📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আযাদী আন্দোলনের মাশুল

📄 আযাদী আন্দোলনের মাশুল


এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে মুসলমানদেরকেই। ইংরেজ শাসনের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও লেখকরা একথা ভাবতে থাকে যে, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের জন্য মূলত মুসলমানরাই দায়ী। এজন্য তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর মাশুল গুনতে হবে। হেনরী হেমিল্টন থমাস (Henry Harrington Thomas) যিনি তৎকালীন বাংলার একজন বড় সিভিল কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৮৫৮ সাল তথা আযাদী আন্দোলনের এক বছর পরে তার লিখিত Late Rebellion in India and Our Future Policy নামক গ্রন্থে মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি ভালভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন:

I have stated that the Hindus were not the contrivers or the primary movers of the 1857 rebellion and I now shall attempt to show that it was the result of a Mohammadan conspiracy. .................Left to their resources, the Hindus never would or could have compassed such an undertaking .................They (the Mohammadans) have been uniformly the same from the times of the first Caliphs to the present day, proud, intolerant and cruel, ever aiming at Mohammadan supremacy by whatever means, and ever fostering a deep hatred of Christians. They cannot be good subjects of any government, which professes another religion; the precepts of the Quran will not suffer it. "আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মূল নায়ক ও প্রবক্তা হিন্দু ছিল না। এখন আমি একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করবো যে, এ বিদ্রোহ ছিল মুসলমানদের চক্রান্তেরই ফলাফল। হিন্দুরা নিজেদের ইচ্ছা ও উপকরণ পর্যন্ত সীমিত থাকলে এমন কোনো চক্রান্তে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারতো না। এবং করতে চাইতোও না। মুসলমানরা প্রথম খলিফার সময়কাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত দাম্ভিক, অসহিষ্ণু ও অত্যাচারী হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে আসছে। সর্বদা তাদের মূল লক্ষ্য এই থাকে যে, যে করেই হোক ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং খ্রিষ্টানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব জিইয়ে রাখতে হবে। মুসলমানরা কখনো ভিন্ন ধর্মানুসারী সরকারের ভাল প্রজা হতে পারে না। কেননা কুরআনের নির্দেশমালার উপস্থিতিতে এই সহাবস্থান সম্ভব নয়।"¹

টিকাঃ
১. Tufil Ahmad, Responsible Government and the Solution of Hindu-Muslim Problem. 1928, p.56.

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মুসলমানদের অধিকার হরণ ও চাকরীচ্যুতি

📄 মুসলমানদের অধিকার হরণ ও চাকরীচ্যুতি


পরবর্তী ইংরেজ প্রশাসনের সমস্ত উচ্চপদস্থ অফিসার ও কোর্ট-কাচারীর কর্মকার্তারা এই নীতি ও কর্মপন্থা দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে থাকে যে, মুসলমানদেরকে প্রশাসন যন্ত্রের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ থেকে পৃথক রাখতে হবে। তাদের জীবিকার উৎস বন্ধ করে দিতে হবে। বাজেয়াপ্ত করতে হবে ওয়াকফকৃত সম্পদ ও জমিজমা গুলো যার সাহায্যে পরিচালিত হয় তাদের মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠান সমূহ। এর পরিবর্তে এমন বিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে যেখান থেকে মুসলমানরা উপকৃত হতে পারে না।¹ কোনো কোনো সরকারী বিজ্ঞপ্তিতে একথা স্পষ্ট করে বলে দেয়া হতো যে, এই এই পদের জন্য শুধু হিন্দুদেরই নিয়োগ দেয়া হবে। স্যার উইলিয়াম হান্টার কোলকাতা হতে প্রকাশিত একটি ফার্সি পত্রিকার (১৮৬৯, ১৪ জুলাই) উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেনঃ "Recently, when several vacancies occurred in the office of the Sunderbans Commissioner, that official in advertising them in the Government Gazette, stated that the appointments would be given to none but Hindus." Commenting on the above complaint, the author goes on to say: the Muslims have now sunk so low that, even when qualified for Government employment, they are studiously kept out of it by government notifications. Nobody takes any notice of their helpless condition, and the higher authorities do not deign even to acknowledge their existence.²

"সুন্দরবনের কমিশনার সরকারী গেজেটে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যেসব পদ শূন্য হয়েছিল সেগুলোতে হিন্দু ব্যতীত অন্য কাউকে নিয়োগ দেয়া হবে না।³ মুসলমানরা এখন এমন অধঃপতিত হয়ে গেছে যে, তারা যদি সরকারী পদ পাওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করে তবুও সরকারী ঘোষণার সাহায্যে বিশেষ সতর্কতার সাথে তাদের নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। মুসলমানদের অসহায়ত্বের প্রতি কেউ দৃষ্টিপাত করে না। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তো মুসলমানদের অস্তিত্ব মেনে নেয়াকেই নিজেদের অসম্মান মনে করেন।"⁴

টিকাঃ
১. বিশ্লেষণের জন্য দ্রষ্টব্য- W.W. Hunter. The Indian Musalmans, 1876
২. Ibid. p. 176
৩. প্রাগুক্ত পৃ.১৫৮।
৪. প্রাগুক্ত।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ

📄 মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ


মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের ক্ষোভ ও প্রতিশোধ স্পৃহা খুবই স্পষ্ট ছিল। অতি সাধারণ দোষ কিংবা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হতো এবং কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি দেয়া হতো। হিন্দুস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্তের দুর্গম এলাকা সমূহে মুজাহিদদের যে দলটি তৎপর ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ইংরেজরা প্রাণপণ যুদ্ধ করে ও প্রচুর অর্থ ঢেলেও অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছিল। এ জন্য যার ব্যাপারেই সন্দেহ হয় যে, সে উক্ত দল কিংবা হযরত সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর দলের সাথে সম্পর্ক রাখে, সাথে সাথেই তার বিরুদ্ধে নির্মমভাবে মামলা পরিচালনা করা হয়। হিজরী ১২৮১ মোতাবেক ১৮৬৪ সালে পাটনা, থানেশ্বর ও লাহোরের বহু ওলামায়ে কেরাম, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যে মামলা চালানো হয়, তা থেকেই অনুমান করা যায় মুসলমানদের প্রতি তাদের অন্তরে কি পরিমান বিদ্বেষ ও ঘৃণা পুঞ্জিভূত ছিল। তাদের মধ্য থেকে কতিপয় লোককে ইংরেজরা ওয়াহাবী নামে আখ্যায়িত করলো। মাওলানা ইয়াহইয়া আলী, মাওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী, মুহাম্মদ শফী লাহোরীর বিরুদ্ধে ফাঁসির ফয়সালা হলো। এই ফয়সালা শুনাতে গিয়ে জজ বললেনঃ You will be hanged till death, your properties will be confiscated and your corpses will not be handed over to your relatives. Instead, you will be buried contemptuously in the jail compound. “তোমাদের ফাঁসি দেয়া হবে এবং তোমাদের সমস্ত সম্পদ সরকার বাজেয়াপ্ত করবে। তোমাদের লাশগুলোও হস্তান্তর করা হবে না তোমাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছে। বরং তা অত্যন্ত অপমানের সাথে কারাগারের গোরস্তানে পুঁতে ফেলা হবে।”¹

ইংরেজ নারী-পুরুষ সবাই ফাঁসির ঘরে আসতো। যাতে এই মজলুমদের অসহায়ত্ব ও যাতনা দেখে চোখ শীতল ও মন প্রফুল্ল করতে পারে। কিন্তু যখন তারা দেখলো যে, এ লোকগুলো বেশ আনন্দিত এবং আল্লাহর পথে কাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তখন এ অবস্থা তাদের সহ্য হলো না। ডেপুটি কমিশনার আম্বালা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত শুনালো যে, তাদের মৃত্যুদন্ড লোনা দরিয়ার দ্বীপে আজীবন নির্বাসনে পরিবর্তিত করা হয়। তিনি বললেন:

You rejoice over the sentence of death and look upon it as martyrdom. The Government, therefore have decided not to award you the punishment your like so much. The death-sentence passed against you has been changed to that of transportation of life. "তোমরা ফাঁসিতে ঝুলতে বড় ভালবাসো। এটাকে মনে করো শাহাদাত। এজন্য সরকার তোমাদের কাঙ্ক্ষিত সে শাস্তি আর দিবে না। তোমাদের ফাঁসির হুকুম লোনা দরিয়ার দ্বীপে চির নির্বাসনের সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।”²

টিকাঃ
১. কালাপানি, মাওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী।
২. কালাপানি, মওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আন্দামানের বন্দীগণ

📄 আন্দামানের বন্দীগণ


এই বিস্ময়কর আবেগমূলক পন্থায়- যা ইংরেজদের ন্যায় নিয়মতান্ত্রিকতা ও গণতন্ত্রের দাবীদার জাতির কাছে প্রত্যাশিত নয়। ১৮৬৫ সালে মাওলানা ইয়াহইয়া আলী, মাওলানা আহমদুল্লাহ আযীমাবাদী, মৌলভী আবদুর রহীম সাদেকপুরী এবং মাওলানা মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরীকে পোর্ট আন্দামান পাঠিয়ে দেয়া হয়। মাওলানা ইয়াহইয়া আলী এবং মাওলানা আহমদুল্লাহ আন্দামানেই পরলোক গমন করেন এবং মৌলভী মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী দীর্ঘ ১৮ বছরের মানবেতর বন্দী জীবন ও নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন। ইংরেজরা পাটনায় সাদেকপুরী গোত্রের সমস্ত সম্পদ ও জমি জমা বাজেয়াপ্ত করে, গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় তাদের বাড়ি ঘর এবং তদস্থলে নূতন সরকারী ভবন নির্মাণ করে। মুছে দেয় তাদের কবরগুলোর নাম নিশানা। এ সব কিছু করা হয় তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করে অন্তরে প্রশান্তি যোগানোর জন্য।

এভাবে খ্যাত ও জলীলুল কদর ওলামায়ে কেরামের একটি বিশেষ অংশকে নির্বাসনের শাস্তি দেয়া হয়। তাদের মধ্যে মাওলানা ফযলে হক খায়রাবাদী, মুফতী এনায়েত উল্লাহ কাকুরী, মুফতী মুজহের করীম দরয়াবাদী তো সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাকি দু'জন আলেম দীর্ঘ দিন নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px