📄 অউধের এলাকা
এ খান্দানের শিষ্যরাও ভারতের প্রতিটি কোণায় কোনায় জ্ঞানের আলো বিস্তারে কোন ত্রুটি করেননি। কুতুবুদ্দীন শামসাবাদী, কুতুব উদ্দীন গোপামুয়ী, মুহিব্বুল্লাহ্ বিহারী, আমানুল্লাহ্ বেনারসী, মৌলভী ইয়াদুল্লাহ্, মৌলভী ফযল ইমাম, মৌলভী ফযলে হক ও তাঁদের নয়নমনি মৌলভী আবদুল হক প্রমুখ- সবাই সেই জ্ঞান সাগর হতে পরিতৃপ্ত ছিলেন।
অউধের প্রতিটি গ্রামে ছিলো ইলমের চর্চা সম্প্রসারিত। এ রকম কোন দূর্ভাগা পাওয়া কঠিন ছিলো যেখানে ইলমের আলো পৌঁছেনি। সব চেয়ে প্রসিদ্ধ স্থান সমূহ ছিলো: জায়েস, আমেঠী, হরগা, নিউতনী, গোপামুঁ, বিলগ্রাম, সিন্দালিয়া, কাকুরী, প্রভৃতি। এ সব স্থানে এত বেশী আলিম জন্ম নিয়েছেন যাদের নযীর পাওয়া ছিল অন্যান্য দেশে দূরূহ ব্যাপার।
📄 পাঠ্যক্রমের বিভিন্ন স্তর
এখানে সহজতর প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রচলিত পাঠ্যক্রমের চারটি যুগের বর্ণনা করা সমীচিন মনে করি। প্রতিটি যুগে যেসব বই-পুস্তক প্রচলিত ছিলো তার বিবরণও যতটুকু সম্ভব ইতিহাস থেকে, বিভিন্ন স্তরের মাশায়িখ হতে, কবিদের আলোচনা থেকে উপস্থাপন করলে ভাল হয়। দেখতে এ কাজটা হালকা মনে হলেও কিন্তু হাজার হাজার পৃষ্ঠা মন্থন করার পর যে ফলাফলে আমরা পৌঁছেছি তাই পাঠক মহলের উদ্দেশ্যে পেশ করছি।¹
টিকাঃ
১. এ বইয়ে এমন সব পাঠ্য বই সমূহের তালিকা বাদ দেয়া হয়েছে। যেহেতু তা শুধু গবেষকদেরই প্রিয় বিষয়। বিস্তারিত জানার জন্যে মূল লেখা দ্রষ্টব্য।
📄 প্রথম যুগ
এ যুগের সূচনা হিজরী সপ্তম শতাব্দী হতে আর এর শেষ দশম শতাব্দীর তখন হয় যখন দ্বিতীয় যুগ শুরু হয়ে যায়। প্রায় দু'শ' বছর পর্যন্ত নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর অর্জন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি মনে করা হতো। বিষয় সমূহ হচ্ছে নাহু-ছরফ, বালাগাত, ফিক্হ, উসূলে ফিক্হ, মানতিক, তাসাউফ, তাফসীর ও হাদীস। এ যুগের স্বনামধন্য আলিমদের জীবনী অনুসন্ধানে জানা যায় যে, আমাদের যুগে 'মানতিক' ও 'ফালসাফা' যেমন শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি তেমনি সে যুগে ছিল ফিক্হ ও উসূলে ফিক্হ।
📄 দ্বিতীয় যুগ
হিজরী নবম শতাব্দীর শেষদিকে শায়খ আবদুল্লাহ ও শায়খ আযীযুল্লাহ মুলতান থেকে আগমন করেন।² শায়খ আবদুল্লাহ দিল্লিতে এবং শায়খ আযীযুল্লাহ অবস্থান নেন সাম্বলে। সুলতান সিকান্দার লোদী হৃদয় উজাড় করে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। এমনকি স্বয়ং বাদশাহ শাখ আবদুল্লাহর দরসের হালকায়ে অংশ গ্রহন করতেন। তাঁর আগমনে দরসের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হবে এ আশঙ্কায় তিনি মসজিদের এক কোণে বসে তাঁর বক্তব্য শুনতেন। দরস সমাপ্ত হলে শায়খের খিদমতে গিয়ে সাক্ষাত করতেন।
এ শায়খদ্বয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও পান্ডিত্বের কারণে এবং পাশাপাশি বাদশাহর আন্তরিক মূল্যায়নে খুব দ্রুত তাঁদের ইলমী খ্যাতি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। তারা 'ফযিলতের' মান আরো একটু বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কাজী ইব্দ রচিত 'মাতালে' ও 'মাওয়কিফ' গ্রন্থদ্বয়¹ এবং সাকাকী রচিত 'মিফতাহুল উলুম'² তাদের দরসে সংযোজিত করেন। খুব অল্প সময়ে এসব গ্রন্থের বহুল প্রচলন ঘটে।
এ যুগেই মীর সায়্যিদ শরীফের ছাত্ররা 'শারহে মাতালে' এবং 'শারহে মাওয়াকিফ' ব্যাখ্যাগ্রন্থ দ্বয় চালু করেন। আল্লামা তাফতাযানীর শাগরেদরা 'মুতাওয়াল' ও 'মুখতাসার' এর গোড়াপত্তন করলেন এবং প্রচলন করেন 'তালভীহ'³ ও 'শরহে আক্বায়েদে নাসাফী'⁴ গ্রন্থ সমূহের। এ সময়ে 'শারহে বেকায়া'⁵ এবং 'শারহে মোল্লা জামী'⁶ ধীরে ধীরে পাঠ্যক্রমে ঢুকে পড়ে।
এ যুগের সব চেয়ে শেষ; তবে সব চেয়ে খ্যাতনামা আলেম শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী ভারত থেকে আরব তাশরীফ নিয়ে যান। যেখানে তিন বছর অবস্থান করে মক্কা-মদীনার আলেমদের নিকট হাদীসের তাকমীল করেন এবং সে ইলমী তোহফা নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি এবং তাঁর সন্তানরা সর্বদা ইলমের প্রচার প্রসারের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু দূঃখের বিষয়, তা জনপ্রিয়তা লাভে ব্যর্থ হয়। এ সম্মান পরবর্তী যুগে জনাব শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ দেহলভী (রহ.) এর ভাগ্যে জোটে। তিনি এ ইলমের প্রচার প্রসার ঘটান সফলতার সাথে।
টিকাঃ
২. আলিমদ্বয় মূলতানের পার্শ্ববর্তী এলাকা তুলাম্বার অধিবাসী ছিলেন।
১. ইলমে কালামের দু'টি মৌলিক গ্রন্থ।
২. অলঙ্কার শাস্ত্রের দু'টি প্রসিদ্ধ বইয়ের নাম; যা এখনো প্রাচীন পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
৩. উলূমে ফিকাহ।
৪. ইলমে আক্বায়েদ।
৫. ফিকহে হানাফী।
৬. মানতিকের রঙ মিশ্রিত আরবী ব্যাকরণের একটি গ্রন্থ।