📄 তৃতীয় যুগ
দ্বিতীয় যুগে পাঠ্যক্রমে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল তাতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বেড়েই গিয়েছিল ফলে তাঁরা ফযিলতের মাপকাঠিকে আরো উন্নত করার আগ্রহী ও প্রত্যাশী ছিলেন। সুতরাং শাহ ফতহুল্লাহ্ শিরাজীর আগমনের সাথে সাথে শিক্ষাকেন্দ্র গুলোতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। একদিকে 'দরবারে আকবরী; তাঁকে 'ইযদুল মালিক' (বাদশাহ সহযোগী) উপাধিতে অভিষিক্ত করে স্বীয় মূল্যায়নের প্রমাণ দেয়। অন্যদিকে সেই শাহ ফাতহুল্লাহ্ শিরাজী পাঠ্যক্রমে যেসব পরিবর্ধন করেছিলেন তা নিঃসংকোচে মেনে নেন তৎকালীন আলিমগণ। নিতান্ত অন্যায় হবে যদি এখানে আমরা শায়খ ওয়াজীহ উদ্দীন আলভী গুজরাটীকে বিস্মৃত করি। এ বুযুর্গ গবেষক দাওয়্যানীর পরোক্ষ শাগরেদ ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম পরবর্তী আলেমদের রচিত গ্রন্থাদির প্রচলন ঘটিয়েছেন। ইলমের এ ঝর্ণাধারা হতে শুধু গুজরাটই সিক্ত হয়নি বরং তার ছিটেফোটা মধ্যভারত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। নিউতনীর বাসিন্দা কাজী জিয়া উদ্দীন গুজরাট থেকে ইলমী তোহফা নিয়ে আসেন। আর শায়খ জামাল তাঁর কাছ তা অর্জন করে দূর-দূরান্ত ছড়িয়ে দেন। শায়খ জামাল এর যোগ্য ছাত্র মোল্লা লুতফুল্লাহর কাছ থেকে মোল্লা জিয়ূন, (নুরুল আনওয়ার রচয়িতা), মোল্লা আলী আসগর, কাজী আলীমুল্লাহ্, মোল্লা মুহাম্মদ জামান প্রমূখ আলেমগণ ইলম হাসিল করেন। এদের প্রত্যেকেই আধ্যাত্মিকতা ও পঠন পাঠনের যোগ্য ব্যক্তিত্ব।
তবে যখন শাহ ফতহুল্লাহ্ শিরাজী দরসটি চালু করেন তখনই তা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। পরে তাঁর শিষ্য এবং শিষ্যদের শিষ্যরা সারা ভারত ছড়িয়ে পড়লে তাঁর দরসেরও প্রচার-প্রসার ঘটে। শাহ ফতহুল্লাহর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন মুফতী আবদুস সালাম। তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত লাহোরে বসে হাজার হাজার জ্ঞানপিপাসুকে ইলম দান করেন। তবে হাজারে এক-দুই জনই এমন হতো যারা খ্যাতি ও স্থায়ীত্বের ডিগ্রী পেতো। 'দিওয়াহ্' অঞ্চলের মুফতী আবদুস সালাম ও এলাহাবাদের শায়খ মুহিব্বুল্লাহ ছিলেন সেই দু'-একজন সৌভাগ্যবানদের মধ্যে যারা লাহোর থেকে জ্ঞানের মশাল এনে এতদঞ্চলে দরস-তাদরীসের শ্রেষ্ঠত্বের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আমল কায়েম করেন। প্রসিদ্ধ 'দরসে নিজামিয়া'র প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা নিযামুদ্দীনের সম্মানিত পিতা শায়খ কুতুবুদ্দীন সাহালভী পরোক্ষ ভাবে এ দু'জনেরই সুযোগ্য শাগরেদ ছিলেন।
শাহ ওয়ালি উল্লাহ্ দেহলভী (মৃত্যু. ১১৭৪ হি.) এ যুগের সর্বশেষ; তবে সব চেয়ে ধীমান ও মেধা সম্পন্ন আলেম ছিলেন। শাহ সাহেব ব্যাপক ভাবে আরব দেশে সফর করেন। সেখানে কয়েক বছর থেকে শায়খ আবু তাহের মাদানীর নিকট ইলমে হাদীস সমাপ্ত করেন। পরে জ্ঞানের এ হাদিয়া ভারত নিয়ে আসেন এবং এমন তৎপরতার সাথে তার প্রচার প্রসারে লেগে যান যে, প্রতিকুল পরিবেশ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তার স্মৃতি চিহ্ন রয়ে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র। প্রকৃত পক্ষে 'সিহাহ সিত্তাহ'র পঠন-পাঠন ভারতে তখন থেকেই আরম্ভ হয় যখন শাহ সাহেব ও তাঁর প্রখ্যাত উত্তরসূরীরা তা চালু করেন এবং তাঁদের মুল্যবান জীবনের অধিকাংশ সময় হাদীস চর্চার বিকাশে ব্যয় করেন। শাহ সাহেব নিজেও স্বীয় মডেলের একটি পাঠ্যক্রম তৈরী করেছিলেন যেহেতু সে সময় ইলমের আসল কেন্দ্র দিল্লি থেকে লক্ষ্ণৌ স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানতিক ও হিকমাতের স্বাদের সাথে পরিচিত হচ্ছিল ছাত্র-শিক্ষকের রসনায় তাই নতুন পাঠ্যক্রম উপাদেয় হয়নি।
📄 চতুর্থ যুগ
হিজরী ১২ শতাব্দীতে কায়েম হয়। আর মোল্লা নিজামুদ্দীন এমন জোরদার হাতে তার গোড়াপত্তন করেন যে, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে গেলো অথচ এখন পর্যন্ত তা অপরিবর্তনীয় রয়ে গেলো।¹
টিকাঃ
১. 'আন-নদওয়া' ষষ্ঠ খন্ড, নং-১, এটা অর্ধশতাব্দী আগের কথা। সুতরাং নদওয়াতুল উলামার আন্দোলন এবং কালের পরিবর্তনে প্রভাবিত হয়ে অনেক জায়গায় প্রাচীন পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।