📄 ইসলামী জগতের ভুবন খ্যাত লেখকদের জীবনী সংক্রান্ত গ্রন্থরাজির সর্ববৃহৎ আকর
মাওলানা মাহমূদুল হাসান টুল্কী (মৃত্যু : ১৩৬৬ হি.) ইসলামী জগতের খ্যাতিমান গ্রন্থাকারদের জীবন ও কর্ম বিষয়ক 'মু'জামুল মুসানিফীন' নামক এক অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ গ্রন্থ রচনা করেন। বিজ্ঞ মহলে এটি স্বতন্ত্র বিশ্বকোষের মর্যাদা সম্পন্ন এক আকরতূল্য। ৬০ খন্ডে বিন্যস্ত ২০ হাজার পৃষ্ঠা সম্বলিত এ গ্রন্থে ৪০ হাজার গ্রন্থকারের জীবনী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গ্রন্থটির বিশালত্ব ও ব্যাপকতা থেকে এ ধারণা লাভ করা যায় যে, লেখক এতে দু'হাজার এরকম গ্রন্থকারের জীবনী লিপিবদ্ধ করেছেন যাদের নাম 'আহমদ'। এ গ্রন্থে দেড়হাজার গ্রন্থের সার-নির্যাস রয়েছে। প্রাথমিক ইসলামী যুগের গ্রন্থ থেকে শুরু করে ১৩৫০ হিজরী পর্যন্ত সে সমস্ত ব্যক্তিবর্গের আলোচনাও এতে স্থান পেয়েছে যাদের অন্তত একটি গ্রন্থ হলেও প্রকাশিত হয়েছে। এই বিশাল গ্রন্থের মাত্র ৪টি খন্ড হায়দারাবাদ সরকারের অর্থায়নে বৈরুত থেকে মুদ্রিত হয়, বাকী অংশের ব্যাপারে অনুসন্ধানে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি যে, তা কোথায় আছে।
সাম্প্রতিক কালের বিদগ্ধ লেখক ও প্রাজ্ঞ গ্রন্থকারের তালিকায় মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর (রহ.) নাম সর্বশীর্ষে স্থান পাওয়ার যোগ্য। যিনি সীরাতে নববী (সা.), ইসলামী আইনশাস্ত্র, ইসলামের ইতিহাস এবং সাহিত্যের উপর অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ রচনায় রীতিমত কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর (রহ.) রচিত গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ভারতের মর্যাদাশীল সাময়িকী মাসিক 'মা'আরিফ' এ উঁচুমাপের প্রবন্ধ-নিবন্ধ, শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী লেখা তো এ হিসেবের বাইরে। এ প্রবন্ধ সমগ্রের পৃষ্ঠা হিসেব করলেও হাজার ছাড়িয়ে যাবে বললে অত্যুক্তি হবে না। এসব মূল্যবান শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ ও গবেষণা কর্মের বিবেচনায় মাওলানা সুলাইমান নদভী (রহ.) নিঃসন্দেহে প্রাচ্যের এক বহুমাত্রিক প্রতিভাধর শক্তিমান লেখক, বিদগ্ধ গ্রন্থকার ও অত্যন্ত উঁচু মাপের বিশ্লেষক, প্রাবন্ধিক ও গভীর পান্ডিত্যের অধিকারী গবেষক। ব্যাপক গবেষণা, অধিক গ্রন্থরচনা এবং শাণিত লিখনী বিচারে মাওলানা মানাযির আহসান গিলানী (রহ.) (মৃত্যু: ১৩৭৫ হি.) এর নাম উল্লেখ না করার সুযোগ নেই। "আন-নাবিউল খাতিম", "তাদভীন-এ-হাদীস", "ইসলামী মা'আশিয়াত" এবং "মুসলমানোকা নেজামে তা'লীম ওয়াতারবিয়াত" শীর্ষক গ্রন্থগুলো আলোচ্য লেখকের গুরুত্বপূর্ণ রচনাকর্ম। প্রকৃত পক্ষে লেখক তাঁর রচিত বলিষ্ঠ ও গতিশীল লেখনী দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার বিনির্মাণ করে গেছেন।
📄 ইলমে হাদীস তথা হাদীস শাস্ত্রে অবদান
ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ ও বিকাশে ভারতীয় উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের নিষ্ঠাপূর্ণ, গভীর ব্যুৎপত্তি সমৃদ্ধ অবদান সর্বত্র প্রসিদ্ধ। বিশেষতঃ হাদীস শাস্ত্রের উপর সর্বোতমূখী অবদান, যথা-পাঠদান, মূল পাঠের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তাঁদের অবদান সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে পরবর্তী যুগে ইলমে হাদীসের একচ্ছত্র রাজত্ব তাঁদের হাতে চলে আসে। 'আল-মানার' পত্রিকার সম্পাদক আল্লামা সৈয়দ রেজা মিশরী 'মিফতাহু কুনুযিস্ সুন্নাহ্' গ্রন্থের ভূমিকায় ভারতীয় ওলামায়ে কেরামের উক্ত অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে গিয়ে বলেন: “যদি ভারতীয় ওলাময়ে কেরাম এ যুগে ইলমে হাদীসের দিকে গুরুত্ববহ দৃষ্টিপাত না করতেন তাহলে, এ শাস্ত্র প্রাচ্য থেকে বিদায় নিতো। কেননা, মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও হিজাজের অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে ইলমে হাদীস হিজরী ১০ শতাব্দী থেকেই বিদায় নিয়েছিল।” ভারতে বিশেষতঃ কেন্দ্রীয় তথা মধ্যভারতে হাদীস চর্চা, প্রসার, ও সর্বব্যাপী গ্রহনযোগ্যতার ভরসাস্থল হযরত শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস-এ-দেহলভী (রহ.) (৯৫১-১০৫২ হি.) এ অসাধারণ মেধা ও প্রতিভাধর মনীষী অর্ধশতাব্দী ধরে হাদীস গ্রন্থের উঁচু মানের ব্যাখ্যা, প্রাসঙ্গিক সূত্র বিবরণী; অনুবাদ, অধ্যাপনাসহ নানাবিধ গৌরবোজ্জ্বল নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের মাধ্যমে হাদীস শাস্ত্রকে (এতদঞ্চলে এক সময় তা যথোপযুক্ত মর্যাদা ও মহিমায় প্রতিষ্ঠিত ছিল না।) নবজীবন দান করেছেন। ক্রমশ: শিক্ষা, ও প্রকাশনা কেন্দ্র সমূহ এ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিদানে উদ্যোগী হয়েছে নবোদ্দমে। তাঁর সন্তান ও শিষ্যরা হাদীস চর্চা ও বিকাশের মহান দায়িত্ব পালনে কার্যকর ও অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। পরিশেষে শাহ ওয়ালি উল্লাহ্ মুহাদ্দিস-এ-দেহলভী (রহ.) ও তাঁর বংশধররা এই পবিত্র বৃক্ষকে প্রত্যেকের দোরগোড়ায় সম্প্রসারিত করেছেন। সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় ওলামায়ে কেরাম হাদীস শাস্ত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচনা করেছেন যা সর্বত্র সমানভাবে সমাদৃত হয়েছে। যথা মাওলানা আশরাফ আলী ডিয়ানভী (রহ.)¹ রচিত 'আউনুল মাবুদ ফি শরহি আবিদাউদ', মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) বিরচিত 'বযলুল মাজহুদ ফি শরফি সুনান-ই-আবি দাউদ', মাওলানা আবদুর রহমান মুবারকপুরী বিরচিত 'তুহফাতুল আহওয়াযী ফি শরহি সুনান আত-তিরমিযী' মাওলানা শব্বির আহমদ উসমানী বিরচিত 'ফাতহুল মুলহিম ফি শরহি সহীহিল মুসলিম', শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্দলভী (রহ.) লিখিত 'আউজাযুল মাসালিক ইলা শরহি মুআত্তা ইমাম মালিক (রহ.)', এ ছাড়াও মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ.) এর সহীহুল বুখারীর টীকা গ্রন্থ 'ফয়জুল বারী' বর্তমানে হাদীস শাস্ত্রের অধ্যয়ন, অধ্যাপনা ও গবেষণায় নিয়োজিত ওলামায়ে কেরাম ও হাদীসের ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত উপকারী অমূল্য আকর। মাওলানা জহীর আহসান শওকু নিমভী² রচিত গ্রন্থ 'আসারুস সুনান' মুহাদ্দিস সুলভ দৃষ্টিভঙ্গির চুলচেরা বিশ্লেষণ, হানাফী মাযহাব এর সপক্ষে একটি একটি উঁচু মাপের রচনাকর্ম এবং ভারতীয় উপমহাদেশের গ্রন্থের তালিকায় একটি মর্যাদাশীল গ্রন্থ ও নতুন সংযোজন। ভাগ্যের পরিহাস! লেখক এ গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করার সুযোগ পাননি। অকালেই তাঁকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো। যদি এটির সমাপ্তি টানা সম্ভব হতো তাহলে হানাফী মাযহাবের যুক্তি-বিশ্লেষণ ও মুহাদ্দিস সুলভ বর্ণনারীতির ক্ষেত্রে এক বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ হিসেবে তা আত্মপ্রকাশ করতো।
টিকাঃ
১. এ গ্রন্থ মাওলানা সৈয়দ নাযির হোসাইন মুহাদ্দিস-এ- দেহলভীর (রহ.) দিকনির্দেশনায় তাঁর বিশেষ ঘনিষ্ঠ শিষ্য বিহারের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এবং বিজ্ঞ আলিম শামসুল হক ডিয়ানভী কর্তৃক প্রণীত যা প্রথমে তিনি 'গায়াতুল মাকসূদ' নামে 'সুনান-এ- তিরমিযী' এর বৃহৎ ব্যাখ্যা গ্রন্থরূপে লিখা শুরু করেছিলেন, যা অসমাপ্ত ছিল এবং এর কেবল ১ম খন্ড প্রকাশিত হয় পরে তা এক প্রিয় শিষ্য মাওলানা আশরাফ আলীকে দিয়ে এটি লিখিয়েছেন।
২. মাওলানা জহির আহসান শওকু নিমভী বিহারী অধুনা যুগের গৌরব মাওলানা আবদুল হাই ফিরিঙ্গি মহল্লীর মর্যাদাবান কৃতিছাত্র। মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ.) বলতেন, "৩শ' বছরে ভারতীয় উপমহাদেশের এ ধরনের মুহাদ্দিস জন্ম নেয়নি।"
📄 ভারতীয় ওলামায়ে কেরামদের স্বাতন্ত্রিক রচনাবলী
সমগ্র ইসলামী দুনিয়ার বিদ্বান ও বিশ্লেষক মহল ভারতীয় ওলামায়ে কেরামের কতিপয় গ্রন্থকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সর্বোত্তম রচনাকর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তন্মধ্যে তাফসীর বিষয়ে কাযী সানাউল্লাহ্ পাণিপথির (মৃত্যু : ১২২৫ হি.) 'তাফসীর-এ মাযহারী'। খ্রিস্টবাদের অসারতা ও তাওরীত ইঞ্জিলের বিশ্লেষণ বিষয়ক মাওলানা রহমতুল্লাহ্ কিরানভী (মৃত্যু: ১৩০৯ হি.) এর রচনাবলী 'ইজহারুল হক', 'ইযালাতুল আওহাম' এবং 'ইযালাতুশ শুকুক' সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চূড়ান্ত রচনা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। তুরস্ক, মিশর ও সিরিয়ার উলামাবৃন্দ সংশ্লিষ্ট ছাত্র-শিক্ষক তার্কিকদের উপর্যুক্ত বিষয়ের জন্য উল্লিখিত গ্রন্থ অধ্যয়নের এবং উক্ত দেশ মূহের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সমূহ এ সব গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ প্রকাশ করে বস্তুতঃ এর ব্যাপক গুরুত্বকে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ভাষার অলঙ্করণ শাস্ত্রে আল্লামা মাহমূদ জৌনপুরী (রহ.) (১০৮২ হি.) রচিত 'আল ফারায়েদ' মাওলানা হামীদ্দীন ফারাহী (রহ.) রচিত 'আল আমআন ফি আকসামিল কুরআন', 'জামরাতুল বালাগাহ্' এবং পবিত্র কুরআন মজীদের বিভিন্ন সূরার ব্যাখ্যা-তাফসীর সমূহ লেখকের সুগভীর দৃষ্টি, আরবী ও অলঙ্করণ শাস্ত্রে বিজ্ঞজনোচিত পারদর্শিতা এবং সুক্ষ্ম বিশ্লেষকের পরিচয় মেলে।
বিচারপতি কিরামত হোসাইনের বিশিষ্ট গ্রন্থ 'ফিকহুল লিসান' Fiqhul- Lisan (আরবী) এবং মাওলানা মুহাম্মদ সুলাইমান আশরাফ, প্রাক্তণ পরিচালক দ্বীনিয়াত বিভাগ আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, রচিত 'আল-মুবীন' (উর্দু) ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেখকের সুক্ষ্ম দৃষ্টি, গভীর অনুসন্ধিৎসা, সাহিত্য ও কথাশিল্পে নিপুনতা ও উন্নত অভিরুচির পরিচয় মেলে। আলোচ্য গ্রন্থ দু'টি আরবী ভাষার অলঙ্করণ শাস্ত্রের প্রকরণ, বিন্যাস, সংক্রান্ত সুক্ষ্ণ বিষয়াদির এক অনবদ্য সংকলন।
আরবী ছাড়াও ইসলামিয়াত, সাহিত্য বিষয়ক ফার্সি এবং উর্দুতে ভারতীয় ওলামাদের বেশ কিছু দূর্লভ রচনা কতিপয় স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের অনন্য গ্রন্থ রুপে পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে। অন্য কোন দেশে এর তুলনা পাওয়া দুষ্কর। যেমন- ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান পরিচিতি বিষয়ে মুজাদ্দিদে আলফে সানী হযরত শায়খ আহমদ সেরহিন্দির (রহ.) রচনা সমগ্র- মাকতুবাত, মাখদুম শায়খ ইয়াহইয়া মুনিরী (রহ.) 'মাকতুবাত'-এ-সেরহিন্দি', খিলাফত বিষয়ে শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ্ মুহাদ্দিস-এ-দেহলভী (রহ.) বিরচিত 'ইযালাতুল খফা' তাফসীর শাস্ত্রের মূলনীতি বিষয়ক লেখকের অপর গ্রন্থ শিয়াবাদের অসারতা বিষয়ে শাহ আবদুর আযীয মুহাদ্দিস-এ- দেহলভী (রহ.) রচিত 'আল-ফাউযুল কাবির' 'তুফা-এ-ইসনা আশরিয়া' তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধি বিষয়ে হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর 'সিরাতুল মুস্তাকীম', নেতৃত্ব এবং নেতা ও নবীর (সা.) ওয়ারিস তথা উত্তরাধিকারীদের গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য, দায়িত্ব-কর্তব্য বিষয়ক এক অসাধারণ গ্রন্থ মাওলানা শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.) লিখিত 'মানসব ওয়া ইমামত' (ইসলামের দৃষ্টিতে মর্যাদাপূর্ণ পদ)। হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুভী (রহ.) রচিত 'হুজ্জাতুল ইসলাম' এবং 'তাকুরীর-এ দিলপযীর', মাওলানা আবদুশ শকুর ফারুকী লক্ষ্ণৌভী রচিত 'রদ্দে শীয়ত' (শীয়বাদের ভ্রান্তি), সীরাতে নববী সম্পর্কে মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.) এর 'সীরাতুন্নবী (সা.)' এবং 'খুতবাত-এ মাদ্রাজ', কাজী মুহাম্মদ সুলাইমান মনসূরপুরী রচিত 'সীরাতু রহমাতুল লিল আলামীন', মাওলানা মুনাযির আহসান গিলানী (রহ.) রচিত 'আন নাবিয়্যুল খাতিম' এবং ফার্সি কাব্য চর্চা বিষয়ে মাওলানা শিবলীর 'শেরুল আজম' অতুলনীয় রচনা কর্ম। উল্লিখিত গ্রন্থ সমূহ আরবী, ফার্সি ও তুর্কি ভাষায় অনূদিত হয়ে দুনিয়া ব্যাপী বিদগ্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে আদৃত হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী (রহ.) রচিত পবিত্র কুরআনের ভাষ্য 'তাফসীর-ই-মাজেদী' (উর্দু-ইংরেজী) সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এসব তাফসীরে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও স্থান সমূহ সম্পর্কে নতুন তথ্য রয়েছে যার ইঙ্গিত রয়েছে পবিত্র কুরআনে। এছাড়াও এতে রয়েছে ইয়াহুদীবাদ ও খ্রিস্টবাদ সম্পর্কে বিশ্লেষণ যা আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব, পুরাকীর্তি, খনন (Archaeology and Excavation) ও বাইবেলীয় সাহিত্যের তথ্যাবলীর উপর নির্ভর করে রচিত। বিশদ আলোচনায় উল্লিখিত গ্রন্থ অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং একই সাথে ইসলামী সাহিত্যের এক বিরাট শূন্যতা পূরণ হয়েছে এর মাধ্যমে।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদের রচনা, গ্রন্থ সংখ্যা, কলেবর এবং বিষয় বৈচিত্র্য বিচারে যদিও অত্যধিক গুরুত্বের দাবী রাখেনা কিন্তু তিনি তাঁর যাদুকরী সাহিত্য রীতিতে (যার রূপকার-উদ্ভাবক তিনিই ছিলেন এবং সমাপ্তকারীও তিনি) উৎকৃষ্ট বর্ণনারীতি, চমৎকার ভাষাশৈলী আর উঁচু মানের বাচনভঙ্গির জন্য এবং জীবন স্মরণীয় সাহিত্য বিষয়ক রচনা কর্মের কারণে যা 'তাযকিরাহ' ও 'তরজুমানুল কুরআন' এর অংশ এবং উর্দু সাহিত্যের জগতে উঁচু মাপের সম্পদ হিসেবে পরিগণিত। তিনি সমসাময়িক কালের অত্যন্ত উঁচুমাপের লেখক ও ক্ষুরধার লেখনীর অধিকারী। তাঁর রচিত তাফসীর গ্রন্থ 'তারজুমানুল কুরআন' বহু এমন বিশ্লেষণ, তাফসীর ও কুরআনের বর্ণনা সমৃদ্ধ যা এ গ্রন্থকে এক ব্যতিক্রমধর্মী বিশিষ্টতা দান করেছে।
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী যিনি মূলত ভারতের অধিবাসী এবং এখানেই তাঁর লেখা-লেখির জীবনের হাতেখড়ি ও উত্তরণকাল শুরু হয়। তিনি এমন বেশ কিছু গ্রন্থ, পুস্তিকা ও গবেষনা কর্মের প্রণেতা যা গভীর বিশ্লেষণ, দলিল উপস্থাপনের বলিষ্ঠতা, বর্ণনা ও ভাষা শৈলীর কারুকার্য এবং প্রাঞ্জল সাবলীলতায় পশ্চিমা সংস্কৃতি, দর্শন, জীবনাচার বিশ্লেষণে অনন্য বৈশিষ্টের অধিকারী। চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও তাঁর যুক্তি নির্ভর রচনা সংকলন 'তানকীহাত' 'তাফহীমাত' 'পর্দা' 'সূদ' ইত্যাদি সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নমুনা।
📄 আরবী ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শিতা
প্রাথমিক যুগ থেকেই আরবী ভাষা ও সাহিত্যের সাথে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও মজবুত ছিল। ফলে তাঁরা রচনা, লেখালেখি, শিক্ষা ও সাহিত্যের বাহন হিসেবে এ ভাষাকে বরাবরই সযত্নে লালন করেছেন ও সংরক্ষণ করেছেন। এখানে জন্ম নিয়েছেন প্রাঞ্জল, দ্ব্যর্থহীন, সাবলীল ও চিত্তাকর্ষক আরবী কবি, সাহিত্যিক ও কথাশিল্পীগণ। এর মধ্যে আবদুল মুক্তাদির কান্দেহলভী (মৃত্যু : ৭৯১হি.), শায়খ আহমদ বিন মুহাম্মদ থানেশ্বরী (মৃত্যু : ৮২০হি.), মাওলানা গোলাম আলী আযাদ বিলগ্রামী 'সাব-এ-সাইয়ারা' (মৃত্যু: ১২০০হি.) মুফতী সদরুদ্দীন দেহলভী (মৃত্যু: ১২৭৫হি.), মাওলানা ফয়জুল হাসান সাহারানপুরী, (মৃত্যু: ১৩০৪ হি.) এবং মাওলানা যুলফিকার আলী देওবন্দী (মৃত্যুঃ ১৩২২ হি.), মুফতি মুহাম্মদ আব্বাস লক্ষ্ণৌনভী (মৃত্যু: ১৩০৬ হি.) এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আরব সাহিত্যিক ও গবেষকগণ প্রফেসর মাওলানা আবদুল আযিয মেমন ও মাওলানা মুহাম্মদ সূরতীর আরবী ভাষায় বিস্ময়কর পান্ডিত্য, আরবী অভিধান ও ব্যাকরণে অগাধ গভীরতাকে মাথা পেতে নিতে বাধ্য হয়েছেন। আরবী ভাষার সবচে বিশদ ও প্রামাণ্য অভিধান 'লিসানুল আরব' এর সম্পাদনা পরিষদে প্রফেসর আবদুল আযিয মেমনকে সদস্য রূপে অন্তর্ভুক্ত করে তাঁর যোগ্যতা দক্ষতা ও বৈদগ্ধের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ 'সিমতুল-লাআলী' এবং রচিত গ্রন্থ 'আবুল আ'লা ওয়ামা ইলাহি' থেকে তাঁর ব্যুৎপত্তি ও তীক্ষ্ণধী-শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।