📄 ইসলামী বিশ্বের শিক্ষা ও চিন্তাগত দীনতার যুগে ভারত বর্ষের ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থান
তাতারী ও মুঘলদের হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ইসলামী বিশ্বে শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তাগত দীনতা বিরাজ করে। ফলে গ্রন্থ রচনা ও লেখালেখির ময়দানে একধরণের স্থবিরতা নেমে আসে। উঁচু মাপের চিন্তা ধারা, বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণায় এক ধরণের বিপর্যয় ও অবসাদ বাসা বাঁধে। হিজরী ৮ম শতাব্দীর পর এ দৈন্যদশা ও চিন্তাগত অবনতির অবয়ব সুস্পষ্ট রূপে আত্মপ্রকাশ করে। চিন্তায় বন্ধ্যাত্ব ও মেধার জড়তা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত ও সংক্রমিত হতে শুরু করে। ওই যুগে হাতে গোনা কতিপয় শীর্ষ ব্যক্তি বাদ দিলে সাধারণতঃ প্রচন্ড ধী-শক্তির অধিকারী (GENIUS) কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিল না বললে চলে, যাকে অনন্য সাধারণ প্রতিভা হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এই হাতেগোনা কয়েক জনের মধ্যে আল্লামা আবদুর রহমান ইব্ন খালদুন এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
হিন্দুস্তান তথা ভারতবর্ষ সমগ্র পৃথিবী থেকে এক প্রকার দূরত্বে থাকায় এই মানসিক অবক্ষয় দ্বারা বেশী প্রভাবিত হয়নি। তাতারীদের আগ্রাসন এবং ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াল ছোবল থেকে ভারতবর্ষ ভৌগলিক কারণেই অনেকটা নিরাপদ ছিল। এই জন্যই ইসলামী শিক্ষাবিদগণ সারা দুনিয়ার নানা প্রান্ত হতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতবর্ষের মাটিতে এসে বসতি স্থাপন করেন। যার সুবাদে বিশেষভাবে ভারতবর্ষে শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক কর্মকান্ডে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। লেখালেখি ও গবেষণার গতিও ছিল প্রবল। যুগে যুগে এখানে সৃষ্টি হয়েছে এমন সব শিক্ষাবিদ ও গুণীজন যাদেরকে ইসলামের শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদ ও গ্রন্থকারদের মধ্যে গণ্য করা যায়।
📄 অনুসন্ধিৎসু ও প্রগতিশীল চিন্তা
তাদের লেখায় সেকালের গতানুগতিকতার পরিবর্তে আধুনিকতা ও উঁচু মানের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। মাখদুম শায়খ শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মুনিরী (মৃত্যু : ৭৭২ হি.) যিনি "মাকতুবাত-ই-ছেহছদী" তথা তৃতীয় শতাব্দীর রচনাবলী, 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ্' ও 'ইযালাতুল খফা' গ্রন্থের রচয়িতা শায়খুল ইসলাম শাহ ওয়ালি উল্লাহ্ দেহলভী, 'তাকমীলুল আযহান' ও 'আসরার-ই-মুহাব্বত' নামক গ্রন্থের প্রণেতা শাহ রফীউদ্দীন দেহলভী 'আল-আবকাত' এর রচয়িতা শাহ ইসমাঈল শহীদ দেহলভী (রহ.) প্রমুখের রচনা ও গ্রন্থে এমন নতুনত্বের ছাপ আছে যা সাধারণ অন্যান্য সমকালীন লেখকদের রচনায় অনুপস্থিত।
📄 পরবর্তী কালের সংস্কার ও আধুনিক গবেষণা আন্দোলনের পাদপীঠ
মুসলিম প্রাধান্যের পতন যুগে নানা প্রকার ঐতিহাসিক ও খোদা প্রদত্ত উপায় উপকরণের কারণে (যা আমি আমার 'তারীখে দাওয়াত ও আযীমাত' গ্রন্থের ৩য় খন্ডে উল্লেখ করেছি।) ভারতবর্ষ দাওয়াত, তাবলীগ, সংস্কার ও আধুনিকতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এতদঞ্চলের দাওয়াতী ও সংস্কারধর্মী কার্যক্রমের সূদুর প্রসারী প্রভাব ভারতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে বিস্তৃত হয়েছে। এ যুগে এমন কতিপয় একনিষ্ঠ, দায়ী, সংস্কারধী ও অগ্রসর চিন্তার পতাকাবাহী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেদের উন্নত দাওয়াতী প্রতিভা, প্রভাববিস্তারশীল আকর্ষণ, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি এবং উদার, ব্যাপক গণমূখী কর্মকান্ডের কারণে দাওয়াতে দ্বীনের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত ও উন্নতর মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।¹
টিকাঃ
১. দেখুন- 'তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমাত' ৪র্থ, ৫ম খন্ড; সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ (১-২)
📄 ভারতবর্ষে ধর্মীয় সংস্কারক ও ধর্ম প্রচারকগণ
এই তালিকায় সর্বাগ্রে ইমাম-ই-রব্বানী হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দীর (মৃত্যু : ১০৩৪ হি.) নাম উল্লেখযোগ্য। সুক্ষদর্শী ও বিদগ্ধমহল তাঁকে মুজাদ্দিদে আলফে সানী তথা বিংশ শতাব্দীর সংস্কারের সম্মানিত উপাধি দিয়ে নিজেদের বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ দিয়েছেন। বস্তুতঃ মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) ভারতবর্ষের মুসলমানদের ধর্মীয় সম্পর্ককে নবায়ন করেছেন। মুহাম্মদী শরীয়তের বিকৃতি, অপব্যাখ্যার অচলায়তন ভেঙে এক সর্বগ্রাসী সংস্কার আন্দোলন পরিচালনার মাধ্যমে দ্বীনে মুহাম্মদী (সা.) নানা ভ্রান্ত বিশ্বাস বিশেষতঃ 'ওয়াহদাতুল ওয়াজুদ' এর আক্বিদা পোষণকারী, সীমালঙ্গণকারী কথিত সূফীদের কুসংস্কার থেকে রক্ষা করেছেন। এ ছাড়াও মুঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তিত দ্বীনে-ই-ইলাহী নামক বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণে, একত্ববাদের সাথে ব্রাহ্মণ্যবাদের এক উদ্ভট ও অবাস্তব সমন্বয়ের মাধ্যমে রূপায়িত সর্বগ্রাসী আগুন থেকে ইসলামকে রক্ষার দূরদর্শিতা তাঁর মস্তিষ্ক থেকেই উৎসারিত। উপরন্তু দ্বীনের সাচ্চা মুজাহিদ আওরঙ্গজেব মুহাম্মদ আলমগীরও (রহ.) মুজাদ্দিদে আলফে সানীর (রহ.) দাওয়াত ও চিন্তার ফসল। আজো তাঁর তাসাউফ এর ধারা সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, ইরাক, কুর্দিস্তান, অবধি প্রবাহমান। আল্লামা খালিদ শাহজুরী কুর্দি (রহ.) (মৃত্যু: ১২৪২ হি.) এর মাধ্যমে এ সিলসিলা ইতালি, আরব উপদ্বীপ, কুর্দিস্তান, সিরিয়া, তুরস্ক, প্রভৃতি অঞ্চলে যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রহনযোগ্যতায় সমাদৃত হয়েছে তা অন্য কোন সিলসিলার ভাগ্যে জুটেনি।¹
দ্বিতীয়ত মহান ব্যক্তিত্ব হলেন, হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ যিনি সত্যিকার দ্বীন, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্, খিলাফতে রাশেদার আদলে ইসলামী হুকুমতের রূপরেখা প্রণয়ন এবং সত্যের পতাকা উড্ডীন রাখার জন্য জান মাল কুরবানী দিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর নিষ্ঠা এবং চেষ্টার কারণে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে ঈমান-ইয়াকীন ও আল্লাহর ইবাদতের প্রতি এক প্রবল স্পৃহার হাওয়া বয়ে যায়। বরং এভাবে বলা যেতে পারে যে, এটি ছিল ইসলামের প্রথম যুগের নতুন স্রোত যা তাঁর যুগে পুনঃ প্রবাহিত হয়েছিল। তিনি ভারতবর্ষের মৃতপ্রায় মুসলমানদের মাঝে ঈমান-ইয়াকীনের প্রাণের সঞ্চারক ছিলেন। তাঁর অনুসারীদের ঈমানী শক্তি, সুদৃঢ় ইসলামী চরিত্রবল এবং উদ্বেল জিহাদী চেতনার তুলনা মেলেনা।²
প্রখ্যাত লিখক, গ্রন্থকার, শিক্ষাবিদ নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁন সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর শিষ্য সহচরদের সম্পর্কে লিখেন: 'মোদ্দা কথা হল, তদানীন্তন বিশ্বে তাদের মতো বহুবিদ যোগ্যতা ও গুণসম্পন্ন মানুষের কথা অতীতে শোনা যায়নি, এ শ্রেণীটির যেসব অবদান জাতির উপর ছিল তার দশমাংশও এ যুগের আলেমদের দ্বারা হয়ে উঠেনি।'³
বর্তমান যুগে ভারতবর্ষ পুনরায় ইসলাম প্রচার ও সংস্কারের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়, যার নিষ্ঠাবান পথিকৃৎ দায়ী হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) (মৃত্যু: ১৩৬৩ হি.)। সাম্প্রতিককালে আমি যেসব ইসলামী রাষ্ট্রে সফর করেছি কোথাও হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এর মতো মজবুত ঈমানদার ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হয়নি। 'তায়াক্কুল আলাল্লাহ' (আল্লাহর উপর অবিচল ভরসা) দাওয়াতে তাবলীগের জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ, নিবিড় ব্যস্ততা তাঁর এক অনুপম বৈশিষ্ট্য।¹ তাঁর প্রতিষ্ঠিত তাবলীগ জামায়াত বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে দাওয়াতী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে নিরচ্ছিন্নভাবে।
টিকাঃ
১. শায়খ উসমান আস-সনদ, 'আসফাল্ মুয়ারিদ ফি তারজুমাতি সায়ি্যদিনা খালিদ'; মাওলানা খালিদ নকশবন্দী, 'সাল্গুল হিসাম'; আমির ইবন্ ওমর আবেদীন (মৃত্যু: ১২৫২), 'রদ্দুল মুখতার'
২. দেখুন সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.), 'সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ; মাওলানা গোলাম রাসূল, 'সাইয়েদ আহমদ শহীদ'।
৩. 'তিকছার' পৃ.১১০।
১. দেখুন- সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.): 'মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ও তাঁর দ্বীনি দাওয়াত'