📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 পাঠ্যক্রমের বিভিন্ন স্তর

📄 পাঠ্যক্রমের বিভিন্ন স্তর


এখানে সহজতর প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রচলিত পাঠ্যক্রমের চারটি যুগের বর্ণনা করা সমীচিন মনে করি। প্রতিটি যুগে যেসব বই-পুস্তক প্রচলিত ছিলো তার বিবরণও যতটুকু সম্ভব ইতিহাস থেকে, বিভিন্ন স্তরের মাশায়িখ হতে, কবিদের আলোচনা থেকে উপস্থাপন করলে ভাল হয়। দেখতে এ কাজটা হালকা মনে হলেও কিন্তু হাজার হাজার পৃষ্ঠা মন্থন করার পর যে ফলাফলে আমরা পৌঁছেছি তাই পাঠক মহলের উদ্দেশ্যে পেশ করছি।¹

টিকাঃ
১. এ বইয়ে এমন সব পাঠ্য বই সমূহের তালিকা বাদ দেয়া হয়েছে। যেহেতু তা শুধু গবেষকদেরই প্রিয় বিষয়। বিস্তারিত জানার জন্যে মূল লেখা দ্রষ্টব্য।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 প্রথম যুগ

📄 প্রথম যুগ


এ যুগের সূচনা হিজরী সপ্তম শতাব্দী হতে আর এর শেষ দশম শতাব্দীর তখন হয় যখন দ্বিতীয় যুগ শুরু হয়ে যায়। প্রায় দু'শ' বছর পর্যন্ত নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর অর্জন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি মনে করা হতো। বিষয় সমূহ হচ্ছে নাহু-ছরফ, বালাগাত, ফিক্‌হ, উসূলে ফিক্‌হ, মানতিক, তাসাউফ, তাফসীর ও হাদীস। এ যুগের স্বনামধন্য আলিমদের জীবনী অনুসন্ধানে জানা যায় যে, আমাদের যুগে 'মানতিক' ও 'ফালসাফা' যেমন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি তেমনি সে যুগে ছিল ফিক্‌হ ও উসূলে ফিক্‌হ।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 দ্বিতীয় যুগ

📄 দ্বিতীয় যুগ


হিজরী নবম শতাব্দীর শেষদিকে শায়খ আবদুল্লাহ ও শায়খ আযীযুল্লাহ মুলতান থেকে আগমন করেন।² শায়খ আবদুল্লাহ দিল্লিতে এবং শায়খ আযীযুল্লাহ অবস্থান নেন সাম্বলে। সুলতান সিকান্দার লোদী হৃদয় উজাড় করে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। এমনকি স্বয়ং বাদশাহ শাখ আবদুল্লাহর দরসের হালকায়ে অংশ গ্রহন করতেন। তাঁর আগমনে দরসের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হবে এ আশঙ্কায় তিনি মসজিদের এক কোণে বসে তাঁর বক্তব্য শুনতেন। দরস সমাপ্ত হলে শায়খের খিদমতে গিয়ে সাক্ষাত করতেন।

এ শায়খদ্বয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও পান্ডিত্বের কারণে এবং পাশাপাশি বাদশাহর আন্তরিক মূল্যায়নে খুব দ্রুত তাঁদের ইলমী খ্যাতি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। তারা 'ফযিলতের' মান আরো একটু বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কাজী ইব্দ রচিত 'মাতালে' ও 'মাওয়কিফ' গ্রন্থদ্বয়¹ এবং সাকাকী রচিত 'মিফতাহুল উলুম'² তাদের দরসে সংযোজিত করেন। খুব অল্প সময়ে এসব গ্রন্থের বহুল প্রচলন ঘটে।

এ যুগেই মীর সায়্যিদ শরীফের ছাত্ররা 'শারহে মাতালে' এবং 'শারহে মাওয়াকিফ' ব্যাখ্যাগ্রন্থ দ্বয় চালু করেন। আল্লামা তাফতাযানীর শাগরেদরা 'মুতাওয়াল' ও 'মুখতাসার' এর গোড়াপত্তন করলেন এবং প্রচলন করেন 'তালভীহ'³ ও 'শরহে আক্বায়েদে নাসাফী'⁴ গ্রন্থ সমূহের। এ সময়ে 'শারহে বেকায়া'⁵ এবং 'শারহে মোল্লা জামী'⁶ ধীরে ধীরে পাঠ্যক্রমে ঢুকে পড়ে।

এ যুগের সব চেয়ে শেষ; তবে সব চেয়ে খ্যাতনামা আলেম শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী ভারত থেকে আরব তাশরীফ নিয়ে যান। যেখানে তিন বছর অবস্থান করে মক্কা-মদীনার আলেমদের নিকট হাদীসের তাকমীল করেন এবং সে ইলমী তোহফা নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি এবং তাঁর সন্তানরা সর্বদা ইলমের প্রচার প্রসারের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু দূঃখের বিষয়, তা জনপ্রিয়তা লাভে ব্যর্থ হয়। এ সম্মান পরবর্তী যুগে জনাব শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ দেহলভী (রহ.) এর ভাগ্যে জোটে। তিনি এ ইলমের প্রচার প্রসার ঘটান সফলতার সাথে।

টিকাঃ
২. আলিমদ্বয় মূলতানের পার্শ্ববর্তী এলাকা তুলাম্বার অধিবাসী ছিলেন।
১. ইলমে কালামের দু'টি মৌলিক গ্রন্থ।
২. অলঙ্কার শাস্ত্রের দু'টি প্রসিদ্ধ বইয়ের নাম; যা এখনো প্রাচীন পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৩. উলূমে ফিকাহ।
৪. ইলমে আক্বায়েদ।
৫. ফিকহে হানাফী।
৬. মানতিকের রঙ মিশ্রিত আরবী ব্যাকরণের একটি গ্রন্থ।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 তৃতীয় যুগ

📄 তৃতীয় যুগ


দ্বিতীয় যুগে পাঠ্যক্রমে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল তাতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বেড়েই গিয়েছিল ফলে তাঁরা ফযিলতের মাপকাঠিকে আরো উন্নত করার আগ্রহী ও প্রত্যাশী ছিলেন। সুতরাং শাহ ফতহুল্লাহ্ শিরাজীর আগমনের সাথে সাথে শিক্ষাকেন্দ্র গুলোতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। একদিকে 'দরবারে আকবরী; তাঁকে 'ইযদুল মালিক' (বাদশাহ সহযোগী) উপাধিতে অভিষিক্ত করে স্বীয় মূল্যায়নের প্রমাণ দেয়। অন্যদিকে সেই শাহ ফাতহুল্লাহ্ শিরাজী পাঠ্যক্রমে যেসব পরিবর্ধন করেছিলেন তা নিঃসংকোচে মেনে নেন তৎকালীন আলিমগণ। নিতান্ত অন্যায় হবে যদি এখানে আমরা শায়খ ওয়াজীহ উদ্দীন আলভী গুজরাটীকে বিস্মৃত করি। এ বুযুর্গ গবেষক দাওয়্যানীর পরোক্ষ শাগরেদ ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম পরবর্তী আলেমদের রচিত গ্রন্থাদির প্রচলন ঘটিয়েছেন। ইলমের এ ঝর্ণাধারা হতে শুধু গুজরাটই সিক্ত হয়নি বরং তার ছিটেফোটা মধ্যভারত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। নিউতনীর বাসিন্দা কাজী জিয়া উদ্দীন গুজরাট থেকে ইলমী তোহফা নিয়ে আসেন। আর শায়খ জামাল তাঁর কাছ তা অর্জন করে দূর-দূরান্ত ছড়িয়ে দেন। শায়খ জামাল এর যোগ্য ছাত্র মোল্লা লুতফুল্লাহর কাছ থেকে মোল্লা জিয়ূন, (নুরুল আনওয়ার রচয়িতা), মোল্লা আলী আসগর, কাজী আলীমুল্লাহ্, মোল্লা মুহাম্মদ জামান প্রমূখ আলেমগণ ইলম হাসিল করেন। এদের প্রত্যেকেই আধ্যাত্মিকতা ও পঠন পাঠনের যোগ্য ব্যক্তিত্ব।

তবে যখন শাহ ফতহুল্লাহ্ শিরাজী দরসটি চালু করেন তখনই তা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। পরে তাঁর শিষ্য এবং শিষ্যদের শিষ্যরা সারা ভারত ছড়িয়ে পড়লে তাঁর দরসেরও প্রচার-প্রসার ঘটে। শাহ ফতহুল্লাহর সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন মুফতী আবদুস সালাম। তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত লাহোরে বসে হাজার হাজার জ্ঞানপিপাসুকে ইলম দান করেন। তবে হাজারে এক-দুই জনই এমন হতো যারা খ্যাতি ও স্থায়ীত্বের ডিগ্রী পেতো। 'দিওয়াহ্' অঞ্চলের মুফতী আবদুস সালাম ও এলাহাবাদের শায়খ মুহিব্বুল্লাহ ছিলেন সেই দু'-একজন সৌভাগ্যবানদের মধ্যে যারা লাহোর থেকে জ্ঞানের মশাল এনে এতদঞ্চলে দরস-তাদরীসের শ্রেষ্ঠত্বের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আমল কায়েম করেন। প্রসিদ্ধ 'দরসে নিজামিয়া'র প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা নিযামুদ্দীনের সম্মানিত পিতা শায়খ কুতুবুদ্দীন সাহালভী পরোক্ষ ভাবে এ দু'জনেরই সুযোগ্য শাগরেদ ছিলেন।

শাহ ওয়ালি উল্লাহ্ দেহলভী (মৃত্যু. ১১৭৪ হি.) এ যুগের সর্বশেষ; তবে সব চেয়ে ধীমান ও মেধা সম্পন্ন আলেম ছিলেন। শাহ সাহেব ব্যাপক ভাবে আরব দেশে সফর করেন। সেখানে কয়েক বছর থেকে শায়খ আবু তাহের মাদানীর নিকট ইলমে হাদীস সমাপ্ত করেন। পরে জ্ঞানের এ হাদিয়া ভারত নিয়ে আসেন এবং এমন তৎপরতার সাথে তার প্রচার প্রসারে লেগে যান যে, প্রতিকুল পরিবেশ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তার স্মৃতি চিহ্ন রয়ে গেছে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র। প্রকৃত পক্ষে 'সিহাহ সিত্তাহ'র পঠন-পাঠন ভারতে তখন থেকেই আরম্ভ হয় যখন শাহ সাহেব ও তাঁর প্রখ্যাত উত্তরসূরীরা তা চালু করেন এবং তাঁদের মুল্যবান জীবনের অধিকাংশ সময় হাদীস চর্চার বিকাশে ব্যয় করেন। শাহ সাহেব নিজেও স্বীয় মডেলের একটি পাঠ্যক্রম তৈরী করেছিলেন যেহেতু সে সময় ইলমের আসল কেন্দ্র দিল্লি থেকে লক্ষ্ণৌ স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানতিক ও হিকমাতের স্বাদের সাথে পরিচিত হচ্ছিল ছাত্র-শিক্ষকের রসনায় তাই নতুন পাঠ্যক্রম উপাদেয় হয়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px