📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 জাগ্রত বিবেক, জ্ঞানী মন্ত্রী, প্রশাসক ও কবিগণ

📄 জাগ্রত বিবেক, জ্ঞানী মন্ত্রী, প্রশাসক ও কবিগণ


শৌর্যবীর্য আর মর্যাদাশীল রাজা-বাদশাহগণের কাহিনীতো আপনারা শুনলেন। এবার আসুন! কতিপয় জাগ্রত বিবেকের অধিকারী জ্ঞানী মন্ত্রীবর্গ, প্রশাসক ও কবিদের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ভারতের তোতা পাখি বলে খ্যাত আমির খসরুর (মৃত্যু: ৬৫১-৭২৫ হি.) নাম এ প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর সর্বাধিক প্রতিভাবান লোকদের যত সংক্ষিপ্ত তালিকাই প্রণীত হোক না কেন আমীর খসরুর নাম তাতে না রেখে উপায় নেই। বহুবিধ জ্ঞান, শাস্ত্র, সাহিত্য, সংগীত বিদ্যার শিল্পী ও উদ্ভাবক, হরেক রকমের কাব্যরীতির আবিষ্কারক, সংগীতে পারদর্শী ও সূরছন্দের রূপকার, ফার্সী ও হিন্দী কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি আকাশচুম্বী। ভারতবর্ষের কবিকূল সম্রাট আমীর খসরু ভাষা, পরিভাষা, উপমা- উৎপ্রেক্ষা, প্রচন্ড কল্পনাশক্তি, কথার নিপুন গাঁথুনী, সরল অকৃত্রিমতা আর প্রাঞ্জল মাধুর্যে দরদভরা যাদুময়ী কাব্যের জন্য পারস্যেও তিনি সমানভাবে আদৃত ও স্বীকৃত। ঈর্ষণীয় খ্যাতির অধিকারী এ কবি ও কথা সাহিত্যিকের প্রশংসা করেছেন খাজা হাফিজ শিরাজী এবং শেখ সা'দী পর্যন্ত। একই সাথে তিনি এক দরদী খোদাপ্রেমিক, উচ্চবংশীয় সূফী যার দরদভরা আর প্রেমসিক্ত কাব্যমালার ঝংকারে খানকাহ সমূহ আজো তন্ময় হয়। হিন্দি ভাষায় রচিত তার কবিতা হিন্দি কাব্য জগতের মূল্যবান সম্পদ ও উর্দু সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

উযির ইমাম উদ্দীন গিলানী: যিনি মাহমূদ গাওয়াঁ (মৃত্যু: ৮৮৬ হি.) নামে সমধিক পরিচিত। সময়ের উঁচু মাপের পন্ডিত বিজ্ঞ ও শাণিত লেখনীর অধিকারী ছিলেন। তাঁর খ্যাতি ভারতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে আরব, পারস্য, তুর্কিস্থান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ইবাদত, খোদাভীতি, পরিশুদ্ধ ব্যক্তিত্ব, শিক্ষানুরাগ, নিয়মানুবর্তিতা ও সুন্দর ব্যবস্থাপনায় তিনি অত্যন্ত শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। সমকালীন বরেণ্য সাহিত্যিক ও লেখক সমাজের মধ্যে তিনি একটি পরিচিত নাম। ইরানের প্রখ্যাত কবি মরমী সাধক মাওলানা আবদুর রহমান জামী তাঁর সম্পর্কে বলেন, “বিত্তশালীদের তিনি গুরু, অভাবীদেরও অলংকার। তাঁর মধ্যে দারিদ্র্যের চিহ্ন বিদ্যমান বটে তবে তা ধনাঢ্যের চাদরে আবৃত।”

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আবুল কাসেম আবদুল আযীয গুজরাটী

📄 আবুল কাসেম আবদুল আযীয গুজরাটী


যিনি আসিফ খাঁন উযিরে গুজরাটী উপাধিতে প্রসিদ্ধ (মৃত্যু: ৯৬১ হি.) জ্ঞানী ও বহুমাত্রিক গুণে গুনান্বিত মন্ত্রী-উযিরদের মধ্যে তাঁর অবস্থান প্রথম কাতারে। আল্লামা হিজায ইবন্ হাজার আল-মাক্কী তাঁর জীবন ও কর্ম বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করেন। এতে লেখক তাঁর খোদাভীতি, উন্নত চরিত্র ও উঁচু মর্যাদার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি লিখেন: যখন আসিফ খান মক্কা মুয়ায্যামাতে এসে বসবাস শুরু করেন তখন পবিত্র মক্কা এক বিস্ময়কর আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। উলামা-ফকীহগণ তার সান্নিধ্য লাভকে নিজেদের জন্য সৌভাগ্য মনে করতেন এবং জ্ঞানের চর্চা আরম্ভ হয় ঘরে ঘরে।¹ আরব জাহানের কবিগণ আসিফ খান সম্পর্কে অনেক কাব্য রচনা করেন ও তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর স্মরণে এক শোকাবহপূর্ণ কাব্যমালা রচনা করেন।¹ মুঘল সাম্রাজ্যের বিখ্যাত সেনাধ্যক্ষ আবদুর রহীম বৈরামখান (১০০৫ হি.) ফার্সি, তুর্কী ও হিন্দি ভাষায় বড় মাপের কবি ও কথাশিল্পী ছিলেন। একাধারে অসি ও মসির অধিকারী বৈরাম খান সপ্তভাষার পন্ডিত ছিলেন। ভারতবর্ষের এক নিরপেক্ষ সত্যভাষী ও সতর্ক ইতিহাসবিদ আবদুর রহীম খান সম্পর্কে লিখেন: “তার মেধা, প্রজ্ঞা, উদারতা, দূরদর্শিতা, সাহসিকতা ও বদান্যতার প্রশংসা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। সাহিত্য, কাব্যচর্চা, গভীর অধ্যয়ন, গবেষণা, বিশেষতঃ ইতিহাসের গ্রন্থাবলীর প্রতি তাঁর বিস্ময়কর অনুরাগ লক্ষ্য করার মত। জ্ঞানী গুণীদের সান্নিধ্যপ্রিয়তা ও দূর্জনের সংশ্রব পরিহারের ব্যাপারে তিনি কঠোর যত্নবান ছিলেন। অত্যন্ত সতর্ক; পবিত্র ও নির্মল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে এ সেনানায়ক সর্বদা উঁচু মাপের সাহসিকতা ও দৃঢ়চিত্ততার বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে সক্ষম হন। তিনি বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ও বৈচিত্রপূর্ণ যোগ্যতায় সমৃদ্ধ এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যুগযুগ ধরে ইতিহাস তাঁর মতো উদাহরণ উপস্থাপনে অক্ষম।² আবদুর রহীম বৈরাম খান হিন্দী কবিতার অঙ্গনে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছেন। ফার্সী কাব্যেও তাঁর দক্ষতা ঈর্ষণীয়। রাজনীতির কারণে তাঁর কাব্যচর্চার বিষয়টি ঢাকা পড়ে গেছে। এটাকে তিনি যদি খ্যাতির শীর্ষে আরোহনের মাধ্যম ও সিঁড়ি বানাতে চাইতেন তাঁর কদর কিছুতেই পারস্যের রাজ কবিদের তুলনায় কোন অংশে কম হত না যাদের কাব্যলহরীর ঝংকার এখনো সর্বত্র অনুরণিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।³

আবুল ফজল আর ফয়জীর আক্বিদা বিশ্বাস, লক্ষ্য ও কর্মকান্ড সম্পর্কে যথেষ্ট মতবিরোধ আর বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তাদের দ্বারা ভারতবর্ষে প্রকৃত ইসলামের ক্ষতি সাধিত হওয়ার বাস্তবতা স্বীকার করার পরও তাঁরা যে, তাঁদের অসাধারণ প্রতিভা, স্বভাবজাত জ্ঞান অনুরাগ ও কাব্য সাহিত্যের আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অদ্বিতীয় ছিলেন তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তাঁরা উপর্যুক্ত শ্রেষ্ঠত্বের বিবেচনায় ভারতবর্ষে নয় বরং সমগ্র পৃথিবীতে এক বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবে খ্যাত। ফয়জী ফার্সী কাব্যজগতে কবিগুরুর কাতারে স্থান পাওয়ার যোগ্য। আবুল ফযল রচিত "আইন-এ-আকবরী' এবং 'আকবার নামা' তার অধ্যয়ন শক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, (Power of observation) জ্ঞানের ব্যাপ্তি, সুক্ষ্মদর্শিতা, তীক্ষ্ণধী শক্তির এক রাজকীয় কীর্তি। প্রখ্যাত ফরাসী মনীষী (Carra-de-Vaux) 'আকবর নামা' সম্পর্কে লিখেন:

'আকবর নামা' এক অসাধারণ রচনাকর্ম, যা জীবন, কল্পনা এবং জ্ঞানের সমন্বয়ে এক অনবদ্য গ্রন্থ। এ গ্রন্থ অধ্যয়ন করলে মনে হয় যেন জীবনের প্রতিটি অধ্যায় গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়েছে এবং অতঃপর এই গ্রন্থের বিন্যাস করা হয়েছে। এ গ্রন্থের ধারাবাহিক সিঁড়ি মাড়াতে গিয়ে চোখ স্থির হয়ে পড়ে। এটি জ্ঞানের এমন এক দস্তাবেজ যার কারণে প্রাচ্য সভ্যতা অহঙ্কার করতে পারে। যেসব মেধা এই বিশাল গ্রন্থের মাধ্যমে দুনিয়ার সামনে স্বীয় পরিচিতি তুলে ধরেছেন তাঁরা প্রশাসনিক দক্ষতায় ছিলেন যুগ অগ্রবর্তী চিন্তা চেতনার অধিকারী। তাঁরা কেবল প্রশাসনিক বিদ্যা ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অগ্রসর প্রতিভাত হয় তা নয় বরং ধর্মীয় দর্শনে ও চিন্তায়ও অগ্রসর। এসব বিজ্ঞ চিন্তাবিদগণ বস্তুজগতকে অত্যন্ত গভীর থেকেই নিরীক্ষণ করেছেন। অতঃপর তা অন্তরে গ্রথিত করেন এবং প্রত্যেকটি বিষয়ে অভিজ্ঞতার মুখোমুখী হন। ব্যক্তিগত চিন্তাধারার সাথে অন্যান্য বাস্তবতার যাচাই-মূল্যায়ন করেন। একদিকে তাঁদের সৌকর্যপূর্ণ বর্ণনা শৈলী ও ভাষার অলংকরণে থাকে সমৃদ্ধি, অন্যদিকে বর্ণিত উপজীব্যকে পরিসংখ্যান, সংখ্যা ও তথ্য দিয়ে প্রামাণ্য দলিলে বলিষ্ঠতা দান করার সযত্ন প্রয়াস।¹

টিকাঃ
১. নুযহাতুল খাওয়াতির, ৪ খন্ড।
২. নুযহাতুল খাওয়াতির ৫ খন্ড পৃ.২০৭।
৩. ফার্সি কাব্যে তাঁর মান ও স্তর অনুধাবন করতে তার একটি গজল এর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যেতে পারে যার পংক্তিগুলো নিম্নরূপ। "সাধ আর স্বপ্নের হিসাব রাখিনি যে তার সংখ্যা কত? তবে এতটুকু জানি যে, আমার মনটি বড় স্বপ্ন বিলাসী।" এই গজলের আরেকটি পংক্তি লক্ষ্য করুন: 'প্রেমিক মহলে প্রতিশ্রুতির কথা বৃথা, প্রেমিকের দৃষ্টি সহস্র আবিলতায় পূর্ণ।'
১. Carra de Vaux : Penseur de Islam, Paris, 1921

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ইসলামী বিশ্বের শিক্ষা ও চিন্তাগত দীনতার যুগে ভারত বর্ষের ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থান

📄 ইসলামী বিশ্বের শিক্ষা ও চিন্তাগত দীনতার যুগে ভারত বর্ষের ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থান


তাতারী ও মুঘলদের হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ইসলামী বিশ্বে শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তাগত দীনতা বিরাজ করে। ফলে গ্রন্থ রচনা ও লেখালেখির ময়দানে একধরণের স্থবিরতা নেমে আসে। উঁচু মাপের চিন্তা ধারা, বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণায় এক ধরণের বিপর্যয় ও অবসাদ বাসা বাঁধে। হিজরী ৮ম শতাব্দীর পর এ দৈন্যদশা ও চিন্তাগত অবনতির অবয়ব সুস্পষ্ট রূপে আত্মপ্রকাশ করে। চিন্তায় বন্ধ্যাত্ব ও মেধার জড়তা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত ও সংক্রমিত হতে শুরু করে। ওই যুগে হাতে গোনা কতিপয় শীর্ষ ব্যক্তি বাদ দিলে সাধারণতঃ প্রচন্ড ধী-শক্তির অধিকারী (GENIUS) কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিল না বললে চলে, যাকে অনন্য সাধারণ প্রতিভা হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এই হাতেগোনা কয়েক জনের মধ্যে আল্লামা আবদুর রহমান ইব্‌ন খালদুন এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

হিন্দুস্তান তথা ভারতবর্ষ সমগ্র পৃথিবী থেকে এক প্রকার দূরত্বে থাকায় এই মানসিক অবক্ষয় দ্বারা বেশী প্রভাবিত হয়নি। তাতারীদের আগ্রাসন এবং ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াল ছোবল থেকে ভারতবর্ষ ভৌগলিক কারণেই অনেকটা নিরাপদ ছিল। এই জন্যই ইসলামী শিক্ষাবিদগণ সারা দুনিয়ার নানা প্রান্ত হতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতবর্ষের মাটিতে এসে বসতি স্থাপন করেন। যার সুবাদে বিশেষভাবে ভারতবর্ষে শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক কর্মকান্ডে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। লেখালেখি ও গবেষণার গতিও ছিল প্রবল। যুগে যুগে এখানে সৃষ্টি হয়েছে এমন সব শিক্ষাবিদ ও গুণীজন যাদেরকে ইসলামের শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদ ও গ্রন্থকারদের মধ্যে গণ্য করা যায়।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 অনুসন্ধিৎসু ও প্রগতিশীল চিন্তা

📄 অনুসন্ধিৎসু ও প্রগতিশীল চিন্তা


তাদের লেখায় সেকালের গতানুগতিকতার পরিবর্তে আধুনিকতা ও উঁচু মানের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। মাখদুম শায়খ শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মুনিরী (মৃত্যু : ৭৭২ হি.) যিনি "মাকতুবাত-ই-ছেহছদী" তথা তৃতীয় শতাব্দীর রচনাবলী, 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ্' ও 'ইযালাতুল খফা' গ্রন্থের রচয়িতা শায়খুল ইসলাম শাহ ওয়ালি উল্লাহ্ দেহলভী, 'তাকমীলুল আযহান' ও 'আসরার-ই-মুহাব্বত' নামক গ্রন্থের প্রণেতা শাহ রফীউদ্দীন দেহলভী 'আল-আবকাত' এর রচয়িতা শাহ ইসমাঈল শহীদ দেহলভী (রহ.) প্রমুখের রচনা ও গ্রন্থে এমন নতুনত্বের ছাপ আছে যা সাধারণ অন্যান্য সমকালীন লেখকদের রচনায় অনুপস্থিত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px