📄 মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) ও জমিয়তুল উলামা
ওলামায়ে কেরামের যে বড় অংশ 'জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ' এর সাথে জড়িত ছিল তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কংগ্রেসের সাথে ছিলেন এবং পূর্বমত ও চিন্তাধারার উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকেন।¹ তাঁদের সর্বাগ্রে ছিলেন মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদনী (রহ.) যিনি ইংরেজদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ, দেশের স্বাধীনতার জন্য অসীম আগ্রহ-অনুপ্রেরণা ও আন্তরিকতায় তাঁর শায়খ মাওলানা মাহমূদুল হাসান (রহ.) এর যোগ্য স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। তিনি স্বয়ং জমিয়তে ওলামার অন্যান্য সদস্যগণ মুসলমানদের বৃহত্তম অংশ তথা মুসলিম লীগের সমর্থকদের তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও অবমাননা হাসিমুখে সহ্য করেন। মাওলানা মাদানী এ বছরটি কঠিন ব্যস্ততা, উৎকণ্ঠা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে অতিবাহিত করেন। শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে শত-সহস্র মাইল এক নাগাড়ে সফর করেন।
তখন তাঁর ধর্মীয় ও চারিত্রিক জীবন ছিল নিষ্কলুষ ও সন্দেহমুক্ত। তাঁর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার উপর পক্ষ ও বিপক্ষ সবাই ছিল একমত। ইংরেজ শাসনের কালো অধ্যায় শেষে যখন স্বাধীন হলো হিন্দুস্থান এবং দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় প্রশাসন হতে ফায়দা হাসিলের সুযোগ হাতে আসলো, তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র সেই অনুপম ব্যক্তিত্ব, যিনি ব্যক্তিগত একটি তুচ্ছ স্বার্থ উদ্ধার করতেও প্রস্তুত হননি। এমনকি যখন ১৯৫৪ সালে ভারত প্রজাতন্ত্র সরকার তাকে 'পদ্ম বিভূষন' (ভারতের সর্ব বৃহৎ সাহিত্য পদক) এর সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তিনি বিনয়ের সাথে এই বলে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন যে, এটা তাঁর পূর্বসূরীদের রীতি সম্মত নয়। নিঃসন্দেহে দেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে তিনি যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছিলেন, এর অনেক কিছুই পূর্ণ হয়নি, বরং সেসময় তিনি এমন বহু তিক্ত অভিজ্ঞতাও লাভ করেছেন, তাঁর কোমল হৃদয়কে ভেঙ্গে খান খান করে দেয়। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে কখনো বিচ্যুত হয়নি তাঁর অবিচল পদ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী কালে কোন পরিবর্তন আসেনি তাঁর নীতি ও চিন্তাধারায়।
টিকাঃ
১. সে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মাওলানা মুফতী কিফায়াতুল্লাহ, সভাপতি, জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ, মাওলানা সাঈদ আহমদ, মাওলানা মুহাম্মদ সাজ্জাদ বিহারী, মাওলানা হিফজুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ, মাওলানা আতাউল্লাহ্ শাহ বুখারী, মাওলানা হাবীবুর রহমান লুধিয়ানবী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
📄 মাওলানা আবুল কালাম আযাদ (রহ.)
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ দীর্ঘদিন কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অন্য কোন সভাপতি এত দীর্ঘ ও নাযুক সময় দায়িত্ব পালন করেননি। তার সভাপতিত্ব কালে ভারতবর্ষ বহু স্পর্শকাতর ও জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়। সে সময় ভারতের সমস্যার সমাধান, স্বাধীনতার শর্ত নির্ণয় ও আনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্য ব্রিটেন সরকারের পক্ষ হতে দু'টি প্রতিনিধি দল (ক্রিপ্স মিশন ও কেবিনেট মিশন) প্রেরণ করা হয়। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ সভাপতি রূপে আলোচনায় কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিনিধিদল গুলোর সদস্যরা যাদের নেতা ছিলেন Sir Stafford Cripps, মাওলানা আযাদের মেধা ও প্রতিভা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও সাংবিধানিক সুক্ষাতিসুক্ষ্ণ বিষয় সহজে বুঝার অসাধারণ দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তারই সভাপতিত্বে ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে হিন্দুস্থান স্বাধীনতা লাভ করে। তাঁর গ্রন্থ India Wins Freedom অধ্যয়ন করে একথা অনুধাবন করতে মোটেই বেগ পেতে হয়না যে, তিনি কংগ্রেসের পুরা প্রশাসন যন্ত্রে এক সজাগ মস্তিষ্কের ভূমিকা পালন করতেন এবং স্বীয় প্রতিভা, দূরদর্শিতা ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের সাহায্যে এই প্রতিষ্ঠানকে পরিবেষ্টন করে রাখতেন। একজন জাতীয় নেতার পক্ষে স্বদেশের আযাদী আন্দোলনে যতটুকু অবদান রাখা সম্ভব, হিন্দুস্থানের আযাদী আন্দোলনে তিনি সেই অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন।