📄 ইসলামী বিদ্রোহ
এ নির্মম গণহত্যায় মুসলমানরাই ছিল ইংরেজদের মূল টার্গেট। কারণ বহু ইংরেজ কর্মকর্তা মনে করতো যে, এটা মূলত ইসলামী জিহাদ এবং মুসলমানরাই এই বিদ্রোহের মূল নায়ক ও প্রবক্তা। এক ইংরেজ লেখক Henry Mead বলেনঃ
This rebellion, in its present phase, cannot be called a sepoy Mutiny. It did begin with the sepoys, but soon its true nature was revealed. It was an Islamic revolt. "এ বিদ্রোহকে বর্তমান পর্যায়ে সিপাহী বিদ্রোহ বলে আখ্যায়িত করা যায় না। অবশ্যই এর সূচনা হয়েছিল সিপাহীদের দ্বারাই। কিন্তু অচিরেই তার আসল রূপ ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ এ বিদ্রোহ ছিল মূলত ইসলামী বিদ্রোহ।"¹
একজন সমসাময়িক ঐতিহাসিক লেখেন : “প্রতিটি ইংরেজের অভ্যাসই হয়ে গিয়েছিল যে, সে প্রত্যেক মুসলমানকেই মনে করতো বিদ্রোহী। প্রত্যেক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাস করতো হিন্দু না মুসলমান। উত্তরে মুসলমান শুনতেই গুলি চালাতো।”²
টিকাঃ
১. প্রাগুক্ত।
২. উরুজে সালতানাতে ইংলিশিয়া পৃ. ৭১২।
📄 মুসলিম গণহত্যা
এর পর শুরু হয় ফাঁসির কালো অধ্যায়। প্রায় মহাসড়ক ও রাস্তায় ফাঁসির কাষ্ঠ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ স্থানগুলো রূপান্তরিত হয় ইংরেজদের চিত্তবিনোদন ও আনন্দ উপভোগের কেন্দ্রে। সেখানে এসে তারা ফাঁসি প্রাপ্তদের যন্ত্রণা ও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য উপভোগ করতো। ধূমপানের আসর জমতো ও একে অপরের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠতো। যখন ফাঁসির কাজ সম্পন্ন হয়ে যেতো এবং সেই মজলুম ব্যক্তিটি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতো, তখন ইংরেজরা হাসি-তামাশা ও বিদ্রুপের সাথে অভিবাদন জানাতো। এ হতভাগাদের মধ্যে বড় বড় মান্যগণ্য ও সম্ভ্রান্ত লোকও ছিলেন। কোনো কোনো মুসলিম পল্লী এভাবে কৃপাণ তলে নিক্ষেপ করা হয় যে, তাদের একজন সদস্যও প্রাণে রক্ষা পায়নি। একজন সমসাময়িক ঐতিহাসিক লিখেনঃ
Twenty-seven thousand Muslims were executed, to speak nothing of those killed in the general massacre. It seemed that the British were determined to blot out of existence the entire Muslim race. They killed the children and the way they treated the women simply belies description. It rends the heart to think of it.¹
“সাতাশ হাজার মুসলমানকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়। লাগাতার ও নির্বিচারে গণহত্যা চলতে থাকে। এতে কতোজন নিহত হয়েছে তার হিসেব নেই। বস্তুতঃ মুসলমানদের নাম-নিশানা মুছে ফেলতে বৃটিশরা সংকল্পবদ্ধ ছিল। হত্যা করেছে শিশুদের, নারীদের সাথে যে আচরণ করেছে তা বর্ণনার বাইরে, যা কল্পনায়ও কেঁপে উঠে হৃদয়।"
আমাদের সেনা অফিসার সব ধরনের অপরাধীদের হত্যা করে ফিরছিলেন। কোন রকমের আক্ষেপ ছাড়াই তাদের ফাঁসি দিচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন তারা কুকুর বা শৃগাল কিংবা অতি নিকৃষ্ট কোন পোকা মাকড়।²
ফিল্ড মার্শাল লর্ড রবার্টস ১৮৫৭ সালের ২১ জুন তাঁর মায়ের কাছে লিখিত এক পত্রে বলেনঃ "The death that seems to have the greatest effect is being blown from a gun. It is rather a horrible sight, but, in these times, we cannot be particular." The purpose of this "business" was to show "these rascally Musalmans that, with God's help, Englishmen will still be masters of India."³
“মৃত্যুদন্ডের সবচেয়ে কার্যকর ও সুন্দর ব্যবস্থা হল কামানের গোলায় উড়িয়ে দেয়া। এই দৃশ্য বড় বীভৎস হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সতর্কতার সাথে কাজ চালাতে পারছি না। আমাদের উদ্দেশ্য, বদমায়েশ মুসলমানদের একথা বুঝিয়ে দেয়া যে, ঈশ্বরের সাহায্যে ইংরেজরা এখনও হিন্দুস্থানের অধিপতি থাকবে।"
টিকাঃ
১. সৈয়দ কামাল উদ্দীন হায়দার, কায়সারুত তাওয়ারীখ ২ খ, পৃ.৪৫৪।
২. মালেসন, ২খ, পৃ.১৭৭। (১৮৫৭ সাল হতে উদ্ধৃত)
৩. Edward Thompson, The Other Side of the Medal, 1269, p.40)
📄 আযাদী আন্দোলনের মাশুল
এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে মুসলমানদেরকেই। ইংরেজ শাসনের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও লেখকরা একথা ভাবতে থাকে যে, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের জন্য মূলত মুসলমানরাই দায়ী। এজন্য তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর মাশুল গুনতে হবে। হেনরী হেমিল্টন থমাস (Henry Harrington Thomas) যিনি তৎকালীন বাংলার একজন বড় সিভিল কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৮৫৮ সাল তথা আযাদী আন্দোলনের এক বছর পরে তার লিখিত Late Rebellion in India and Our Future Policy নামক গ্রন্থে মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি ভালভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন:
I have stated that the Hindus were not the contrivers or the primary movers of the 1857 rebellion and I now shall attempt to show that it was the result of a Mohammadan conspiracy. .................Left to their resources, the Hindus never would or could have compassed such an undertaking .................They (the Mohammadans) have been uniformly the same from the times of the first Caliphs to the present day, proud, intolerant and cruel, ever aiming at Mohammadan supremacy by whatever means, and ever fostering a deep hatred of Christians. They cannot be good subjects of any government, which professes another religion; the precepts of the Quran will not suffer it. "আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মূল নায়ক ও প্রবক্তা হিন্দু ছিল না। এখন আমি একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করবো যে, এ বিদ্রোহ ছিল মুসলমানদের চক্রান্তেরই ফলাফল। হিন্দুরা নিজেদের ইচ্ছা ও উপকরণ পর্যন্ত সীমিত থাকলে এমন কোনো চক্রান্তে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারতো না। এবং করতে চাইতোও না। মুসলমানরা প্রথম খলিফার সময়কাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত দাম্ভিক, অসহিষ্ণু ও অত্যাচারী হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে আসছে। সর্বদা তাদের মূল লক্ষ্য এই থাকে যে, যে করেই হোক ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং খ্রিষ্টানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব জিইয়ে রাখতে হবে। মুসলমানরা কখনো ভিন্ন ধর্মানুসারী সরকারের ভাল প্রজা হতে পারে না। কেননা কুরআনের নির্দেশমালার উপস্থিতিতে এই সহাবস্থান সম্ভব নয়।"¹
টিকাঃ
১. Tufil Ahmad, Responsible Government and the Solution of Hindu-Muslim Problem. 1928, p.56.
📄 মুসলমানদের অধিকার হরণ ও চাকরীচ্যুতি
পরবর্তী ইংরেজ প্রশাসনের সমস্ত উচ্চপদস্থ অফিসার ও কোর্ট-কাচারীর কর্মকার্তারা এই নীতি ও কর্মপন্থা দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে থাকে যে, মুসলমানদেরকে প্রশাসন যন্ত্রের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ থেকে পৃথক রাখতে হবে। তাদের জীবিকার উৎস বন্ধ করে দিতে হবে। বাজেয়াপ্ত করতে হবে ওয়াকফকৃত সম্পদ ও জমিজমা গুলো যার সাহায্যে পরিচালিত হয় তাদের মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠান সমূহ। এর পরিবর্তে এমন বিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে যেখান থেকে মুসলমানরা উপকৃত হতে পারে না।¹ কোনো কোনো সরকারী বিজ্ঞপ্তিতে একথা স্পষ্ট করে বলে দেয়া হতো যে, এই এই পদের জন্য শুধু হিন্দুদেরই নিয়োগ দেয়া হবে। স্যার উইলিয়াম হান্টার কোলকাতা হতে প্রকাশিত একটি ফার্সি পত্রিকার (১৮৬৯, ১৪ জুলাই) উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেনঃ "Recently, when several vacancies occurred in the office of the Sunderbans Commissioner, that official in advertising them in the Government Gazette, stated that the appointments would be given to none but Hindus." Commenting on the above complaint, the author goes on to say: the Muslims have now sunk so low that, even when qualified for Government employment, they are studiously kept out of it by government notifications. Nobody takes any notice of their helpless condition, and the higher authorities do not deign even to acknowledge their existence.²
"সুন্দরবনের কমিশনার সরকারী গেজেটে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, যেসব পদ শূন্য হয়েছিল সেগুলোতে হিন্দু ব্যতীত অন্য কাউকে নিয়োগ দেয়া হবে না।³ মুসলমানরা এখন এমন অধঃপতিত হয়ে গেছে যে, তারা যদি সরকারী পদ পাওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করে তবুও সরকারী ঘোষণার সাহায্যে বিশেষ সতর্কতার সাথে তাদের নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। মুসলমানদের অসহায়ত্বের প্রতি কেউ দৃষ্টিপাত করে না। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তো মুসলমানদের অস্তিত্ব মেনে নেয়াকেই নিজেদের অসম্মান মনে করেন।"⁴
টিকাঃ
১. বিশ্লেষণের জন্য দ্রষ্টব্য- W.W. Hunter. The Indian Musalmans, 1876
২. Ibid. p. 176
৩. প্রাগুক্ত পৃ.১৫৮।
৪. প্রাগুক্ত।