📄 বলকান যুদ্ধ এবং ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ
১৯১২ সালে বলকান যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইউরোপীয়ান রাষ্ট্র সংঘ বিশেষতঃ ব্রিটেনের বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ ও দুঃখের এক প্রবল ঝড় বইতে শুরু করে। প্রাচ্যের ইসলামী রাজনৈতিক জাগৃতির ক্রমবর্ধমান লাভা সহসা বিস্ফোরিত হয়। সে সময়েই মাওলানা আবুল কালাম আযাদ 'আল-হিলাল' পত্রিকা প্রকাশ করেন। এতে আগুনঝরা বক্তব্য প্রচার করা হতো এবং ইউরোপের মুসলিম বিদ্বেষী রাজনীতি ও চিন্তাধারার বিরুদ্ধে অত্যন্ত বাকনৈপুন্য ও বলিষ্ঠতার সাথে প্রামান্য সমালোচনা করা হতো। হাজার নয় লাখো মুসলমান আগ্রহ ও কৌতুহলের সাথে তা পাঠ করতেন। মাওলানা মুহাম্মদ আলী কলকাতা হতে The Comrade পত্রিকা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে এর কার্যালয় স্থানান্তরিত হয় দিল্লিতে। তিনি ইংরেজ রাজনীতির বিরুদ্ধে সুনিপুন ও বিদ্রূপ মিশ্রিত ভাষায় সমালোচনা করতেন। অনুরূপ মাওলানা যফর আলী খানের 'জমিদার' পত্রিকা অন্যান্য ইসলামী সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন জন সম্মুখে আসে। এর মাধ্যমে সমগ্র হিন্দুস্থানে এক মানসিক ও নৈতিক বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে ভারত সরকার মাওলানা যফর আলী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা হাসরত মুহানীকে গ্রেফতার করে।
মুসলমানদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে মাওলানা শিবলী নো'মানী (রহ.) এর অবদানকে খাটো করে দেখা সম্ভব নয়। তিনি 'আল হেলাল' এ প্রকাশিত কাব্য ও 'মুসলিম গেজেট' এ প্রচারিত তাঁর রচনা সমূহের সাহায্যে ইংরেজদের শোষণ নীতি ও মুসলমানদের দূর্বল রাজনীতির বিরুদ্ধে জোরদার সমালোচনা করে শিক্ষিত সমাজের মন-মানসে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন।
📄 শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.)
দারুল উলূম দেওবন্দের মাওলানা মাহমূদুল হাসান (যিনি পরে 'শায়খুল হিন্দ' নামে খ্যাত হয়েছেন) ইংরেজ শাসন ও আধিপত্যের প্রবল বিরোধী ছিলেন। সুলতান টিপুর পরে ইংরেজদের এত বড় শত্রু ও প্রতিপক্ষ আর কেউ আত্মপ্রকাশ করেনি। তিনি তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের অগ্রনায়ক ও খিলাফতের পতাকাবাহী ওসমানী সালতানাতের সোচ্চার সমর্থক এবং হিন্দুস্থানের স্বাধীনতা ও স্বাধীন জাতীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ আহবায়ক ছিলেন। তিনি সেই মহান ব্যক্তিবর্গের অন্যতম ছিলেন, যাদের সমস্ত জীবন এই মূল্যবান মিশনের জন্য ওয়াকফ ছিল এবং সব আবেগ-উদ্দীপনা চেষ্টা-উদ্যম এই মিশনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। এ ক্ষেত্রে তিনি আফগান সরকার ও ওসমানী সাম্রাজ্যের কতিপয় নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি যেমন আনোয়ার পাশা প্রমুখের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন।¹ ১৯১৬ সালে শরীফ হোসাইনের সরকার তাঁকে মদীনা মুনাওয়ারায় গ্রেফতার করে ইংরেজ সরকারের হাতে তুলে দেয়। ইংরেজ প্রশাসন তাঁকে এবং কতিপয় সাথী ও শিষ্য মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী, মাওলানা উযাইর গুল, মাওলানা হাকীম নুসরাত হোসাইন, মৌলভী ওয়াহীদ আহমদকে ১৩৩৫ হি./১৯১৭ সালে মাল্টার দ্বীপে নির্বাসন দেয়। তাঁরা ১৩৩৮ হিজরী/১৯২০ সাল পর্যন্ত সেখানে দুঃখের জীবন অতিবাহিত করেন।
টিকাঃ
১. ইংরেজদের বিরুদ্ধে বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য আনোয়ার পাশা ও জামাল পাশার পক্ষ হতে তিনি পত্র লাভ করতে সক্ষম হন। এই পত্রগুলো তিনি কাঠের ফলকে প্রোথিত করে বক্স তৈরী করেন এবং তাতে রেশমী কাপড় ভর্তি করে হিন্দুস্থানে পাঠিয়ে দেন। বক্সটি হিন্দুস্থানে আপন গন্তব্যে পৌঁছে যায় এই ঘটনাটি 'রেশমী রুমাল' নামে খ্যাত। রলেট (Rowlatt) তার বিখ্যাত প্রতিবেদনে এর উল্লেখ করেছেন।
📄 মাওলানা আবদুল বা’রী ফিরিঙ্গী মহল্লী (রহ.)
জমিয়তুল উলামার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুল বা'রী ফিরিঙ্গী মহল্লী (১৯২৬) স্বাধীনতা ও খিলাফত আন্দোলনের বলিষ্ঠ ও শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও লক্ষ্ণৌতে তাঁর আবাসস্থল তথা ফারাঙ্গী মহল ছিল মুসলমানদের বিশ্বাস ও রাজনীতির কেন্দ্র।
📄 রওলেট রিপোর্ট (Rowlatt Report)
১৯১৮ সালে রওলেটের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে মুসলমানদেরকেই বিশেষভাবে টার্গেট করে বিদ্রোহের জন্য দায়ী করা হয়। এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে হিন্দুস্থানের সর্বত্র প্রবল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।