📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আধুনিকশিক্ষার মুসলিম প্রতিষ্ঠান

📄 আধুনিকশিক্ষার মুসলিম প্রতিষ্ঠান


দারুল উলূম দেওবন্দের পদ্ধতি অনুসৃত অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের বিপরীতে মুসলমানগণ আলীগড়, দিল্লি এবং হায়দ্রাবাদে বহু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম তরুণ-যুবকদের আধুনিক ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ, বিদেশী ভাষা শিক্ষা, সরকারী বিভিন্ন পদে অংশ গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনধারা ও সংস্কৃতিতে যথাযথ অংশ গ্রহণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এসব প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করা হয়।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি

📄 আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি


মুসলমানদের আধুনিক চিন্তা চেতনা, জাতীয় মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে সক্রিয় অংশ গ্রহণে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারতবর্ষের বৃহৎ আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বিশিষ্ট মুসলিম দিকপাল ও বরেণ্য শিক্ষাবিদ স্যার সৈয়দ আহমদ খান মাদ্রাসাতুল উলূম নামে এটা প্রতিষ্ঠা করেন, পরে তা সাধারণ সমাজে আলীগড় কলেজ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৭৫ সালে সিপাহী বিপ্লবের পর মুসলমানরা শিক্ষা, সংস্কৃতির পরিমন্ডলে বিপর্যয় ও পতনের মুখোমূখী হয়। ইংরেজদের বিজয়ের প্রেক্ষাপটে তাদের ব্যাপক হতাশা, সর্বপ্নাবী অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যতে সম্পর্কে মারাত্মক নিরাশার প্লাবন দেখা দেয়। সরকার মুসলমানদের বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখতো, মুসলমানদের ব্যাপারে সরকারী তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বাভাবিক ও ব্যাপার। ফলে সরকারী চাকুরীসহ যেকোন কর্মকান্ডে মুসলমানদের অংশগ্রহণের সকল দরজা ছিল প্রায় রুদ্ধ। অথচ সাম্প্রতিক অতীতেই মুসলমানদের হাতে ছিল ক্ষমতার বাগডোর কিন্তু আজ তাঁদের ক্ষমতার অলিন্দ ও কর্মব্যবস্থার আশ পাশ থেকে পর্যন্ত দূরদূরান্তে নির্বাসিত করা হয়েছে নির্মম ভাবে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান অত্যন্ত সুক্ষ্ণ, সচেতন স্বভাবের অধিকারী ছিলেন।

তিনি স্বীয় দূরদৃষ্টির আয়নায় মুসলমানদের শৌর্য বীর্য ও ক্ষমতার সূর্য অস্ত মিত হবার দৃশ্য অবলোকন করলেন। মুসলমানদের এ করুণ অবস্থাদৃষ্টে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং স্বীয় চিন্তাধারার আলোকে এ পরিস্থিতির পরিবর্তনের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। তিনি ভাবলেন, যতদিন মুসলমানগণ উচ্চতর ইংরেজী শিক্ষা অর্জন না করবে, নিজেদের জীবন যাত্রার মান উন্নত করতে প্রয়াসী না হবে, জীবনযাপনের প্রণালী, লেবাস-পোষক ও জীবনাচারের মানসম্মত নেতৃত্বের রঙে রঙিন না হবে ততদিন পর্যন্ত না তাদের হীমন্যতা দূর হবে; আর না এদেশের বহিরাগত শাসকগণ তাদের সমীহ ও শ্রদ্ধার চোখে দেখবে। তাঁর চিন্তাধারা রূপায়ন ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি প্রতিষ্ঠা কররেন এই ইসলামী বিদ্যাপীঠ, যা ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়ে আলীগড় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। মুসলিম ইউনিভার্সিটি তার লক্ষ্যার্জনে সন্তোষজনক সাফল্য অর্জন করে। সারাদেশের বিপুল সংখ্যক সম্ভ্রান্ত, (Aristrocrate) স্বচ্ছল মুসলিম পরিবারের সন্তানেরা এ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে আসে এবং লেখাপড়া শেষে সরকারী উচ্চ থেকে উচ্চতর পদগুলোতে তাঁরা অধিষ্ঠিত হন। মুসলিম ইউনিভার্সিটি রাষ্ট্রের রাজনীতি বিশেষতঃ মুসলিম রাজনীতিতে পথনির্দেশক হিসেবে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে। এখান থেকেই উঠেছিল সর্বভারতীয় অভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক আন্দোলন, যার নেতৃত্ব সম্ভ্রান্ত ও সুশীল মুসলিম সমাজের হাতে। ভারত বিভাগের পরও আলীগড় ও মুসলিম ইউনিভার্সিটি স্বমহিমায় ও বিপুল বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে আজো। এতে নানা দিক এর প্রভূত উন্নতিও সাধিত হয়েছে। এতে সংযোজিত হয়েছে চিকিৎসা অনুষদ, প্রকৌশল অনুষদ ও আধুনিক নানা বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। মুসলমানদের সংশ্লিষ্টতা আছে এমন ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে এটি সর্ব বৃহৎ শিক্ষাঙ্গন। পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনায় এই ভার্সিটি অন্যান্য ভার্সিটির উপর প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 জামিয়া মিল্লিয়া দিল্লি

📄 জামিয়া মিল্লিয়া দিল্লি


আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির কতিপয় কৃতি ছাত্র খেলাফত আন্দোলনের সময় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক হয়ে যায়; তাঁরা ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন ; যার নামকরণ করা হয় 'জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া' যার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী (রহ.) পরে এটি দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। এই শ্রেণীটির নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহার (রহ.)। তাঁর অন্যতম সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন হাকীম আজমল খান মরহুম এবং ডা. মুখতার আহমদ আনসারী। এখানকার শিক্ষক মন্ডলীর দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও কুরবানীর মানসিকতা অনন্য ও ভাস্বর হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ ডা. জাকির হোছাইন খানের নেতৃত্বে (প্রাক্তণ রাষ্ট্রপতি গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত) এবং তাঁর বিজ্ঞ নির্দেশনায় এ প্রতিষ্ঠান প্রতিকূল ও বৈরী চিন্তার ভয়াবহ তুফান এবং জটিলতর সংকট মুকাবিলা করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয় সভ্যতা-সংস্কৃতি, জ্ঞান, শিক্ষার সাহিত্যের পরিমন্ডলে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বর্তমানে এটি কেন্দ্রীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিণত হয়। এতে মুসলিম ছাত্রের তুলনায় হিন্দু ছাত্রদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

📘 ভারতর্বর্ষে মুসলমানদের অবদান 📄 জামেয়া উসমানিয়া হায়দ্রাবাদ

📄 জামেয়া উসমানিয়া হায়দ্রাবাদ


জামেয়া ইসলামিয়া হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে উর্দুকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয় যা ভারতের জ্ঞান চর্চার ভাষা। আধুনিক জ্ঞান, দর্শন, হিকমাত, মনস্তত্ত্ব, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজ তত্ত্ব, ইতিহাসের এক বিশাল ভান্ডার, অন্যভাষা থেকে উর্দুতে অনুদিত হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন শাস্ত্রগত পরিভাষাগুলোর উর্দু রূপান্তর এবং প্রণয়নের কাজ আঞ্জাম দেয়ার মহান কর্তব্য সমাধা হয়ে যায়। অনুরূপভাবে এ প্রতিষ্ঠান উর্দু ভাষা শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভারতের কতিপয় সুযোগ্য শিক্ষকমন্ডলী এবং বিশেষজ্ঞ শাস্ত্রবিদ এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার খিদমত করেন।¹

পরিবর্তনের হাওয়া লেগে এটিও অন্যসব ইউনিভার্সিটির মত গতানুগতিক ও একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং উর্দুর পূর্বেকার সেই গুরুত্বও আর বাকী নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মুসলমানরা বিভিন্ন জায়গায় ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে কিছু স্বাতন্ত্রিক ব্যতিক্রম বাদে সাধারণতঃ সরকারী পাঠ্যক্রম ও বিষয়াদিই পড়ানো হয়। উত্তর ভারতের প্রায় প্রতিটি বড় শহরেই এ ধরণের ইন্টারমেডিয়েট ও ডিগ্রী কলেজ অবস্থিত। দক্ষিণ ভারত, মাদ্রাজ ও কেরালাতে অনেক মুসলিম কলেজ রয়েছে, যার মধ্যে মাদ্রাজের নিউ কলেজ, ট্রিচিনিপলীর জামাল মুহাম্মদ কলেজ, করনুলের উসমানিয়া কলেজ এবং ক্যালিকটের অদূরে ফারুক কলেজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে আজমগড়ের শিবলী কলেজও উল্লেখ করার মতো প্রতিষ্ঠান।

টিকাঃ
১. যথা মাওলানা সাইয়েদ মানাযির আহসান গিলানী (রহ.) চেয়ারম্যান- দ্বীনিয়াত বিভাগ, মাওলানা আবদুল বা'রী নদভী, শিক্ষক-দ্বীনিয়াত ও আধুনিক দর্শন, প্রফেসর ইলিয়াস বারণী, শিক্ষক- সমাজ বিজ্ঞান, ডা. খলিফা আবদুল হালীম, অধ্যাপক- আধুনিক শাস্ত্র, ড. মীর ওয়ালিউদ্দীন (দর্শন) ড. হামীদুল্লাহ্, (রাষ্ট্রনীতি), হারুন খান শিরওয়ানী ড. রকীবুদ্দীন সিদ্দিকী, (হিসাব বিজ্ঞান), ড. মুহিউদ্দীন কাদেরী জ্বর, (উর্দু), ড. সাইয়েদ আবদুল লতীক (ইংরেজী)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px