📄 জামেয়া উসমানিয়া হায়দ্রাবাদ
জামেয়া ইসলামিয়া হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে উর্দুকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয় যা ভারতের জ্ঞান চর্চার ভাষা। আধুনিক জ্ঞান, দর্শন, হিকমাত, মনস্তত্ত্ব, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজ তত্ত্ব, ইতিহাসের এক বিশাল ভান্ডার, অন্যভাষা থেকে উর্দুতে অনুদিত হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন শাস্ত্রগত পরিভাষাগুলোর উর্দু রূপান্তর এবং প্রণয়নের কাজ আঞ্জাম দেয়ার মহান কর্তব্য সমাধা হয়ে যায়। অনুরূপভাবে এ প্রতিষ্ঠান উর্দু ভাষা শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভারতের কতিপয় সুযোগ্য শিক্ষকমন্ডলী এবং বিশেষজ্ঞ শাস্ত্রবিদ এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার খিদমত করেন।¹
পরিবর্তনের হাওয়া লেগে এটিও অন্যসব ইউনিভার্সিটির মত গতানুগতিক ও একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং উর্দুর পূর্বেকার সেই গুরুত্বও আর বাকী নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মুসলমানরা বিভিন্ন জায়গায় ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে কিছু স্বাতন্ত্রিক ব্যতিক্রম বাদে সাধারণতঃ সরকারী পাঠ্যক্রম ও বিষয়াদিই পড়ানো হয়। উত্তর ভারতের প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই এ ধরণের ইন্টারমেডিয়েট ও ডিগ্রী কলেজ অবস্থিত। দক্ষিণ ভারত, মাদ্রাজ ও কেরালাতে অনেক মুসলিম কলেজ রয়েছে, যার মধ্যে মাদ্রাজের নিউ কলেজ, ট্রিচিনিপলীর জামাল মুহাম্মদ কলেজ, করনুলের উসমানিয়া কলেজ এবং ক্যালিকটের অদূরে ফারুক কলেজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে আজমগড়ের শিবলী কলেজও উল্লেখ করার মতো প্রতিষ্ঠান।
টিকাঃ
১. যথা মাওলানা সাইয়েদ মানাযির আহসান গিলানী (রহ.) চেয়ারম্যান- দ্বীনিয়াত বিভাগ, মাওলানা আবদুল বা'রী নদভী, শিক্ষক-দ্বীনিয়াত ও আধুনিক দর্শন, প্রফেসর ইলিয়াস বারণী, শিক্ষক- সমাজ বিজ্ঞান, ডা. খলিফা আবদুল হালীম, অধ্যাপক- আধুনিক শাস্ত্র, ড. মীর ওয়ালিউদ্দীন (দর্শন) ড. হামীদুল্লাহ্, (রাষ্ট্রনীতি), হারুন খান শিরওয়ানী ড. রকীবুদ্দীন সিদ্দিকী, (হিসাব বিজ্ঞান), ড. মুহিউদ্দীন কাদেরী জ্বর, (উর্দু), ড. সাইয়েদ আবদুল লতীক (ইংরেজী)।
📄 দারুল মুসান্নিফীন আজমগড়
মাওলানা মানযূর নো'মানী ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে আজমগড়ে এক মর্যাদাশীল শিক্ষা ও প্রকাশনা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন, যা 'দারুল মুসান্নিফীন' নামে নামকরণ করা হয়। এর জন্য তিনি স্বীয় ব্যক্তিগত বাগান ও বাংলো ওয়াকফ করে দেন। তাঁর পর ২৫০ বছরের অধিককাল পর্যন্ত মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর (রহ.) সুযোগ্য নেতৃত্ব ও সুদক্ষ পরিচালনায় ধন্য ও সমৃদ্ধ হয় এই একাডেমী। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ লেখক ও গবেষকগণ মাযহাব, ইতিহাস ও সাহিত্যের নানা বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন; যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্ততঃ উর্দু ভাষায় শীর্ষ শ্রেণীর গ্রন্থ। এখানে লিখিত কতিপয় গ্রন্থ অন্যান্য ভাষায় রচিত গ্রন্থ থেকেও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠ ও অনন্য, যা ছাড়া কোন কুতুবখানা বা গ্রন্থাগার পূর্ণতার দাবী করতে পারেনা। বিখ্যাত শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক সাময়িকী 'আল-মারুফ' ও দারুল মুসান্নিফীন থেকে প্রকাশিত হয়, যার সম্পাদক মাওলানা সুলাইমান নদভী (রহ.)। তাঁর পর তাঁর সুযোগ্য ছাত্ররা যথাক্রমে এ দায়িত্বপালন করেন। যাদের মধ্যে মাওলানা শাহ মুঈনুদ্দীন আহমদ নাদভী, মাওলানা আবদু সালাম কিদওয়ায়ী নাদভী, এবং সাইয়্যেদ সাবাহ উদ্দীন আবদুর রহমান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
📄 নদওয়াতুল মুসান্নিফীন দিল্লি
দিল্লিতে অবস্থিত 'নাদওয়াতুল মুসান্নিফীন' এ শ্রেণীরই অপর শিক্ষা সংস্থা। যা ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক কয়েক ডজন গ্রন্থ প্রকাশ করে। দেশের শিক্ষিত ও ধর্মীয় মহলে এসব গ্রন্থ ব্যাপক সমাদর লাভ করে। এর প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালকদের মধ্যে মাসিক 'বুরহান' সম্পাদক মাওলানা মুফতী আতীকুর রহমান উসমানী ও মাওলানা সাইয়েদ আহমদ আকবরাবাদীর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
📄 মজলিস-ই- তাহকীকাত ওয়া নাশরিয়াতে ইসলাম, আলীগড় মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স
কতিপয় বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন ও ইসলামের চৌকস দাঈর প্রচেষ্টায় ১৯৫৯ ইংরেজীতে নদওয়াতুল উলামার চৌহদ্দিতে প্রতিষ্ঠিত হয় মজলিসে-ই-তাহকীকাত ওয়া নাশরিয়াত-ই-ইসলাম। এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো, আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীকে যারা ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে গেছেন, ইসলামের আবেদন, বৈশিষ্ট্য, শ্রেষ্ঠত্বের সাথে নতুন ভাবে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ভাষায় বেশ কিছু গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ প্রবন্ধ আধুনিক শিক্ষিত লোকদের দোরগোড়ায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে, যাতে তাঁরা ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পান। 'নতুন তুফান ও তার প্রতিকার' নামক এক পুস্তিকা দিয়েই কার্যক্রম শুরু হয়। এই পুস্তিকা যা দিয়ে অত্র প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরম্ভ; আধুনিক শিক্ষিতদের ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরত্ব ও ইসলামী আক্বিদা, আমল প্রভৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা যে ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তা চমৎকারভাবে এতে চিত্রায়িত হয়েছে এবং ক্রমশ এর ফলে ইসলামের সাথে আধুনিক শিক্ষিতদের বন্ধন শিথিল হবার বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছে সার্থকভাবে। আর এই বন্ধনকে পুনঃউজ্জীবিত ও সুদৃঢ় করার মহান লক্ষ্যে এধরণের পরিশীলিত প্রবন্ধ-পুস্তিকার রচনা ও আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে তা প্রকাশ ও প্রসার করা একটি অতীব জরুরী কর্তব্য। এতে ইসলামী চিন্তাধারা, সংস্কৃতি এবং দ্বীনের স্বরূপ হৃদয়গ্রাহী ও মনোজ্ঞ রীতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটা সময়ের এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন ও দাবীও বটে। উপরিউক্ত লক্ষ্য হাসিলের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ইসলামী শিক্ষাবিদদের মনোযোগ ও পারস্পরিক মতবিনিময় এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। উল্লিখিত আমার ছোট পুস্তি কাটি আরবী, উর্দু এবং ইংরেজী তিন ভাষাতেই প্রকাশিত হয়েছে এবং বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এর পর থেকে এই প্রতিষ্ঠান বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলী প্রকাশ করতে শুরু করে। আনুমানিক ৩২/৩৩ বছরে আড়াই শ'- এর মত গ্রন্থ এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়ে সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে। কতিপয় গ্রন্থের ইংরেজী, আরবী, ফার্সি, তুর্কী, ফরাসী, ইন্দোনেশিয়ান ও হিন্দী ভাষায় অনুবাদও প্রকাশিত হয়। এসব গ্রন্থ শিক্ষিত মহলের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। এসব কিতাবাদির লেখকদের মধ্যে এমন শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদগণ আছেন যাদের রচনাকর্ম ও গ্রন্থ সর্বত্র ব্যাপকভাবে সমাদৃত। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, শরয়ী বিধানের গুঢ়রহস্য, ইসলামের ইতিহাস, ইসলামী গবেষণা ও চিন্তাধারা, ইসলামী সংস্কৃতি, ইসলাম ও অনৈসলামিক দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক বিশ্লেষণ, মুসলিম দেশ সমূহে দাওয়াতী সফরের ইতিবৃত্ত, দাওয়াতী বক্তৃতা সমূহ এবং এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ইংরেজীতে এর নাম: Academy of Islamic Research & Publication আরবীতে 'আল-মাজমাউল ইসলামী আল-ইলমী'। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও তার প্রয়োজনীয় বিষয়াদি চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা ও সার্বিক তৎপরতার জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিষদ রয়েছে। এর সাথে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষিত মহল এবং লেখক-গবেষকগণ সম্পৃক্ত আছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দারুল উলূম নাদওয়াতুল উলামার অঙ্গনে অবস্থিত। নাদওয়াতুল উলামা এবং প্রতিষ্ঠার পরস্পর সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ।
আলীগড় মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স:
মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স ভারতবর্ষের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রাচীনতম শিক্ষা সংস্থা, যা ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে স্যার সৈয়দ আহমদ খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল, ভারতবর্ষের মুসলমানদের মাঝে শিক্ষা ব্যাপক প্রসার ও মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যাদি সমাধান করা। মুসলমানদের শিক্ষা ও রাজনৈতিক জাগরণ সৃষ্টিতে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগের আন্দোলনের সৃষ্টি এখান থেকেই হয়। ১৯২ খ্রিষ্টাব্দে রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠানে কর্মপরিধি ও তৎপরতা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। অতীতে ভারতবর্ষের বিখ্যাত ও মর্যাদাশীল শিক্ষাবিদ, রাজনীতিকগণ বিশেষত স্যার সাইয়েদ আহমদ খান, নবাব ভিকারুল মুলক, নবাব সদর ইয়ার জঙ্গ, মাওলানা হাবীবুর রহমান শিরওয়ানী প্রমুখ এ প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা স্বীয় যুগে এ প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারী ছিলেন।