📄 সাম্প্রদায়িক দাবানল
সাম্প্রদায়িক দ্বন্ধ-কলহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এমনকি ১৯২৭ সালের মাত্র মাস দু'য়েকের মধ্যে পঁচিশটি হাঙ্গামা হয়। এই দাঙ্গাগুলোই ছিল সাধারণ মানুষের আলোচনার বিষয়। প্রত্যেকের মূখে রাতদিন এই একটিই আলোচনা। কংগ্রেস ও খিলাফত আন্দোলনের নেতাদের ক্ষমতা ছিল না যে, তারা এই দাঙ্গা-ফ্যাসাদ রুখে দাঁড়াবে এবং হিন্দু মুসলমান ঐক্যের সেই সোনালী যুগে নিয়ে যাবে, যখন পরস্পরে গভীর আস্থা ও বিশ্বাস, শান্তি ও সুখের নির্মল পরিবেশ বিরাজমান ছিল। সারকথা, এভাবে উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাশাপাশি নেতাদের মাঝেও বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা দেখা দেয়। হিন্দু-মুসলমান কেউ এ বাস্তবতা এড়াতে পারেননি।
📄 বিচ্ছিন্নতার ক্রমবর্ধমানে প্রবণতা
লোকেরা ভাবতে শুরু করলো যে, দেশের জাতীয় নেতাদের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা শীতল হয়ে যাচ্ছে এবং তাঁরা সাম্প্রদায়িক শিবিরে অংশ গ্রহণ করছেন। নেতাগণ ধর্মীয় শ্লোগান ও আবেগ-অনুভূতিতে প্রভাবিত হয়ে ভাবনার ঘোড়া দৌড়াতে শুরু করেছেন। মুসলমানদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ মনে করছিলেন যে, হিন্দু নেতারা (যাদের প্রধান ছিলেন গান্ধীজী) দাঙ্গা-ফ্যাসাদ থামানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা সে দৃঢ় সংকল্প ও চেষ্টা-উদ্যমের প্রমাণ দেননি, যা তাদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও শক্তির অধিকারী হওয়ার কারণে তাঁদের পক্ষে এটা সম্ভব ছিল যে, তাঁরা পরিপূর্ণ নিরপেক্ষতা ও অসন্তোষ প্রকাশ করে এই বিস্তৃত দাবানলকে থামিয়ে দিবেন, যা দেশের শান্তি ও ঐক্যের সেই সোনালী পরিবেশকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
এই ধারণা সঠিক হোক বা ভুল, কিংবা এতে অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেয়া হোক, এই ধারণা ও অনুভূতি বহু এমন মুসলিম নেতাকে কংগ্রেস থেকে দূরে সরিয়ে দেয় যারা জাতীয় আযাদী আন্দোলনের অগ্রপথিক ছিলেন, গোটা জাতির মনমানসে স্বাধীনতার স্পৃহা ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন এবং দেশসেবা ও ইংরেজ বিরোধিতায় যাদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাঁরা এবার নিজেদের মনোযোগ ও তৎপরতা মুসলমানদের বিষয়ে কেন্দ্রীভূত করা সমীচীন মনে করেন।
📄 মুসলমানদের জাতীয় ঐক্য ও বিভক্তির দাবী
এভাবে মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও তাঁর বহু সাথী-সঙ্গী কংগ্রেস থেকে ইস্তেফা দিয়ে মুসলমানদের জাতীয় শিবিরে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। সময়ের বিবর্তনে মুসলমানদের মধ্যে দেশবিভাগের মনোভাব চাঙ্গা ও তীব্র হতে থাকে। বিভক্তি আন্দোলনে মিষ্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন। ১৯৩৭ সালে মি. জিন্নাহ মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং মাত্র ক'বছরের মধ্যে এটা ভারতীয় মুসলমানদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনে পরিণত হয়। মুসলমানদের এক বৃহৎ অংশের উষ্ণ সমর্থনে বলীয়ান হয়ে এ আন্দোলন এক পর্যায়ে 'পাকিস্তান' সৃষ্টির দাবী তোলে। ভারতের সামাজিক অস্থিত্বে অনিয়ম, মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তার অভাব, রাষ্ট্রীয় অফিস-আদালতে সাম্প্রদায়িকতার তিক্ত অভিজ্ঞতা, আন্তঃসপ্রদায়ের পারস্পরিক অনাস্থা, রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব ও পরস্পর কাঁদা ছুঁড়াছুড়ি মুসলমানদের এই দাবীকে আরো সুদৃঢ় করে। অবশেষে ১৯৪৭ সালে দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় অখন্ড ভারত। জন্ম নেয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের। পরবর্তীতে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।
📄 মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) ও জমিয়তুল উলামা
ওলামায়ে কেরামের যে বড় অংশ 'জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ' এর সাথে জড়িত ছিল তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কংগ্রেসের সাথে ছিলেন এবং পূর্বমত ও চিন্তাধারার উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকেন।¹ তাঁদের সর্বাগ্রে ছিলেন মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদনী (রহ.) যিনি ইংরেজদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ, দেশের স্বাধীনতার জন্য অসীম আগ্রহ-অনুপ্রেরণা ও আন্তরিকতায় তাঁর শায়খ মাওলানা মাহমূদুল হাসান (রহ.) এর যোগ্য স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। তিনি স্বয়ং জমিয়তে ওলামার অন্যান্য সদস্যগণ মুসলমানদের বৃহত্তম অংশ তথা মুসলিম লীগের সমর্থকদের তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও অবমাননা হাসিমুখে সহ্য করেন। মাওলানা মাদানী এ বছরটি কঠিন ব্যস্ততা, উৎকণ্ঠা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে অতিবাহিত করেন। শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে শত-সহস্র মাইল এক নাগাড়ে সফর করেন।
তখন তাঁর ধর্মীয় ও চারিত্রিক জীবন ছিল নিষ্কলুষ ও সন্দেহমুক্ত। তাঁর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার উপর পক্ষ ও বিপক্ষ সবাই ছিল একমত। ইংরেজ শাসনের কালো অধ্যায় শেষে যখন স্বাধীন হলো হিন্দুস্থান এবং দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় প্রশাসন হতে ফায়দা হাসিলের সুযোগ হাতে আসলো, তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র সেই অনুপম ব্যক্তিত্ব, যিনি ব্যক্তিগত একটি তুচ্ছ স্বার্থ উদ্ধার করতেও প্রস্তুত হননি। এমনকি যখন ১৯৫৪ সালে ভারত প্রজাতন্ত্র সরকার তাকে 'পদ্ম বিভূষন' (ভারতের সর্ব বৃহৎ সাহিত্য পদক) এর সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তিনি বিনয়ের সাথে এই বলে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন যে, এটা তাঁর পূর্বসূরীদের রীতি সম্মত নয়। নিঃসন্দেহে দেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে তিনি যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছিলেন, এর অনেক কিছুই পূর্ণ হয়নি, বরং সেসময় তিনি এমন বহু তিক্ত অভিজ্ঞতাও লাভ করেছেন, তাঁর কোমল হৃদয়কে ভেঙ্গে খান খান করে দেয়। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে কখনো বিচ্যুত হয়নি তাঁর অবিচল পদ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী কালে কোন পরিবর্তন আসেনি তাঁর নীতি ও চিন্তাধারায়।
টিকাঃ
১. সে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মাওলানা মুফতী কিফায়াতুল্লাহ, সভাপতি, জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ, মাওলানা সাঈদ আহমদ, মাওলানা মুহাম্মদ সাজ্জাদ বিহারী, মাওলানা হিফজুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ, মাওলানা আতাউল্লাহ্ শাহ বুখারী, মাওলানা হাবীবুর রহমান লুধিয়ানবী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।