📄 আরবী ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শিতা
প্রাথমিক যুগ থেকেই আরবী ভাষা ও সাহিত্যের সাথে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও মজবুত ছিল। ফলে তাঁরা রচনা, লেখালেখি, শিক্ষা ও সাহিত্যের বাহন হিসেবে এ ভাষাকে বরাবরই সযত্নে লালন করেছেন ও সংরক্ষণ করেছেন। এখানে জন্ম নিয়েছেন প্রাঞ্জল, দ্ব্যর্থহীন, সাবলীল ও চিত্তাকর্ষক আরবী কবি, সাহিত্যিক ও কথাশিল্পীগণ। এর মধ্যে আবদুল মুক্তাদির কান্দেহলভী (মৃত্যু : ৭৯১হি.), শায়খ আহমদ বিন মুহাম্মদ থানেশ্বরী (মৃত্যু : ৮২০হি.), মাওলানা গোলাম আলী আযাদ বিলগ্রামী 'সাব-এ-সাইয়ারা' (মৃত্যু: ১২০০হি.) মুফতী সদরুদ্দীন দেহলভী (মৃত্যু: ১২৭৫হি.), মাওলানা ফয়জুল হাসান সাহারানপুরী, (মৃত্যু: ১৩০৪ হি.) এবং মাওলানা যুলফিকার আলী देওবন্দী (মৃত্যুঃ ১৩২২ হি.), মুফতি মুহাম্মদ আব্বাস লক্ষ্ণৌনভী (মৃত্যু: ১৩০৬ হি.) এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আরব সাহিত্যিক ও গবেষকগণ প্রফেসর মাওলানা আবদুল আযিয মেমন ও মাওলানা মুহাম্মদ সূরতীর আরবী ভাষায় বিস্ময়কর পান্ডিত্য, আরবী অভিধান ও ব্যাকরণে অগাধ গভীরতাকে মাথা পেতে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আরবী ভাষার সবচে বিশদ ও প্রামাণ্য অভিধান 'লিসানুল আরব' এর সম্পাদনা পরিষদে প্রফেসর আবদুল আযিয মেমনকে সদস্য রূপে অন্তর্ভুক্ত করে তাঁর যোগ্যতা দক্ষতা ও বৈদগ্ধের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ 'সিমতুল-লাআলী' এবং রচিত গ্রন্থ 'আবুল আ'লা ওয়ামা ইলাহি' থেকে তাঁর ব্যুৎপত্তি ও তীক্ষ্ণধী-শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।
📄 ভারতে আরবী সাংবাদিকতা
আজো ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা আরবী ভাষাকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে আছেন। মাদ্রাসা সমূহে মৌলিক আরবী সাহিত্য ও শিক্ষামূলক কিতাবাদি পাঠ্য তালিকাভূক্ত। লেখা-লেখি ও গ্রন্থ রচনা উক্ত ভাষায় বিপুল ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে চলছে। বিভিন্ন সময়ে আরবী পুস্তিকা ও সংবাদপত্র, সাময়িকী ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে যা থেকে ভারতীয় মুসলমানের আরবী ভাষার সন্তোষজনক অন্তরঙ্গতার প্রমাণ পাওয়া যায়। যথা আরবী মাসিক ম্যাগাজিন 'আল-বায়ান' লক্ষ্ণৌ থেকে প্রকাশিত হতো। মাওলানা ইমাদী এবং মাওলানা আবদুর রাজ্জাক মলীহাবাদী এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। সাপ্তাহিক 'আল- জামিয়া' মাওলানা আবুল কালাম আযাদ এর তত্ত্বাবধানে কলিকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। মাসিক 'আয যিয়া' নদওয়াতুল উলামা লক্ষ্ণৌ এর মূখপাত্র হিসেবে প্রকাশিত হতো। এর উন্নত সাহিত্য মান, মুনশিয়ানা লেখা, শিকড় সন্ধানী বিশ্লেষণ ও মননশীলতার জন্য আরব বিশ্বের শিক্ষা ও সাহিত্যের পরিমন্ডলে বিশেষ কদর ও গ্রহনযোগ্যতা সুবিদিত। শীর্ষ ভাষাবিদ বিশ্লেষক মহল এর উৎকৃষ্ট ভাষাশৈলীর স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। মাওলানা মাসউদ আলম নদভী (রহ.) এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ১৯৩৫ ইংরেজী মুতাবিক ১৩৫৪ হিজরীতে লক্ষ্ণৌ থেকে হাকীম মুহাম্মদ আসকারী নদভী (রহ.) এর সম্পাদনায় মাওলানা আলী নক্বী মুজতাহিদী¹ এর পৃষ্টপোষকতায় মাসিক আরবী সাময়িকী 'আর রিদওয়ান' প্রকাশিত হয়। এটি চার বছর পর্যন্ত প্রকাশিত হতে থাকে এবং এটি শিক্ষা ও সাহিত্যের মান বিচারে একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা। দ্বীনি মেজায তৈরী ও মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশে এ সাময়িকীর ভূমিকা ছিল অগ্রণী।
'নদওয়াতুল উলামা'র সার্বিক তত্ত্বাবধানে অদ্যাবধি প্রকাশিত মাসিক 'আল-বা'ছুল ইসলামী', নদওয়াতুল ওলামা' থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক 'আর রায়িদ' উভয় সাময়িকী আরব বিশ্বে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার পরিসরে অত্যন্ত মর্যাদাশীল পত্রিকা হিসেবে বিবেচিত ও সমাদৃত। আরব বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকী এই পত্রিকা দু'টি থেকে বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে। ইসলামী বিশ্বের নানা প্রান্ত হতে গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদদের বহু উচ্ছসিত প্রশংসা সূচক ও প্রেরণা মূলক চিঠিপত্র সম্পাদনা কার্যালয়ে পৌঁছে। এটা পত্রিকাদ্বয়ের শীর্ষ মহলে সন্তোষজনক গ্রহণযোগ্যতার দলীল। দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত 'আদ-দায়ী' এর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মানসম্মত রচনা পাঠক মহলকে মুগ্ধ করে। অনুরূপ হায়দারাবাদ থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক 'আস-সাহওয়াতুল ইসলামিয়া', আল-জামিয়া সালফিয়া বেনারস থেকে প্রকাশিত 'সাওতুল উম্মাহ্' নামক ম্যাগাজিন সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশের বহু মাদ্রাসা ও ইসলামী দাওয়াতী কেন্দ্র সমূহ থেকে বিভিন্ন আরবী সাময়িকী নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
টিকাঃ
১. যিনি পরে মুসলিম ইউনিভার্সিটির দ্বীনিয়াত (শিয়া) বিষয়ে শিক্ষকতা করেন।
📄 আধুনিক আরবী কলামিস্টবৃন্দ
এছাড়াও দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামা একদল এমন সুদক্ষ আরবী সাহিত্যিক ও কলামিস্ট তৈরী করেছে, যাদের ব্যাপক খিদমত দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে। ইসলামী বিশ্বের সাহিত্য আন্দোলন ও বহুমাত্রিক গবেষণালব্ধ রচনা কর্মের পরিসংখ্যান তৈরী করতে চাইলে কোন উদার, দূরদর্শী ঐতিহাসিক এই নদভী লেখক মহলের নিবেদিত, পরিপক্কতায় সমৃদ্ধ সাহিত্য ও চমৎকার রচনাশৈলীকে উপেক্ষা করতে পারেন না। যেখানে একই সাথে সাহিত্যরস, দাওয়াতী চেতনা, ঈমানী সজীবতা আর শক্তির চমকপ্রদ সম্মিলন ও চিত্তাকর্ষনের সমন্বয় ঘটেছে। সাহিত্যের পরিমন্ডলে তাঁরা একটি স্বতন্ত্র রীতির প্রবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। ক্ল্যাসিকাল সাহিত্যের পরিপক্কতা, কৃষ্টি ও আধুনিক সাহিত্যের সুষমা ও সাবলীলতা যেখানে পুরোমাত্রায় বিদ্যমান।
এই নদওয়াতুল ওলামাতে ইসলামী দাওয়াতী ও সাহিত্য কর্ম বিষয়ক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় যেখানে আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদগণ অংশ গ্রহণ করেন। এ সম্মেলন 'রাবেতা আল আদব আল- ইসলামী' তথা আন্তর্জাতিক ইসলামী সাহিত্য সংস্থার বিশ্বব্যাপৃত ভিত্তি স্থাপনের বুনিয়াদী উপকরণ যোগানে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। এ সংগঠনের একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় রিয়াদে এবং অপরটি লক্ষেতে অবস্থিত। আরব বিশ্বের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও লেখকবৃন্দ এ সংস্থার সদস্য হতে পারাকে গৌরবের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। সংস্থার সামগ্রিক কার্যক্রমে শেকড়সন্ধানী গবেষকগণ অত্যন্ত উৎসাহী ও তৎপর ভুমিকা পালনে নিবেদিত আছেন।