📄 দিল্লী
যখন দিল্লি জয় হলো, রাজা-বাদশাহদের মূল্যায়ন পেয়ে যোগ্য আলিম-উলামা চারদিক থেকে দিল্লি আসতে থাকেন। এক সময় দিল্লিতে এমন বড় বড় মর্যাদাবান উলামার সমাগম হয়ে গেলো যাদের খ্যাতি শুনে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতো এবং উপকৃত হতো। গিয়াস উদ্দীন বলবনের সময় শামসুদ্দীন খাওয়ারজমী, শামসুদ্দীন কৌশজী, বুরহানুদ্দীন বলখী, বুরহানুদ্দীন বাযায, নজমুদ্দীন দেমশকী, কামালুদ্দীন জাহেদ এর মত বিশজন এমন যোগ্য আলেম ছিলেন যাদের ইলম ও শ্রেষ্টত্বের কারণে দিল্লির অলিগলিগুলো কর্ডোবা ও বাগদাদের রূপ পরিগ্রহ করে। আলাউদ্দীন খলজীর যুগে জহীরুদ্দীন ভকরী, ফরীদুদ্দীন শাফেঈ, হামীদুদ্দীন মুখলিস, শামসুদ্দীন নাজী, মুহীউদ্দীন কাশানী, ফখরুদ্দীন হালুভী, ওয়াজীউদ্দীন রাজী, তাজুদ্দীন মুকাদ্দাম এর মত ছয় চল্লিশজন এমন উঁচু মানের আলেম ছিলেন যাদের সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ জিয়াউদ্দীন বারণীর মন্তব্য হলো, 'সমকালীন পৃথিবীতে তারা ছিলো নজীরবিহীন।'
মুহাম্মদ শাহ তুঘলকের সামনে মুঈনুদ্দীন উমরানী, কাজী আবদুল মুকতাদির, মাওলানা খাজাগী শায়খ আহমদ থানেশ্বরী-এর মত সুযোগ্য আলেমরা ছিলেন যাদের লালন-পালনের ছোঁয়া পেয়ে শিহাবুদ্দীন দৌলতাবাদী 'মালিকুল উলামা' (উলামারাজ) হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। সারা দুনিয়ার দৃষ্টি যখন তাঁর দিকে নিবদ্ধ ছিলো ফিরোজ শাহের সময় জালালুদ্দীন রূমী তাশরীফ আনলে তাঁকে শাহী মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব সোপর্দ করা হলো। নজমুদ্দীন সমরকন্দীও সে সময়ে দিল্লি এসেছিলেন এবং দীর্ঘ দিন স্বীয় জ্ঞান ও যোগ্যতা দিয়ে জ্ঞান পিপাসুদের ধন্য করতে থাকেন। সিকান্দার লোদীর যুগে শায়খ আবদুল্লাহ্ ও আজীজুল্লাহ খ্যাতিমান আলিমদ্বয় মুলতান থেকে এসে মানতিক ও হিকমাত এর মান বাড়িয়ে প্রচলিত পাঠ্যক্রমে জোরদার ভূমিকা রাখেন।
বাদশাহ আকবরের আমলে শাহ ফতহুল্লাহ সিরাজী আসলে 'আযদুল মালিক' (বাদশাহর সহযোগী) উপাধি লাভে সম্মানিত হন। শুধু তাই নয়; তাঁর আগমনে সারা দেশে ধুম পড়ে গেলো। একই সময়ে হাকীম শামসুদ্দীন এবং তার ভাগিনা হাকীম আলী গিলানীর মাধ্যমে চিকিৎসা বিদ্যার প্রসার ঘটে। আর শায়খ আবদুল হকের মাধ্যমে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ইলমে হাদীসের আলো।
শাহজাহান ও আলমগীরের শাসনামলে মীর জাহেদের জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের আলো বিকিরিত হচ্ছিলো চারিদিকে। তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা সমূহ এ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে যোগ করেছিল সৌভাগ্যের সব পালক। দরসে নেযামিয়ার ভিত্তি তাঁর জোরদার হাতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁর ধারাবাহিক শিষ্যত্ব লাভ করেছিলেন কাজী মুবারক এবং শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ সাহেবের প্রসিদ্ধ খান্দান আর এ খান্দানেই জন্ম নিয়েছেন জনাব শাহ আবদুল আজীজ, শাহ রফীউদ্দীন, শাহ আবদুল কাদির, মাওলানা আবদুল হাই, শাহ মুহাম্মদ ইসমাঈল, মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, মাওলানা রশীদুদ্দীন খান, মুফতী সদরুদ্দীন খান, মাওলানা মমলূকুল আলী প্রমুখ আলেম ও শিক্ষাবিদগণ।
📄 লাহোর
লাহোরে ইলমের চর্চা ও প্রচার-প্রসার দিল্লির আগেই ঘটেছিল। তবে দিল্লির পরবর্তী অগ্রগতির সামনে তা কিছুদিনের জন্য চাপা পড়েছিল। পরে অবশ্যই সামনে গিয়েছিল। সুতরাং জালালুদ্দীন, কামাল উদ্দীন, মুফতী আবদুস সালাম, মোল্লা আবদুল হাকীম শিয়ালকুটী প্রমূখ খ্যাতিমানদের কারণে দীর্ঘদিন পর্যন্ত লাহোরে ইলমের চর্চা অব্যাহত ছিলো। এ সময়ে হাজার হাজার জ্ঞান পিপাসু ছাত্র তাঁদের দ্বারা উপকৃত হয়।
📄 জৌনপুর
প্রাচ্যাঞ্চলীয় বাদশাহদের আমন্ত্রণে জৌনপুরে শায়খ আবুল ফাতেহ শিহাবুদ্দীন দৌলতাবাদী, মাওলানা আল-হাদাদ, উস্তাদুল মুলক মুহাম্মদ আফজাল, 'শামসে বাজেগা' প্রণেতা মাওলানা মাহমূদ, দেওয়ান আবদুর রশীদ, মুফতী আবদুল বাকী, মোল্লা নুরুদ্দীন এর মতো যোগ্য আলেমরা কালের পরিক্রমায় জন্ম নিয়েছেন এবং তাঁদের শিষ্যরা গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়েন।
📄 গুজরাট
গুজরাটে 'মাজমাউল বিহার' এর লিখক শায়খ মুহাম্মদ তাহের পাটনী, শায়খ ওয়াজীহুদ্দীন আলভী গুজরাটী, মোল্লা নূরুদ্দীন প্রমূখ আলেমরা ইলমের বারি ধারা বর্ষণ করেছেন। একই সময়ে নিউতনী নিবাসী কাজী যিয়াউদ্দীন গুজরাটে এসে শায়খ ওয়াজীহুদ্দীনের নিকট লালিত হন। পরবর্তীতে দীর্ঘ তরবিয়তের ইলমী তোহফা স্বদেশবাসীর জন্যে বহন করে নিয়ে যান। তাঁর দ্বারা শায়খ জামাল উপকৃতহন, যার কাছে জ্ঞান অর্জন করেন মোল্লা লুতফুল্লাহ। শেষোক্ত আলেমের শিষ্যদের মধ্যে 'নুরুল আনওয়ার' রচয়িতা মোল্লা জিয়ুন, মোল্লা আলী আসগর, মোল্লা মুহাম্মদ জামান, কাজী আলীমুল্লাহ্ খুব বেশী প্রসিদ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে প্রত্যেকেই দীর্ঘ কালব্যাপী পঠন পাঠন ও অধ্যাত্ম সাধনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন।