📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 প্রাচীন পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাকেন্দ্র সমূহ

📄 প্রাচীন পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাকেন্দ্র সমূহ


ভারতের মুসলিম যুগে প্রচলিত পাঠ্যসূচীর বিন্যাস এবং সেই পাঠ্যসূচীতে পরিবর্তন-পরিবর্দ্ধনের ইতিহাস খুবই দীর্ঘ ও সুক্ষ্ম। কারণ তা আটশ' বছরের জ্ঞান ও শিক্ষার এমন এক ঐতিহাসিক পর্যালোচনা যার বিষয়গুলো ইতিহাস, মনীষীদের জীবনী, বুজুর্গদের মুখের বাণী এবং তাদের লেখাতে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়েছে। একইভাবে সেই পাঠ্যসূচীর প্রবর্তক, শিক্ষক এবং শিক্ষাকেন্দ্র গুলোর তালিকাও সুদীর্ঘ। মুসলমান রাজা-বাদশাহ, আমীর, হিতাকাঙ্ক্ষী, বিদ্যোৎসাহী ও মধ্যবিত্ত লোকেরাই গ্রাম-গঞ্জে, জায়গায়-জায়গায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এখন সেগুলোর সঠিক সংখ্যা ও ধরণ বা পদ্ধতি জানার উপায় নেই।¹

এ পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন সময় যে সব পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাধিত হয়েছে এবং তা এ ক্ষেত্রে যেসব পরিবার-খান্দানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে সেগুলোর বিবরণও এ সংক্ষিপ্ত গ্রন্থের অওতা বহির্ভূত। গোটা বিষয়টাই গবেষণামূলক। এখানে ভারতের মুসলিম যুগের এক খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ মাওলানা হাকীম আবদুল হাই (রহ.)-এর এতদ সংশ্লিষ্ট একটি লেখার অংশ বিশেষ উপস্থাপিত হচ্ছে সংক্ষিপ্ত সংযোজন-বিয়োজন সহকারে। এতে দেশব্যাপী ইলমী আন্দোলন এবং আন্দোলনের পরিবর্তন ও অগ্রগতির এমন একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র পাঠকের চোখের সামনে এসে যাবে যা ভারতের সাধারণ ইতিহাসের গ্রন্থ সমূহে পাওয়া যায় না। মাওলানা মরহুম এক লেখায়² বলেন : 'ইতিহাস বলে, ভারত বিজেতাদের সাথে সাথে এদেশে ইলম তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানের আগমন ঘটেছিল। সুতরাং ইরান ও মাওয়ারাউন্নাহার অঞ্চল সমূহে যুগ-যুগান্তরে প্রবাহিত পরিবর্তনের হাওয়া এখানকার পাঠ্যক্রমেও লাগতো।

টিকাঃ
১. মাওলানা সায়ি‍্যদ আবদুল হাই (রহ.) সাহেব স্বীয় মূল্যবান পুস্তক 'জান্নাতুল মাশারিক'-এ অত্যন্ত পরিশ্রম করে এসব মাদ্রাসার অনুসন্ধান চালিয়েছেন যার আলোচনা ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থে কোথাও মৌলিক আবার কোথাও প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে। তাতে প্রায় ১০৩ টি মাদ্রাসার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য, তার মধ্যে একটি মহিলা মাদ্রাসাও ছিলো এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে দানশীলা মহিলাও ছিলেন।
২. আন্-নদওয়া (প্রথম যুগ) ১৯০৯ ইং ষষ্ঠ খন্ড, নং-১, এ লেখাটি আলাদা পুস্তকাকারে 'ভারতের পাঠ্যক্রম ও তার পরিবর্তন সমূহ' শিরোনামে নদওয়াতুল উলামা হতে প্রকাশিত হয়েছে।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 সিন্ধু ও মুলতান

📄 সিন্ধু ও মুলতান


সর্বপ্রথম সিন্ধু ও মুলতানের মরুভূমিতে ইলমের আলো জ্বলে। এ আলোর ঝিকিমিকি পরবর্তীতে এতোই বৃদ্ধি পায় যে, সারা ভারতে তার প্রভা ছড়িয়ে পড়ে। গজনোবা এর রাজারা যখন লাহোরকে ভারতের রাজধানী বানালেন তখন এ রাজধানী শহরও প্রায় সর্বপ্রথম জ্ঞানের এ আলো থেকে উপকৃত হয়।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 দিল্লী

📄 দিল্লী


যখন দিল্লি জয় হলো, রাজা-বাদশাহদের মূল্যায়ন পেয়ে যোগ্য আলিম-উলামা চারদিক থেকে দিল্লি আসতে থাকেন। এক সময় দিল্লিতে এমন বড় বড় মর্যাদাবান উলামার সমাগম হয়ে গেলো যাদের খ্যাতি শুনে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতো এবং উপকৃত হতো। গিয়াস উদ্দীন বলবনের সময় শামসুদ্দীন খাওয়ারজমী, শামসুদ্দীন কৌশজী, বুরহানুদ্দীন বলখী, বুরহানুদ্দীন বাযায, নজমুদ্দীন দেমশকী, কামালুদ্দীন জাহেদ এর মত বিশজন এমন যোগ্য আলেম ছিলেন যাদের ইলম ও শ্রেষ্টত্বের কারণে দিল্লির অলিগলিগুলো কর্ডোবা ও বাগদাদের রূপ পরিগ্রহ করে। আলাউদ্দীন খলজীর যুগে জহীরুদ্দীন ভকরী, ফরীদুদ্দীন শাফেঈ, হামীদুদ্দীন মুখলিস, শামসুদ্দীন নাজী, মুহীউদ্দীন কাশানী, ফখরুদ্দীন হালুভী, ওয়াজীউদ্দীন রাজী, তাজুদ্দীন মুকাদ্দাম এর মত ছয় চল্লিশজন এমন উঁচু মানের আলেম ছিলেন যাদের সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ জিয়াউদ্দীন বারণীর মন্তব্য হলো, 'সমকালীন পৃথিবীতে তারা ছিলো নজীরবিহীন।'

মুহাম্মদ শাহ তুঘলকের সামনে মুঈনুদ্দীন উমরানী, কাজী আবদুল মুকতাদির, মাওলানা খাজাগী শায়খ আহমদ থানেশ্বরী-এর মত সুযোগ্য আলেমরা ছিলেন যাদের লালন-পালনের ছোঁয়া পেয়ে শিহাবুদ্দীন দৌলতাবাদী 'মালিকুল উলামা' (উলামারাজ) হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। সারা দুনিয়ার দৃষ্টি যখন তাঁর দিকে নিবদ্ধ ছিলো ফিরোজ শাহের সময় জালালুদ্দীন রূমী তাশরীফ আনলে তাঁকে শাহী মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব সোপর্দ করা হলো। নজমুদ্দীন সমরকন্দীও সে সময়ে দিল্লি এসেছিলেন এবং দীর্ঘ দিন স্বীয় জ্ঞান ও যোগ্যতা দিয়ে জ্ঞান পিপাসুদের ধন্য করতে থাকেন। সিকান্দার লোদীর যুগে শায়খ আবদুল্লাহ্ ও আজীজুল্লাহ খ্যাতিমান আলিমদ্বয় মুলতান থেকে এসে মানতিক ও হিকমাত এর মান বাড়িয়ে প্রচলিত পাঠ্যক্রমে জোরদার ভূমিকা রাখেন।

বাদশাহ আকবরের আমলে শাহ ফতহুল্লাহ সিরাজী আসলে 'আযদুল মালিক' (বাদশাহর সহযোগী) উপাধি লাভে সম্মানিত হন। শুধু তাই নয়; তাঁর আগমনে সারা দেশে ধুম পড়ে গেলো। একই সময়ে হাকীম শামসুদ্দীন এবং তার ভাগিনা হাকীম আলী গিলানীর মাধ্যমে চিকিৎসা বিদ্যার প্রসার ঘটে। আর শায়খ আবদুল হকের মাধ্যমে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ইলমে হাদীসের আলো।

শাহজাহান ও আলমগীরের শাসনামলে মীর জাহেদের জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের আলো বিকিরিত হচ্ছিলো চারিদিকে। তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা সমূহ এ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে যোগ করেছিল সৌভাগ্যের সব পালক। দরসে নেযামিয়ার ভিত্তি তাঁর জোরদার হাতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁর ধারাবাহিক শিষ্যত্ব লাভ করেছিলেন কাজী মুবারক এবং শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ সাহেবের প্রসিদ্ধ খান্দান আর এ খান্দানেই জন্ম নিয়েছেন জনাব শাহ আবদুল আজীজ, শাহ রফীউদ্দীন, শাহ আবদুল কাদির, মাওলানা আবদুল হাই, শাহ মুহাম্মদ ইসমাঈল, মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, মাওলানা রশীদুদ্দীন খান, মুফতী সদরুদ্দীন খান, মাওলানা মমলূকুল আলী প্রমুখ আলেম ও শিক্ষাবিদগণ।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 লাহোর

📄 লাহোর


লাহোরে ইলমের চর্চা ও প্রচার-প্রসার দিল্লির আগেই ঘটেছিল। তবে দিল্লির পরবর্তী অগ্রগতির সামনে তা কিছুদিনের জন্য চাপা পড়েছিল। পরে অবশ্যই সামনে গিয়েছিল। সুতরাং জালালুদ্দীন, কামাল উদ্দীন, মুফতী আবদুস সালাম, মোল্লা আবদুল হাকীম শিয়ালকুটী প্রমূখ খ্যাতিমানদের কারণে দীর্ঘদিন পর্যন্ত লাহোরে ইলমের চর্চা অব্যাহত ছিলো। এ সময়ে হাজার হাজার জ্ঞান পিপাসু ছাত্র তাঁদের দ্বারা উপকৃত হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px