📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আযাদী আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান

📄 আযাদী আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান


আযাদী আন্দোলন ছিল প্রকৃত অর্থে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনসাধারণের স্বতস্ফূর্ত ও সম্মিলিত সংগ্রাম। ভারতবর্ষ দেশপ্রেম, ঐক্য ও সংহতি, উৎসাহ ও উদ্দীপনা, আবেগ ও উত্তাপের এই প্রাণময় দৃশ্য আর কখনো দেখেনি। তা সত্ত্বেও নেতৃত্বের অগ্রণী ভূমিকায় মুসলমানদের পাল্লা ছিল ভারী। এ আন্দোলনে অধিকাংশ নেতা ও সেনা অধিনায়ক ছিলেন মুসলমান।²

টিকাঃ
২. আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সমরনৈতিক নেতৃত্বে আজীমুল্লাহ খান, জেনারেল বখত খান, খান বাহাদুর খান, মাওলানা আহমদুল্লাহ্, মাওলানা লিয়াকত আলী, হযরত মহল প্রমুখ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মধ্যে মাওলানা আহমদুল্লাহ্ শাহ ফয়েজাবাদীর ব্যক্তিত্ব ছিল সুবিদিত ও মহান। হোমজ লেখেন, "মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ ছিলেন উত্তর ভারতে ইংরেজদের সবচেয়ে বড় শত্রু।" পন্ডিত চন্দ্র লাল লেখেন, "এ কথা সন্দেহাতীত যে, পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের মাঝে ১৮৫৭ সনের মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ এর নাম চির গৌরবান্বিত ও প্রোজ্জ্বল হয়ে থাকবে।" (সাতান্ন সাল পৃ. ২০৮) মালেসন (Malleson) বলেন, "মৌলভী আহমদুল্লাহ এক বড় বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব ছিলেন, বিদ্রোহের সময় সেনাপতি রূপে তিনি দক্ষতা ও কৃতিত্বের অপূর্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। অন্যকেউ একথা সদর্পে বলতে পারবেনা যে, আমি স্যার কলিন ক্যাম্পবিলকে ময়দানে দু'দুবার পরাজিত করেছি।" Malleson আরো বলেনঃ The Moulvi was a true patriot. He had not strained his sword with assassination. He had connived at no murders: he had fought manfully, honourably in the battlefield against strangers who had seized his country, and his memory is entitled to the respect of the brave and the true-hearted of all nation. "মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক ছিলেন, তিনি কোন নিরীহ লোকের রক্ত ঝরিয়ে কৃপান অপবিত্র করেননি। যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব ও অবিচলতার সাথে সেই ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান, যারা তার মাতৃভূমি ছিনিয়ে নিয়েছিল প্রত্যেক দেশের বীর ও সৎসাহসী লোকদের উচিৎ মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহকে মর্যাদার সাথে স্মরণ করা।' (History of Indian Mutiny, vol.iv,p.381) হোম্স লেখেন, "শত্রুরা যতই হিংস্র প্রকৃতির হোক না কেন, তাদের নেতা ছিলেন এক মহান লক্ষ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিশাল সেনাবাহিনীর সফল নেতৃত্ব দানের জন্য পুরোপুরি যোগ্য ব্যক্তি।"

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ইংরেজদের প্রতিশোধস্পৃহা ও হত্যাযজ্ঞ

📄 ইংরেজদের প্রতিশোধস্পৃহা ও হত্যাযজ্ঞ


আযাদী আন্দোলন যখন করুণভাবে ব্যর্থ হলো, যে ব্যর্থতার কারণ উদ্ঘাটন করতে রচিত হয়েছে বহু পুস্তক।¹ তখন ইংরেজরা ভারতীয়দের উপর প্রতিশোধ নিতে শুরু করলো। ভারতীয়দের সাথে তারা এমন জালিম ও অত্যাচারী বিজয়ী জাতির ন্যায় আচরণ করলো যেন তারা দয়া-মায়া, ন্যায়-নীতি ও মানবতার তাৎপর্যের সাথে পরিচিত নয়। ফলে এমন নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যালীলায় মেতে উঠলো, যা স্মরণ করিয়ে দেয় চেঙ্গিস ও হালাকু খানের প্রলয় তান্ডব ও মানব সংহারের করুণ ইতিহাস। ইংরেজরা বাদশাহর তিন যুবক ছেলেকে হত্যা করলো। অথচ তাদেরকে ইতোপূর্বে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়া হয়েছিলো। এমন হিংস্রতা ও বর্বরতার সাথে তাদের হত্যা করা হলো, যে দৃশ্য দেখে স্বয়ং বহু ইংরেজ শিউরে উঠে। তাদের সাথে শাহী খান্দানের তেত্রিশ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে ছিল রোগপীড়িত, বয়োবৃদ্ধ, এমনকি পঙ্গু ব্যক্তিও। তারা বাদশাহকে অপদস্থ করে এবং নিতান্ত অবমাননাকর পন্থায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করে। ইংরেজরা বাদশাহকেও হত্যা করতে চেয়েছিল কিন্তু সেনা কমান্ডার তাঁর জীবনের দায়িত্ব নেয়ায় চিরদিনের জন্য তাঁকে রেংগুনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তিনি সেখানে অবর্ণনীয় কষ্ট-যাতনার মাঝে মানবেতর জীবন যাপন করে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

টিকাঃ
১. ইংরেজ সাম্রাজ্যের উত্থান (উর্দু) মুনশী জাকাউল্লাহ ২য় খন্ড, পৃ. ৭০৮।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 লুটতরাজ ও গণহত্যা

📄 লুটতরাজ ও গণহত্যা


ইংরেজ সেনাবাহিনী ঢুকে পড়লো হিন্দুস্তানের প্রাণকেন্দ্র দিল্লিতে। সাথে সাথে চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনের এই আযাবের ব্যাখ্যাঃ "যখন বাদশাহরা কোন দেশে প্রবেশ করে তাকে তছনছ করে ক্ষান্ত হয় ও সেদেশের সম্মানিত লোকদেরকে অপদস্ত করে।"¹

সেনা সদস্যদেরকে তিন দিন পর্যন্ত দিল্লিকে লুট করার অনুমতি দেওয়া হয়। তারা অত্যন্ত ভয়ানকভাবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। জন লরেন্স ১৮৫৭ সনের ডিসেম্বরে ইংরেজ সেনাপতি General Penny র কাছে লিখেন:

I believe we shall lastingly, and indeed, justly be abused for the way in which we have despoiled all classes without distinction. "আমার বিশ্বাস, যেভাবে আমরা নির্বিচারে সকল স্তরের লোকদের লুট করেছি, এর জন্য চিরকাল আমাদেরকে অভিশাপ দেয়া হবে। আমরা এই অভিশাপ পাওয়ার যোগ্য বটে।”²

তিন দিন পর্যন্ত দিল্লির মাটিতে হত্যা লুণ্ঠনের রাজত্ব ছিল। দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল, বয়ে যাচ্ছিল রক্তের নহর, দোষী ও নির্দোষ নির্বিশেষে সকলের গায়ে বিদ্ধ হচ্ছিল ঘাতক বুলেট, লুট হচ্ছিল বাড়ির পর বাড়ি। যারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো, তারা আপন ইজ্জত-আব্রু ও পরিবার-পরিজন নিয়ে দিল্লি থেকে পালিয়ে গেল। এক পর্যায়ে যে শহর একযুগে সমগ্র হিন্দুস্তানের মধ্যমণি ও রাজধানী ছিল, সেটি এক জনমানবহীন ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়। সেখানে বিধ্বস্ত বাড়ি ঘর, খড়কুটো, পঁচে গলে যাওয়া লাশ ও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ইংরেজ কমান্ডার ফিল্ড মার্শাল লর্ড রবার্টস (Lord Roberts) যিনি সিপাহী বিদ্রোহ দমনের জন্য সেনাবাহিনীসহ ১৮৫৭ সনের ২৪ ডিসেম্বর কানপুর হতে দিল্লি গমন করেছিলেন, তিনি লালকেল্লা জয়ের পরবর্তী দিল্লির হৃদয়বিদারক চিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ

That March through Delhi in the early morning light was a gruesome proceeding. Our way by the Lahore Gate from the Chandni Chowk led through a veritable city of the dead; not a sound was to be hard but the falling of our own footsteps; not a living creature was to be seen. Dead bodies were strewn about in all directions, in every attitude that the death-struggle had caused them to assume, and in every stage of decomposition. We marched in silence or involuntarily spoke in whispers, as though fearing to disturb those ghastly remains of humanity. The sights we encountered were horrible and sickening to the last degree. Here a dog gnawed at an uncovered limb, there a vulture disturbed by our approach from its loathsome meal, but too completely gorged to fly, fluttered away to a safer distance. In many instances, the positions of the dead bodies were appallingly life-like. Some with their arms uplifted as if beckoning, and indeed, the whole scene weired and and terrible beyond description. Our horses seemed to feel the horror of it as much as we did, for they shook and snorted in evident terror. The atmosphere was unimaginably disgusting, laden as it was with the most noxious and sickening odours.

“ভোরের মৃদু আলোয় দিল্লি হতে যাত্রার সে দৃশ্য ছিল বড়ই করুণ। লালকিল্লার লাহোরী দরজা দিয়ে বের হয়ে আমরা চাঁদনী চক অতিক্রম করে যাচ্ছিলাম। দিল্লিকে মনে হচ্ছিল এক নীরব-নিস্তব্ধ শহর। আমাদের অশ্ব সমূহের পদধ্বনি ব্যতীত কোন দিক থেকে অন্য কোন আওয়াজ আসছিল না। একটি জীবিত প্রাণীও আমাদের চোখে পড়েনি। সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাশ আর লাশ। প্রত্যেক লাশে পরিস্ফুট মৃত্যুর বিভীষিকা। লাশগুলো ছিন্নভিন্ন ও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। আমরা চুপচাপ চলছিলাম অথবা বলতে পারেন অনিচ্ছায় অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করছিলাম, যাতে মানবতার এ করুণ সাক্ষীগুলোর প্রশান্তিতে কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়। যেই দৃশ্যগুলো দেখে আমাদের আঁখি জর্জরিত হয়, সে গুলো বড়ই হৃদয়বিদারক। কোথাও কুকুর কারো দিগম্বর দেহ ছিঁড়ে ফেঁড়ে খাচ্ছে। আবার কোথাও শকুন আমাদের কাছে পৌঁছার কারণে তার দুর্গন্ধময় খাবার ছেড়ে পাখা ঝাপটিয়ে অদূরে চলে যাচ্ছে কিন্তু তার উদর টইটম্বুর হওয়ায় উড়তে পারছে না। প্রায় ক্ষেত্রে মৃত্যুকে মনে হচ্ছিল জীবিত। কারো হাত উপরের দিকে উঠানো, যেন কাউকে ইশারা করছে। প্রকৃতপক্ষে কোন দৃশ্য এমন ভয়ানক ও বিভীষিকাময় ছিল যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। মনে হয় আমাদের ন্যায় ঘোড়াগুলো ভীত সন্ত্রস্ত ছিল। বার বার চমকে উঠতো ও অসন্তোষ প্রকাশ করতো। পুরা পরিবেশ অকল্পনীয়ভাবে ভয়ানক রূপ ধারণ করে, যা ছিল বড় ক্ষতিকর, রোগজীবাণু বাহী ও পুঁতিগন্ধময়।"

টিকাঃ
১. সূরা নামালঃ ৩৪
২. Basworth Smith, Life of Lord Lawrence, 1883, vol- 1, p-158

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 ইসলামী বিদ্রোহ

📄 ইসলামী বিদ্রোহ


এ নির্মম গণহত্যায় মুসলমানরাই ছিল ইংরেজদের মূল টার্গেট। কারণ বহু ইংরেজ কর্মকর্তা মনে করতো যে, এটা মূলত ইসলামী জিহাদ এবং মুসলমানরাই এই বিদ্রোহের মূল নায়ক ও প্রবক্তা। এক ইংরেজ লেখক Henry Mead বলেনঃ

This rebellion, in its present phase, cannot be called a sepoy Mutiny. It did begin with the sepoys, but soon its true nature was revealed. It was an Islamic revolt. "এ বিদ্রোহকে বর্তমান পর্যায়ে সিপাহী বিদ্রোহ বলে আখ্যায়িত করা যায় না। অবশ্যই এর সূচনা হয়েছিল সিপাহীদের দ্বারাই। কিন্তু অচিরেই তার আসল রূপ ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ এ বিদ্রোহ ছিল মূলত ইসলামী বিদ্রোহ।"¹

একজন সমসাময়িক ঐতিহাসিক লেখেন : “প্রতিটি ইংরেজের অভ্যাসই হয়ে গিয়েছিল যে, সে প্রত্যেক মুসলমানকেই মনে করতো বিদ্রোহী। প্রত্যেক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাস করতো হিন্দু না মুসলমান। উত্তরে মুসলমান শুনতেই গুলি চালাতো।”²

টিকাঃ
১. প্রাগুক্ত।
২. উরুজে সালতানাতে ইংলিশিয়া পৃ. ৭১২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px