাত্র- ছাত্রীগণ নিজেদের অতীত ইতিহাসের সাথে সম্যক পরিচিতি লাভ করতে পারে। পাঠ্যপুস্তক রচয়িতাগণ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ও পরিকল্পিতভাবে ইসলামী ব্যক্তিবর্গের আদর্শ ও ইতিহাস বর্ণনাকে উপেক্ষা করে গেছেন। ইসলামের চৌদ্দশ' বছরের ইতিহাসে কোন আধ্যাত্মিক সাধক, ন্যায়পরায়ন শাসক, বিজ্ঞ সংবিধান প্রণেতা, অকুতোভয় সমর কুশলী ও প্রাজ্ঞ পন্ডিত তাঁরা পাননি, যাদের জীবন ও কর্ম পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। অথচ ভারত বর্ষের আনাচে-কানাচে এমন সব ইসলামী ব্যক্তিত্ব জন্ম লাভ করেন, যাদের নিয়ে ভারত বর্ষ রীতিমত গর্ব করতে পারে। এসব প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিবর্গ ভারতীয় ইতিহাসের রত্ন। তাঁদের আলোচনা ও জীবন কর্মের ইতিহাস ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের সাহস ও কর্ম শক্তি যোগাতে পারতো। বস্তুতঃ পাঠ্যপুস্তক প্রণেতাগণ মুসলিম যুগের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের শিক্ষা ও ইতিহাস ক্যারিকুলামের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিদেশী ও অপরিচিতের ন্যায় ব্যবহার করেছেন। যদি কোথাও কোন ইসলামী ব্যক্তিত্বের আলোচনা আসে তাও এমন ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয় যাতে তাঁর অমর্যাদা মানহানি ঘটে।¹ মানবতার বন্ধু, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতে গিয়ে এমন অশালীন ও অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য কিছু কিছু পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং অজ্ঞতা ও বিদ্বেষ প্রসূত। এসব আপত্তিকর আলোচনা ভারতীয় মুসলমানদের সাথে অবিচারের শামিল এবং এতে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি প্রচন্ডভাবে আহত হয়। বহুস্থানে মুসলমানদের 'যবন' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যার অর্থ হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন, অস্পৃশ্য, নীচ ও বিদেশী। এ ধরণের আপত্তিকর পুস্তক পাঠ্য তালিকায় সন্নিবেশ এবং মুসলমানগণ সহ সব ছাত্র-ছাত্রীর জন্য বাধ্যতামুলক করণ স্পষ্টভাবে মুসলমানদের সাথে না ইনসাফীর শামিল এবং তাদের অনুভূতি ও অধিকার লঙ্ঘণের নামান্তর। এটা মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংহতি এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের অধিকারের প্রতি প্রচন্ড ধরণের হুমকী। অথচ মুসলমানগণ ভারতবর্ষকে নিজের মাতৃভূমি মনে করেন, এখানে স্থায়ী বসবাসের ইচ্ছে পোষণ করেন এবং এদেশের সেবা ও উন্নয়নে নিজেদের শ্রেষ্ঠতম মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর ব্রত নেন।
শিক্ষা পদ্ধতি মুসলিম সন্তান সন্ততিদের দ্রুত ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক নৈরাজ্যের অতলপঙ্কে নিক্ষেপ করবে এ আশঙ্কা অমূলক নয়। ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে উদাসীন এমন সব মুসলিম পরিবারে ইতোমধ্যেই নতুন শিক্ষা পদ্ধতির মারাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব পরিবারের সন্তানগণ উদারভাবে অনৈসলামিক ও পৌত্তলিক শিক্ষা ও রীতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। সত্যিকার অর্থে এটা মুসলমানদের জন্য বড়ই উদ্বেগের বিষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের ইঙ্গিতবাহী।
বর্তমান পরিস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত ক্লেশকর। সৃষ্ট পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর প্রদেশের বাস্তী জেলায় এক বিশাল শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন মাসলাকের প্রায় ৩০০ মুসলিম প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগদান করে সর্বসম্মতিক্রমে ভারত সরকারের কাছে দাবী জানান যেন সরকারী পাঠ্যক্রম জরুরী ভিত্তিতে সংশোধন করা হয়; যেসব নিবন্ধ ইসলামী আকায়েদের পরিপন্থী ও বিশেষ কোন ধর্মাবলম্বীদের এবং তাদের ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে তা যেন সিলেবাস থেকে বাদ দিয়ে ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক আদর্শের আলোকে ধর্মনিরপেক্ষ পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়। সম্মেলনে স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় প্রভাতী ও নৈশকালীন বিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকালয়ে আরো কিছু নতুন বিদ্যালয় খোলা হবে যেখানে সরকারী অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি পবিত্র কুরআন, ইসলামিক ষ্টাডিজ ও উর্দু শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকবে। সম্মেলনের সিদ্ধান্তের প্রতি মুসলমানগণ ইতিবাচক সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন এবং উত্তর প্রদেশের প্রায় শহরে শিক্ষা সম্মেলনের শাখা কমিটি গঠিত হয়। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মতবিনিময় সভা, নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠকের মাধ্যমে মুসলমানগণ ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হচ্ছে মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও।
টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য - উত্তর প্রদেশের ৬ষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তক 'হামারে পুরুজ'
দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা। এ সমস্যা মুসলমানদের জাতীয় জীবন ও তাদের ভবিষ্যতের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দ্বীনের তাবলীগের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাতে কেবল ইসলামের বিস্তৃতি ও অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তাতে ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। এতে মুসলমানদের বিশেষ সংস্কৃতি, বিশেষ তাহযীব ও বিশেষ আকীদা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
গণতান্ত্রিক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে প্রত্যেক ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব বিশ্বাস, ধর্মমত ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের দৃষ্টিতে দেশের প্রতিটি নাগরিক ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে সমান অধিকার পাওয়ার দাবীদার। এ সংবিধান এমন একটি দেশের জন্য প্রণীত হয়েছে যেখানে বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন ধর্ম ও বিভিন্ন সংস্কৃতির অনুসারী বসবাস করেন। এ দৃষ্টিকোণে উক্ত সংবিধানের ধারা উপধারা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। ভারতের জন্য এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণীত হওয়া দরকার ছিল যেখানে রাষ্ট্র ও প্রশাসন বিশেষ কোন ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা না করে সবধর্মকে সমান দৃষ্টিতে দেখবেন এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় সব ধর্মের আদর্শের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। ভারতবর্ষের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে সব ধর্মের আদর্শের প্রতিনিধিত্বশীল একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন হয়তো সম্ভব নয়। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ হতো এটাই ভাল ছিল, যেখানে কোন বিশেষ ধর্মের পক্ষে ওকালতি করা হবেনা। ভারতের সংবিধান প্রণেতাগণের বিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টির প্রশংসার দাবী রাখে কারণ তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ ব্যবস্থা বৃটিশ শাসিত ভারতে চালু ছিল। বাস্তবে রাষ্ট্রের পক্ষপাত মুক্ত ব্যবস্থায় কোন সম্প্রদায়ের আপত্তি ও অভিযোগ থাকতে পারেনা। মুসলমানগণও এ ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। কিন্তু দূঃখের সাথে বলতে হয় যে, শিক্ষা পদ্ধতির ব্যাপারে সংবিধানের ধারা উপধারা ও সরকারী ঘোষণা কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
পাঠ্যপুস্তক প্রণেতাগণ এমন এক কারিকুলাম তৈরী করেন যা সংবিধানের মৌল চেতনার পরিপন্থী। তাঁরা ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকীদা বিশ্বাস ও দেবদেবীর কাহিনী (Mythology) দ্বারা পাঠ্যক্রম ভর্তি করে দেন। পৌত্তলিক চিন্তাধারা ও বিশ্বাস কুরআনের উল্লেখযোগ্য শিক্ষা, তাওহীদ ও রাসুলুল্লাহর (সা.) আদর্শের পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক। পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করলে সহজে বুঝা যায় এর প্রণেতাগণ ভারত বর্ষের মতো বহুধর্মের দেশকে ব্রাহ্মণের দেশ মনে করেছেন এবং ব্রাহ্মণ্যপ্রীতিকে বিবেচনায় রেখেছেন। তারা দেবতা, অবতার, উৎসব, মেলা, মন্দির, তীর্থকেন্দ্র, উপনিষদীয় রীতি-পদ্ধতিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
অধ্যয়নের জন্য যেসব গ্রন্থ নির্ধারিত হয়েছে তাতে একটি বিশেষ ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবন কাহিনী সন্নিবেশিত হয়েছে যাতে ছাত্র- ছাত্রীগণ নিজেদের অতীত ইতিহাসের সাথে সম্যক পরিচিতি লাভ করতে পারে। পাঠ্যপুস্তক রচয়িতাগণ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ও পরিকল্পিতভাবে ইসলামী ব্যক্তিবর্গের আদর্শ ও ইতিহাস বর্ণনাকে উপেক্ষা করে গেছেন। ইসলামের চৌদ্দশ' বছরের ইতিহাসে কোন আধ্যাত্মিক সাধক, ন্যায়পরায়ন শাসক, বিজ্ঞ সংবিধান প্রণেতা, অকুতোভয় সমর কুশলী ও প্রাজ্ঞ পন্ডিত তাঁরা পাননি, যাদের জীবন ও কর্ম পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। অথচ ভারত বর্ষের আনাচে-কানাচে এমন সব ইসলামী ব্যক্তিত্ব জন্ম লাভ করেন, যাদের নিয়ে ভারত বর্ষ রীতিমত গর্ব করতে পারে। এসব প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিবর্গ ভারতীয় ইতিহাসের রত্ন। তাঁদের আলোচনা ও জীবন কর্মের ইতিহাস ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের সাহস ও কর্ম শক্তি যোগাতে পারতো। বস্তুতঃ পাঠ্যপুস্তক প্রণেতাগণ মুসলিম যুগের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের শিক্ষা ও ইতিহাস ক্যারিকুলামের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিদেশী ও অপরিচিতের ন্যায় ব্যবহার করেছেন। যদি কোথাও কোন ইসলামী ব্যক্তিত্বের আলোচনা আসে তাও এমন ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয় যাতে তাঁর অমর্যাদা মানহানি ঘটে।¹ মানবতার বন্ধু, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতে গিয়ে এমন অশালীন ও অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য কিছু কিছু পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং অজ্ঞতা ও বিদ্বেষ প্রসূত। এসব আপত্তিকর আলোচনা ভারতীয় মুসলমানদের সাথে অবিচারের শামিল এবং এতে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি প্রচন্ডভাবে আহত হয়। বহুস্থানে মুসলমানদের 'যবন' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যার অর্থ হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন, অস্পৃশ্য, নীচ ও বিদেশী। এ ধরণের আপত্তিকর পুস্তক পাঠ্য তালিকায় সন্নিবেশ এবং মুসলমানগণ সহ সব ছাত্র-ছাত্রীর জন্য বাধ্যতামুলক করণ স্পষ্টভাবে মুসলমানদের সাথে না ইনসাফীর শামিল এবং তাদের অনুভূতি ও অধিকার লঙ্ঘণের নামান্তর। এটা মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংহতি এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের অধিকারের প্রতি প্রচন্ড ধরণের হুমকী। অথচ মুসলমানগণ ভারতবর্ষকে নিজের মাতৃভূমি মনে করেন, এখানে স্থায়ী বসবাসের ইচ্ছে পোষণ করেন এবং এদেশের সেবা ও উন্নয়নে নিজেদের শ্রেষ্ঠতম মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর ব্রত নেন।
শিক্ষা পদ্ধতি মুসলিম সন্তান সন্ততিদের দ্রুত ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক নৈরাজ্যের অতলপঙ্কে নিক্ষেপ করবে এ আশঙ্কা অমূলক নয়। ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে উদাসীন এমন সব মুসলিম পরিবারে ইতোমধ্যেই নতুন শিক্ষা পদ্ধতির মারাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব পরিবারের সন্তানগণ উদারভাবে অনৈসলামিক ও পৌত্তলিক শিক্ষা ও রীতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। সত্যিকার অর্থে এটা মুসলমানদের জন্য বড়ই উদ্বেগের বিষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের ইঙ্গিতবাহী।
বর্তমান পরিস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত ক্লেশকর। সৃষ্ট পরিস্থিতি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর প্রদেশের বাস্তী জেলায় এক বিশাল শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন মাসলাকের প্রায় ৩০০ মুসলিম প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগদান করে সর্বসম্মতিক্রমে ভারত সরকারের কাছে দাবী জানান যেন সরকারী পাঠ্যক্রম জরুরী ভিত্তিতে সংশোধন করা হয়; যেসব নিবন্ধ ইসলামী আকায়েদের পরিপন্থী ও বিশেষ কোন ধর্মাবলম্বীদের এবং তাদের ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে তা যেন সিলেবাস থেকে বাদ দিয়ে ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক আদর্শের আলোকে ধর্মনিরপেক্ষ পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়। সম্মেলনে স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় প্রভাতী ও নৈশকালীন বিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকালয়ে আরো কিছু নতুন বিদ্যালয় খোলা হবে যেখানে সরকারী অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি পবিত্র কুরআন, ইসলামিক ষ্টাডিজ ও উর্দু শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকবে। সম্মেলনের সিদ্ধান্তের প্রতি মুসলমানগণ ইতিবাচক সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন এবং উত্তর প্রদেশের প্রায় শহরে শিক্ষা সম্মেলনের শাখা কমিটি গঠিত হয়। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মতবিনিময় সভা, নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠকের মাধ্যমে মুসলমানগণ ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হচ্ছে মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও।
টিকাঃ
১. দ্রষ্টব্য - উত্তর প্রদেশের ৬ষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর জন্য অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তক 'হামারে পুরুজ'
📄 উর্দু ভাষার সমস্যা
ভারতীয় মুসলমানদের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে ভাষা সমস্যা। উর্দু ভাষা হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও শ্রেণীর মিলনের ফলে সৃষ্ট একটি নতুন ভাষা। উর্দু ভাষার মূলে ও নির্মাণ শৈলীতে সংস্কৃতি, আরবী, ফার্সি ও তুর্কীর বিশেষ প্রভাব বিদ্যমান। ভারতে বৃটিশ শাসনামলে বিপুল সংখ্যক ইংরেজী শব্দ উর্দু সাহিত্য পরিভাষার অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়ে। ফলে উর্দু ভাষা সত্যিকার অর্থে ভারতীয় জাতীয়তার প্রতীক ও সাধারণ মানুষের ভাব প্রকাশের শ্রেষ্টতম মাধ্যমরূপে স্বীকৃতি পায়। ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী মিলে উর্দুকে বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি, কবিতা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ভাবের আদান প্রদানের শক্তিশালী বাহন হিসেবে গড়ে তুলেন। উত্তর প্রদেশ, বিহার, পাঞ্জাব, হায়দ্রাবাদ, দিল্লি এবং তার সন্নিহিত অঞ্চলের অধিবাসীদের উর্দুই হচ্ছে মাতৃভাষা। কিছু ইংরেজী সংবাদপত্রকে বাদ দিলে সবচেয়ে বহুপঠিত সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় উর্দু ভাষায়।
ইংরেজীর পর উর্দুই ছিল ভারতের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা। আদালত, সরকারী অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উর্দুর বিচরণ ছিল জোরালো ও সচ্ছন্দ। উত্তর প্রদেশের প্রাক্তণ লেফটেন্যান্ট গভর্ণর স্যার এ্যান্থনী ম্যাকডোনাল্ড (Sir Anthony Mecdonald) হিন্দীকে আদালতের ভাষারূপে ঘোষণা দিয়ে দু'ভাষার এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতার বীজ বপন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর ভারতীয় ইউনিয়নের সংবিধানে হিন্দীকে সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ৩৪৩ ধারায় বলা হয়ঃ The Official Language of the Unions Shall be Hindi in Devenagri script. 'দেবনাগরী হরফে হিন্দীই হবে ভারত ইউনিয়নের সরকারী ভাষা।'
এছাড়াও সংবিধানের ৩৪৫ ধারায় দেশের আরো ১৪টি ভাষাকে ভারতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এসব ভাষায় যারা কথা বলেন তাঁদের দাবীর প্রেক্ষিতে সন্তান সন্ততিদের নিজেদের ভাষায় শিক্ষা প্রদান করবে। এক্ষেত্রে সবধরণের সুযোগ-সুবিধে সরকার প্রদান করবে। এক্ষেত্রে ভারতের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা রয়েছে তিনি যেকোন রাজ্য কর্তৃপক্ষকে সে রাজ্যের জনগোষ্ঠীর ভাষার ভিত্তিতে যেকোন ভাষাকে সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। সংবিধানের ৩৪৭ ধারায় বলা হয়েছে:
On a demand being made on that behalf, the President may, if he is satisfied that a substantial proportion of the population of a State desire the use of any language spoken by them to be recognised by that State, direct that such language shall also be officially recognised throughout the State or any part thereof for such purpose as he may specify.
'যেকোন রাজ্যের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি চান যে, তাঁরা সে ভাষা ব্যবহার করবেন যে ভাষায় তাঁরা কথা বলেন এবং রাজ্য সরকারও সে ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদান করুক; রাষ্ট্রপতি যদি এতে সন্তুষ্ট হন তাহলে দাবীর প্রেক্ষিতে সে ভাষাকে পুরো রাজ্যের জন্য অথবা রাজ্যের কোন অংশ বিশেষের সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারেন।'
কিন্তু সংবিধানের উপরিউক্ত গ্যারান্টি সত্ত্বেও উর্দুর জন্ম ও বিকাশভূমি উত্তর প্রদেশ ও দিল্লি হতে উর্দুকে নির্বাসন দেয়া হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও উর্দুর অস্তিত্বকে বরদাশত করা হয়নি। শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রমের স্তরে হিন্দিকে শিক্ষার মাধ্যম বানানো হয়। উত্তর প্রদেশ সরকারের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে উর্দু ব্যবহারের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে। সৃষ্ট এ পরিস্থিতি উর্দু ভাষী জনগোষ্ঠীকে দারুনভাবে হতাশ ও বিস্মিত করে দেয়। উর্দুর প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ ও বেদনার সৃষ্টি হয়। কারণ উর্দুর মর্যাদা ও ব্যবহার হ্রাস পেলে কেবল মুসলমানদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতি হবেনা বরং তাদের আকীদা ও মাযহাবের ভবিষ্যতকে প্রশ্ন সাপেক্ষ করে তুলবে। কারণ উর্দু ভাষাই ভারতীয় মুসলমানদের সংস্কৃতি ও সভ্যতার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। উর্দু ভাষায় রয়েছে মুসলমানদের প্রায় সব ধর্মীয় সাহিত্য। উর্দু ভাষার বর্ণমালা আরবী বর্ণমালার কাছাকাছি হওয়ার কারণে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত সহজতর হয়। উর্দু ভাষা হতে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ মুসলমানগণ জাতীয়তা, সংস্কৃতি, সম্প্রদায়গত বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে আত্ম পরিচয়হীন জাতিতে পরিণত হয়ে পড়বে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে উর্দু ভাষীগণ সরকারী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শণ করতে থাকে ফলে কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিতে ১৯৪৯ সালে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রীদের এক সম্মেলন আহবান করেন। উক্ত সম্মেলনে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম সংক্রান্ত নিম্নোক্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়ঃ
The medium of instruction and examination in the Junior basic stage must be the mother-tongue of the child and where the mother-tongue is different from the Regional or the State language, arrangements must be made for instruction in the mother tongue by appointing at least one teacher, provided there are not less than 40 pupils speaking the language in the whole school or 10 such pupils in a class. The mother tongue will be the language declared by the parent of the guardian to the mother tongue.
'মাধ্যমিক মৌলিক স্তরে শিশুদের শিক্ষা ও পরীক্ষার মাধ্যম অবশ্যই মাতৃভাষায় হওয়া চাই। যেখানে রাষ্ট্রীয় ও রাজ্যের ভাষা হতে মাতৃভাষা ভিন্ন হবে সেখানে মাতৃভাষায় শিক্ষা দানের জন্য কমপক্ষে একজন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে তবে শর্ত থাকে যে, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে ন্যূনপক্ষে ৪০ জন অথবা ক্লাসে ১০জন উক্ত ভাষা ভাষাভাষী ছাত্র-ছাত্রী থাকতে হবে। শিক্ষার্থীর মাতা-পিতা ও অভিভাবক যে ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে ঘোষণা দিবেন সেটাই হবে উক্ত শিক্ষার্থীর 'মাতৃভাষা'।
দুর্ভাগ্যজনক ভাবে উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। উত্তর প্রদেশের সরকারী ও পৌর বিদ্যালয়গুলোতে হিন্দীকে বাধ্যতামূলক শিক্ষা দেয়া হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কেবল হিন্দীই পরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে অব্যাহত থাকে। উর্দু শিক্ষা প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়। যেসব শিশুদের মাতৃভাষা উর্দু তারাও প্রাথমিক পর্যায়ে উর্দু ভাষা শিক্ষার সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। মুসলমান ও উর্দুভাষী জনগণ ১৯৪৯ সালে দিল্লিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের স্কুলে উর্দু শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের নিকট বারংবার আবেদন-নিবেদন করতে থাকেন। একমাত্র লক্ষ্ণৌতেই ১০ হাজার মাতা-পিতা ও অভিভাবক রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর নিকট এ ব্যাপারে লিখিত আবেদন জানান কিন্তু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কোন মনোযোগ প্রদান করেননি।
সব প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার পর উর্দু ভাষী জনগণ সংবিধানের ৩৪৭ ধারার আশ্রয় নিয়ে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির সমীপে একটি স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। উর্দু উন্নয়ন সমিতির (আঞ্জুমান-ই- তারাক্কী-ই-উর্দু) উদ্যোগে স্বেচ্ছায় ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রায় ২০ লাখ ৫০ হাজার বয়স্ক মানুষের এবং ২০ লাখ ছাত্র-ছাত্রীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয় স্মারক লিপিতে। আঞ্জুমানে-ই-তারাক্কী-ই-উর্দুর সভাপতি, বিহারের প্রাক্তণ গভর্ণর ও আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তণ ভাইস চ্যান্সেলর ড. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জননেতা ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল গঠণ করা হয়। ১৯৫৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী উত্তর প্রদেশের আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে উর্দুকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবী জানিয়ে স্মারকলিপিটি রাষ্ট্রপতিকে প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় যে (ক) যেসব ছাত্র-ছাত্রীর মাতৃভাষা উর্দু তাদের প্রাথমিক স্তরে উর্দু ভাষায় শিক্ষা প্রদানের সুবিধে প্রদান করা হোক। (খ) যেসব স্কুলে ৪০জন বা ক্লাসে ১০জন উর্দুভাষী শিক্ষার্থী রয়েছে তাদের জন্য উর্দু শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হোক। (গ) তাদের অফিস ও আদালতে উর্দু ভাষায় লিখিত আবেদন ও আর্জি বিবেচনা গ্রহণ করা হোক। (ঘ) সরকারের সব নির্দেশনাবলী, নোটিফিকেশন, গেজেট, বিল, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য প্রকাশনা উর্দু ভাষায় করা হোক। (ঙ) আগের রেওয়াজ মত উর্দু ভাষায় রচিত ব্যতিক্রমধর্মী গদ্য ও পদ্য সাহিত্যের জন্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ঘোষণা করা হোক। (চ) সরকারী গণগ্রন্থাগার, একাডেমী, সেমিনার লাইব্রেরী ও পাঠকক্ষের জন্য উর্দু ভাষায় রচিত গ্রন্থ সমূহ ক্রয় করা হোক। (ছ) সরকারী দফতর সমূহে পূনরায় উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
বার সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দলে পাঁচ জন ছিলেন হিন্দু বিশেষজ্ঞ। রাষ্ট্রপতি প্রতিনিধি দলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং তাঁদের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন এবং দাবী গুলোর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। ব্যাস্ এতুটুকু। যথা পূর্বং তথা পরং। স্মারকলিপির আলোকে এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি যাতে উর্দু ভাষীদের স্বস্তি মেলে এবং তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবার হাত থেকে মুক্তি পায়। শিক্ষাবিভাগ পূর্বেকার মত উর্দুর সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ অব্যাহত রাখে। উর্দু ভাষাভাষী অঞ্চলের শিশুরা আগের মতই মাতৃভাষার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হতে বঞ্চিত রয়ে গেলো। যার ফলে নব প্রজন্মের শিশুরা ক্রমশ: প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি, আকীদা, মাযহাব ও পূর্ববর্তী যুগের বুযুর্গদের সাথে তাদের সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নব প্রজন্ম নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে শত যোজন দূরে চলে গেছে। শত প্রচেষ্টা চালিয়েও তাদের নিজেদের তাহযীব ও তামাদ্দুনের সাথে পরিচিত করানো সম্ভব হচ্ছেনা। কারণ নতুন ও পুরনোর মাঝে যে সেতুবন্ধন ছিল তা ভেঙ্গে গেছে।
১৯৬১ সালের আগষ্ট মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় সরকারে উদ্যোগে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীদের এক সম্মেলনে বহুল আলোচিত 'তিন ভাষার ফর্মুলা' (Three Language Formula) উদ্ভাবন করা হয়। ফর্মুলা অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের হিন্দী, ইংরেজী ও একটি ভারতীয় ভাষা শিখতে হবে। আশা করা হয়েছিল উর্দুভাষী শিক্ষার্থীগণ মাধ্যমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে কিন্তু উত্তর প্রদেশ কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতমূলক নীতি ও উর্দুভাষী শিক্ষার্থীদের আশার গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিল। কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিলেন কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্ত তাদের জন্য প্রযোজ্য নয় বরং এটা দক্ষিণ ভারতের ভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ ব্যাখ্যা মাধ্যমিক পর্যায়ে উর্দু ভাষার শিক্ষা গ্রহণেচ্ছু শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। উর্দুকে সমাজ জীবন থেকে নির্বাসিত করার এটা কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগ একথা নির্দ্ধিধায় বলা চলে।
১৯৬১ সালে পুনরায় উত্তর প্রদেশ সরকারের উদ্যোগে আচার্য জে.বি ক্রিপালিনীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠণ করা হয়। কমিটি গঠণের উদ্দেশ্য ছিল উর্দু ভাষী মানুষের ক্ষোভ যাচাই, সরকারের নির্দেশ কেন বাস্তবায়িত হয়নি তা খতিয়ে দেখা এবং এ ব্যাপারে যুৎসই সুপারিশ পেশ করা। কিন্তু আফসোসের বিষয় কমিটি কর্তৃক সরকারের নিকট দাখিলকৃত রিপোর্ট অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। উর্দু ভাষী জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ ও দূঃখের ব্যাপারটি আদৌ বিবেচনায় না নিয়ে তদন্ত কমিটি উল্টো মুসলমানদের মাকতাব, ইসলামিক স্কুল ও ধর্মীয় আরবী-ফার্সী মাদ্রাসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কমিটির সুপারিশ যদি গ্রহণ করা হতো তাহলে উর্দুর অবস্থান আরো দুর্বলতর হয়ে পড়তো এবং ক্রমান্বয়ে উর্দু তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতো। মুসলমানদের শিক্ষা সংস্কৃতির উন্নয়নের উদ্দেশ্যে গঠিত ক্রিপালিনী কমিটির সুপারিশমালা বাস্তবায়িত হলে শত বছর ধরে প্রচলিত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ বন্ধ হয়ে যেত।
উর্দু ভাষার প্রতি সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় মুসলমানদের উভয় সঙ্কটে নিপতিত করে দেয় এবং তাঁরা এক বিস্ময়কর নৈতিক অবিশ্বাসের শিকার হন। নিজ মাতৃভূমিতে তাঁরা ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ার ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এতদসত্ত্বেও ভারতের মুসলমানদের হতাশ হয়ে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। রাজনৈতিক সচেতনতা মুসলমানদেরকে ভারতের বৃহত্তর শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করে দেবে এবং বিদ্যমান সমস্যার একটি ন্যায়ানুগ ও সম্মানজনক সমাধানে আসতে একান্ত ভাবে বাধ্য। বিজ্ঞ জনমত মুসলমান ও উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষাবিদ্যা ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবরূপ দানের প্রজ্ঞা শিগগির উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। ভারতে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির লালনে আস্থা ও প্রত্যাশার একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির অপরিহার্য পূর্বশর্ত। সংখ্যালঘুদের মনে এমন আস্থার জন্ম দিতে হবে যে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও বঞ্চনার দিন ফুরিয়ে গেছে; স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং কোন ভাষা, হোক সেটা হিন্দী, কোনক্রমেই যেন অন্যভাষার উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস যখন সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরু করেন এবং ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণের গ্যারান্টি প্রদান করেন তখন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত হন শুধু একটি আশা বুকে নিয়ে তাহলো আকীদা, ধর্ম ও সভ্যতা সংস্কৃতির অধিকার যা ইংরেজ শাসনামলে জনগণ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর তা তাঁরা পুনরায় ফিরে পাবেন। মেধা ও প্রয়োজন অনুসারে তাঁরা নিজেদের উত্তরাধিকার ঐতিহ্য ও লালিত আদর্শকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে অধিকতর স্বাধীনতা ভোগ করবেন। এটাই ছিল তাদের প্রত্যাশা।
ভারতীয় মুসলমানদের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে ভাষা সমস্যা। উর্দু ভাষা হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও শ্রেণীর মিলনের ফলে সৃষ্ট একটি নতুন ভাষা। উর্দু ভাষার মূলে ও নির্মাণ শৈলীতে সংস্কৃতি, আরবী, ফার্সি ও তুর্কীর বিশেষ প্রভাব বিদ্যমান। ভারতে বৃটিশ শাসনামলে বিপুল সংখ্যক ইংরেজী শব্দ উর্দু সাহিত্য পরিভাষার অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়ে। ফলে উর্দু ভাষা সত্যিকার অর্থে ভারতীয় জাতীয়তার প্রতীক ও সাধারণ মানুষের ভাব প্রকাশের শ্রেষ্টতম মাধ্যমরূপে স্বীকৃতি পায়। ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী মিলে উর্দুকে বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি, কবিতা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও ভাবের আদান প্রদানের শক্তিশালী বাহন হিসেবে গড়ে তুলেন। উত্তর প্রদেশ, বিহার, পাঞ্জাব, হায়দ্রাবাদ, দিল্লি এবং তার সন্নিহিত অঞ্চলের অধিবাসীদের উর্দুই হচ্ছে মাতৃভাষা। কিছু ইংরেজী সংবাদপত্রকে বাদ দিলে সবচেয়ে বহুপঠিত সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় উর্দু ভাষায়।
ইংরেজীর পর উর্দুই ছিল ভারতের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা। আদালত, সরকারী অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উর্দুর বিচরণ ছিল জোরালো ও সচ্ছন্দ। উত্তর প্রদেশের প্রাক্তণ লেফটেন্যান্ট গভর্ণর স্যার এ্যান্থনী ম্যাকডোনাল্ড (Sir Anthony Mecdonald) হিন্দীকে আদালতের ভাষারূপে ঘোষণা দিয়ে দু'ভাষার এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতার বীজ বপন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর ভারতীয় ইউনিয়নের সংবিধানে হিন্দীকে সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ৩৪৩ ধারায় বলা হয়ঃ The Official Language of the Unions Shall be Hindi in Devenagri script. 'দেবনাগরী হরফে হিন্দীই হবে ভারত ইউনিয়নের সরকারী ভাষা।'
এছাড়াও সংবিধানের ৩৪৫ ধারায় দেশের আরো ১৪টি ভাষাকে ভারতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এসব ভাষায় যারা কথা বলেন তাঁদের দাবীর প্রেক্ষিতে সন্তান সন্ততিদের নিজেদের ভাষায় শিক্ষা প্রদান করবে। এক্ষেত্রে সবধরণের সুযোগ-সুবিধে সরকার প্রদান করবে। এক্ষেত্রে ভারতের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা রয়েছে তিনি যেকোন রাজ্য কর্তৃপক্ষকে সে রাজ্যের জনগোষ্ঠীর ভাষার ভিত্তিতে যেকোন ভাষাকে সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। সংবিধানের ৩৪৭ ধারায় বলা হয়েছে:
On a demand being made on that behalf, the President may, if he is satisfied that a substantial proportion of the population of a State desire the use of any language spoken by them to be recognised by that State, direct that such language shall also be officially recognised throughout the State or any part thereof for such purpose as he may specify.
'যেকোন রাজ্যের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি চান যে, তাঁরা সে ভাষা ব্যবহার করবেন যে ভাষায় তাঁরা কথা বলেন এবং রাজ্য সরকারও সে ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদান করুক; রাষ্ট্রপতি যদি এতে সন্তুষ্ট হন তাহলে দাবীর প্রেক্ষিতে সে ভাষাকে পুরো রাজ্যের জন্য অথবা রাজ্যের কোন অংশ বিশেষের সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারেন।'
কিন্তু সংবিধানের উপরিউক্ত গ্যারান্টি সত্ত্বেও উর্দুর জন্ম ও বিকাশভূমি উত্তর প্রদেশ ও দিল্লি হতে উর্দুকে নির্বাসন দেয়া হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও উর্দুর অস্তিত্বকে বরদাশত করা হয়নি। শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রমের স্তরে হিন্দিকে শিক্ষার মাধ্যম বানানো হয়। উত্তর প্রদেশ সরকারের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে উর্দু ব্যবহারের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারী হয়েছে। সৃষ্ট এ পরিস্থিতি উর্দু ভাষী জনগোষ্ঠীকে দারুনভাবে হতাশ ও বিস্মিত করে দেয়। উর্দুর প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ ও বেদনার সৃষ্টি হয়। কারণ উর্দুর মর্যাদা ও ব্যবহার হ্রাস পেলে কেবল মুসলমানদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতি হবেনা বরং তাদের আকীদা ও মাযহাবের ভবিষ্যতকে প্রশ্ন সাপেক্ষ করে তুলবে। কারণ উর্দু ভাষাই ভারতীয় মুসলমানদের সংস্কৃতি ও সভ্যতার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। উর্দু ভাষায় রয়েছে মুসলমানদের প্রায় সব ধর্মীয় সাহিত্য। উর্দু ভাষার বর্ণমালা আরবী বর্ণমালার কাছাকাছি হওয়ার কারণে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত সহজতর হয়। উর্দু ভাষা হতে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ মুসলমানগণ জাতীয়তা, সংস্কৃতি, সম্প্রদায়গত বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে আত্ম পরিচয়হীন জাতিতে পরিণত হয়ে পড়বে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে উর্দু ভাষীগণ সরকারী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শণ করতে থাকে ফলে কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিতে ১৯৪৯ সালে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রীদের এক সম্মেলন আহবান করেন। উক্ত সম্মেলনে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম সংক্রান্ত নিম্নোক্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়ঃ
The medium of instruction and examination in the Junior basic stage must be the mother-tongue of the child and where the mother-tongue is different from the Regional or the State language, arrangements must be made for instruction in the mother tongue by appointing at least one teacher, provided there are not less than 40 pupils speaking the language in the whole school or 10 such pupils in a class. The mother tongue will be the language declared by the parent of the guardian to the mother tongue.
'মাধ্যমিক মৌলিক স্তরে শিশুদের শিক্ষা ও পরীক্ষার মাধ্যম অবশ্যই মাতৃভাষায় হওয়া চাই। যেখানে রাষ্ট্রীয় ও রাজ্যের ভাষা হতে মাতৃভাষা ভিন্ন হবে সেখানে মাতৃভাষায় শিক্ষা দানের জন্য কমপক্ষে একজন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে তবে শর্ত থাকে যে, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে ন্যূনপক্ষে ৪০ জন অথবা ক্লাসে ১০জন উক্ত ভাষা ভাষাভাষী ছাত্র-ছাত্রী থাকতে হবে। শিক্ষার্থীর মাতা-পিতা ও অভিভাবক যে ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে ঘোষণা দিবেন সেটাই হবে উক্ত শিক্ষার্থীর 'মাতৃভাষা'।
দুর্ভাগ্যজনক ভাবে উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। উত্তর প্রদেশের সরকারী ও পৌর বিদ্যালয়গুলোতে হিন্দীকে বাধ্যতামূলক শিক্ষা দেয়া হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কেবল হিন্দীই পরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে অব্যাহত থাকে। উর্দু শিক্ষা প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়। যেসব শিশুদের মাতৃভাষা উর্দু তারাও প্রাথমিক পর্যায়ে উর্দু ভাষা শিক্ষার সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। মুসলমান ও উর্দুভাষী জনগণ ১৯৪৯ সালে দিল্লিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের স্কুলে উর্দু শিক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের নিকট বারংবার আবেদন-নিবেদন করতে থাকেন। একমাত্র লক্ষ্ণৌতেই ১০ হাজার মাতা-পিতা ও অভিভাবক রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর নিকট এ ব্যাপারে লিখিত আবেদন জানান কিন্তু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কোন মনোযোগ প্রদান করেননি।
সব প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার পর উর্দু ভাষী জনগণ সংবিধানের ৩৪৭ ধারার আশ্রয় নিয়ে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির সমীপে একটি স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। উর্দু উন্নয়ন সমিতির (আঞ্জুমান-ই- তারাক্কী-ই-উর্দু) উদ্যোগে স্বেচ্ছায় ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রায় ২০ লাখ ৫০ হাজার বয়স্ক মানুষের এবং ২০ লাখ ছাত্র-ছাত্রীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয় স্মারক লিপিতে। আঞ্জুমানে-ই-তারাক্কী-ই-উর্দুর সভাপতি, বিহারের প্রাক্তণ গভর্ণর ও আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তণ ভাইস চ্যান্সেলর ড. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জননেতা ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল গঠণ করা হয়। ১৯৫৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী উত্তর প্রদেশের আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে উর্দুকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবী জানিয়ে স্মারকলিপিটি রাষ্ট্রপতিকে প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় যে (ক) যেসব ছাত্র-ছাত্রীর মাতৃভাষা উর্দু তাদের প্রাথমিক স্তরে উর্দু ভাষায় শিক্ষা প্রদানের সুবিধে প্রদান করা হোক। (খ) যেসব স্কুলে ৪০জন বা ক্লাসে ১০জন উর্দুভাষী শিক্ষার্থী রয়েছে তাদের জন্য উর্দু শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হোক। (গ) তাদের অফিস ও আদালতে উর্দু ভাষায় লিখিত আবেদন ও আর্জি বিবেচনা গ্রহণ করা হোক। (ঘ) সরকারের সব নির্দেশনাবলী, নোটিফিকেশন, গেজেট, বিল, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য প্রকাশনা উর্দু ভাষায় করা হোক। (ঙ) আগের রেওয়াজ মত উর্দু ভাষায় রচিত ব্যতিক্রমধর্মী গদ্য ও পদ্য সাহিত্যের জন্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ঘোষণা করা হোক। (চ) সরকারী গণগ্রন্থাগার, একাডেমী, সেমিনার লাইব্রেরী ও পাঠকক্ষের জন্য উর্দু ভাষায় রচিত গ্রন্থ সমূহ ক্রয় করা হোক। (ছ) সরকারী দফতর সমূহে পূনরায় উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
বার সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দলে পাঁচ জন ছিলেন হিন্দু বিশেষজ্ঞ। রাষ্ট্রপতি প্রতিনিধি দলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং তাঁদের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন এবং দাবী গুলোর প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। ব্যাস্ এতুটুকু। যথা পূর্বং তথা পরং। স্মারকলিপির আলোকে এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি যাতে উর্দু ভাষীদের স্বস্তি মেলে এবং তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবার হাত থেকে মুক্তি পায়। শিক্ষাবিভাগ পূর্বেকার মত উর্দুর সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ অব্যাহত রাখে। উর্দু ভাষাভাষী অঞ্চলের শিশুরা আগের মতই মাতৃভাষার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হতে বঞ্চিত রয়ে গেলো। যার ফলে নব প্রজন্মের শিশুরা ক্রমশ: প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতি, আকীদা, মাযহাব ও পূর্ববর্তী যুগের বুযুর্গদের সাথে তাদের সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নব প্রজন্ম নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে শত যোজন দূরে চলে গেছে। শত প্রচেষ্টা চালিয়েও তাদের নিজেদের তাহযীব ও তামাদ্দুনের সাথে পরিচিত করানো সম্ভব হচ্ছেনা। কারণ নতুন ও পুরনোর মাঝে যে সেতুবন্ধন ছিল তা ভেঙ্গে গেছে।
১৯৬১ সালের আগষ্ট মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় সরকারে উদ্যোগে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীদের এক সম্মেলনে বহুল আলোচিত 'তিন ভাষার ফর্মুলা' (Three Language Formula) উদ্ভাবন করা হয়। ফর্মুলা অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের হিন্দী, ইংরেজী ও একটি ভারতীয় ভাষা শিখতে হবে। আশা করা হয়েছিল উর্দুভাষী শিক্ষার্থীগণ মাধ্যমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে কিন্তু উত্তর প্রদেশ কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতমূলক নীতি ও উর্দুভাষী শিক্ষার্থীদের আশার গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিল। কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিলেন কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্ত তাদের জন্য প্রযোজ্য নয় বরং এটা দক্ষিণ ভারতের ভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ ব্যাখ্যা মাধ্যমিক পর্যায়ে উর্দু ভাষার শিক্ষা গ্রহণেচ্ছু শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। উর্দুকে সমাজ জীবন থেকে নির্বাসিত করার এটা কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগ একথা নির্দ্ধিধায় বলা চলে।
১৯৬১ সালে পুনরায় উত্তর প্রদেশ সরকারের উদ্যোগে আচার্য জে.বি ক্রিপালিনীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠণ করা হয়। কমিটি গঠণের উদ্দেশ্য ছিল উর্দু ভাষী মানুষের ক্ষোভ যাচাই, সরকারের নির্দেশ কেন বাস্তবায়িত হয়নি তা খতিয়ে দেখা এবং এ ব্যাপারে যুৎসই সুপারিশ পেশ করা। কিন্তু আফসোসের বিষয় কমিটি কর্তৃক সরকারের নিকট দাখিলকৃত রিপোর্ট অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। উর্দু ভাষী জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ ও দূঃখের ব্যাপারটি আদৌ বিবেচনায় না নিয়ে তদন্ত কমিটি উল্টো মুসলমানদের মাকতাব, ইসলামিক স্কুল ও ধর্মীয় আরবী-ফার্সী মাদ্রাসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কমিটির সুপারিশ যদি গ্রহণ করা হতো তাহলে উর্দুর অবস্থান আরো দুর্বলতর হয়ে পড়তো এবং ক্রমান্বয়ে উর্দু তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতো। মুসলমানদের শিক্ষা সংস্কৃতির উন্নয়নের উদ্দেশ্যে গঠিত ক্রিপালিনী কমিটির সুপারিশমালা বাস্তবায়িত হলে শত বছর ধরে প্রচলিত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ বন্ধ হয়ে যেত।
উর্দু ভাষার প্রতি সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় মুসলমানদের উভয় সঙ্কটে নিপতিত করে দেয় এবং তাঁরা এক বিস্ময়কর নৈতিক অবিশ্বাসের শিকার হন। নিজ মাতৃভূমিতে তাঁরা ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ার ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এতদসত্ত্বেও ভারতের মুসলমানদের হতাশ হয়ে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। রাজনৈতিক সচেতনতা মুসলমানদেরকে ভারতের বৃহত্তর শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করে দেবে এবং বিদ্যমান সমস্যার একটি ন্যায়ানুগ ও সম্মানজনক সমাধানে আসতে একান্ত ভাবে বাধ্য। বিজ্ঞ জনমত মুসলমান ও উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষাবিদ্যা ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবরূপ দানের প্রজ্ঞা শিগগির উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। ভারতে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির লালনে আস্থা ও প্রত্যাশার একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির অপরিহার্য পূর্বশর্ত। সংখ্যালঘুদের মনে এমন আস্থার জন্ম দিতে হবে যে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও বঞ্চনার দিন ফুরিয়ে গেছে; স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং কোন ভাষা, হোক সেটা হিন্দী, কোনক্রমেই যেন অন্যভাষার উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস যখন সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরু করেন এবং ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণের গ্যারান্টি প্রদান করেন তখন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত হন শুধু একটি আশা বুকে নিয়ে তাহলো আকীদা, ধর্ম ও সভ্যতা সংস্কৃতির অধিকার যা ইংরেজ শাসনামলে জনগণ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পর তা তাঁরা পুনরায় ফিরে পাবেন। মেধা ও প্রয়োজন অনুসারে তাঁরা নিজেদের উত্তরাধিকার ঐতিহ্য ও লালিত আদর্শকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে অধিকতর স্বাধীনতা ভোগ করবেন। এটাই ছিল তাদের প্রত্যাশা।
📄 মুসলমানদের অর্থনৈতিক সমস্যা
ভারতীয় মুসলমানদের চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে অর্থনৈতিক সমস্যা। ইতিহাসের দর্শন ও বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের কাহিনী অধ্যয়নে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অর্থনৈতিক অবস্থা যেকোন জাতির চিন্তা-চেতনা, স্বাস্থ্য, ও বুদ্ধি বৃত্তিক ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রভাব বিস্তার করে। যে জাতি আর্থিক দুরাবস্থা, ক্ষুৎ দারিদ্র্য, অন্নাভাবের শিকার হয়, সে জাতি উন্নতির দিশা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, ভবিষ্যত হয় অন্ধকার এবং নব প্রজন্ম হতাশ ও সাহসহারা হয়ে গুরুদায়িত্ব পালনে অক্ষম থেকে যায়। যারা উন্নত ও দুঃসাহসী জাতির সারি থেকে দূরে সরে দাঁড়ায় শিগগির তারা পশ্চাদপদ, মর্যাদাহীন ও ভীরু জাতির কাতারে শামিল হয়। তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা ও ধীশক্তির তীক্ষ্ণতা নিঃশেষ হয়ে যায়। ইংরেজদের রাজত্বকালে ভারতীয় মুসলমানদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল সরকারী উচ্চ পদ ও বড় মাপের ব্যবসা। দেশ বিভাগের পর জমিদারী শেষ হয়ে যায় এবং এ পদক্ষেপ ভারতীয় সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনে সঠিক ছিল। সরকারী পদ ও চাকুরীতে মুসলমানদের অনুপাত দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক জীবনের ভবিষ্যত তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর বিভিন্ন বিভাগে বিশেষত পুলিশ, সেনাবাহিনী ও দায়িত্বশীল পদে লোক নিয়োগের অনুপাতিক হারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে অপরিচিত যেকোন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে, হয়তো এদেশ হতে মুসলমানগণ হিজরত করে চলে গেছেন অথবা যারা আছেন তারা এতই গন্ডমুর্খ যে, সরকারী চাকুরী করার যোগ্যতাই তাঁরা রাখেন না। কিছু দিনের মধ্যে পুরনো মুসলমান অফিসার বিভিন্ন দফতর হতে সম্পূর্ণরূপে বহিস্কৃত হয়ে যাবেন। ১৫ কোটি মানুষের বিশাল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কোন দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব আমলাতন্ত্রে ও সরকারের প্রশাসনযন্ত্রে আর দেখা যাবেনা। আমাদের বক্তব্যের সপক্ষে কতিপয় কর্তৃপক্ষীয় তথ্য-উপাত্ত পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। প্রথম উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহের লাল নেহেরুর ওই ভাষণের অংশ বিশেষ উল্লেখ করছি যা তিনি ১৯৫৮ সালের ১১ মে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সম্মেলনে প্রদান করেছিলেন:
"I called for statistics from the Sates to ascertain the percentage of minorities in the recruitments to public services. I found that the representation of Muslims was progressively declining, one of the reasons being the procedure adopted for competitive examinations that are held for recruitment to all- India services. In these examinations insistence is laid on the knowledge of Hindi and candidates who fail to qualify in it are rejected. Question papers are also required to be answered in Hindi and candidates belonging to minority communities it hard to come up to the standard of literary Hindi."
"সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের নিয়োগের আনুপাতি হার নিরুপনের জন্য আমি বিভিন্ন রাজ্যের পরিসংখ্যান তলব করি। আমি লক্ষ্য করি যে, চাকুরীতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে; সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বর্তমান নিয়মপদ্ধতি তার অন্যতম কারণ। এসব পরীক্ষায় হিন্দীর ভাষাজ্ঞানের উপর জোর দেয়া হয় এবং যেসব পরীক্ষার্থী এতে অকৃতকার্য হয় তাদেরকে চাকুরী প্রদান করা হয়না। প্রশ্নের উত্তর হিন্দী ভাষা চাওয়া হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীগণের পক্ষে উচ্চাঙ্গের হিন্দী সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।"
দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে ১৯৫২ সালে দিল্লি রাজ্য সভার (Delhi State Legislature) কার্যবিবরণী। এক প্রশ্নের উত্তরে সংসদকে জানানো হয় যে, '১৯৪৬ সালে দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৪৭০ জন আর বর্তমানে মাত্র ৫৬ জন। ১৯৪৬ সাল থেকে দু'জন মুসলিম কনষ্টেবল এবং একজন হেড কনষ্টেবলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পুলিশের মোট সংখ্যা হচ্ছে ২০৫৮ জন।' অর্থাৎ ১৯৪৬ সাল হতে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ছ'বছরে মাত্র তিনজন মুসলিম দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে নেয়া হয়েছে।
তৃতীয় উদাহরণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী মি. মহাবীর তিয়াগীর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ভাষণ। প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন: The percentage of Muslims in the Armed Forces, which was 32 at the time of Partition, has now come down to 2. To correct this state of things, I have instructed that due regard should be paid to their recruitment.
"দেশ বিভাগের সময় সেনাবাহিনীতে যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩২ জন বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ জনে। এ অবস্থা সংশোধনের জন্য আমি সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের নিয়োগের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”
উপরিউক্ত বাস্তব তথ্যের আলোকে অনুমান করা যায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে কতজন মুসলমান কর্মরত রয়েছেন, যদিও এখনো মুসলমানদের মধ্যে যোগ্যতা ও দক্ষতা পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। অতীতেও দক্ষতা ও কর্তব্য নিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের ব্যাপক খ্যাতি ছিল এবং বর্তমানেও তাদের পড়া-লেখা ও যোগ্যতার মান ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের সংবিধান যদিও ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমান সুবিধার গ্যারান্টি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারে ভিন্ন ও উল্টো। বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ভারতে চাকুরী না পেয়ে মুসলমানদের ছেলে মেয়েরা হতাশ। বহু শিক্ষিত যুবক দেশ ত্যাগ করে প্রতি বছর পাকিস্তানে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতদসত্ত্বেও আশা করা যায় সংবিধানের বৈশিষ্ট্যাবলী বর্তমান অস্বাভাবিক অবস্থার অবসানে সক্ষম কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে সংবিধানের মৌল চেতনার পরিপন্থী। তবে এর জন্য পূর্বশত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগণ তাদের আবেগকে সংযত করে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব যদি মেনে নেন তাহলে অতীতের তিক্ত স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব।
ভারতীয় মুসলমানদের চতুর্থ সমস্যা হচ্ছে অর্থনৈতিক সমস্যা। ইতিহাসের দর্শন ও বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের কাহিনী অধ্যয়নে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অর্থনৈতিক অবস্থা যেকোন জাতির চিন্তা-চেতনা, স্বাস্থ্য, ও বুদ্ধি বৃত্তিক ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রভাব বিস্তার করে। যে জাতি আর্থিক দুরাবস্থা, ক্ষুৎ দারিদ্র্য, অন্নাভাবের শিকার হয়, সে জাতি উন্নতির দিশা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, ভবিষ্যত হয় অন্ধকার এবং নব প্রজন্ম হতাশ ও সাহসহারা হয়ে গুরুদায়িত্ব পালনে অক্ষম থেকে যায়। যারা উন্নত ও দুঃসাহসী জাতির সারি থেকে দূরে সরে দাঁড়ায় শিগগির তারা পশ্চাদপদ, মর্যাদাহীন ও ভীরু জাতির কাতারে শামিল হয়। তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা ও ধীশক্তির তীক্ষ্ণতা নিঃশেষ হয়ে যায়। ইংরেজদের রাজত্বকালে ভারতীয় মুসলমানদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল সরকারী উচ্চ পদ ও বড় মাপের ব্যবসা। দেশ বিভাগের পর জমিদারী শেষ হয়ে যায় এবং এ পদক্ষেপ ভারতীয় সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনে সঠিক ছিল। সরকারী পদ ও চাকুরীতে মুসলমানদের অনুপাত দিন দিন হ্রাস পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক জীবনের ভবিষ্যত তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর বিভিন্ন বিভাগে বিশেষত পুলিশ, সেনাবাহিনী ও দায়িত্বশীল পদে লোক নিয়োগের অনুপাতিক হারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে অপরিচিত যেকোন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে, হয়তো এদেশ হতে মুসলমানগণ হিজরত করে চলে গেছেন অথবা যারা আছেন তারা এতই গন্ডমুর্খ যে, সরকারী চাকুরী করার যোগ্যতাই তাঁরা রাখেন না। কিছু দিনের মধ্যে পুরনো মুসলমান অফিসার বিভিন্ন দফতর হতে সম্পূর্ণরূপে বহিস্কৃত হয়ে যাবেন। ১৫ কোটি মানুষের বিশাল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কোন দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব আমলাতন্ত্রে ও সরকারের প্রশাসনযন্ত্রে আর দেখা যাবেনা। আমাদের বক্তব্যের সপক্ষে কতিপয় কর্তৃপক্ষীয় তথ্য-উপাত্ত পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। প্রথম উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহের লাল নেহেরুর ওই ভাষণের অংশ বিশেষ উল্লেখ করছি যা তিনি ১৯৫৮ সালের ১১ মে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সম্মেলনে প্রদান করেছিলেন:
"I called for statistics from the Sates to ascertain the percentage of minorities in the recruitments to public services. I found that the representation of Muslims was progressively declining, one of the reasons being the procedure adopted for competitive examinations that are held for recruitment to all- India services. In these examinations insistence is laid on the knowledge of Hindi and candidates who fail to qualify in it are rejected. Question papers are also required to be answered in Hindi and candidates belonging to minority communities it hard to come up to the standard of literary Hindi."
"সরকারী চাকুরীতে সংখ্যালঘুদের নিয়োগের আনুপাতি হার নিরুপনের জন্য আমি বিভিন্ন রাজ্যের পরিসংখ্যান তলব করি। আমি লক্ষ্য করি যে, চাকুরীতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে; সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বর্তমান নিয়মপদ্ধতি তার অন্যতম কারণ। এসব পরীক্ষায় হিন্দীর ভাষাজ্ঞানের উপর জোর দেয়া হয় এবং যেসব পরীক্ষার্থী এতে অকৃতকার্য হয় তাদেরকে চাকুরী প্রদান করা হয়না। প্রশ্নের উত্তর হিন্দী ভাষা চাওয়া হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীগণের পক্ষে উচ্চাঙ্গের হিন্দী সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।"
দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে ১৯৫২ সালে দিল্লি রাজ্য সভার (Delhi State Legislature) কার্যবিবরণী। এক প্রশ্নের উত্তরে সংসদকে জানানো হয় যে, '১৯৪৬ সালে দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৪৭০ জন আর বর্তমানে মাত্র ৫৬ জন। ১৯৪৬ সাল থেকে দু'জন মুসলিম কনষ্টেবল এবং একজন হেড কনষ্টেবলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পুলিশের মোট সংখ্যা হচ্ছে ২০৫৮ জন।' অর্থাৎ ১৯৪৬ সাল হতে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ছ'বছরে মাত্র তিনজন মুসলিম দিল্লি পুলিশ বাহিনীতে নেয়া হয়েছে।
তৃতীয় উদাহরণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী মি. মহাবীর তিয়াগীর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ভাষণ। প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন: The percentage of Muslims in the Armed Forces, which was 32 at the time of Partition, has now come down to 2. To correct this state of things, I have instructed that due regard should be paid to their recruitment.
"দেশ বিভাগের সময় সেনাবাহিনীতে যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩২ জন বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ জনে। এ অবস্থা সংশোধনের জন্য আমি সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের নিয়োগের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”
উপরিউক্ত বাস্তব তথ্যের আলোকে অনুমান করা যায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে কতজন মুসলমান কর্মরত রয়েছেন, যদিও এখনো মুসলমানদের মধ্যে যোগ্যতা ও দক্ষতা পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। অতীতেও দক্ষতা ও কর্তব্য নিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের ব্যাপক খ্যাতি ছিল এবং বর্তমানেও তাদের পড়া-লেখা ও যোগ্যতার মান ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের সংবিধান যদিও ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমান সুবিধার গ্যারান্টি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারে ভিন্ন ও উল্টো। বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ভারতে চাকুরী না পেয়ে মুসলমানদের ছেলে মেয়েরা হতাশ। বহু শিক্ষিত যুবক দেশ ত্যাগ করে প্রতি বছর পাকিস্তানে পাড়ি জমাচ্ছেন। এতদসত্ত্বেও আশা করা যায় সংবিধানের বৈশিষ্ট্যাবলী বর্তমান অস্বাভাবিক অবস্থার অবসানে সক্ষম কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে সংবিধানের মৌল চেতনার পরিপন্থী। তবে এর জন্য পূর্বশত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগণ তাদের আবেগকে সংযত করে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব যদি মেনে নেন তাহলে অতীতের তিক্ত স্মৃতি মুছে ফেলা সম্ভব।