📄 তাতারী ফিৎনার কবলে ওলামা ও সুশীল সমাজ
হিজরী ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকেই ভারতবর্ষে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগী ইসলামী সরকারের গোড়াপত্তন হয়, যার উদার পৃষ্ঠপোষকতায় পর্যাপ্ত সংখ্যক বিজ্ঞ ও ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন ওলামা ও শিক্ষাবিদগণ এখানে জমায়েত হয়েছেন। ভয়ঙ্কর অত্যাচারী তাতারীরা ইসলামী প্রাচ্যে আগ্রাসন চালিয়ে পুরো ইসলামী দুনিয়াকে তচনচ করে দেয়। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, তাহযীব-তামাদ্দুন ও সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র সমূহ পৈশাচিক উম্মত্ততায় তারা ধ্বংস করে দেয়। যে সব শহরে নারী পুরুষ মুঘল ও তাতারীদের হিংস্র আক্রমনের শিকার হয়েছিল, তাদের হিজরত ও দেশ ত্যাগের এক বিরামহীন হিড়িক পড়ে যায়। জ্ঞানী-গুনী ব্যক্তিরা তাতারীদের অত্যাচার ও বর্বরতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য মাতৃভূমি ছেড়ে নতুন আশ্রয় স্থলের আশায় ভিন্নদেশে পাড়ি জমাতে শুরু করে। এ সময় ভারতবর্ষে তুর্কী বংশোদ্ভূত দাস বংশের রাজত্ব ছিল এবং কেবল ভারতবর্ষই একমাত্র রাষ্ট্র ছিল যা তাতারীদের প্রত্যেকটি আক্রমনের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে তাদের আগ্রাসী আক্রমনকে বারংবার ব্যর্থ করে দেয়। একারণেই বিভিন্ন সময়ে ইরান ও তুর্কিস্থানের শীর্ষস্থানীয় বরেণ্য শিক্ষানুরাগী ও প্রতিভাবান সম্প্রদায় বিপুল সংখ্যায় মাতৃভূমি থেকে হিজরত করে ভারতবর্ষে আশ্রয় নেয়। গ্রহণ করেন। বংশ পরম্পরায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালনে নিয়োজিত ছিলেন এমন অসংখ্য সম্ভ্রান্ত জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শামসুদ্দীন বলবন এবং আলাউদ্দীন খলজী প্রমুখের যুগে এসব সম্প্রদায় বিপুল সংখ্যায় এতদঞ্চলে আবাস স্থাপন করেন। এই হিজরত ও তার পটভূমির উপর আলোকপাত করতে গিয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসবিদ জিয়াউদ্দীন বারণী লিখেন:
All these families of respected noblemen, accomplished scholars and exalted spiritual leaders left their homes and wended their way towards India as a result of the invasion by the Mongols and by Chengis Khan. Princes of the blood, experienced generals, celebrated teachers, learned jurists and illustrious religious and spiritual masters were included among the migrants.
“চেঙ্গিজ খান তথা মোঙ্গলদের আক্রমনের ফলে মর্যাদা সম্পন্ন অভিজাত ব্যক্তি, বিদগ্ধ পন্ডিত এবং উচ্চ মাকামের অধ্যাত্মিক সাধকগণ পৈত্রিক বাস্তু ভিটা ছেড়ে ভারতের পথে হিজরত করেন। এই হিজরতকারীদের মধ্যে উচ্চবংশীয় রাজপুত্র, অভিজ্ঞ সিপাহসালার, সুদক্ষ গুণীজন, বিচারপতি, ইসলামী আইন বিশারদ, ফকীহ, সম্মানিত মাশায়েখ ও উঁচু স্তরের আধ্যাত্মিক সাধক অন্তর্ভূক্ত ছিলেন।”¹
টিকাঃ
১. তারীখে ফিরোজশাহী, গিয়াস উদ্দীন বলবনের যুগ দ্রষ্টব্য।
📄 ভারতীয় বংশোদ্ভূত গুণীজন
উক্ত সম্প্রদায় সমূহ এবং তাঁদের হাতে ইসলাম গ্রহণকারী ভারতবর্ষের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্বখ্যাত মহান শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সব্যসাচী বিদগ্ধ গবেষক এবং বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ জন্ম নিয়েছেন। এমন কতিপয় ব্যক্তিবর্গও সৃষ্টি হয়েছেন সমগ্র পৃথিবীতে যাদের জুড়ি মেলা ভার। এই ভারতীয় জনগোষ্ঠী থেকে এমন শাসক, মন্ত্রী, সেনাধ্যক্ষ, ওলামা ও লেখক সৃষ্টি হয়েছেন যাদের পরিচয়ে ইসলামী বিশ্ব গৌরবান্বিত এবং অন্য জাতি যার উদাহরণ উপস্থাপন করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।
📄 মর্যাদাবান মুসলিম শাসকবর্গ
শেরশাহ শুরীর বর্ণাঢ্য জীবনী, রাষ্ট্রের বিস্ময়কর উন্নতি সাধন, সুনিপুন প্রশাসনিক বিন্যাসে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ন্যায়-ইনসাফ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অধ্যয়নের পর এ সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, খোদা প্রদত্ত প্রখর মেধার অধিকারী এ মহান ব্যক্তিটি মাত্র পাঁচ বছরের স্বল্প সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। শেরশাহ শুরীর শাসনামল মাত্র পাঁচ বছর। এই অল্প সময়ে তিনি বিপুল কার্য সম্পাদন করেছেন বিস্ময়কর কৃতিত্বের সাথে। শেরশাহ সুলতান আলাউদ্দীন খলজীর পর প্রথম মুসলিম যিনি আইন ও রাষ্ট্রীয় বিধানাবলীতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন ও ঢেলে সাজানোর কাজটিতে হাত দিয়েছেন। তাঁর পরবর্তী শাসকগণ তাঁর সম্পাদিত বিন্যাসকে ভিত্তি করে নানাবিধ সংস্কারমূলক কর্মসূচীকে সম্প্রসারিত করেছেন এবং পূর্ণতা দানের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনিই সশস্ত্র বাহিনীকে নতুন ভাবে একটি নিয়মের অধীনে বিন্যস্ত করেছেন। অর্থনৈতিক বিধান প্রণয়ন, মুদ্রানীতি চালু, ভূমি রক্ষণাবেক্ষণ, খাদ্যের শ্রেণীভেদে কর ও শুল্ক নির্ধারণ, দেশকে প্রদেশ, প্রদেশকে জিলা ও জিলাকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করণ কর্মসূচী সম্পন্ন করেছেন। আদালত ও বিচার ব্যবস্থার নতুন বিন্যাস ও সুব্যবস্থাপনায় সমৃদ্ধ করেছেন। তার স্বল্পকালীন শাসনামলেই বাংলাদেশের তৎকালীন রাজধানী সোনারগাঁ থেকে সিন্ধুর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত রাজপথটি নির্মিত হয়। যার মোট দৈর্ঘ্য ৩০০০ মাইল (৪৮২০-৭০৯ কি.মি.) এ মহাসড়কের প্রতি দুই কিলোমিটার পর পর একটি বড় সরাইখানা ছিল যেখানে মুসলমান ও হিন্দুদের জন্য পৃথক খাবারের ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক সরাইখানাতে ডাকচৌকির (Post Box) ব্যবস্থা ছিল। এ পদ্ধতিতে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত একদিনে সংবাদ পৌঁছার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। রাস্তার দু'পাশে সারিবদ্ধ বৃক্ষরোপন করা হয় যাতে ক্লান্ত পথচারীরা ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারেন। অনুরূপ আগ্রা থেকে মন্ডু পর্যন্ত ৬০০ মাইল দীর্ঘ সড়কে পর্যাপ্ত সরাইখানা নির্মাণ করা হয়। সারিবদ্ধ বৃক্ষরাজিতো ছিলই।¹ এসব বিস্ময়কর অবদান ও জনহিতকর কর্মকান্ডের জন্য জনসাধারণ তাঁকে যুগের এক কীর্তিমান ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি ও পৃথিবীর খ্যাতিমান মহান শাসকদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত না করে পারে না।
সম্রাট জালালুদ্দীন আকবর তাঁর ভ্রান্ত বিশ্বাস ও দর্শন 'দ্বীনে ইলাহী'র সাথে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের যথেষ্ট মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও তাঁর অন্তিম কালের অসংলগ্ন ও সংগতিহীন ভীমরতির জন্য একজন মুসলিম ঐতিহাসিকের হৃদয়ে যতই রক্তক্ষরণ হোক না কেন এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি স্বীয় দৃঢ়চিত্ততা, আইন প্রণয়ন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা, প্রত্যেক যোগ্য ব্যক্তির কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ আদায়, রাজ্যের সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক ভিত মজুত করণ এবং ভারতীয়দের মানসিকতা, আবেগ-অনুভূতি অনুধাবনে সক্ষম এক মহান শাসক ছিলেন। কোন ইতিহাসবিদের পক্ষে এ বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
সুলতান আওরঙ্গজেব আলমগীর (মৃত্যু: ১১১৮ হি.)-এর জীবনী, তাঁর জ্ঞান ও চরিত্রমাধুরী, মহান কীর্তিসমূহে ভরপুর ইতিহাস, অর্ধশতাব্দী ব্যাপী বিরামহীন প্রয়াস, তাঁর আমলে বড় বড় অভিযান, সংস্কার কর্মসূচী, তাঁর অনাড়ম্বর ও সাদাসিদে জীবন যাপন, তুলনাহীন ধৈর্য শক্তি, দৃঢ়তা, অবিচলতা, বার্ধক্যেও বিশাল সাম্রাজ্যের তত্ত্বাবধান ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব, সময়ানুবর্তিতা, তার স্পর্শকাতর মহাব্যস্ততার মাঝেও ইসলামী শরীয়তের ফরয-সুন্নাত সমূহের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দান, ইবাদত, অধ্যয়ন, জ্ঞান চর্চার নিবিড় ব্যস্ততা প্রত্যক্ষ করে যে কেউ নিশ্চিত বিশ্বাসে উপনীত হতে বাধ্য হবেন যে, পৃথিবীতে আওরঙ্গজেবের মতো শাসকের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুঃসাধ্য। তিনি এক বিস্ময়কর লৌহমানব ছিলেন। ভীতি, অস্থিরতা, হতাশা আর ইতস্ততা কি জিনিস তাঁর জানা ছিল না। অত্যন্ত সতর্কতা ও পূর্ণ দায়িত্বশীলতা সহাকারে যদি দুনিয়ার কীর্তিমান, যুগশ্রেষ্ঠ বিরলপ্রজ শাসকদের তালিকা প্রণয়ন করা হয়, তবে তিনি সন্দেহাতীতভাবে, কোনরূপ সানুগ্রহ বিবেচনা ব্যতিরেকে সেখানে স্থান পাবার যোগ্য।
সুলতান মুযাফফর হালীম গুজরাটীও (মৃত্যু: ৯৩২ হি.) এমনই একজন দরবেশ প্রকৃতির জ্ঞানী শাসক ছিলেন। তাঁর ঈমান, তাকওয়া, খোদাভীতি, ন্যায়-ইনসাফ, বীরত্ব, সাহসিকতা, উদারতা, আত্মবিশ্বাস, ধর্মীয় পৃষ্টপোষকতা ও জ্ঞান গভীরতার দৃষ্টান্ত সেসব লোকদের মাঝেও পাওয়া দুষ্কর যারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন ও রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথ এড়িয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্যের মাঝেই সর্বদা ডুবে আছেন।
আলোচ্য শাসকের নিষ্ঠা, নিঃস্বার্থপরতার এই কাহিনী রাজা-বাদশাহদের বিজয়াভিযান ও সেনাপ্রতিপালনের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গুজরাটের এক ইতিহাসবিদ বলেন, “মালওয়াহ্ অধিপতিগণ দীর্ঘ এক শতাব্দী গুজরাটের শাসকদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালনার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত মালওয়াহের শাসক দ্বিতীয় মাহমূদ শাহের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার সুযোগে তার মন্ত্রী শ্রী মন্ডলী রায় ক্ষমতার বাগডোর নিজের হস্তগত করে নেন এবং মাহমূদ শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেন। ইসলামের যাবতীয় প্রতীক ও বিধানাবলী রহিত করে কুফরী প্রথার প্রবর্তন করেন। মুযাফফর শাহ হালীমের (রহ.) আত্মমর্যাদাবোধ উদ্বেল তরঙ্গে আন্দোলিত হল। তিনি একদল দূর্ধর্ষ সেনাবাহিনীসহ মালওয়াহ্ অভিমূখে অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন। বহরের পর বহর নিয়ে মন্ডু পৌঁছলেন এবং রাজ্যটি অবরোধ করলেন। শ্রী মন্ডলী রায় প্রমাদ গুনলেন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে, তাঁর পক্ষে অবরোধকারী মুযাফফর শাহের সেনাবাহিনীর সাথে পেরে উঠা সম্ভব নয়; তাই অগত্যা তিনি মোট অঙ্কের লোভ দেখিয়ে রানা সিংহকে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসতে প্রস্তাব দিলেন। তিনি তখনো সারেংপুর পৌঁছেননি মোজাফফর শাহ হালীম তাঁর বাহিনীর একটি পর্যাপ্ত অংশ অগ্রবর্তী দল হিসেবে আগে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সে দলের মুকাবিলায় রানা সিংহের সামনে এগুনোর সাহস হয়নি। এদিকে মন্ডলী রায়ের চতুর্দিক থেকে আগত বাহিনী দূর্গের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়।
মোদ্দা কথা হলো, দূর্গের নিয়ন্ত্রণ হস্তগত করার পর মোজাফফর শাহ হালীম যখন দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন; তখন অমাত্যবর্গ মালওয়াহ্ অঞ্চলের প্রশাসকদের বিলাস সামগ্রী, ধন-সম্পদ, খনিজ ও ভূগর্ভস্থ রত্ন ভান্ডারের ব্যাপারে মোজাফফর শাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, এই যুদ্ধে প্রায় দু'হাজার বীর সৈনিক শাহাদাত বরণ করেছেন। জান-মালের এত ক্ষতি স্বীকারের পর এই অঞ্চলে পূর্বের শাসককে পূনর্বহাল করা কিছুতেই উচিত হবে না। যার অযোগ্যতা ও অব্যবস্থাপনার সুযোগে মন্ডলী রায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন। একথা শুনেই বাদশাহ পরিদর্শন স্থগিত রেখে তৎক্ষণাৎ দূর্গ থেকে বেরিয়ে আসলেন মাহমূদ শাহকে লক্ষ্য করে তিনি নির্দেশনা দিলেন তার সফর সঙ্গী কাউকে যেন দূর্গাভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না দেয়া হয়। মাহমূদ বারংবার মিনতি ভরে এই আবেদন জানাচ্ছিলেন যে, বাদশাহ যেন কিছুদিন দূর্গাভ্যন্তরে বিশ্রাম নেন। কিন্তু মোজাফফর শাহ তা মঞ্জুর করেননি এবং নিজেই ব্যাপারটি পরিস্কার করে বলেন যে, আমি এই জিহাদ ও যুদ্ধাভিযান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যেই পরিচালনা করেছিলাম। আমি আমার আমীর-উমরাহদের নিয়ে শংকিত ছিলাম যেন আমার মনে কোন কুমন্ত্রণার জন্ম না হয় কারণ আমার নিয়তের বিশুদ্ধতা ও নিষ্ঠা বরবাদ হয়ে যেতে পারে। আমি মাহমুদের উপর কোন করুনা করিনি বরং আমার উপর তাঁর এই করুনা রয়েছে যে, তাঁর কারণেই আমার এই সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে।¹
জ্ঞান-গরিমায় তাঁর মর্যাদা, হাদীসে নববী এবং ইসলামী শিক্ষায় তাঁর নিবিড় ব্যস্ততা সম্পর্কে তাঁর নিজ ভাষায় আমরা সম্যক ধারণা লাভ করতে পারি যা তিনি মৃত্যুশয্যায় নেয়ামতের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে ব্যক্ত করেছিলেন :
“আমি আমার ওস্তাদ শেখ মাজদুদ্দীন (রাহ.) থেকে যত হাদীস বর্ণনা করেছি তাঁর বর্ণনাকারী সূত্র সম্পর্কে জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয়, নির্ভরযোগ্যতা, শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাবতীয় অবস্থা আমার জানা আছে। অনুরূপভাবে আল্লাহর রহমতে পবিত্র কুরআনের সমস্ত আয়াত আমার মুখস্ত আছে। তা ছাড়াও শরয়ী বিধান সম্পর্কিত আয়াত সমূহের তাফসীর, শানে নুযুল ও তাৎপর্য সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল। ফলে আমি নিজেকে এই সুসংবাদের অন্তর্ভূক্ত মনে করি। “আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে ধর্মীয় বিষয়ে ব্যুৎপত্তি দান করেন।”
কয়েক মাস আত্মশুদ্ধির জন্যে, সূফী সাধকদের রীতি অনুকরণে যিকির-আযকারে সময় দিয়েছি যাতে বুযুর্গদের জীবনাচারের সাথে সাদৃশ্য লাভে ধন্য হতে পারি। কেননা হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “যে ব্যক্তি যেসব জনগোষ্ঠীর ও সম্প্রদায়ে সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত হবে। আমার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের বরকতের যেন আমিও অংশীদার হতে পারি। আমি সম্প্রতি তাফসীর 'মাআলিমুত তানযীল' অধ্যয়ন শুরু করেছি এখন তা শেষের দিকে কিন্তু আশা করছি বেহেশতে তা সমাপ্ত করব।” ঠিক মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর মুখে হযরত ইউসুফ (আ.) এর নিম্নোক্ত দোয়াটি উচ্চারিত হয় :
"হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছেন। স্বপ্নের তাবীল-ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। হে আসমান-যমিনের সৃষ্টিকর্তা! ইহলোক ও পরকালে আপনিই আমার সর্বোত্তম অভিভাবক। আমাকে আপনি মুসলমান হিসেবে মৃত্যু দিন এবং সৎকর্ম পরায়নদের অন্তর্ভূক্ত করুন।" (সূরা ইউসুফ: ১০১)
টিকাঃ
১. নুযহাতুল খাওয়াতির ৪র্থ খন্ড, পৃ. ৫৫-১৫২।
১. 'ইয়াদে আইয়াম' গুজরাটের ইতিহাস কৃত মাওলানা সৈয়দ হাকীম আবদুল হাই (রাহ.) সাবেক শিক্ষা পরিচালক নদওয়াতুল ওলামা সূত্র: মিরআতে সিকান্দারী।
📄 জাগ্রত বিবেক, জ্ঞানী মন্ত্রী, প্রশাসক ও কবিগণ
শৌর্যবীর্য আর মর্যাদাশীল রাজা-বাদশাহগণের কাহিনীতো আপনারা শুনলেন। এবার আসুন! কতিপয় জাগ্রত বিবেকের অধিকারী জ্ঞানী মন্ত্রীবর্গ, প্রশাসক ও কবিদের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ভারতের তোতা পাখি বলে খ্যাত আমির খসরুর (মৃত্যু: ৬৫১-৭২৫ হি.) নাম এ প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর সর্বাধিক প্রতিভাবান লোকদের যত সংক্ষিপ্ত তালিকাই প্রণীত হোক না কেন আমীর খসরুর নাম তাতে না রেখে উপায় নেই। বহুবিধ জ্ঞান, শাস্ত্র, সাহিত্য, সংগীত বিদ্যার শিল্পী ও উদ্ভাবক, হরেক রকমের কাব্যরীতির আবিষ্কারক, সংগীতে পারদর্শী ও সূরছন্দের রূপকার, ফার্সী ও হিন্দী কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি আকাশচুম্বী। ভারতবর্ষের কবিকূল সম্রাট আমীর খসরু ভাষা, পরিভাষা, উপমা- উৎপ্রেক্ষা, প্রচন্ড কল্পনাশক্তি, কথার নিপুন গাঁথুনী, সরল অকৃত্রিমতা আর প্রাঞ্জল মাধুর্যে দরদভরা যাদুময়ী কাব্যের জন্য পারস্যেও তিনি সমানভাবে আদৃত ও স্বীকৃত। ঈর্ষণীয় খ্যাতির অধিকারী এ কবি ও কথা সাহিত্যিকের প্রশংসা করেছেন খাজা হাফিজ শিরাজী এবং শেখ সা'দী পর্যন্ত। একই সাথে তিনি এক দরদী খোদাপ্রেমিক, উচ্চবংশীয় সূফী যার দরদভরা আর প্রেমসিক্ত কাব্যমালার ঝংকারে খানকাহ সমূহ আজো তন্ময় হয়। হিন্দি ভাষায় রচিত তার কবিতা হিন্দি কাব্য জগতের মূল্যবান সম্পদ ও উর্দু সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
উযির ইমাম উদ্দীন গিলানী: যিনি মাহমূদ গাওয়াঁ (মৃত্যু: ৮৮৬ হি.) নামে সমধিক পরিচিত। সময়ের উঁচু মাপের পন্ডিত বিজ্ঞ ও শাণিত লেখনীর অধিকারী ছিলেন। তাঁর খ্যাতি ভারতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে আরব, পারস্য, তুর্কিস্থান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ইবাদত, খোদাভীতি, পরিশুদ্ধ ব্যক্তিত্ব, শিক্ষানুরাগ, নিয়মানুবর্তিতা ও সুন্দর ব্যবস্থাপনায় তিনি অত্যন্ত শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। সমকালীন বরেণ্য সাহিত্যিক ও লেখক সমাজের মধ্যে তিনি একটি পরিচিত নাম। ইরানের প্রখ্যাত কবি মরমী সাধক মাওলানা আবদুর রহমান জামী তাঁর সম্পর্কে বলেন, “বিত্তশালীদের তিনি গুরু, অভাবীদেরও অলংকার। তাঁর মধ্যে দারিদ্র্যের চিহ্ন বিদ্যমান বটে তবে তা ধনাঢ্যের চাদরে আবৃত।”