📄 আন্দামানের বন্দীগণ
এই বিস্ময়কর আবেগমূলক পন্থায়- যা ইংরেজদের ন্যায় নিয়মতান্ত্রিকতা ও গণতন্ত্রের দাবীদার জাতির কাছে প্রত্যাশিত নয়। ১৮৬৫ সালে মাওলানা ইয়াহইয়া আলী, মাওলানা আহমদুল্লাহ আযীমাবাদী, মৌলভী আবদুর রহীম সাদেকপুরী এবং মাওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরীকে পোর্ট আন্দামান পাঠিয়ে দেয়া হয়। মাওলানা ইয়াহইয়া আলী এবং মাওলানা আহমদুল্লাহ আন্দামানেই পরলোক গমন করেন এবং মৌলভী মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী দীর্ঘ ১৮ বছরের মানবেতর বন্দী জীবন ও নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন। ইংরেজরা পাটনায় সাদেকপুরী গোত্রের সমস্ত সম্পদ ও জমি জমা বাজেয়াপ্ত করে, গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় তাদের বাড়ি ঘর এবং তদস্থলে নূতন সরকারী ভবন নির্মাণ করে। মুছে দেয় তাদের কবরগুলোর নাম নিশানা। এ সব কিছু করা হয় তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করে অন্তরে প্রশান্তি যোগানোর জন্য।
এভাবে খ্যাত ও জলীলুল কদর ওলামায়ে কেরামের একটি বিশেষ অংশকে নির্বাসনের শাস্তি দেয়া হয়। তাদের মধ্যে মাওলানা ফযলে হক খায়রাবাদী, মুফতী এনায়েত উল্লাহ কাকুরী, মুফতী মুজহের করীম দরয়াবাদী তো সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাকি দু'জন আলেম দীর্ঘ দিন নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
📄 শিক্ষা ও রাজনীতিতে অধঃপতনের কারণ
এই নির্মম ও অদ্ভুত আচরণ যা ইংরেজ সরকার মুসলমানদের সাথে করেছে তা-ই মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অভাব ও সরকারী চাকরী না পাওয়ার মূল কারণ। ইংরেজ প্রশাসনের পক্ষ হতে তাদের উপর অন্যায় ভাবে আরোপিত অভিযোগসমূহ থেকে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যয় হয়ে যেতো তাদের সকল সময়। এই সুযোগ কখনো হতো না যে, তারা দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করবে এবং জাতীয় সচেতনতা ও জাগরণে দেশের অন্যান্য দ্রুত উন্নতিশীল অধিবাসীদের পাশাপাশি সামনে অগ্রসর হবে। কারণ অন্যান্য সম্প্রদায় সরকারের অকুণ্ঠ আস্থা ও অনুপ্রেরণার বলে বলীয়ান ছিল। পক্ষান্তরে মুসলমানরা ছিল তাদের বিরাগভাজন ও ঘৃণার পাত্র।
📄 ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা
১৮৮৪ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে কতিপয় শ্রেষ্ঠ মুসলিম পন্ডিত ও চিন্তাবিদ অংশ গ্রহণ করেন। কংগ্রেসের চতুর্থ সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ সালে মাদ্রাজে। এর সভাপতিত্ব করেন জনাব বদরুদ্দীন তৈয়বজী। এতে মীর হুমায়ুন জাহও অংশ গ্রহণ করেন এবং কংগ্রেসের তহবিলে পাঁচ হাজার রূপি চাঁদা দেয়ার ঘোষণা করেন। এই সভায় মুসলমান দায়িত্বশীল, ধনবান, উকিল ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ উপস্থিত ছিলেন।
📄 স্যার সৈয়দ আহমদ খানের পৃথক রাজনৈতিক প্ল্যট ফরম
মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান শুরুতে জাতীয় ঐক্যের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমানদের শিক্ষাগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধঃপতন দেখে তিনি এ থেকে আলাদা থাকতে ভাল মনে করেন। তিনি বাইরে থেকে মুসলমানদের সতর্ক করে দেন যে, তারা যেন আবেগপ্রবণ হিন্দু ও চরমপন্থী বাঙ্গালীদের প্রভাবে প্রভাবিত না হয়, যারা ইংরেজদের রাজনীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা ও স্বীয় অধিকার আদায়ের দাবী উত্থাপন করেছিলো। তিনি একটি ইসলামী প্ল্যাটফরম গঠনের পরামর্শ দেন এবং রাজনীতি হতে পৃথক থাকার উপর জোর আরোপ করেন, কারণ তিনি মনে করেন ব্রিটিশের বিরোধিতায় হিন্দুদের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুললে মুসলমানদের জন্য নতুন জটিলতা ও সমস্যা সৃষ্টি হবে। এতে করে সেই পুরনো ক্ষত নতুন ভাবে তাজা ও জীবন্ত হয়ে উঠবে, যা এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। স্মর্তব্য যে, স্যার সাইয়্যেদ আহমদ খানের উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি সন্দেহাতীতভাবে ভুল ছিল। মূলত ইংরেজ রাজনীতিক Mr. Back ও তাঁর পূর্বসূরি Mr. Morrison এর প্রভাবেই তিনি এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। ভারতবর্ষের মুসলিম রাজনীতিতে উক্ত দু'রাজনীতিবিদের প্রভাব ছিল শক্তিশালী। সে সময়ে রাজনীতির প্রতি মুসলমানদের অনীহ ভাব জাতীয় অস্তিত্বকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে, এটাই বাস্তবতা।