📄 মুসলমানদের ঝুঁকিপূর্ণ ও দ্বিমাত্রিক দায়িত্ব
ভারতীয় উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরাম সকল যুগে নিজেদের প্রিয় মাতৃভূমির সাথে সুগভীর, আন্তরিক, নিবিড় ও নিষ্ঠাপূর্ণ সম্পর্কের দৃষ্টান্তই স্থাপন করে গেছেন। স্বদেশের শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর শাখাও বাদ দেননি। সবখানে তাঁদের ভূমিকা ছিল মূখ্য। একই সাথে স্বীয় ধর্মীয় তথা ইসলামী ও আরবী কৃষ্টি-কালচার এবং ঐতিহ্যের সাথেও সমানভাবে বিশ্বস্ততার সাক্ষর রেখেছেন। ইসলামী দুনিয়ার সাথে তাঁদের নিবিড় সম্পর্ক এক মূহুর্তের জন্যও বিচ্ছিন্ন হয়নি বরং ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অবস্থান সেনাপতি সুলভ ছিল।
দু'ভিন্ন প্রকৃতির সংস্কৃতির মাঝে সহাবস্থান ও সমন্বয় সাধন এবং ভিন্ন দু'টি স্বদেশের (সত্তাগত ও আধ্যাত্মিক) একই সাথে সুষম বিশ্বস্ততা বজায় রাখা রীতিমত দুঃসাধ্য ব্যাপার। ইসলামী উম্মাহর মধ্যে ভারতীয় মুসলমানদের মত একই সময়ে একই সাথে এমন ঝুঁকিপূর্ণ, দ্বিমাত্রিক ও দ্বৈত দায়িত্ব সফল ভাবে পালনের নজীর দ্বিতীয়টি নেই।
📄 গ্রন্থনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ভারতীয় ওলামায়ে কেরামের অগ্রণী ভূমিকা
ইসলামী শিক্ষার জগতে ভারতীয় মুসলমানদের গ্রন্থের সংখ্যা অগুনতি। হাজী খলিফা প্রণীত 'কাশফুয যুনূন' এর ব্যাপক বিষয় সম্বলিত সাধারণ গ্রন্থও ভারতীয় ওলামায়ে কেরামের লিখিত গ্রন্থাবলী ও রচনাকর্মের আলোচনা থেকে খালি থাকেনি। মাওলানা আবদুল হাই হাসানী (রহ.) (মৃত্যু: ১৩৪১ হিজরী, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) রচিত 'আস- সাকাফাতুল ইসলামিয়া ফিল হিন্দ'¹ (ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সংস্কৃতি) শীর্ষক গ্রন্থের সরল স্বীকৃতি থেকেই ভারতীয় ওলামায়ে কেরামের লেখা ও গবেষণা এবং গ্রন্থ রচনার অগ্র প্রয়াসের যথাযথ ধারণা লাভ করা যায়।
টিকাঃ
১. এটি ভারতীয় উপমহাদেশে জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা-দীক্ষার ইতিহাস ও ক্রমবিকাশের ধারা এবং গ্রন্থাবলীর সূচী বিবরণী, যাতে পাঠ্যসূচীর ক্রমোন্নতি ও কালানুক্রমিক বিন্যাস এবং সংস্কার সংক্রান্ত বিশদ বিবরণী প্রদত্ত হয়েছে। তাছাড়াও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শাস্ত্রের নানা শাখায় ভারতীয় ওলামাদের পৃথক পৃথক ছোট বড় গ্রন্থের বিস্তারিত তালিকা সন্নিবেশিত হয়েছে। এটি '৫৮ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কের 'রয়েল একাডেমী'র পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে সংযোজিত ও বর্ধিতরূপে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। (মাওলানা আবুল ইরফান নদভী (রহ.), শিক্ষক- দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামা লক্ষ্ণৌ কর্তৃক উর্দু অনূদিত।) 'হিন্দুস্তানে ইসলামী জ্ঞান শাস্ত্র' নামে 'দারুল মুসান্নিফীন' আজমগড় থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
📄 ভারতীয় ওলামায়ে কেরাম রচিত কতিপয় বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ
এ পর্যায়ে আমি ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাতিমান ওলামায়ে কেরাম রচিত সেসব বিশ্ববরেণ্য গ্রন্থাবলীর ব্যাপারে আলোকপাত করতে প্রয়াস পাবো যা ভারতের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে আপন মহিমায়। আরবরাও এসব গ্রন্থকে সাদরে ও সসম্মানে বরণ করে নিয়েছেন। এ ধারা পরিক্রমায় সর্বাগ্রে হিজরী ৭ম শতাব্দীর (খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী) হাদীসের ইমাম ও অভিধান বিশারদ হাসান বিন মুহাম্মদ আস্ সাগানী লাহোরী রচিত 'আল-উবাবুষ যাখির' গ্রন্থের আলোচনা সমধিক প্রণিধানযোগ্য মনে করি। এটি আরবী ভাষায় প্রামাণ্য ও মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। অভিধান বিশারদগণ যুগে যুগে এ গ্রন্থ থেকে উপকৃত হয়েছেন এবং গ্রন্থকারের পান্ডিত্য, গভীরদৃষ্টি ও বিদগ্ধতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন অকুণ্ঠ চিত্তে। আল্লামা সূযুতী (রহ.) এ গ্রন্থের রচয়িতা সম্পর্কে লিখেন: "তিনি অভিধান শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন।" ইমাম যাহাবী (রহ.) তাঁকে "অভিধান শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য অবলম্বন ও চূড়ান্ত দলীল" হিসেবে অভিহিত করেন। আদ্ দিমইয়াতীর মতে তিনি “ফিক্হ শাস্ত্র ও হাদীস শাস্ত্রের পথিকৃৎ ছিলেন।” আলোচ্য গ্রন্থকারের অপর বিখ্যাত রচনা 'মাশারিকুল আরদ' ওই স্তরের গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত যে, সুদীর্ঘকাল ব্যাপী তা শিক্ষানিকেতন সমূহে সিলেবাসভূক্ত হয়ে ইসলামী দুনিয়ায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। সেই বিখ্যাত গ্রন্থাবলীর অন্যতম হলো হিজরী দশম শতাব্দীর (খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দী) প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ আলী বিন হুসাম উদ্দীন আল মুত্তাকী বুরহানপুরী (রহ.) (শায়খ আলী মুত্তাকী গুজরাটী) রচিত গ্রন্থ 'কানযুল উম্মাল'¹ যা আল্লামা সূযুতীর (রহ.) 'জামউল জাওয়ামি' এর বিষয় ভিত্তিক ও পরিচ্ছেদ বিন্যাসের ধারাবাহিকতা।² 'কানযুল উম্মাল' হাদীস শাস্ত্রের সেই বিখ্যাত গ্রন্থ যা থেকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম ব্যাপক উপকৃত হয়েছেন এবং গ্রন্থকারের পান্ডিত্য, পারদর্শিতা ও অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যিনি তাদের অসংখ্য সূত্র ও প্রাসঙ্গিকতা খোঁজার সীমাহীন পরিশ্রম থেকে পরিত্রান দিয়েছেন। শায়খ আবুল হাসান আল-বাকারী আশ শাফেয়ী (রহ.) যিনি হিজরী দশম শতাব্দীর নেতৃত্বস্থানীয় ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি বলেন, 'সারা দুনিয়ার উপর ইমাম সূযুতীর (রহ.) অবদান রয়েছে কিন্তু খোদ সূয়ূতী শায়খ আলী মুত্তাকীর কাছে ঋণী।'
আল্লামা মুহাম্মদ তাহের পাটানী¹ (মৃত্যু: ৯৮৬ হিজরী) বিরচিত 'মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার ফি গারাইবিত তানযীল ওয়া লাতাইফিল আখবার' নামক গ্রন্থের খ্যাতি দুনিয়া জোড়া। মওলানা আবদুল হাই (রহ.) 'নুযহাতুল খাওয়াতির' গ্রন্থে মাওলানা আবদুল হাই (রহ.) বলেন, 'এই গ্রন্থে লেখক হাদীসের প্রয়োজনীয় শব্দার্থ এবং শব্দের ব্যাখ্যা সংযোজন করেছেন এবং এতদসংক্রান্ত মুহাদ্দিসীনদের মতামত সংকলন করেছেন। ফলে এটি ষষ্ঠ প্রামাণিক গ্রন্থের (সিহাহ সিত্তা) ব্যাখ্যা গ্রন্থের স্থানে অভিষিক্ত হয়েছে। শুরু থেকে এ গ্রন্থ বিদগ্ধ মহলে বরাবরই সমাদৃত হয়ে সর্বজন বিদিত গ্রন্থ হিসেবে বিজ্ঞ মহলকে ঋণী করে গেছেন।" আল্লামা মুহাম্মদ তাহির (রহ.) বিরচিত 'তাযকিরাতুল মাওজুয়াত' হাদীসের বিষয়সূচী' বিষয়ক গ্রন্থরূপে ব্যাপক সমাদৃত ও প্রখ্যাত গ্রন্থ। এই ক্রমধারায় 'আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া'ও উল্লেখযোগ্য যা সাধারণ মহলে 'ফাতাওয়া আলমগীরী' নামেই অত্যধিক পরিচিত। ফিকহী মাসায়েল বিষয়ক গ্রন্থের জগতে এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি গ্রন্থের মর্যাদা রাখে। যেসব ইসলামী রাষ্ট্রের শরয়ী আদালতে হানাফী মতাদর্শ মতে রায় প্রদান করা হয়, সেখানে এ গ্রন্থ 'প্রামাণ্য আইন গ্রন্থ' হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এটি সংশ্লিষ্ট বিদগ্ধ মহলে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে আদৃত। 'আস্ সাকাফাতুল ইসলামিয়া' গ্রন্থের রচয়িতা এ সম্পর্কে বলেন, "ফতোয়া-এ-আলমগীরী যাকে 'ফাতাওয়া হিন্দিয়া' বলা হয়, অধিক সংখ্যক মাসায়িল সংকলন, সহজবোধ্য ও সাবলীল রীতির লিখন পদ্ধতি এবং অত্যন্ত কঠিন বিষয় সমূহের সহজ, সরল উপস্থাপনার জন্য অত্যধিক উপকারী গ্রন্থ। মিশর, সিরিয়া এবং আরব রাষ্ট্র সমূহে 'ফাতাওয়া হিন্দিয়া' গ্রন্থের ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এটি বৃহৎ ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত, যা 'হেদায়া' র রীতিতে বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং অপ্রসিদ্ধ বর্ণনা সমূহ বাদ দিয়ে কেবল প্রসিদ্ধ বর্ণনা সমূহ গ্রহন করা হয়েছে। কিন্তু যেখানে প্রসিদ্ধ (যাহির রেওয়ায়েত) পাওয়া যায়নি সেখানে ফতওয়ার নির্দেশনা সূচক দিক উল্লেখ পূর্বক বর্ণনাকারীর উক্তির সাথে আসল বর্ণনা (ইবারত) হুবহু লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। হানাফী মাযহাবের ফিকহ বিশারদগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এ গ্রন্থটি সংকলনের বিরাট দূর্বহ কর্মটি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব (রহ.) কর্তৃক তার রাজত্বের প্রারম্ভে শায়খ নিজাম উদ্দীন বুরহানপুরী (রহ.) এর উপর অর্পন করেন এবং এ কাজে তৎকালীন দুই লাখ রূপী ব্যয় করেন। সংকলক এ গ্রন্থে ভারতীয় উপমহাদেশের ২৪ জন শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের নাম উল্লেখ করেছেন যারা এ গ্রন্থ সংকলনে সরাসরি জড়িত ছিলেন। যাদের অন্যতম চারজন ওলামায়ে কেরাম হলেন, কাযী মুহাম্মদ হোসাইন জৌনপুরী মুহতাসিব, শায়খ আলী আকবার হোসাইনী, আসাদুল্লাহ খানী, শায়খ হামেদ বিন আবু হামেদ জৌনপুরী এবং মুফতী মুহাম্মদ আকরাম হানাফী লাহোরী এ চারজন সমন্বিতভাবে সংকলন কর্ম তত্ত্বাবধান ও তদারকি করেন।
'মুসাল্লামু সাবৃত ফি উসূলিল ফিকহ' ওই শ্রেণীর একটি দূর্লভ গ্রন্থ, যার রচয়িতা আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ্ বিহারী (রহ.)। ভারতীয় এবং ইসলামী দুনিয়ার জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র সমূহে এটি ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম স্বীয় যুগে এ গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও টীকা গ্রন্থ রচনা করেছেন। 'আস সাকাফাতুল ইসলামিয়াহ্' গ্রন্থের লিখক এ ধরনের দশটি গ্রন্থের বিবরণ দিয়েছেন। জ্ঞান ও শাস্ত্রের জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয় সমূহের উপর রচিত হিজরী দ্বাদশ শতাব্দীর (খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় আলিম মাওলানা মুহাম্মদ আ'লা থানভী (রহ.) রচিত গ্রন্থ 'কাশশাফু ইসতিলাহাতিল ফুনুন' একটি উপকারী ও গ্রহনযোগ্য রচনাকর্ম। আরব জাহানের সকল পন্ডিতবর্গ এ গ্রন্থের উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন। কারণ এটি জ্ঞানের পরিভাষা সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ অভিধান তূল্য, যা গবেষকদের হাজারো গ্রন্থ আর অসংখ্য পৃষ্ঠা হাতড়ানোর পরিশ্রম থেকে মুক্তি দিয়েছে। ইতঃপূর্বে এ বিষয়ে যথেষ্ট চাহিদা সত্ত্বেও এ ধরনের কোন ভাল গ্রন্থ ছিল না এবং গবেষকদের জন্য এটি আজো অনবদ্য ভরসাস্থল। এ বিষয়ের উপর অপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন মাওলানা আবদুন্নবী আহমদনগরী যা 'জামিউল উলুম' নামে পরিচিত। এটি দস্তুরুল ওলামা নামেও প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। পুরো গ্রন্থটি চার খন্ডে বিভক্ত। আলোচ্য গ্রন্থকারও দ্বাদশ শতাব্দীর সুপরিচিত আলিম।
এ বিষয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহান রচনাকর্ম হিসেবে রাজকীয় শীর্ষস্থান দখল করে আছে হযরত শাহ্ ওয়ালি উল্লাহ্ দেহলভীর (মৃত্যু: ১১৭৬ হি.) 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ্' যাতে ইসলামী শরীয়তের দর্শন শাস্ত্র এবং ইসলামী বিধি-বিধান সমূহের অন্তর্নিহিত বিষয়াদি সম্পর্কে বিশদ আলোকপাত করা হয়েছে। এটি এ বিষয়ে স্বকীয় বৈশিষ্টে সমুজ্জ্বল একমাত্র গ্রন্থ। আরবী ভাষা স্বীয় বহুল ব্যাপকতা সত্ত্বেও এর বিকল্প দৃষ্টান্ত উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। দার্শনিক ও পর্যবেক্ষক মহল এ গ্রন্থের সপ্রশংস ও অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিয়েছেন। মিশরে এ গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে। এখানে একথা বলে রাখা জরুরী যে, আরবী ভাষায় পারঙ্গমতা, বলিষ্ঠ উপস্থাপনা এবং সাবলীল বাকরীতির উপরও এটি এক সফল ও অনবদ্য গ্রন্থ। লেখকের সমকালীন যুগে কৃত্রিমতাপূর্ণ ছন্দোবদ্ধ, কাব্যিক রীতির দস্তুর মত প্রতিযোগিতা ছিল কিন্তু গ্রন্থকারের আলোচ্য গ্রন্থটি তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। অথচ তখন পরবর্তী যুগের খুব কম লিখকই এই অসার অনুকরণ রীতি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। প্রকৃত পক্ষে অনারবদের কৃত্রিম প্রিয়তা, আরবী ভাষার দৈন্যদশার যুগে, অকৃত্রিম গদ্য রচনা সাবলীল, পরিশীলিত ও মর্যাদাপূর্ণ গবেষণাধর্মী লিখন পদ্ধতি বিষয়ক 'মুকাদ্দামা-এ- ইব্ন খালদুন' এর পরই শীর্ষতম গ্রন্থ।
আল্লামা সাইয়েদ মুরতজা বিলগ্রামী (১২০৫ হিঃ) যিনি যাবিদী নামে সমধিক পরিচিত তাঁর রচিত 'তাজুল ওরুস ফি শারহিল কামূস' এ বিষয়ের উপর ভূবনখ্যাত গ্রন্থ যা পরিচিতি ও প্রশংসার ঊর্ধ্বে। সুবৃহৎ কলেবর, ১০ খন্ডে বিভক্ত ঝকঝকে টাইপে মূদ্রিত প্রায় পাঁচ হাজার পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটি আরবী অভিধান শাস্ত্রের দস্তুর মত গ্রন্থাগার তূল্য। এক সময় তো আরবী ভাষায় ভারতীয় কোন লিখকের কলম ধরাটাই দুঃসাহসিক ব্যাপার ছিল। অথচ ঠিক সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে অভিধান শাস্ত্রের পুরোধা আল্লামা মাজদুদ্দীন ফিরোজাবাদীর¹ নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য অভিধান গ্রন্থ 'আল কামূসুল মুহিত' এর ব্যাখ্যা গ্রন্থের বর্ধিতরূপে সংযোজন, পরিমার্জন ও পূর্ণাঙ্গতা দানে আল্লামা সাইয়েদ আলী মুরতজা বিলগ্রামী জ্ঞানের গভীর ব্যুৎপত্তি, বিদগ্ধ পান্ডিত্য আর তুলনাহীন ভাষাজ্ঞানের এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। লিখকের জীবদ্দশাই এ গ্রন্থ এত বেশী প্রসিদ্ধি ও বৈশ্বিক খ্যাতি লাভ করেছে যে, তুর্কী সূলতান এ গ্রন্থের একটি অনুলিপির জন্য আবেদন করেন। এছাড়াও দারপুরের শাসক ও মরক্কোর বাদশাহও এ গ্রন্থের একটি করে কপি সোৎসাহে সংগ্রহ করেন। মিশরের খ্যাতিমান সেনাপ্রধান ও শিক্ষানুরাগী মুহাম্মদ বেগ আবৃষ যাহাব আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিহিত অঞ্চলে তাঁর নির্মিত মসজিদের গ্রন্থাগারের জন্য এক হাজার রিয়াল ব্যয়ে এর একটি কপি সংগ্রহ করেন।
টিকাঃ
১. সুদীর্ঘকাল হতে এ গ্রন্থ হায়দারাবাদ 'ইদারাতুল মা'আরিফ' হতে প্রকাশিত হয়ে দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি ও সমাদরের উচ্চাসনে সমাসীন রয়েছে।
২. আল্লামা সূযুতীর কিতাব 'জামউল জাওয়ামি' হাদীস শাস্ত্রের সর্ববৃহৎ পরিসরের এক অনবদ্য আকর কিন্তু লেখক এতে বিষয় সূচী অনুযায়ী অধ্যায় ও পরিচ্ছেদ বিন্যাস করেননি। (ফি ও অর্থগত) হাদীসে কাউলী তথা মহানবীর (সা.) মুখনিঃসৃত পবিত্র বাণীমূলক হাদীস হলে হাদীসের প্রথম শব্দ মুখস্ত থাকলেই আর ফে'লী বা কার্য, সম্মতি সূচক হাদীস হলে বর্ণনাকারীর নাম মূখস্ত থাকলেই কেবল হাদীসটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। শায়খ আলী মুত্তাকী এটাকে বিষয় ভিত্তিক অধ্যায় পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করায় তা অধিকতর ফলপ্রসূ ও ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে।
১. পাঠানি গুজরাটে অবস্থিত, এটি এখনো একটি ঐতিহ্যমন্ডিত আলোচিত অঞ্চল। আহমদাবাদ থেকে প্রায় ৬৮ মাইল দূরত্বে উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত।' আল হালওয়াড়া' আরবীতে 'নাহার দাওয়ালা' লিখা হয়। হিজরী ৫ম শতাব্দীতে গুজরাট একটি শক্তিশালী মুসলিম রাজত্বের রাজধানী ছিল। ৪১৬ হিজরীতে সুলতান মাহমূদ গজনভী এটি জয় করেন। ৫৯২ হিজরীতে কুতুব উদ্দীন আইবেক কর্তৃক এটি ২য় বার বিজিত এলাকা।
১. প্রধান বিচারপতি মাজদুদ্দীন সিদ্দিকী ফিরোজাবাদী সিরাজ জেলার অধিবাসী ছিলেন, তিনি ৭২৯ হিজরী সনে ইরানে জন্ম গ্রহন করেন এবং ৮০৭ হিজরীতে ইয়েমেনে ইন্তেকাল করেন।
📄 বহু গ্রন্থ প্রণেতা কতিপয় ভারতীয় লেখক
হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীতেও ভারত এমন কতিপয় ক্ষুরধার লিখনীর অধিকারী ও প্রচুর সংখ্যক গ্রন্থ রচয়িতা জন্ম দিয়েছে যারা লেখার জগতে ও গ্রন্থ সংখ্যার মাধ্যমে সারা দুনিয়ার সাথে বাজি রেখেছে। তাঁদের প্রত্যেকেই দস্তুরমত এক একটি স্বতন্ত্র একাডেমী ও ব্যস্ততম শিক্ষা সংস্থা তুল্য। ভূপালের নবাব সিদ্দিক হাসান খান (মৃত্যু: ১৩০৭ হি.) এর গ্রন্থ সংখ্যা ২২২। যার মধ্যে ৫৬টি আরবী ভাষায় রচিত যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথাযথ উপকারী ও তথ্যপূর্ণ। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর কয়েকটি হল : 'ফতহুল বায়ান ফি তাফসীরিল কুরআন' (১০ খন্ড), 'আবজাদুল উলুম', 'আত্তাজুল মুকাল্লাল', 'আল বুলাগাহ্ ফি উসূলিল লুগাহ্' ও 'আল আলামুল খাফফাক মিন ইলমিল ইশতিকাক'। পরবর্তী যুগের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের গৌরব মাওলানা আবদুল হাই ফিরিঙ্গি মহল্লী (রহ.) (মৃত্যুঃ ১৩০৪ হি.) রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ১১০টি। যার মধ্যে ৮৬টি আরবী ভাষায় রচিত। তন্মধ্যে 'আসসিআবাহ্ ফি শরহি শরহিল বেকায়া', 'মিসবাহুদ্ দুজা' এবং 'যফরুল আমানী' গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম। হানাফী ওলামাদের জীবন ও কর্ম বিষয়ক তাঁর রচিত গ্রন্থ 'আল ফাউয়াইদুল বাহিয়্যাহ্' সর্বাধিক সমাদৃত ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থ এবং হানাফী মাযহাবের ওলামাদের জীবনী সম্পর্কে সর্বাধিক তথ্য-উপাত্ত এ গ্রন্থ থেকেই সংগ্রহ করা হয়।
হাকীমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) রচিত গ্রন্থ সংখ্যা (৯১০) নয়শ'দশটি এর মধ্যে ১৩টি আরবী ভাষায় রচিত। অধিক সংখ্যক গ্রন্থ রচনা ও অগ্রসর লেখকের তালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। মাওলানা বাকির বিন মুরতজা মাদ্রাজী (মৃত্যু: ১২১০ হিজরী) এবং মুফতী মুহাম্মদ আব্বাসী লক্ষ্ণৌভী (রহ.) (মৃত্যু: ১৩০৩ হি.) আরবী ও ফার্সিতে বিপুল সংখ্যক গ্রন্থ পাঠক মহল ও শিক্ষিত সমাজের জন্য তাঁদের মেধা ও প্রতিভার স্মারক রূপে রেখে গেছেন।