📄 জামেয়াতুল ফালাহ আজমগড়
একই মূলনীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে আজমগড়ের বলইয়ারগঞ্জে গড়ে উঠে জামেয়াতুল ফালাহ্। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে বিশেষ শিক্ষিত মহলের মনোযোগ বরাবরই সম্পৃক্ত। কচি-কাঁচা ছেলে-মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এখানে ব্যাপক ও সমৃদ্ধ ব্যবস্থাপনা রয়েছে। সাম্প্রতিককালেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জামেয়া ইসলামিয়া মুজাফফরপূর নামে আরেকটি মাদ্রাসা। এটি প্রচুর সম্ভাবনাময় একটি প্রতিষ্ঠান।
📄 দারুল উলুম ভূপাল
ভূপাল ভারতের বড় ধরণের শিক্ষা-দীক্ষার প্রাণকেন্দ্র ছিল। ১৯৪৮ সালে বিভিন্ন রাজ্যের ভারত ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির কারণে মনে হয়েছিল; শুধু ভূপাল নয় বরং পুরো মধ্যবর্তী অঞ্চলে (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) দ্বীনি শিক্ষার প্রদীপ নিভে যাবে কিন্তু ভাগ্যক্রমে কতিপয় দরদী, দূরদর্শী, আত্মপ্রত্যয়ী ওলামায়ে কেরামের সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়। ১৩৭৯ হিজরীতে মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নাদভীর (রহ.) (যিনি তৎকালীন বিচারপতি ও জামেয়া আহমদিয়ার প্রধান হিসেবে সেখানে অবস্থান করতেন) দিক নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মাওলানা ইমরান খান সাহেবের সাহস, ব্যাপক প্রচেষ্টা ও প্রয়াসে ভূপালের বৃহৎ পরিসর সম্পন্ন মসজিদ 'তাজুল মাসাজিদ'-এ নদওয়াতুল উলামার চিন্তাধারা এবং এরই পাঠ্যক্রম অনুসরণে দারুল উলূম নামক মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা মধ্য প্রদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাদ্রাসা এবং মাওলানা ইমরান খানের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়ে আসছে।
📄 আধুনিকশিক্ষার মুসলিম প্রতিষ্ঠান
দারুল উলূম দেওবন্দের পদ্ধতি অনুসৃত অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের বিপরীতে মুসলমানগণ আলীগড়, দিল্লি এবং হায়দ্রাবাদে বহু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম তরুণ-যুবকদের আধুনিক ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ, বিদেশী ভাষা শিক্ষা, সরকারী বিভিন্ন পদে অংশ গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনধারা ও সংস্কৃতিতে যথাযথ অংশ গ্রহণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এসব প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করা হয়।
📄 আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি
মুসলমানদের আধুনিক চিন্তা চেতনা, জাতীয় মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে সক্রিয় অংশ গ্রহণে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারতবর্ষের বৃহৎ আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বিশিষ্ট মুসলিম দিকপাল ও বরেণ্য শিক্ষাবিদ স্যার সৈয়দ আহমদ খান মাদ্রাসাতুল উলূম নামে এটা প্রতিষ্ঠা করেন, পরে তা সাধারণ সমাজে আলীগড় কলেজ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৭৫ সালে সিপাহী বিপ্লবের পর মুসলমানরা শিক্ষা, সংস্কৃতির পরিমন্ডলে বিপর্যয় ও পতনের মুখোমূখী হয়। ইংরেজদের বিজয়ের প্রেক্ষাপটে তাদের ব্যাপক হতাশা, সর্বপ্নাবী অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যতে সম্পর্কে মারাত্মক নিরাশার প্লাবন দেখা দেয়। সরকার মুসলমানদের বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখতো, মুসলমানদের ব্যাপারে সরকারী তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বাভাবিক ও ব্যাপার। ফলে সরকারী চাকুরীসহ যেকোন কর্মকান্ডে মুসলমানদের অংশগ্রহণের সকল দরজা ছিল প্রায় রুদ্ধ। অথচ সাম্প্রতিক অতীতেই মুসলমানদের হাতে ছিল ক্ষমতার বাগডোর কিন্তু আজ তাঁদের ক্ষমতার অলিন্দ ও কর্মব্যবস্থার আশ পাশ থেকে পর্যন্ত দূরদূরান্তে নির্বাসিত করা হয়েছে নির্মম ভাবে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান অত্যন্ত সুক্ষ্ণ, সচেতন স্বভাবের অধিকারী ছিলেন।
তিনি স্বীয় দূরদৃষ্টির আয়নায় মুসলমানদের শৌর্য বীর্য ও ক্ষমতার সূর্য অস্ত মিত হবার দৃশ্য অবলোকন করলেন। মুসলমানদের এ করুণ অবস্থাদৃষ্টে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং স্বীয় চিন্তাধারার আলোকে এ পরিস্থিতির পরিবর্তনের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। তিনি ভাবলেন, যতদিন মুসলমানগণ উচ্চতর ইংরেজী শিক্ষা অর্জন না করবে, নিজেদের জীবন যাত্রার মান উন্নত করতে প্রয়াসী না হবে, জীবনযাপনের প্রণালী, লেবাস-পোষক ও জীবনাচারের মানসম্মত নেতৃত্বের রঙে রঙিন না হবে ততদিন পর্যন্ত না তাদের হীমন্যতা দূর হবে; আর না এদেশের বহিরাগত শাসকগণ তাদের সমীহ ও শ্রদ্ধার চোখে দেখবে। তাঁর চিন্তাধারা রূপায়ন ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি প্রতিষ্ঠা কররেন এই ইসলামী বিদ্যাপীঠ, যা ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়ে আলীগড় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। মুসলিম ইউনিভার্সিটি তার লক্ষ্যার্জনে সন্তোষজনক সাফল্য অর্জন করে। সারাদেশের বিপুল সংখ্যক সম্ভ্রান্ত, (Aristrocrate) স্বচ্ছল মুসলিম পরিবারের সন্তানেরা এ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে আসে এবং লেখাপড়া শেষে সরকারী উচ্চ থেকে উচ্চতর পদগুলোতে তাঁরা অধিষ্ঠিত হন। মুসলিম ইউনিভার্সিটি রাষ্ট্রের রাজনীতি বিশেষতঃ মুসলিম রাজনীতিতে পথনির্দেশক হিসেবে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে। এখান থেকেই উঠেছিল সর্বভারতীয় অভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক আন্দোলন, যার নেতৃত্ব সম্ভ্রান্ত ও সুশীল মুসলিম সমাজের হাতে। ভারত বিভাগের পরও আলীগড় ও মুসলিম ইউনিভার্সিটি স্বমহিমায় ও বিপুল বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে আজো। এতে নানা দিক এর প্রভূত উন্নতিও সাধিত হয়েছে। এতে সংযোজিত হয়েছে চিকিৎসা অনুষদ, প্রকৌশল অনুষদ ও আধুনিক নানা বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। মুসলমানদের সংশ্লিষ্টতা আছে এমন ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে এটি সর্ব বৃহৎ শিক্ষাঙ্গন। পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনায় এই ভার্সিটি অন্যান্য ভার্সিটির উপর প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।