📄 মুসলমানরা আযাদী আন্দোলনের অগ্রনায়ক
ভারতবর্ষের আযাদী আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান ছিল অলৌকিকভাবে অসাধারন ও অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে মুসলমানরা অগ্রনায়ক ও পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। এর কারণ ছিল, ইংরেজরা যখন হিন্দুস্তান দখল করতে শুরু করলো এবং ক্রমান্বয়ে একের পর এক প্রদেশ ও রাজ্য তাদের করতলগত হতে লাগলো, তখন মুসলমানই ছিলেন হিন্দুস্তানের শাসনকর্তা। সর্বপ্রথম যার অন্তরে এই বিপদের আশঙ্কা অনুভূত হয়, তিনি ছিলেন মহীসূরের সাহসী ও নির্ভীক গভর্ণর ফাতহে আলী খান টিপু সুলতান (১২১৩ হি./১৭৯৯ ইং.) তিনি অসাধারণ বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সাহায্যে একথা উপলব্ধি করলেন যে, যদি ইংরেজরা এভাবে এক একটি প্রদেশ ও রাজ্য দখল করতে থাকে এবং কোন সুনিয়ন্ত্রিত ও সংঘবদ্ধ শক্তি তাদের মুকাবিলায় না আসে, তবে ভবিষ্যতে পুরা ভারতবর্ষকে তারা সহজে গ্রাস করে ফেলবে। এরপর তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সংকল্পবদ্ধ হলেন এবং পূর্ণ সাজ-সজ্জা ও সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে তাদের মুকাবিলায় ময়দানে নেমে আসলেন।
📄 টিপু সুলতানের প্রয়াস ও দুঃসাহস
টিপু সুলতান হিন্দুস্তানের রাজা-মহারাজা ও নবাবদেরকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি তুর্কী সম্রাট সলিম উসমানী, অন্যান্য মুসলিম রাজা-বাদশাহ এবং হিন্দুস্তানের আমীর-উমরা ও নবাবদের সাথে পত্র যোগাযোগ করেন। সারা জীবন তিনি ঔপনিবেশবাদী ইংরেজদের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। তাঁর প্রচন্ড প্রতিরোধের কারণে এক পর্যায়ে ইংরেজদের সমস্ত পরিকল্পনা তছনছ হয়ে এদেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ইংরেজরা তাদের অসাধারণ ধূর্ততা, কূটচালের মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতের নবাবদেরকে বশে আনতে সক্ষম হয়। অবশেষে দেশ ও জাতির জন্য নিবেদিত প্রাণ মুজাহিদ বাদশাহ টিপু সুলতান ৪ মে ১৭৯৯ সালে ‘সারেঙ্গা পিয়ম’ এর যুদ্ধে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন। তিনি ইংরেজদের দাসত্ব বরণ ও তাদের দয়ায় বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে প্রাধান্য দিলেন। তাঁর ইতিহাস বিশ্রুত বাণী ছিলঃ
To live for a day like a tiger is far more precious than to live for a hundred years like a jackal.
"শৃগালের একশ' বছরের জীবনের চেয়ে সিংহের একদিনের জীবন অনেক উত্তম।” ব্রিটিশ সেনাপতি জেনারেল হ্যারিস (Harris) এর কাছে যখন সুলতানের শাহাদাতের খবর পৌঁছলো, সে তাঁর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে সদম্ভে বললেনঃ
From today India is ours "আজ থেকে হিন্দুস্তান আমাদের।"
ভারতের ইতিহাসে টিপু সুলতানের চেয়ে অধিক সাহসী, দূরদর্শী, ধর্ম ও মাতৃভূমির জন্য উৎসর্গিতপ্রাণ এবং বৈদেশিক আধিপত্যবাদী শত্রুর বিরুদ্ধে আপোষহীন যোদ্ধা আর জন্ম গ্রহণ করেনি একথা বললে অত্যুক্তি হবে না। ইংরেজদের সামনে টিপু সুলতানের চেয়ে ভয়ঙ্কর ও বিদ্বেষভাজন আর কেউ ছিল না। বহু কাল যাবৎ (এবং সে যুগ আমরাও দেখেছি) তারা নিজেদের মনের ঝাল মিটানোর জন্য এবং স্বাধীনতা ও জিহাদের এই মহানায়ককে অপমানিত ও কলঙ্কিত করার হীন মানসে তাদের কুকুরের নাম রাখতো টিপু সুলতান।¹
টিকাঃ
১. গান্ধীজী Young India এর একটি ভাষ্যে সুলতানের দেশপ্রেম ও উদারতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে শাহাদাতপ্রাপ্তদের মধ্যে তাঁর চেয়ে মহান আর কেউ ছিল না।
📄 স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্মিলিত প্ল্যাটফরম
ইংরেজ শাসন ও আধিপত্য, ইংরেজদের দম্ভ ও অহঙ্কার, দেশের সম্পদ শোষণ ও আত্মসাৎ এবং সর্বোপরি ভারতবাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি একের পর এক আঘাত হানার কারণে পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার পর ভারতীয় সৈন্যরা ১৮৫৭ সালে এই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদের পতাকা উত্তোলন করলো। তাদের এই বিদ্রোহের ঘোষণা মুহূর্তে দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। জেগে উঠলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল জনতা। হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ গ্রহণ করলো। সিপাহীরা মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ যফরের বাসস্থান দিল্লি অভিমূখে যাত্রা করলো। এই অখন্ড দেশাত্মবোধ ও গণযুদ্ধের মহানায়ক ও প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত হলেন স্বয়ং সম্রাট। তিনি সমাদৃত হলেন হিন্দুস্থানের বৈধ বাদশাহ এবং খ্যাতনামা মুঘল সম্রাটগণের যোগ্য উত্তরসূরী রূপে। হিন্দুস্তানের পথে-প্রান্তরে তাঁর নামে ও পতাকাতলে বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। লোকেরা তাকে ধর্মীয় ও জাতীয় যুদ্ধের নায়ক এবং দিল্লিকে স্বাধীন হিন্দুস্তানের রাজধানী মনে করতে লাগল। তাঁর নেতৃত্বের ব্যাপারে কারো দ্বিমত ছিল না।¹
টিকাঃ
১. দুঃখের বিষয় হলো, শিখ ও কোন কোন রাজ্যের নবাবরা এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি বরং তাদেরকে ইংরেজরা বিদ্রোহ দমনের কাজে ব্যবহার করেছে।
📄 আযাদী আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান
আযাদী আন্দোলন ছিল প্রকৃত অর্থে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনসাধারণের স্বতস্ফূর্ত ও সম্মিলিত সংগ্রাম। ভারতবর্ষ দেশপ্রেম, ঐক্য ও সংহতি, উৎসাহ ও উদ্দীপনা, আবেগ ও উত্তাপের এই প্রাণময় দৃশ্য আর কখনো দেখেনি। তা সত্ত্বেও নেতৃত্বের অগ্রণী ভূমিকায় মুসলমানদের পাল্লা ছিল ভারী। এ আন্দোলনে অধিকাংশ নেতা ও সেনা অধিনায়ক ছিলেন মুসলমান।²
টিকাঃ
২. আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সমরনৈতিক নেতৃত্বে আজীমুল্লাহ খান, জেনারেল বখত খান, খান বাহাদুর খান, মাওলানা আহমদুল্লাহ্, মাওলানা লিয়াকত আলী, হযরত মহল প্রমুখ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মধ্যে মাওলানা আহমদুল্লাহ্ শাহ ফয়েজাবাদীর ব্যক্তিত্ব ছিল সুবিদিত ও মহান। হোমজ লেখেন, "মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ ছিলেন উত্তর ভারতে ইংরেজদের সবচেয়ে বড় শত্রু।" পন্ডিত চন্দ্র লাল লেখেন, "এ কথা সন্দেহাতীত যে, পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের মাঝে ১৮৫৭ সনের মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ এর নাম চির গৌরবান্বিত ও প্রোজ্জ্বল হয়ে থাকবে।" (সাতান্ন সাল পৃ. ২০৮) মালেসন (Malleson) বলেন, "মৌলভী আহমদুল্লাহ এক বড় বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব ছিলেন, বিদ্রোহের সময় সেনাপতি রূপে তিনি দক্ষতা ও কৃতিত্বের অপূর্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। অন্যকেউ একথা সদর্পে বলতে পারবেনা যে, আমি স্যার কলিন ক্যাম্পবিলকে ময়দানে দু'দুবার পরাজিত করেছি।" Malleson আরো বলেনঃ The Moulvi was a true patriot. He had not strained his sword with assassination. He had connived at no murders: he had fought manfully, honourably in the battlefield against strangers who had seized his country, and his memory is entitled to the respect of the brave and the true-hearted of all nation. "মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক ছিলেন, তিনি কোন নিরীহ লোকের রক্ত ঝরিয়ে কৃপান অপবিত্র করেননি। যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব ও অবিচলতার সাথে সেই ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান, যারা তার মাতৃভূমি ছিনিয়ে নিয়েছিল প্রত্যেক দেশের বীর ও সৎসাহসী লোকদের উচিৎ মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহকে মর্যাদার সাথে স্মরণ করা।' (History of Indian Mutiny, vol.iv,p.381) হোম্স লেখেন, "শত্রুরা যতই হিংস্র প্রকৃতির হোক না কেন, তাদের নেতা ছিলেন এক মহান লক্ষ্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিশাল সেনাবাহিনীর সফল নেতৃত্ব দানের জন্য পুরোপুরি যোগ্য ব্যক্তি।"