📄 মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ
মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের ক্ষোভ ও প্রতিশোধ স্পৃহা খুবই স্পষ্ট ছিল। অতি সাধারণ দোষ কিংবা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হতো এবং কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি দেয়া হতো। হিন্দুস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্তের দুর্গম এলাকা সমূহে মুজাহিদদের যে দলটি তৎপর ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ইংরেজরা প্রাণপণ যুদ্ধ করে ও প্রচুর অর্থ ঢেলেও অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছিল। এ জন্য যার ব্যাপারেই সন্দেহ হয় যে, সে উক্ত দল কিংবা হযরত সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর দলের সাথে সম্পর্ক রাখে, সাথে সাথেই তার বিরুদ্ধে নির্মমভাবে মামলা পরিচালনা করা হয়। হিজরী ১২৮১ মোতাবেক ১৮৬৪ সালে পাটনা, থানেশ্বর ও লাহোরের বহু ওলামায়ে কেরাম, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যে মামলা চালানো হয়, তা থেকেই অনুমান করা যায় মুসলমানদের প্রতি তাদের অন্তরে কি পরিমান বিদ্বেষ ও ঘৃণা পুঞ্জিভূত ছিল। তাদের মধ্য থেকে কতিপয় লোককে ইংরেজরা ওয়াহাবী নামে আখ্যায়িত করলো। মাওলানা ইয়াহইয়া আলী, মাওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী, মুহাম্মদ শফী লাহোরীর বিরুদ্ধে ফাঁসির ফয়সালা হলো। এই ফয়সালা শুনাতে গিয়ে জজ বললেনঃ You will be hanged till death, your properties will be confiscated and your corpses will not be handed over to your relatives. Instead, you will be buried contemptuously in the jail compound. “তোমাদের ফাঁসি দেয়া হবে এবং তোমাদের সমস্ত সম্পদ সরকার বাজেয়াপ্ত করবে। তোমাদের লাশগুলোও হস্তান্তর করা হবে না তোমাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছে। বরং তা অত্যন্ত অপমানের সাথে কারাগারের গোরস্তানে পুঁতে ফেলা হবে।”¹
ইংরেজ নারী-পুরুষ সবাই ফাঁসির ঘরে আসতো। যাতে এই মজলুমদের অসহায়ত্ব ও যাতনা দেখে চোখ শীতল ও মন প্রফুল্ল করতে পারে। কিন্তু যখন তারা দেখলো যে, এ লোকগুলো বেশ আনন্দিত এবং আল্লাহর পথে কাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তখন এ অবস্থা তাদের সহ্য হলো না। ডেপুটি কমিশনার আম্বালা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত শুনালো যে, তাদের মৃত্যুদন্ড লোনা দরিয়ার দ্বীপে আজীবন নির্বাসনে পরিবর্তিত করা হয়। তিনি বললেন:
You rejoice over the sentence of death and look upon it as martyrdom. The Government, therefore have decided not to award you the punishment your like so much. The death-sentence passed against you has been changed to that of transportation of life. "তোমরা ফাঁসিতে ঝুলতে বড় ভালবাসো। এটাকে মনে করো শাহাদাত। এজন্য সরকার তোমাদের কাঙ্ক্ষিত সে শাস্তি আর দিবে না। তোমাদের ফাঁসির হুকুম লোনা দরিয়ার দ্বীপে চির নির্বাসনের সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।”²
টিকাঃ
১. কালাপানি, মাওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী।
২. কালাপানি, মওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী।
📄 আন্দামানের বন্দীগণ
এই বিস্ময়কর আবেগমূলক পন্থায়- যা ইংরেজদের ন্যায় নিয়মতান্ত্রিকতা ও গণতন্ত্রের দাবীদার জাতির কাছে প্রত্যাশিত নয়। ১৮৬৫ সালে মাওলানা ইয়াহইয়া আলী, মাওলানা আহমদুল্লাহ আযীমাবাদী, মৌলভী আবদুর রহীম সাদেকপুরী এবং মাওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরীকে পোর্ট আন্দামান পাঠিয়ে দেয়া হয়। মাওলানা ইয়াহইয়া আলী এবং মাওলানা আহমদুল্লাহ আন্দামানেই পরলোক গমন করেন এবং মৌলভী মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী দীর্ঘ ১৮ বছরের মানবেতর বন্দী জীবন ও নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন। ইংরেজরা পাটনায় সাদেকপুরী গোত্রের সমস্ত সম্পদ ও জমি জমা বাজেয়াপ্ত করে, গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় তাদের বাড়ি ঘর এবং তদস্থলে নূতন সরকারী ভবন নির্মাণ করে। মুছে দেয় তাদের কবরগুলোর নাম নিশানা। এ সব কিছু করা হয় তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করে অন্তরে প্রশান্তি যোগানোর জন্য।
এভাবে খ্যাত ও জলীলুল কদর ওলামায়ে কেরামের একটি বিশেষ অংশকে নির্বাসনের শাস্তি দেয়া হয়। তাদের মধ্যে মাওলানা ফযলে হক খায়রাবাদী, মুফতী এনায়েত উল্লাহ কাকুরী, মুফতী মুজহের করীম দরয়াবাদী তো সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাকি দু'জন আলেম দীর্ঘ দিন নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
📄 শিক্ষা ও রাজনীতিতে অধঃপতনের কারণ
এই নির্মম ও অদ্ভুত আচরণ যা ইংরেজ সরকার মুসলমানদের সাথে করেছে তা-ই মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অভাব ও সরকারী চাকরী না পাওয়ার মূল কারণ। ইংরেজ প্রশাসনের পক্ষ হতে তাদের উপর অন্যায় ভাবে আরোপিত অভিযোগসমূহ থেকে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যয় হয়ে যেতো তাদের সকল সময়। এই সুযোগ কখনো হতো না যে, তারা দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করবে এবং জাতীয় সচেতনতা ও জাগরণে দেশের অন্যান্য দ্রুত উন্নতিশীল অধিবাসীদের পাশাপাশি সামনে অগ্রসর হবে। কারণ অন্যান্য সম্প্রদায় সরকারের অকুণ্ঠ আস্থা ও অনুপ্রেরণার বলে বলীয়ান ছিল। পক্ষান্তরে মুসলমানরা ছিল তাদের বিরাগভাজন ও ঘৃণার পাত্র।
📄 ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা
১৮৮৪ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে কতিপয় শ্রেষ্ঠ মুসলিম পন্ডিত ও চিন্তাবিদ অংশ গ্রহণ করেন। কংগ্রেসের চতুর্থ সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ সালে মাদ্রাজে। এর সভাপতিত্ব করেন জনাব বদরুদ্দীন তৈয়বজী। এতে মীর হুমায়ুন জাহও অংশ গ্রহণ করেন এবং কংগ্রেসের তহবিলে পাঁচ হাজার রূপি চাঁদা দেয়ার ঘোষণা করেন। এই সভায় মুসলমান দায়িত্বশীল, ধনবান, উকিল ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ উপস্থিত ছিলেন।