📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 লুটতরাজ ও গণহত্যা

📄 লুটতরাজ ও গণহত্যা


ইংরেজ সেনাবাহিনী ঢুকে পড়লো হিন্দুস্তানের প্রাণকেন্দ্র দিল্লিতে। সাথে সাথে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনের এই আযাবের ব্যাখ্যাঃ "যখন বাদশাহরা কোন দেশে প্রবেশ করে তাকে তছনছ করে ক্ষান্ত হয় ও সেদেশের সম্মানিত লোকদেরকে অপদস্ত করে।"¹

সেনা সদস্যদেরকে তিন দিন পর্যন্ত দিল্লিকে লুট করার অনুমতি দেওয়া হয়। তারা অত্যন্ত ভয়ানকভাবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। জন লরেন্স ১৮৫৭ সনের ডিসেম্বরে ইংরেজ সেনাপতি General Penny র কাছে লিখেন:

I believe we shall lastingly, and indeed, justly be abused for the way in which we have despoiled all classes without distinction. "আমার বিশ্বাস, যেভাবে আমরা নির্বিচারে সকল স্তরের লোকদের লুট করেছি, এর জন্য চিরকাল আমাদেরকে অভিশাপ দেয়া হবে। আমরা এই অভিশাপ পাওয়ার যোগ্য বটে।”²

তিন দিন পর্যন্ত দিল্লির মাটিতে হত্যা লুণ্ঠনের রাজত্ব ছিল। দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল, বয়ে যাচ্ছিল রক্তের নহর, দোষী ও নির্দোষ নির্বিশেষে সকলের গায়ে বিদ্ধ হচ্ছিল ঘাতক বুলেট, লুট হচ্ছিল বাড়ির পর বাড়ি। যারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো, তারা আপন ইজ্জত-আব্রু ও পরিবার-পরিজন নিয়ে দিল্লি থেকে পালিয়ে গেল। এক পর্যায়ে যে শহর একযুগে সমগ্র হিন্দুস্তানের মধ্যমণি ও রাজধানী ছিল, সেটি এক জনমানবহীন ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়। সেখানে বিধ্বস্ত বাড়ি ঘর, খড়কুটো, পঁচে গলে যাওয়া লাশ ও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ইংরেজ কমান্ডার ফিল্ড মার্শাল লর্ড রবার্টস (Lord Roberts) যিনি সিপাহী বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনাবাহিনীসহ ১৮৫৭ সনের ২৪ ডিসেম্বর কানপুর হতে দিল্লি গমন করেছিলেন, তিনি লালকেল্লা জয়ের পরবর্তী দিল্লির হৃদয়বিদারক চিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ

That March through Delhi in the early morning light was a gruesome proceeding. Our way by the Lahore Gate from the Chandni Chowk led through a veritable city of the dead; not a sound was to be hard but the falling of our own footsteps; not a living creature was to be seen. Dead bodies were strewn about in all directions, in every attitude that the death-struggle had caused them to assume, and in every stage of decomposition. We marched in silence or involuntarily spoke in whispers, as though fearing to disturb those ghastly remains of humanity. The sights we encountered were horrible and sickening to the last degree. Here a dog gnawed at an uncovered limb, there a vulture disturbed by our approach from its loathsome meal, but too completely gorged to fly, fluttered away to a safer distance. In many instances, the positions of the dead bodies were appallingly life-like. Some with their arms uplifted as if beckoning, and indeed, the whole scene weired and and terrible beyond description. Our horses seemed to feel the horror of it as much as we did, for they shook and snorted in evident terror. The atmosphere was unimaginably disgusting, laden as it was with the most noxious and sickening odours.

“ভোরের মৃদু আলোয় দিল্লি হতে যাত্রার সে দৃশ্য ছিল বড়ই করুণ। লালকিল্লার লাহোরী দরজা দিয়ে বের হয়ে আমরা চাঁদনী চক অতিক্রম করে যাচ্ছিলাম। দিল্লিকে মনে হচ্ছিল এক নীরব-নিস্তব্ধ শহর। আমাদের অশ্ব সমূহের পদধ্বনি ব্যতীত কোন দিক থেকে অন্য কোন আওয়াজ আসছিল না। একটি জীবিত প্রাণীও আমাদের চোখে পড়েনি। সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাশ আর লাশ। প্রত্যেক লাশে পরিস্ফুট মৃত্যুর বিভীষিকা। লাশগুলো ছিন্নভিন্ন ও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। আমরা চুপচাপ চলছিলাম অথবা বলতে পারেন অনিচ্ছায় অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করছিলাম, যাতে মানবতার এ করুণ সাক্ষীগুলোর প্রশান্তিতে কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়। যেই দৃশ্যগুলো দেখে আমাদের আঁখি জর্জরিত হয়, সে গুলো বড়ই হৃদয়বিদারক। কোথাও কুকুর কারো দিগম্বর দেহ ছিঁড়ে ফেঁড়ে খাচ্ছে। আবার কোথাও শকুন আমাদের কাছে পৌঁছার কারণে তার দুর্গন্ধময় খাবার ছেড়ে পাখা ঝাপটিয়ে অদূরে চলে যাচ্ছে কিন্তু তার উদর টইটম্বুর হওয়ায় উড়তে পারছে না। প্রায় ক্ষেত্রে মৃত্যুকে মনে হচ্ছিল জীবিত। কারো হাত উপরের দিকে উঠানো, যেন কাউকে ইশারা করছে। প্রকৃতপক্ষে কোন দৃশ্য এমন ভয়ানক ও বিভীষিকাময় ছিল যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। মনে হয় আমাদের ন্যায় ঘোড়াগুলো ভীত সন্ত্রস্ত ছিল। বার বার চমকে উঠতো ও অসন্তোষ প্রকাশ করতো। পুরা পরিবেশ অকল্পনীয়ভাবে ভয়ানক রূপ ধারণ করে, যা ছিল বড় ক্ষতিকর, রোগজীবাণু বাহী ও পুঁতিগন্ধময়।"

টিকাঃ
১. সূরা নামালঃ ৩৪
২. Basworth Smith, Life of Lord Lawrence, 1883, vol- 1, p-158

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ইসলামী বিদ্রোহ

📄 ইসলামী বিদ্রোহ


এ নির্মম গণহত্যায় মুসলমানরাই ছিল ইংরেজদের মূল টার্গেট। কারণ বহু ইংরেজ কর্মকর্তা মনে করতো যে, এটা মূলত ইসলামী জিহাদ এবং মুসলমানরাই এই বিদ্রোহের মূল নায়ক ও প্রবক্তা। এক ইংরেজ লেখক Henry Mead বলেনঃ

This rebellion, in its present phase, cannot be called a sepoy Mutiny. It did begin with the sepoys, but soon its true nature was revealed. It was an Islamic revolt. "এ বিদ্রোহকে বর্তমান পর্যায়ে সিপাহী বিদ্রোহ বলে আখ্যায়িত করা যায় না। অবশ্যই এর সূচনা হয়েছিল সিপাহীদের দ্বারাই। কিন্তু অচিরেই তার আসল রূপ ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ এ বিদ্রোহ ছিল মূলত ইসলামী বিদ্রোহ।"¹

একজন সমসাময়িক ঐতিহাসিক লেখেন : “প্রতিটি ইংরেজের অভ্যাসই হয়ে গিয়েছিল যে, সে প্রত্যেক মুসলমানকেই মনে করতো বিদ্রোহী। প্রত্যেক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাস করতো হিন্দু না মুসলমান। উত্তরে মুসলমান শুনতেই গুলি চালাতো।”²

টিকাঃ
১. প্রাগুক্ত।
২. উরুজে সালতানাতে ইংলিশিয়া পৃ. ৭১২।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 মুসলিম গণহত্যা

📄 মুসলিম গণহত্যা


এর পর শুরু হয় ফাঁসির কালো অধ্যায়। প্রায় মহাসড়ক ও রাস্তায় ফাঁসির কাষ্ঠ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ স্থানগুলো রূপান্তরিত হয় ইংরেজদের চিত্তবিনোদন ও আনন্দ উপভোগের কেন্দ্রে। সেখানে এসে তারা ফাঁসি প্রাপ্তদের যন্ত্রণা ও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য উপভোগ করতো। ধূমপানের আসর জমতো ও একে অপরের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠতো। যখন ফাঁসির কাজ সম্পন্ন হয়ে যেতো এবং সেই মজলুম ব্যক্তিটি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতো, তখন ইংরেজরা হাসি-তামাশা ও বিদ্রুপের সাথে অভিবাদন জানাতো। এ হতভাগাদের মধ্যে বড় বড় মান্যগণ্য ও সম্ভ্রান্ত লোকও ছিলেন। কোনো কোনো মুসলিম পল্লী এভাবে কৃপাণ তলে নিক্ষেপ করা হয় যে, তাদের একজন সদস্যও প্রাণে রক্ষা পায়নি। একজন সমসাময়িক ঐতিহাসিক লিখেনঃ

Twenty-seven thousand Muslims were executed, to speak nothing of those killed in the general massacre. It seemed that the British were determined to blot out of existence the entire Muslim race. They killed the children and the way they treated the women simply belies description. It rends the heart to think of it.¹

“সাতাশ হাজার মুসলমানকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়। লাগাতার ও নির্বিচারে গণহত্যা চলতে থাকে। এতে কতোজন নিহত হয়েছে তার হিসেব নেই। বস্তুতঃ মুসলমানদের নাম-নিশানা মুছে ফেলতে বৃটিশরা সংকল্পবদ্ধ ছিল। হত্যা করেছে শিশুদের, নারীদের সাথে যে আচরণ করেছে তা বর্ণনার বাইরে, যা কল্পনায়ও কেঁপে উঠে হৃদয়।"

আমাদের সেনা অফিসার সব ধরনের অপরাধীদের হত্যা করে ফিরছিলেন। কোন রকমের আক্ষেপ ছাড়াই তাদের ফাঁসি দিচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন তারা কুকুর বা শৃগাল কিংবা অতি নিকৃষ্ট কোন পোকা মাকড়।²

ফিল্ড মার্শাল লর্ড রবার্টস ১৮৫৭ সালের ২১ জুন তাঁর মায়ের কাছে লিখিত এক পত্রে বলেনঃ "The death that seems to have the greatest effect is being blown from a gun. It is rather a horrible sight, but, in these times, we cannot be particular." The purpose of this "business" was to show "these rascally Musalmans that, with God's help, Englishmen will still be masters of India."³

“মৃত্যুদন্ডের সবচেয়ে কার্যকর ও সুন্দর ব্যবস্থা হল কামানের গোলায় উড়িয়ে দেয়া। এই দৃশ্য বড় বীভৎস হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সতর্কতার সাথে কাজ চালাতে পারছি না। আমাদের উদ্দেশ্য, বদমায়েশ মুসলমানদের একথা বুঝিয়ে দেয়া যে, ঈশ্বরের সাহায্যে ইংরেজরা এখনও হিন্দুস্থানের অধিপতি থাকবে।"

টিকাঃ
১. সৈয়দ কামাল উদ্দীন হায়দার, কায়সারুত তাওয়ারীখ ২ খ, পৃ.৪৫৪।
২. মালেসন, ২খ, পৃ.১৭৭। (১৮৫৭ সাল হতে উদ্ধৃত)
৩. Edward Thompson, The Other Side of the Medal, 1269, p.40)

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আযাদী আন্দোলনের মাশুল

📄 আযাদী আন্দোলনের মাশুল


এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে মুসলমানদেরকেই। ইংরেজ শাসনের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও লেখকরা একথা ভাবতে থাকে যে, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের জন্য মূলত মুসলমানরাই দায়ী। এজন্য তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর মাশুল গুনতে হবে। হেনরী হেমিল্টন থমাস (Henry Harrington Thomas) যিনি তৎকালীন বাংলার একজন বড় সিভিল কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ১৮৫৮ সাল তথা আযাদী আন্দোলনের এক বছর পরে তার লিখিত Late Rebellion in India and Our Future Policy নামক গ্রন্থে মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি ভালভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন:

I have stated that the Hindus were not the contrivers or the primary movers of the 1857 rebellion and I now shall attempt to show that it was the result of a Mohammadan conspiracy. .................Left to their resources, the Hindus never would or could have compassed such an undertaking .................They (the Mohammadans) have been uniformly the same from the times of the first Caliphs to the present day, proud, intolerant and cruel, ever aiming at Mohammadan supremacy by whatever means, and ever fostering a deep hatred of Christians. They cannot be good subjects of any government, which professes another religion; the precepts of the Quran will not suffer it. "আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মূল নায়ক ও প্রবক্তা হিন্দু ছিল না। এখন আমি একথা প্রমাণ করার চেষ্টা করবো যে, এ বিদ্রোহ ছিল মুসলমানদের চক্রান্তেরই ফলাফল। হিন্দুরা নিজেদের ইচ্ছা ও উপকরণ পর্যন্ত সীমিত থাকলে এমন কোনো চক্রান্তে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারতো না। এবং করতে চাইতোও না। মুসলমানরা প্রথম খলিফার সময়কাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত দাম্ভিক, অসহিষ্ণু ও অত্যাচারী হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে আসছে। সর্বদা তাদের মূল লক্ষ্য এই থাকে যে, যে করেই হোক ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং খ্রিষ্টানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব জিইয়ে রাখতে হবে। মুসলমানরা কখনো ভিন্ন ধর্মানুসারী সরকারের ভাল প্রজা হতে পারে না। কেননা কুরআনের নির্দেশমালার উপস্থিতিতে এই সহাবস্থান সম্ভব নয়।"¹

টিকাঃ
১. Tufil Ahmad, Responsible Government and the Solution of Hindu-Muslim Problem. 1928, p.56.

ফন্ট সাইজ
15px
17px