📄 পরবর্তী কালের সংস্কার ও আধুনিক গবেষণা আন্দোলনের পাদপীঠ
মুসলিম প্রাধান্যের পতন যুগে নানা প্রকার ঐতিহাসিক ও খোদা প্রদত্ত উপায় উপকরণের কারণে (যা আমি আমার 'তারীখে দাওয়াত ও আযীমাত' গ্রন্থের ৩য় খন্ডে উল্লেখ করেছি।) ভারতবর্ষ দাওয়াত, তাবলীগ, সংস্কার ও আধুনিকতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এতদঞ্চলের দাওয়াতী ও সংস্কারধর্মী কার্যক্রমের সূদুর প্রসারী প্রভাব ভারতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে বিস্তৃত হয়েছে। এ যুগে এমন কতিপয় একনিষ্ঠ, দায়ী, সংস্কারধী ও অগ্রসর চিন্তার পতাকাবাহী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেদের উন্নত দাওয়াতী প্রতিভা, প্রভাববিস্তারশীল আকর্ষণ, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি এবং উদার, ব্যাপক গণমূখী কর্মকান্ডের কারণে দাওয়াতে দ্বীনের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত ও উন্নতর মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।¹
টিকাঃ
১. দেখুন- 'তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমাত' ৪র্থ, ৫ম খন্ড; সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ (১-২)
📄 ভারতবর্ষে ধর্মীয় সংস্কারক ও ধর্ম প্রচারকগণ
এই তালিকায় সর্বাগ্রে ইমাম-ই-রব্বানী হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দীর (মৃত্যু : ১০৩৪ হি.) নাম উল্লেখযোগ্য। সুক্ষদর্শী ও বিদগ্ধমহল তাঁকে মুজাদ্দিদে আলফে সানী তথা বিংশ শতাব্দীর সংস্কারের সম্মানিত উপাধি দিয়ে নিজেদের বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ দিয়েছেন। বস্তুতঃ মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) ভারতবর্ষের মুসলমানদের ধর্মীয় সম্পর্ককে নবায়ন করেছেন। মুহাম্মদী শরীয়তের বিকৃতি, অপব্যাখ্যার অচলায়তন ভেঙে এক সর্বগ্রাসী সংস্কার আন্দোলন পরিচালনার মাধ্যমে দ্বীনে মুহাম্মদী (সা.) নানা ভ্রান্ত বিশ্বাস বিশেষতঃ 'ওয়াহদাতুল ওয়াজুদ' এর আক্বিদা পোষণকারী, সীমালঙ্গণকারী কথিত সূফীদের কুসংস্কার থেকে রক্ষা করেছেন। এ ছাড়াও মুঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তিত দ্বীনে-ই-ইলাহী নামক বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণে, একত্ববাদের সাথে ব্রাহ্মণ্যবাদের এক উদ্ভট ও অবাস্তব সমন্বয়ের মাধ্যমে রূপায়িত সর্বগ্রাসী আগুন থেকে ইসলামকে রক্ষার দূরদর্শিতা তাঁর মস্তিষ্ক থেকেই উৎসারিত। উপরন্তু দ্বীনের সাচ্চা মুজাহিদ আওরঙ্গজেব মুহাম্মদ আলমগীরও (রহ.) মুজাদ্দিদে আলফে সানীর (রহ.) দাওয়াত ও চিন্তার ফসল। আজো তাঁর তাসাউফ এর ধারা সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, ইরাক, কুর্দিস্তান, অবধি প্রবাহমান। আল্লামা খালিদ শাহজুরী কুর্দি (রহ.) (মৃত্যু: ১২৪২ হি.) এর মাধ্যমে এ সিলসিলা ইতালি, আরব উপদ্বীপ, কুর্দিস্তান, সিরিয়া, তুরস্ক, প্রভৃতি অঞ্চলে যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রহনযোগ্যতায় সমাদৃত হয়েছে তা অন্য কোন সিলসিলার ভাগ্যে জুটেনি।¹
দ্বিতীয়ত মহান ব্যক্তিত্ব হলেন, হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ যিনি সত্যিকার দ্বীন, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্, খিলাফতে রাশেদার আদলে ইসলামী হুকুমতের রূপরেখা প্রণয়ন এবং সত্যের পতাকা উড্ডীন রাখার জন্য জান মাল কুরবানী দিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর নিষ্ঠা এবং চেষ্টার কারণে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে ঈমান-ইয়াকীন ও আল্লাহর ইবাদতের প্রতি এক প্রবল স্পৃহার হাওয়া বয়ে যায়। বরং এভাবে বলা যেতে পারে যে, এটি ছিল ইসলামের প্রথম যুগের নতুন স্রোত যা তাঁর যুগে পুনঃ প্রবাহিত হয়েছিল। তিনি ভারতবর্ষের মৃতপ্রায় মুসলমানদের মাঝে ঈমান-ইয়াকীনের প্রাণের সঞ্চারক ছিলেন। তাঁর অনুসারীদের ঈমানী শক্তি, সুদৃঢ় ইসলামী চরিত্রবল এবং উদ্বেল জিহাদী চেতনার তুলনা মেলেনা।²
প্রখ্যাত লিখক, গ্রন্থকার, শিক্ষাবিদ নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁন সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর শিষ্য সহচরদের সম্পর্কে লিখেন: 'মোদ্দা কথা হল, তদানীন্তন বিশ্বে তাদের মতো বহুবিদ যোগ্যতা ও গুণসম্পন্ন মানুষের কথা অতীতে শোনা যায়নি, এ শ্রেণীটির যেসব অবদান জাতির উপর ছিল তার দশমাংশও এ যুগের আলেমদের দ্বারা হয়ে উঠেনি।'³
বর্তমান যুগে ভারতবর্ষ পুনরায় ইসলাম প্রচার ও সংস্কারের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়, যার নিষ্ঠাবান পথিকৃৎ দায়ী হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) (মৃত্যু: ১৩৬৩ হি.)। সাম্প্রতিককালে আমি যেসব ইসলামী রাষ্ট্রে সফর করেছি কোথাও হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এর মতো মজবুত ঈমানদার ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হয়নি। 'তায়াক্কুল আলাল্লাহ' (আল্লাহর উপর অবিচল ভরসা) দাওয়াতে তাবলীগের জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ, নিবিড় ব্যস্ততা তাঁর এক অনুপম বৈশিষ্ট্য।¹ তাঁর প্রতিষ্ঠিত তাবলীগ জামায়াত বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে দাওয়াতী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে নিরচ্ছিন্নভাবে।
টিকাঃ
১. শায়খ উসমান আস-সনদ, 'আসফাল্ মুয়ারিদ ফি তারজুমাতি সায়ি্যদিনা খালিদ'; মাওলানা খালিদ নকশবন্দী, 'সাল্গুল হিসাম'; আমির ইবন্ ওমর আবেদীন (মৃত্যু: ১২৫২), 'রদ্দুল মুখতার'
২. দেখুন সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.), 'সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ; মাওলানা গোলাম রাসূল, 'সাইয়েদ আহমদ শহীদ'।
৩. 'তিকছার' পৃ.১১০।
১. দেখুন- সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.): 'মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ও তাঁর দ্বীনি দাওয়াত'
📄 মনীষা প্রসবিনী ভারতবর্ষের ইসলামী বংশধারা
ভারত বর্ষের কতিপয় মনীষীদের উদাহরণ পেশ করা হল যারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব ও অনন্য সফলতার সাক্ষর রেখেছেন। 'নুযহাতুল খাওয়াতির' নামক আট খন্ডে সমাপ্ত বিশাল গ্রন্থটি পাঁচ হাজার মহান ব্যক্তিত্বের আলোচনায় সমৃদ্ধ। এক নজরে এর মূল্যায়ন করলে এই জনপদ থেকে সৃষ্ট বহুমাত্রিক প্রতিভাধর মহান ব্যক্তিত্বদের এক আলোকোজ্জ্বল ধারণা লাভ করা যায়।
মুসলমানরা ভারত বর্ষে নিষ্ঠার সাথে ইসলামের পবিত্র বৃক্ষের চারা রোপন করেছেন। আর পরিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী মুজাহিদীনগণ কলিজার পবিত্র খুন ঢেলে যুগে যুগে এই জমিকে উর্বর করেছেন। বিশ্ব স্রষ্টার করুনায় যা আজো বরাবরই ফসল উৎপাদন করে যাচ্ছে। এখানে যুগে যুগে প্রবাদপ্রতীম, যুগ শ্রেষ্ঠ এমন কীর্তিমান পুরুষগণ জন্ম নিয়েছেন, যারা অন্যান্য মনীষীদের তুলনায় অত্যাশ্চর্য ধীশক্তি, বিরল প্রতিভা এবং আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতায় বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। ঔপনিবেশিক বৃটিশ বেনিয়া গোষ্ঠীর শাসনামলে যখন মুসলমানদের চিন্তা ও চেতনা বিনাশী সুপরিকল্পিত নীল নকশার বাস্তবায়ন চলছিল তখনো মুসলমানদের মাঝে শীর্ষস্থানীয় আইনবিদ, সাহিত্যিক, সব্যসাচী লেখক, অংক শাস্ত্র বিদ, দার্শনিক রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক এবং রসায়ন শাস্ত্রে এমনসব বিশেষজ্ঞ সর্বোপরি ইংরেজী ভাষায় পারদর্শী সাহিত্যিক, ও বিশ্লেষক সৃষ্টি হয়েছিলেন যাদের ইংরেজী সাহিত্য, পান্ডিত্য, বাগ্মীতা এবং অসাধারণ ক্ষুরধার লেখনী বিস্ময়কর প্রতিভার স্বীকৃতি ইংরেজরা পর্যন্ত না দিয়ে পারেনি। এমন কীর্তিমান পুরুষ আইন প্রণেতা, আইনবিদ, বাগ্মী, উঁচুমানের সুবক্তা ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে জন্ম নিয়েছেন যারা গোটা বিশ্বের বড় মাপের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রথম কাতারে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে এমন সব বিস্ময়কর কবি, চিন্তাবিদ, প্রাজ্ঞ বিশ্লেষক যাদের পয়গাম, কাব্য খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা ইরান, আফগানিস্তান এবং তুরস্ক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাঁদের রচনা, বক্তব্য, মুসলিম বিশ্বের একাধিক ভাষায় অনূদিত ও ভাষান্তরিত হয়েছে।¹ আরবী সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেও আজো এ জাতি বুকে আঁকড়ে আছে নিবিড় মমতায় বরং তাতে সৃজনশীল পরিবর্ধন ও নবসংযোজন অব্যাহত রয়েছে।
আমাদের সামনে ঘটনা প্রবাহ এবং বাস্তবতার যে প্রত্যক্ষ চিত্র রয়েছে তা থেকে বরাবরই এ আশা পোষণ যৌক্তিক যে, অদূর ভবিষ্যতে আরবী সাহিত্যের এক নতুন চিন্তাধারা এবং নতুন আঙ্গিকে সাহিত্য রীতির উদ্ভব ঘটবে যা সাহিত্য, অধ্যাত্মিক চেতনা, ঈমান, দাওয়াত এবং সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু রূপে পরিগণিত হবে।
এসব জ্যোতির্ময় বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে বলা যায় ভারত বর্ষের মুসলমান জনগোষ্ঠী যারা আজ ইতিহাসের নাজুক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে হাজারো প্রতিকূলতার ভয়াল তরঙ্গাভিঘাতেও সমহিমায় স্বীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। এ জন্য প্রবল ও বহুমুখী তৎপরতা যেমন আছে তেমনি আছে এ মাটির মহান মনীষীদের অমর ব্যক্তিত্বের যুগান্তকারী প্রভাবও।
টিকাঃ
১. যথা- সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.): বিরচিত 'রাওয়াইউল ইকবাল' দ্রষ্টব্য, উর্দু তরজমা, 'নুকুশে ইকবাল'; ইংরেজী অনুবাদ- GLORY OF IQBAL