📄 নদওয়াতুল মুসান্নিফীন দিল্লি
দিল্লিতে অবস্থিত 'নাদওয়াতুল মুসান্নিফীন' এ শ্রেণীরই অপর শিক্ষা সংস্থা। যা ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক কয়েক ডজন গ্রন্থ প্রকাশ করে। দেশের শিক্ষিত ও ধর্মীয় মহলে এসব গ্রন্থ ব্যাপক সমাদর লাভ করে। এর প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালকদের মধ্যে মাসিক 'বুরহান' সম্পাদক মাওলানা মুফতী আতীকুর রহমান উসমানী ও মাওলানা সাইয়েদ আহমদ আকবরাবাদীর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
📄 মজলিস-ই- তাহকীকাত ওয়া নাশরিয়াতে ইসলাম, আলীগড় মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স
কতিপয় বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন ও ইসলামের চৌকস দাঈর প্রচেষ্টায় ১৯৫৯ ইংরেজীতে নদওয়াতুল উলামার চৌহদ্দিতে প্রতিষ্ঠিত হয় মজলিসে-ই-তাহকীকাত ওয়া নাশরিয়াত-ই-ইসলাম। এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো, আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীকে যারা ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে গেছেন, ইসলামের আবেদন, বৈশিষ্ট্য, শ্রেষ্ঠত্বের সাথে নতুন ভাবে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভাষায় বেশ কিছু গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ প্রবন্ধ আধুনিক শিক্ষিত লোকদের দোরগোড়ায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে, যাতে তাঁরা ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পান। 'নতুন তুফান ও তার প্রতিকার' নামক এক পুস্তিকা দিয়েই কার্যক্রম শুরু হয়। এই পুস্তিকা যা দিয়ে অত্র প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরম্ভ; আধুনিক শিক্ষিতদের ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরত্ব ও ইসলামী আক্বিদা, আমল প্রভৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা যে ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তা চমৎকারভাবে এতে চিত্রায়িত হয়েছে এবং ক্রমশ এর ফলে ইসলামের সাথে আধুনিক শিক্ষিতদের বন্ধন শিথিল হবার বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছে সার্থকভাবে। আর এই বন্ধনকে পুনঃউজ্জীবিত ও সুদৃঢ় করার মহান লক্ষ্যে এধরণের পরিশীলিত প্রবন্ধ-পুস্তিকার রচনা ও আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে তা প্রকাশ ও প্রসার করা একটি অতীব জরুরী কর্তব্য। এতে ইসলামী চিন্তাধারা, সংস্কৃতি এবং দ্বীনের স্বরূপ হৃদয়গ্রাহী ও মনোজ্ঞ রীতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটা সময়ের এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন ও দাবীও বটে। উপরিউক্ত লক্ষ্য হাসিলের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ইসলামী শিক্ষাবিদদের মনোযোগ ও পারস্পরিক মতবিনিময় এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। উল্লিখিত আমার ছোট পুস্তি কাটি আরবী, উর্দু এবং ইংরেজী তিন ভাষাতেই প্রকাশিত হয়েছে এবং বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এর পর থেকে এই প্রতিষ্ঠান বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলী প্রকাশ করতে শুরু করে। আনুমানিক ৩২/৩৩ বছরে আড়াই শ'- এর মত গ্রন্থ এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়ে সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে। কতিপয় গ্রন্থের ইংরেজী, আরবী, ফার্সি, তুর্কী, ফরাসী, ইন্দোনেশিয়ান ও হিন্দী ভাষায় অনুবাদও প্রকাশিত হয়। এসব গ্রন্থ শিক্ষিত মহলের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। এসব কিতাবাদির লেখকদের মধ্যে এমন শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদগণ আছেন যাদের রচনাকর্ম ও গ্রন্থ সর্বত্র ব্যাপকভাবে সমাদৃত। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, শরয়ী বিধানের গুঢ়রহস্য, ইসলামের ইতিহাস, ইসলামী গবেষণা ও চিন্তাধারা, ইসলামী সংস্কৃতি, ইসলাম ও অনৈসলামিক দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক বিশ্লেষণ, মুসলিম দেশ সমূহে দাওয়াতী সফরের ইতিবৃত্ত, দাওয়াতী বক্তৃতা সমূহ এবং এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ইংরেজীতে এর নাম: Academy of Islamic Research & Publication আরবীতে 'আল-মাজমাউল ইসলামী আল-ইলমী'। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও তার প্রয়োজনীয় বিষয়াদি চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা ও সার্বিক তৎপরতার জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিষদ রয়েছে। এর সাথে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষিত মহল এবং লেখক-গবেষকগণ সম্পৃক্ত আছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার অঙ্গনে অবস্থিত। নাদওয়াতুল উলামা এবং প্রতিষ্ঠার পরস্পর সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ।
আলীগড় মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স:
মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স ভারতবর্ষের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রাচীনতম শিক্ষা সংস্থা, যা ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে স্যার সৈয়দ আহমদ খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল, ভারতবর্ষের মুসলমানদের মাঝে শিক্ষা ব্যাপক প্রসার ও মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যাদি সমাধান করা। মুসলমানদের শিক্ষা ও রাজনৈতিক জাগরণ সৃষ্টিতে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগের আন্দোলনের সৃষ্টি এখান থেকেই হয়। ১৯২ খ্রিষ্টাব্দে রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠানে কর্মপরিধি ও তৎপরতা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। অতীতে ভারতবর্ষের বিখ্যাত ও মর্যাদাশীল শিক্ষাবিদ, রাজনীতিকগণ বিশেষত স্যার সাইয়েদ আহমদ খান, নবাব ভিকারুল মুলক, নবাব সদর ইয়ার জঙ্গ, মাওলানা হাবীবুর রহমান শিরওয়ানী প্রমুখ এ প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা স্বীয় যুগে এ প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারী ছিলেন।
📄 ধর্মীয় শিক্ষাবোর্ড ও শিক্ষা কাউন্সিল
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর যদিও নিজের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় সংবিধান বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমতা ভিত্তিক নীতিমালা ও নাগরিক মর্যাদা প্রদান করেছিল এবং তাদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের অঙ্গীকার করেছিল। এসব কিছুর পরও বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসে এমন কতিপয় শিক্ষানীতি মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়, যা মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নাস্তিক্যের দ্বার উন্মোচন করে দিলো, এটা তাদের আক্বীদা-বিশ্বাস ও মৌলিক নীতিমালার বীজকে অঙ্কুরেই নিঃশেষ করে দেয়ার নামান্তর।¹ এসব ভয়ঙ্কর সংকট মুকাবিলা এবং তাদের জাতীয় অস্তিত্ব, চেতনা ও মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তর প্রদেশ ধর্মীয় শিক্ষাবোর্ড এবং ধর্মীয় শিক্ষা কাউন্সিল। ধর্মীয় শিক্ষা কাউন্সিল বিভিন্ন পেশা ও চিন্তাধারার নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের পথনির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় শিক্ষা আন্দোলনের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
টিকাঃ
১. বিস্তারিত জানার জন্য "মুসলমানদের বর্তমান সমস্যা ও তার প্রতিকার" গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।
📄 দায়েরাতুল মা’আরিফ হায়দ্রাবাদ
ভারতবর্ষের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র গুলোর মধ্যে দায়েরাতুল মা'আরিফ হায়দ্রাবাদ এর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতিষ্ঠান ধর্ম, ইতিাস ও শিক্ষা বিষয়ক বেশ কিছু অমূল্য গ্রন্থ প্রাচীন গ্রন্থাগারের অতল গহ্বর থেকে বের করে এনে প্রকাশনা ও পরিবেশনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে দেশের শীর্ষ পুরোধা ব্যক্তিত্ব সাইয়েদ হোসাইন বিলগ্রামী, মোল্লা আবদুল কাইয়ুম, ফযীলত জঙ্গ মাওলানা আনওয়ার খান, হায়দ্রাবাদের সাবেক প্রধান উস্তাদ মীর উসমান আলীর প্রাণান্তকর প্রয়াসে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। 'দায়েরাতুল মা'আরিফ' হাদীস বর্ণনাকারীগণের ইতিবৃত্ত, ইতিহাস, হিসাব বিজ্ঞান এবং দর্শন শাস্ত্রের এমন দেড় শতাধিক কিতাব পাঠকের খিদমতের উপস্থান করে যা ইতোপূর্বে প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলো। শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, প্রাজ্ঞ শিক্ষক মহল, বিদগ্ধ গবেষক শ্রেণী এতদিন এসব গ্রন্থের কেবল নাম শুনে আসছিলেন। 'দায়েরা' এর উদ্যোগের সুবাদে এই প্রথম গ্রন্থগুলো আলোর মুখ দেখলো। ওলামায়ে কেরাম ও বিশ্লেষক মহল এসব গ্রন্থ থেকে প্রভূত উপকৃত হচ্ছেন। 'দায়েরা' এর এই কার্যক্রম শিক্ষা ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সর্বোপরি ভারতীয় মুসলমানদের জন্য এটি চিরন্তন ও যুগান্তকারী শিক্ষা কার্যক্রম এবং তাদের উন্নত জ্ঞান, অভিরুচি ও ধর্মীয় কৃতিত্বের সাক্ষর হয়ে থাকবে।¹ প্রাচ্য-প্রতীচ্যের বরেণ্য ও শীর্ষ শিক্ষাবিদগণ এই গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মহান খিদমতগুলোর সপ্রশংস স্বীকৃতি দিয়েছেন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জামেয়া আল-আযহার এর একটি শিক্ষা প্রতিনিধি দল ভারত সফরে আসলে প্রতিনিধি দলের প্রধান দায়েরাতুল মা'আরিফ সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেন :
"ইসলামী রচনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান যে অবদান রেখে চলেছে তা আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেছি।”
পূর্ববর্তী ওলামা এবং গবেষকদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় গ্রন্থ যা এ যাবতকাল যবনিকার আড়ালে ছিল এবং যেসব গ্রন্থাবলীর চিহ্ন পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু এসব গ্রন্থের নামের গুঞ্জরণ মৃদৃ অনুরণিত হচ্ছিল। জ্ঞান পিপাসু অন্তর ও অনুসন্ধিৎসু প্রতিভা এসব গ্রন্থ থেকে উপকৃত হবার জন্য ছটফট করছিল উদগ্র তৃষ্ণায়। দায়েরাতুল মা'আরিফ এর উৎসাহী কর্মী ও শিক্ষানুরাগী দায়িত্বশীলগণ এসব গ্রন্থরাজি কেবল খুঁজে বের করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং প্রয়োজনীয় পরিমার্জন, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং ফলপ্রসূ সংযোজনে সুসমৃদ্ধ করে তা প্রকাশ করেছেন। একাজে একদিকে তারা বিশাল ব্যয় বহুল প্রকল্পের ঝুঁকি নিয়েছেন এবং অন্যদিকে পরিমার্জন, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধা ও প্রতিভার অসামান্য পরিশ্রমের স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছেন।
টিকাঃ
১. মাওলানা সাইয়েদ হাশেম নদভী, ডা. আবদুল মুয়ীদ খানের পরিচালনায় এ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘকাল ব্যাপী তার মহান খিদমত আঞ্জাম দিয়ে এসেছে। আর্থিক টানাপোড়েন ও প্রতিকূলতার মাঝেও এটি আজো টিকে আছে।